রিডিং রুমলেখালেখি

আমি পৃথিবীর সর্বশেষ মানুষ বলছি…

হ্যাঁ, আমি রিহি। পৃথিবীর সর্বশেষ মানুষ। আমি কেন লিখছি, কার কাছে লিখছি আমি জানিনা। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যে আমার লিখে রেখে যাওয়া দরকার। লিখে রেখে যাওয়া দরকার পৃথিবীর সর্বশেষ ইতিহাসটুকু। আমি এখন যেখানে লুকিয়ে আছি সেখানে কতক্ষণ নিরাপদ থাকতে পারবো জানি না। তাই আমার খুব দ্রুত লিখতে হবে। খুব দ্রুত…

***

আমরা এখন বাস করছি ৩০১৮ সালে। এটা কোন মাস বলতে পারবো না কারণ মাসের হিসেব রাখা আমরা ভুলে গিয়েছি অনেক বছর হল। কেবল আমাদের গোত্রের এক বৃদ্ধ সন্ত কাস্পিয়ান আমাদের জানিয়ে যায় এটি কোন বছর চলছে। আমাদের বাস এখন এশিয়ার সর্ববৃহৎ ওয়েস্টল্যান্ড BISP এ। দাদুর কাছে শুনেছি Bangladesh, India, Srilanaka, Pakistan নামের ৪ টি দেশ মিলিয়ে এই ওয়েস্টল্যান্ড তৈরি করা হয়েছিল। ওয়েস্টল্যান্ড হচ্ছে সেই ভূমি যেখানে আবর্জনা মজুদ করা হতো। পৃথিবীতে আবর্জনা বিগত সহস্রাব্দ থেকে এতোটাই বেড়ে গিয়েছিল যে দেশের পর দেশ, মহাদেশের পর মহাদেশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ওয়েস্টস্টর্ম আর এসিড বৃষ্টিতে। এখন কেবল পৃথিবী বলতে ৩ টি ওয়েস্টল্যান্ডই। এই ৩ ওয়েস্টল্যান্ডের যুদ্ধ ও বিগ্রহের মাঝেই টিকে আছে আজকের পৃথিবী। BISP, BACA (Brazil, Argentina, Canada, America) আর RARCTIC (Russia, Arctic Ocean)

আমরা সাধারণেরা বাস করি মমিফাইড হওয়া আবর্জনার খাঁজ কেটে বানানো ঘরগুলোতে। আর যারা গোত্রের নেতৃত্বে থাকে তাদের জন্য কৃত্রিম অক্সিজেনের তাবুঘর করে দেয়া হয়। আমাদের পরনের পোশাক ভারী পলিথিনের তৈরি আর মুখে সর্বদা একটি মাস্ক তো নিত্যসঙ্গী। মাঝে মাঝে কাস্পিয়ান সন্তের কাছে গিয়ে আগের পৃথিবীর গল্প শুনি। আগে নাকি মানুষ মাস্ক ছাড়া প্রাকৃতিকভাবেই নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নিতো, বিশুদ্ধ পানির বৃষ্টিতে ভিজতো দলবেঁধে, ঘাসের চাদরে বসে আকাশ দেখতো। আমি এসব শুনতাম আর স্থির কালো মেঘের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এই মেঘগুলো ফুঁরেই এককালে বৃষ্টি হতো, অথচ এখন এই মেঘগুলোই স্থির-জমাটবাঁধা। এখনো মনে আছে মাস্ক খুলে একবার নিঃশ্বাস নেবার চেষ্টা করতে গিয়ে প্রায় মৃত্যুশয্যায় চলে গিয়েছিলাম। হঠাৎ হঠাৎই আমাদের এলাকায় হামলা হতো। আমাদের চিরশত্রু ছিল BACA ল্যান্ডের অধিবাসীরা। কারণ সে ওয়েস্টল্যান্ডের সকল অধিবাসীই সাইবর্গ। তারা পুরো পৃথিবীর ওপর দখলদারি চায়, মানুষকে তাদের অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। RARCTIC ল্যান্ডের প্রায় অর্ধেকটাই দখল করে নিয়েছে তারা। মানুষ মেরে তাদের সাইবর্গে রূপান্তরিত করে তাদের যুদ্ধে ব্যবহার করাই BACA ল্যান্ডের কাজ। কাস্পিয়ান সন্ত একবার বলেছিল পৃথিবীতে কেবল আর চারশ মানুষই জীবিত আছে। সে সংখ্যাও দিনদিন কমছে এসব যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে।

আমাদের গোত্রের চার হাজার অধিবাসীর মাঝে ২০০ জনই কেবল মানুষ। বাকিরা সব বুদ্ধিসম্পন্ন রোবট। এসব রোবটগুলোকে আমরাই বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার করে মর্যাদা দিয়েছি। তারাই আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে। আমি অবশ্য মানুষের চেয়ে ভিন্ন কিছু ভাবি না তাদের। ছোটবেলা থেকেই রি, পিকে, আভাদের (এরা সবাই রোবট) কাছে বড় হয়েছি আমি। আমাদের অস্ত্রচালনার শিক্ষা দেয়া হয় ছোটবেলা থেকেই। যুদ্ধের সিমুলেশন দেয়া হয় কৈশোরে এসে। সেখানে আমরা পাশ করতে পারলে তবেই আমাদের একেকটা রোবট প্লাটুনের দায়িত্ব দেয়া হয়। সম্প্রতি খবর এসেছে যে BACA গোত্রের যোদ্ধারা অনেক কাছে চলে এসেছে আমাদের। প্রস্তুতি নিতে বলে দেয়া হয়েছে সকলকে। আমি এই খবর শোনার পরই অন্যমনস্ক হয়ে যাই। মনে হতে থাকে যে কী লাভ এভাবে বেঁচে থেকে। মাঝে মাঝে ভাবি আমরাই কি পৃথিবীর এই অবস্থার জন্য দায়ী না? কাস্পিয়ান সন্ত অন্তত তাই মনে করে। তার মতে মানুষই পৃথিবীকে ধ্বংস করেছে। সবুজ গাছপালা তারা কেটে ঢেকে দিয়েছে কংক্রিটের স্তরে, নদীনালা ভরাট করেছে আবর্জনাতে, আকাশকে ঢেকে দিয়েছে বড় বড় ইমারতে। তারপর যখন উঁচুতে উঠতে উঠতে মুখ থুবড়ে পড়েছে তখন আর দাঁড়ানোর মতো শক্তি ছিল না। তবুও সার্ভাইভ করে টিকে আছে মানুষ, আর কদিন থাকতে পারবে জানা নেই। সবার চোখেমুখে এখন যুদ্ধের নেশা, যেকোনো অবস্থাতেই বেঁচে ফিরতে হবে। পৃথিবী মানুষছাড়া হবে এমনটা কেউ কল্পনাতেই আনতে পারছে না…

এতক্ষণ অতীতের ঘটনা লিখলাম। অতীতের ঘটনা লেখার কারণ অতীতটাই ইতিহাস, বর্তমানটা বাস্তবতা। আমরা যুদ্ধ করেছিলাম সে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছি এটাও বাস্তবতা। আমাদের সকল রোবটদের বিকল করে সকল মানুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এটাই সত্যি। আমার সামনেই কাস্পিয়ানকে হত্যা করা হয়েছে এটাও সত্যি। এতোকিছুর পরেও আমি কাস্পিয়ানের তাঁবুতে লুকিয়ে তার রেখে যাওয়া কাগজ আর তার শিখিয়ে যাওয়া অক্ষরজ্ঞান দিয়ে লিখে যাচ্ছি। কাস্পিয়ান সবসময় বলতো- তুমি যা জানো, তা আরও দশজনকে জানাও। তাহলেই না তোমার জানার সার্থকতা। আমার লেখার কারণটা হয়তো তাই। আরও মানুষকে না জানিয়ে যেতে পারি কিন্তু এই পৃথিবী আগামীতে যাদের হচ্ছে তাদের মধ্যে কেউ যদি পৃথিবীকে আগের রূপে দেখতে চায় তাকে তো আমার জানিয়ে যাওয়া উচিত। তাই হ্যাঁ, যে আমার লেখাটি পড়বে তাকেই বলে যেতে চাই একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে যেও তুমি। যে পৃথিবীতে সবুজ গাছপালা জন্মাবে আবার, আবর্জনার স্তুপের ফাঁক গলে মিষ্টি রোদ চুয়ে পড়বে, যে পৃথিবীতে বৃষ্টি হবে প্রেয়সীর সাথে ভেজার জন্য, যে পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নেয়া যাবে বুকভরে। হয়তো আমরা মানুষেরা থাকবো না সেটি দেখার জন্য, আমরা সেই পৃথিবী দেখাটা আসলে ডিজার্ভও করি না। আমাদের হাত ধরে যে প্রকৃতির ধ্বংস, সে প্রকৃতি ফিরে আসুক তোমাদের হাত ধরে। আমার লেখা এই কাগজের ভাঁজে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের বীজ রেখে গেলাম। কাস্পিয়ান অনেক যত্ন করে আগলে রেখেছিল আদি পৃথিবীর এই নিদর্শনকে। তুমিও আগলে রেখো…

***

৩১১৮ সাল,
BACA GreenLand City,
BACA.

ছোট ছোট শিশু সাইবর্গদের ভিড় BACA মিউজিয়ামের সামনে। তাদের স্কুল থেকে আজ নিয়ে আসা হয়েছে সবুজ বনায়ন ও অক্সিজেন নিষ্কাশনের ওপর জ্ঞান দেয়ার জন্য। রিহি স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুটতে ছুটতে ঢুকে পড়লো মিউজিয়ামের ভেতর। মিউজিয়ামের ঠিক মাঝখানে বিশালকায় এক কৃষ্ণচূড়া গাছ। সকলের অবাক দৃষ্টি সেই গাছের দিকে। যদিও এমন গাছ এখন শহরের মোড়ে মোড়ে কিন্তু কোনটাই এতো বড় না। এই গাছে লালরঙা ফুল থরেথরে সাজানো যেন। গ্লাসরুমের ভেতরে থাকা ট্রি এরিয়াতে ঢুকে সবাই অনুভব করলো যে এক পশলা ফ্রেশ অক্সিজেন যেন গলগল করে ঢুকে গেলো তাদের বায়োমেকানিক্যাল বডিতে। রিহি উঁচুতে তাকিয়ে দেখে গাছের পাশে হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে একজনের ছবি, তার নামও রিহি। এই রিহিই পৃথিবীর সর্বশেষ মানুষ ছিল। তার দেয়া গাছের বীজ ও সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্নই তো পুরো পৃথিবীকে আবার বাঁচিয়ে তুলেছিল। তার সম্মানেই এখন সাইবর্গ বাবা-মারা বেশিরভাগই তাদের ছেলেমেয়েদের নাম রিহি রাখছে। তবে রিহির কপাল ভালো যে তার ক্লাসে অন্তত আর কোন রিহি নেই। রিহি গ্লাসে গাল সেটে দেখতে লাগলো সে অদ্ভুত সুন্দর গাছটিকে। একটি প্রজাপতি তার চোখের সামনে দিয়েই উড়ে গিয়ে একটি ফুলের ওপর বসলো। রিহির মুখ দিয়ে অস্ফুটভাবে বের হল- কী সুন্দর!

THE END

আজ EARTH DAY 2018 এ চলুন একটি প্রতিজ্ঞা করি। পৃথিবীকে ততটাই ভালবাসবো যতটা আমরা নিজেরা নিজেদের বাসি। তাহলেই আবর্জনা ফেলা, পানি-গ্যাস অপচয় করা, গাছ কাটা, ইত্যাদি থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারবো। আমরা যদি রাখি ভালো তবেই থাকবে ভালো পৃথিবী।

(লেখাটি রকমারির মেইল ক্যাম্পেইনে ব্যবহৃত হয়েছে)

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close