ফিচারটি যতবার পড়া হয়েছেঃ 2,237

নিশ্চিতভাবেই বাঁহাতিদের নিয়ে এসব তথ্য আপনি জানতেন না!

Ad

বাম হাতের জাদু দেখিয়ে মুস্তাফিজুর রহমান যখন উইকেটের পরে উইকেট নেয়, তখন বাসায় বসে ঠিকই হাততালি দেন। কিন্তু নিজের সন্তান যদি বাম হাতে লেখে বা খায়, তখন তাকে ধমকে সিধে করেন এরকম মানুষের অভাব এই দেশে নেই! কত হাজার বামহাতি বাচ্চাকে বাবা মা’র চাপে পড়ে ছোট বয়সেই নিজের জিনগত অভ্যাসখানা পাল্টিয়ে ডান হাতে লেখা এবং ভাত খাওয়া অভ্যাস করতে হয়েছে তাঁর ইয়ত্তা নেই! আসলে এই দেশে না শুধু- ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সারা বিশ্বেই “Southpaw” বা বাম হাতিদের একটু বাঁকা চোখেই দেখা হয়ে এসেছে আদিমযুগ থেকেই! আজ জানবো বাঁহাতিদের সম্পর্কে বিচিত্র অনেক তথ্য। 

এই বিশ্বে ১০-১২% মানুষ জন্ম নেন, যারা জন্মগত বাঁহাতি! ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে ৪% অধিক হারে বাঁহাতি হয়ে জন্ম নেয়। সাধারনদের চাইতে জমজ বাচ্চাদের মধ্যে বাঁহাতি বাচ্চাদের জন্ম বেশি দেখা যায়। এমনকি মেডিকেল সায়েন্সের মতে এটাও মনে করা হয় যে- জমজ নয়, এমন বাঁহাতি বাচ্চারা আসলে ভ্রুনাবস্থায় আরেকটা জমজ বাচ্চার সাথেই মায়ের পেটে আসেন, যে অপর ভ্রুনটা পরবর্তীতে নষ্ট হয়ে যায়! LRRTM1 জিনটি বাচ্চাদের বাঁহাতি হবার জন্য দায়ী!

অর্থাৎ বাচ্চা বাঁহাতি বা ডানহাতি হোক, এটা পুরোপুরিই প্রকৃতিপ্রদত্ত জৈবিক ব্যাপার! কিন্তু আদিযুগ থেকেই প্রায় সকল ধর্ম-সংস্কৃতিতেই বাঁহাতি দের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়েছে এবং হয়ে আসছে!সামাজিক, শিক্ষাগত, ধর্মীয় নানা প্রতিষ্ঠানেই বাঁহাতিদের নানা বৈষম্যর শিকার হতে হয়। “বাম” শব্দটিই আসলে নেতিবাচক! বাঁহাতিদের ইংরেজী “Left” শব্দটি এসেছে অ্যাংলো স্যাক্সন “Lyft” থেকে, যার অর্থ দুর্বল অথবা নষ্ট। জার্মান ভাষায় বাঁহাতিদের বলা হয় “linkisch” যার অর্থ অলস! ইটালিয়ান পরিভাষায় সেটা “mancino” অর্থাৎ “কুটিল”!
ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বাঁহাতে কাজ করার স্বভাবজাত প্রবনতাকে দেখা হয়েছে খারাপ স্বভাব, শয়তানের চিহ্ন, মানসিক বিকৃতির লক্ষন, বিদ্রোহ, অপরাধপ্রবনতা এমনকি সমকামিতার প্রতীক হিসেবেই! বিভিন্ন প্রিমিটিভ কালচারে তাদের রাক্ষস, জাদুকর, শয়তানের শিশ্য, অশুভ লক্ষন আনয়নকারী হিসেবে দেখা হয়েছে! স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের সময় বাঁহাতিদের উপর নির্যাতন চালানো হতো। অ্যাংলো, এপিসকোপালিয়ান, ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলামধর্মেও ডান হাতে কাজ করার উপর ভালমতো জোর দেওয়া হয়েছে! ইহুদি যাজক মাইমোনাইডাস (১১৩৫-১২০৪) ইহুদি যাজকদের যে ১০০ টি অযোগ্যতা বা অপরাধ তালিকাভুক্ত করেছিলেন তাদের মধ্যে একটি ছিল বাঁহাতি হওয়া! বাইবেলে ডানহাতি দের কথা উল্লেখ আছে ১০০ বার, বাঁহাতিদের কথা উল্লেখ আছে ২৫ বার (এবং সেগুলিও নেতিবাচক ভাবে লেখা)! ইসলামধর্মেও বাঁহাতে খাদ্যগ্রহন নিষেধ আছে।
 
শুধু ধর্ম বা সমাজ নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানও বাঁহাতিদের প্রতি তেমন সদয় না! গবেষণায় দেখা গেছে- বাঁহাতিরা অটিজম, ডিসলেক্সিয়া, তোতলানো, ক্রন’স ডিজিজ, আলসারাইটিভ কোলাইটিস অথবা মেন্টাল ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয় বেশী। বাঁহাতিরা অ্যালকোহলিক, সিজিওফ্রেনিক হয়ে যায় বেশি! তারা এলার্জি আর অ্যাজমায় আক্রান্ত হয় বেশি! নবজাত শিশুদের স্বাস্থ্য বিচার করা APGAR Test-এ বাঁহাতিরা ডানহাতিদের তুলনায় কম স্কোর করে! পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে বাঁহাতিদের ভুগতে বেশি দেখা যায়!

অনেক তো ভয়াবহ ভয়াবহ তথ্যই দিলাম বাঁহাতিদের বৈশ্বিক, ঐতিহাসিক এবং সামাজিক মর্যাদা নিয়ে! তো যে বাঁহাতিরা এসব পড়ে মুখ গোমড়া করেছেন বা যেই মেজরিটি “ডানহাতি”রা মুচকি মুচকি হাসছেন, তাদের জন্য বাঁহাতি হবার কিছু ভালো ভালো দিক বর্ণনা করি-

১/ সেন্ট লরেন্স ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় জানা যায় যে  ১৪০+ আইকিউধারী (যাদের আইকিউ স্কেলে “জিনিয়াস” ধরা হয়!) মানুষ বাঁহাতিদের মাঝেই বেশি, ডানহাতিদের মাঝে তুলনামুলক কম!

২/ গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁহাতি রা তুখোড় দৃষ্টিশক্তি এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন হয়। গনিত, প্রকৌশলবিদ্যা ইত্যাদিতে তাদের দখল ডানহাতিদের চেয়ে বেশি দেখা যায়! বাঁহাতিদের মাঝে মস্তিষ্কের ডান এবং বাম অংশের ভিতরে সমন্বয় ঘটাবার ক্ষমতা ডানহাতিদের চেয়ে বেশি দেখা যায়, অর্থাৎ এরা একই সাথে অনেক কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে পটু হয়!

৩/ আলবার্ট আইনস্টাইন আইজ্যাক নিউটন, চার্লস ডারউইন, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, বারাক ওবামা বাঁহাতি! ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের বেশিরভাগ সদস্য বংশানুক্রমিকভাবে বাঁহাতি!
(অবশ্য এতো খুশি হওয়ার কিছু নাই! বোস্টন স্ট্র্যাংলার, জ্যাক দা রিপার, ওসামা বিন লাদেনের মতো কুখ্যাত সিরিয়াল কিলাররাও কিন্তু বাঁহাতি ছিলেন হে হে হে….!! )

৪/ গবেষণায় দেখা গেছে, একজন বাঁহাতির “ডমিনেন্ট হ্যান্ড” যদি কোন কারনে অকেজো হয়ে যায়, তাহলে তারা ডানহাতিদের চেয়ে দ্রুত সময়ে নিজেদের অপর হাতের ব্যবহার শিখতে পারে!

৫/ বাঁহাতি দের ফাইটিং স্টাইল “ব্যাতিক্রম” হয় বলে হ্যান্ড টু হ্যান্ড ফাইটে তারা সুবিধা পায় বেশি!

৬/ সুইট একটা তথ্য দেই, বিবাহের আংটি বাঁহাতে পড়ানো হয়, কারণ লোকে বলে, “lover’s vein” (আসল নাম vena amoris) নামক একটি শিরা বাহাতের অনামিকা থেকে সরাসরি হৃৎপিণ্ডে সংযোগ ঘটায়… (আহা!)
 
৭/ সমস্ত কালচারেই যে বাঁহাতিদের খারাপ চোখে দেখা হতো, তা কিন্তু নয়। দক্ষিন আমেরিকার ইনকা সাম্রাজ্যের লোকেরা বাঁহাতিদের “চিকিৎসক” হিসেবে দেখতেন, জুনি উপজাতিরা দেখতেন সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে!

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (4 votes, average: 3.25 out of 5)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad