“আপনি চাইলে অল্প কিছু মানুষকে অনেক লম্বা সময়ের জন্য বা অনেক মানুষকে অল্প সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু আপনি কখনই অনেক লম্বা সময়ের জন্য অনেকগুলো মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখতে পারবেন না” – বিখ্যাত এই বাণীটি দিয়েছিলেন মহান মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। কিন্তু এই কথাটা কতটুকু ভুল হতে পারে তা দেখিয়েছেন আরেক মার্কিন, বার্নার্ড লর‍্যান্স ম্যাডফ! প্রায় আটাশ বছর ধরে উনি আমেরিকার প্রশাসনের নাকের ডগার উপর দিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ধাপ্পাবাজি করে গেছেন।

২০০৮ সালে নিজে ধরা দেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন নিউ ইয়র্ক ওয়াল স্ট্রিটের অন্যতম বৃহত্তম স্টক মার্কেট কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও NASDAQ স্টক মার্কেট সহ অসংখ্য শেয়ার বাজার সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান সহ বহু উঁচুউঁচু পদে! অথচ কেউ কিচ্ছুটি বুঝতে পারেনি অথচ এই লোক আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধাপ্পাবাজি টা করেছিলেন যার পরিমান ৬৪.৮ বিলিয়ন ডলার! এবং এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো ৪৮০০ ক্লায়েন্ট যারা তাকে বিশ্বাস করে তার কোম্পানিতে টাকা ইনভেস্ট করেছিলো।

কিভাবে এটা হলো? ব্যাপারটা আসলে সবই ফাঁকা বুলি আর চাপার জোরের খেলা। “উলফ অফ দ্য ওয়াল স্ট্রিট” নামক মুভিটা কেউ দেখে থাকলে ধারণাটা পাওয়ার কথা। মানুষ অধিক লাভের লোভে নিজের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের টাকা বিভিন্ন ব্রোকার হাউজদের কর্মীদের মিষ্টি কথায় পটে গিয়ে নানা ধরণের কম্পানিতে ইনভেস্ট করে যাদের “অনেক সম্ভাবনা”। শুরুতে দেখা যায় তাদের প্রচুর লাভের গল্প শোনানো হয়, এতে তারা প্রলুব্ধ হয় আরো ইনভেস্ট করতে। আরো বেশি লোভের আশায়।

এখন এই লাভ, নতুন ইনভেস্ট সবই কাগজে কলমে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এগুলোর কোন অস্তিত্বই না থাকতে পারে। সত্যি সত্যি টাকা গুলো নিয়ে কোথাও ইনভেস্ট করে তাদের লভ্যাংশ ফিরিয়ে দেওয়া হবে, এটাই নিয়ম। কিন্তু যদি সত্যিকারের টাকা নিয়ে কাগজের সংখ্যার লাভ, ভার্চুয়াল লেনদেন দেখানো হতে থাকে তাহলে হঠাৎ একদিন সকালে কোন “কাগজে কলমে” মাল্টিমিলিওনিয়ার হঠাৎ আবিষ্কার করতে পারেন, তিনি আসলে দেউলিয়া। তার ধনসম্পদের কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই! ঠিক যেমনটা হয়েছিলো বার্নি মেডফ পুলিশের কাছে আত্মসমার্পণ করার পরে। হাজার হাজার মানুষ, বেশকিছু প্রতিষ্ঠান মূহুর্তে রাস্তায় বসে গেলো! 

জালিয়াত, অর্থ জালিয়াতি, বার্নার্ড লরেন্স ম্যাডফ

মেডফ পরিবারের অনেকেই তার কোম্পানিতে কাজ করতো। তার দুই ছেলে মার্ক ও এন্ড্রু, ভাই পিটার, ভাতিজি সানা ইত্যাদি। কিন্তু বার্নি নিজে ও তার দুই ছেলে, স্ত্রী, ভাই সবাই’ই দাবী করব এসেছে, এই ভয়াবহ প্রতারণা বার্নির একান্তই একার ও নিজের ছিলো। সে ফ্যামিলির কাউকেই জড়ায়নি, শুধু তার কিছু বিশ্বস্ত ডান হাত ছাড়া। স্বভাবতই মিডিয়া ও সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করেনি।

২০০৮ সালের ১০ ডিসেম্বর বার্নি তার দুই ছেলের কাছে সব কনফেস করার আগে ম্যাডফ ফ্যামিলি ছিলো মহাসুখে। ইহুদি বাপ মায়ের সন্তান ম্যাডফ পলিটিকাল সায়েন্স ও আইন নিয়ে পড়লেও ১৯৬০ এর দিকে প্রথম ওয়াল স্ট্রিটে “Bernard L. Madoff Investment Securities LLC” নামে ফার্ম খুলে। সে স্কুল জীবনের প্রেমিকাকে বিয়ে করেছিলো। প্রথমে নিজের জমানো ৫ হাজার ডলার দিয়ে শুরু করলেও পরে শ্বশুর থেকে ৫০ হাজার ডলার লোন নেয়। তার বানানো সেই কোম্পানি একসময় পুরো আমেরিকার সবচেয়ে বড় ইনভেস্টমেন্ট ফার্মে পরিণত হয় আর বার্নি ম্যাডফ হয়ে যায় লিজেন্ড, আইডল। অথচ ১৯৮০ সাল থেকেই সে সত্যিকারের ট্রেডিং, ব্যবসা বাদ দিয়ে মানুষের ইনভেস্ট করা টাকা নিজের কাছে রেখে ভুয়া লেনদেন দেখানো শুরু করে।

মজার ব্যাপার হলো, কেউ যে টের পায়নি একদম তা না। অল্প সময়ে অনেক লাভের লোভে পরে অনেক মানুষ ম্যাডফ কোম্পানিকে নিজেদের টাকা দিলেও বড় বড় কোম্পানি, ইনভেস্টেটররা কখনই তাদের সাথে জড়ায়নি। অনেকেই সন্দেহ করতো, কিছু একটা ঘাপলা আছেই। এমন কি ম্যাডফ কোম্পানি যে লাভের কথা বলে তা সায়েন্টিফিকালি সম্ভব না, এমন দাবীও তোলা হয়। কিন্তু বার্নি ম্যাডফ মোটামুটি ওয়াল স্ট্রীটের দেবতাতূল্য কেউ একজন হয়ে গেছে, অনেক বড় বড় সিনেটর, ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদেরা অনুদান পেতো তার পকেট থেকে, তার বিরুদ্ধে কিছু করার সাধ্য কার? 

জালিয়াত, অর্থ জালিয়াতি, বার্নার্ড লরেন্স ম্যাডফ

তবুও হ্যারি মার্কোপোলোসের জন্য খারাপ না লেগেই যায় না। এই ফিনান্সিয়াল এনালিস্ট একবার দুইবার না, ১৯৯৯, ২০০০, ২০০১, ২০০৫, ২০০৬ সালে পাঁচ পাঁচবার এই মানুষটা SEC (যাদের দায়িত্ব এধরনের জালিয়াতি যেন না হয় তা নজরে রাখা) কে সতর্ক করেছিলেন। তাদের নজরে আনার চেষ্টা করছিলেন, সামথিং ইজ সিরিয়াসলি রং! কিন্তু নানা ভাবে ম্যাডফ নিজেকে ধরা খাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে যেতে থাকে, কখনও তাদের অবহেলায়, কখনই নিছকই ভাগ্যের গুনে। তারপর ২০০৮ সালে যখন ম্যাডফ নিজেই ধরা দিলো তখন SEC এর তুমুল সমালোচনা হয় আর সেই মার্কোপোলোস “কেউ শোনেনা” (No one would listen) শিরোনামে মনের দুঃখে বই লিখে ফেলেন!

যাই হোক, ম্যাডফ তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ স্বীকার করে নেয়। তার ১৫০ বছরের জেল দেওয়া হয়। কিন্তু এতেই শেষ না। এই বার্নি ম্যাডফের মধ্যে কোন অনুশোচনা ছিলো না। যারা অধিক লাভের লোভে পরে তাকে নির্দ্বিধায় টাকা দিতো তাদের জন্য তার কোন অপরাধবোধ ছিলো না। কিন্তু এত গুলো মানুষের সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়া, এতগুলো পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অভিশাপের ছোবল ছিলো মারাত্মক। তার নিজের বিভিন্ন সম্পত্তি, বাড়ি গাড়ি, জায়গা জমি, বিলাস দ্রব্য সব বিক্রি করেও সব টাকা উদ্ধার করা যায়নি। তার দুই ছেলের বড় জন মার্ক- মানুষের ক্রমাগত ঘৃণা, মিডিয়ার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে। ছোট ছেলে এন্ড্রুও বেশিদিন বাঁচেনি। সে মারা যায় ক্যান্সারে ভুগে। অথচ দুই ভাই’ই তাদের বাবার কারণে একসময় খুব বিলাসবহুল জীবন যাপন করছিলো। কিন্তু ঐ যে কথায় আছে, পাপ তার বাপকেও ছাড়ে না। আর এক্ষেত্রে বাপের পাপে ছেলে তো বটেই, বার্নার্ড ম্যাডফের কাছাকাছি সবাইকেই কম বেশি ভুগতে হয়েছে।

কিন্তু আরেকটা কথাও এই সাইকোপ্যাথ প্রমাণ করে দিয়েছে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে! ১৫০ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত ম্যাডফ আরেক কয়েদির সাথে প্রথমে মারামারি করে ভালই একচোট আহত হয়েছিলো। তারপর টিভির চ্যানেল বদলানোকে কেন্দ্র করে আবার ঝামেলায় জড়িয়ে এখন কার্মাইন পার্সিকো নামে জেলের আরেক কয়েদির সাথে বন্ধুত্ব করেছে যে আসলে এক কলম্বিয়ান মাফিয়া ডন!

Comments
Spread the love