সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের হামলা বা আক্রমণ ক্রমশই যেন অতি সাধারণ একটি ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। এর আগেও এ বছর ২৩শে জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের উপর, আর গত মাসে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর অতর্কিতে হামলা চালায় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনটি। তারই ধারাবাহিকতায় আরও একবার নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করল তারা। এবার অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কিংবা রাজধানী ঢাকায় নয়। বরং এবারের ঘটনাস্থল কুমিল্লা।

‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থী বহনকারী বাস, স্টাফ বাসসহ বেশ কয়েকটি বাসে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে কুমিল্লা সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।’ একটি জনপ্রিয় নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদের প্রথম লাইন এটি। এখানে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ শব্দযুগল আলাদা করে নজর কাড়ে। অর্থাৎ ছাত্রলীগ আজকাল আর সাধারণ কায়দায় হামলা বা আক্রমণ চালাচ্ছে না। তাদের হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা বিশেষণে বিশেষায়িত করতে হচ্ছে সংবাদকর্মীদের!

তো কীভাবে এই সন্ত্রাসী হামলার সূত্রপাত? আর কী কারণেই বা এমন সন্ত্রাসী হামলা?

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে, গতকাল (১৩ মে, রবিবার) বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে পুলিশ লাইন এলাকায় পৌঁছলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বহনকারী একটি বাস থামান কুমিল্লা সরকারি কলেজ শাখা ও মহানগর ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। তারা শিক্ষার্থীদের বাস থেকে নেমে যাওয়ার জন্য বলেন। শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলে তারা লাঠিসোঁটা দিয়ে বাসের দরজা জানালা ও সামনের কাচ ভেঙে ফেলেন। তখন দু’পক্ষের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কমপক্ষে ১০ জন আহত হন।

ছাত্রলীগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রলীগের হামলা

তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সংবাদ ঘেঁটে আরও যা জানা যাচ্ছে, তাতে সম্ভবত বাস থেকে নেমে যেতে বলা, আর তাতে রাজি না হওয়াই এ ধরণের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের মূল কারণ নয়। সকালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে মানববন্ধন হয় নগরীর কান্দিরপাড়ে। ওই সময় সরকারি কলেজের কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মীর সাথে মানববন্ধনে অংশ নেয়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর কথা কাটাকাটি হয়। এ ঘটনার জের ধরেই নাকি বিকাল ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলো শহরে পুলিশ লাইন এলাকায় পৌঁছালে নিকটস্থ সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের প্রায় অর্ধ-শতাধিক নেতাকর্মী রড-লাঠি-রামদা নিয়ে কুবি শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসের ওপর হামলা করেন। শিক্ষার্থীরা দৌড়ে এদিক-সেদিক ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

পরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা কুমিল্লা সরকারি কলেজের ভেতর ঢুকে পড়েন। এ সময় বিক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কলেজে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। একই সময়ে পুলিশ লাইনস এলাকার কয়েকটি দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়। শিক্ষার্থীদের বাসে ভাঙচুরের ঘটনা পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়লে নগরের ঝাউতলা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি বাসে হামলা চালানো হয়। তখন ক্যাম্পাস থেকে শহরগামী অন্যান্য রুটের আরও চারটি বাস সড়কের মধ্যে থেমে যায়। তখন নগরের বিভিন্ন সড়কেও যানজট সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ লাইনস এলাকায় পুলিশ এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পুলিশ লাইনস এলাকার পশ্চিম পাশে অবস্থান নেন। অন্যদিকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা কুমিল্লা সরকারি কলেজ ফটকের ভেতর মুখোশ পরে লাঠিসোঁটা ও রড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন ককটেলের বিস্ফোরণ হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তিনটি কাঁদানে গ্যাসের সেল নিক্ষেপ করে।

ছাত্রলীগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রলীগের হামলা

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কুমিল্লা জেলা আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম হানিফ জানান, ছাত্রলীগের কুমিল্লা সরকারি কলেজ ও মহানগর শাখার কয়েকজন নেতা এই হামলার সঙ্গে জড়িত। আমরা এই হামলার বিচার চাই। কোটা সংস্কার আন্দোলন করার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর এই হামলা করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

দুঃখের বিষয় হলো, এ ঘটনায় নগরব্যাপী অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শী থাকলেও, এবং দেশের প্রায় সকল সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে মূল ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ প্রকাশিত হলেও, সরাসরি দায় অস্বীকার করেছেন কুমিল্লা মহানগর ছাত্রলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক নাঈমুল হক। এবং তিনি দোষ চাপিয়ে দিয়েছেন আক্রমণের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীদের উপরই। তিনি বলছেন, বাসটি থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এরপরই নাকি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন!

এ ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রয়েছে পুলিশেরও। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুলিশ নাকি এ ঘটনায় ছাত্রলীগের পক্ষ নিয়ে তাদের উপর হামলা চালিয়েছে। ঘটনার বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজেও পুলিশকে কেবল একপাক্ষিক আচরণ করতেই দেখা যাচ্ছে। তবে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবু ছালাম মিয়া বলেন, পুলিশ কারও পক্ষ নেয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য কর্তব্য পালন করেছে।

ছাত্রলীগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রলীগের হামলা

অপরদিকে সংঘর্ষ এবং আহতের কথা নিশ্চিত করলেও এসবের সঙ্গে ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন কুমিল্লার(উত্তর) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, পুলিশ লাইন মোড়ে হঠাৎ করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে হামলা চালায় ৭-৮ জন। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বাস থেকে নেমে যান এবং হামলাকারীদের ধাওয়া করেন। এসময় দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিয়ন্ত্রণ আনতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।

সামগ্রিক ঘটনা, আর এ সংক্রান্ত নানা জনের মন্তব্য বিশ্লেষণ করে একটি বিষয় মোটামুটি পরিষ্কার যে, আরও একবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছাত্রলীগকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এবং তা করতে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলা ও তাদের আহত হওয়ার বিষয়টিকে আমলেই নেয়া হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে আমরা যে অসুস্থ সংস্কৃতি দেখে আসছি, তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে এ ঘটনায়ও। প্রকাশ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালিয়েও শেষমেষ হয়ত পার পেয়ে যাবে অপরাধীরা, আর তার ফলে তারা উৎসাহিত হবে পরবর্তীতে আবারও এ ধরণের ন্যাক্কারজনক কাজ করায়।

Comments
Spread the love