নেটফ্লিক্সের প্রথম ভারতীয় ওয়েব সিরিজ সেকরেড গেমস নিয়ে আলোচনা যেন থামছেই না। অনুরাগ কাশ্যপ ও বিক্রমাদিত্য মোতওয়ানে পরিচালিত এই সিরিজ নিয়ে এত বেশি চর্চার পেছনে অবশ্য যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে অনেক। ধর্মকে কটাক্ষ করা, প্রতিবেশী দেশের মানুষদের প্রতি বিদ্বেষ প্রদর্শন, কাহিনীর সাথে হিন্দু পুরাণের যোগসাজশ, প্রাক্তন রাজনীতিবিদদের সরাসরি গালি দেয়া, মাত্রাতিরিক্ত যৌন দৃশ্য প্রদর্শন – সবমিলিয়ে এ সিরিজে তথাকথিত নিষিদ্ধ উপাদানের অভাব নেই।

কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে এ সিরিজের যে বিষয়টি সবথেকে বেশি অবাক করেছে, তা হলো অন্যতম প্রধান একটি চরিত্রকে ট্রান্সজেন্ডার (হিজড়া বা লিঙ্গ পরিবর্তনকারী) হিসেবে দেখানো। এই বিষয়টি উল্লেখযোগ্য ও স্পর্শকাতর বেশ কিছু কারণে। প্রথমত শুধু বলিউডই নয়, এমনকি হলিউডেও ট্রান্সজেন্ডার চরিত্রে কেবল পুরুষদেরই দেখানো হয়ে থাকে বেশি। অর্থাৎ সেইসব পুরুষ যারা নারীসুলভ যৌন আচরণ করে থাকে। এবং এ ধরণের চরিত্রগুলোকে প্রধাণত হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে, এবং মূল কাহিনীতে তাদের খুব বেশি অবদান থাকে না।

হলিউডে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি ছবিতেই প্রধান চরিত্র হিসেবে নারী ট্রান্সজেন্ডারদের দেখা মিলেছে। ২০১৩ সালে ডালাস বায়ার্স ক্লাবে জ্যারেড লেটো অভিনয় করেছিলেন রায়োন চরিত্রে, এবং সেজন্য অস্কার জিতেছিলেন তিনি। আবার ২০১৫ সালে দ্য ড্যানিশ গার্ল ছবিতে এডি রেডমেয়নে অভিনয় করেছিলেন ড্যানিশ ট্রান্সজেন্ডার নারী লিলি এলবের চরিত্রে, এবং তিনিও অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন।

দুইটি চরিত্রই সমালোচক মহলে দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল, কিন্তু ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় থেকে শুরু করে রক্ষণশীল সমাজের অনেকেই এর প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল। সে-কারণে আজও হলিউডের মত উদারমনা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও ট্রান্সজেন্ডার নারী চরিত্রের উপস্থাপন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়, এবং নির্মাতারা যথাসম্ভব চেষ্টা করেন এ ধরণের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার।

অথচ সেখানে অনুরাগ কাশ্যপ কী অবলীলায়ই না সেক্রেড গেমসে খলনায়ক গণেশ গাইটোন্ডের (নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী) লাভ ইন্টারেস্ট হিসেবে উপস্থাপন করেছেন কুকু (কুব্রা সেইট)-কে! তাও আবার যেভাবে তিনি পর্দায় কুকু’র প্রকৃত পরিচয় খোলাসা করেছেন, তা দেখে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছেন অধিকাংশ দর্শকই।

প্রথমে একবার কুকু’কে পুরুষদের ন্যায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে দেখানোর মাধ্যমে বিষয়টির ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। উপমহাদেশের ১০০ জন নির্মাতার মধ্যে ৯৯-জনই হয়ত শুধু এই একটি দৃশ্য দেখানোকেই বিশাল কিছু করা হয়ে গেছে বলে মনে করতেন, এবং বাকিটুকু বুঝে নেয়ার দায়িত্ব দর্শকদের মানসিক পরিপক্বতার উপরই ছেড়ে দিতেন।

কিন্তু অনুরাগ কাশ্যপ যে একেবারেই অন্য ধাতুতে গড়া! সেন্সর বোর্ডের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেও যিনি গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরের মত ছবি নির্মাণ করতে পারেন, সেখানে তাকে যদি সেন্সরবিহীন অনলাইন কনটেন্ট নির্মাণ করতে দেয়া হয়, তিনি কি সেই সুযোগের শতভাগ সদ্ব্যবহার না করে পারেন! তাই তো তিনি পর্দায় সরাসরি কুকু’র পেনিসও (পুরুষ) দেখিয়ে দিয়েছেন যাতে দর্শকদের মনে আর বিন্দুমাত্রও দ্বিধাদ্বন্দ্বের জায়গা না থাকে যে কুকু আসলেই একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী।

পর্দায় সরাসরি পুরুষাঙ্গ দেখানোর মাধ্যমে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন অনুরাগ কাশ্যপ, এবং গল্প বলার স্বার্থে ন্যূনতম রক্ষণশীলতাকেও প্রশ্রয় দেননি তিনি। হলিউডের বেশিরভাগ ছবিতেও যেখানে নারীর স্তন ও পশ্চাদ্দেশ দেখানো হলেও আড়ালে রাখা হয় নারীর যোনি ও পুরুষের পুরুষাঙ্গ, সেখানে তিনি সরাসরি দেখিয়ে দিয়েছেন কুকু’র যোনির স্থলে থাকা পুরুষাঙ্গটি।

আর এর মাধ্যমে এক শ্রেণীর দর্শকেরা তাকে প্রচন্ড সমালোচনায় বিদ্ধ করতে শুরু করলেও, সাধারণ দর্শকেরা ঠিকই প্রশংসার বৃষ্টিতে ভেজাচ্ছেন তাকে। অনুরাগ কাশ্যপের কাছ থেকে এমন নির্ভীক, নিঃসংকোচ স্টোরিটেলিংই যে আশা করেন সবাই!

অবশ্য অনুরাগ কাশ্যপকে এমন একটি মহলের কাছ থেকেও ধিক্কার শুনতে হচ্ছে, যা হয়ত তিনি নিজেও আশা করেননি। সেকরেড গেমসে কুকু চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন কুব্রা সেইট, যিনি নিজে বাস্তব জীবনে একজন সিসজেন্ডার নারী। তাই তাকে দিয়ে কেন একজন ট্রান্সজেন্ডার নারীর চরিত্রে অভিনয় করানো হলো, কেন একজন প্রকৃত ট্রান্সজেন্ডার নারীকে দিয়ে অভিনয় করানো হলো না, এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। এর মাধ্যমে ট্রান্সজেন্ডার নারীদের অপমান করা হয়েছে বলেও অভিমত অনেকের!

তবে এর পেছনে অনুরাগ কাশ্যপের নিজের অবস্থানও কিন্তু একদম পরিষ্কার। কুকু যে প্রকৃতপক্ষে নারী নয় বরং ট্রান্সজেন্ডার, তা দেখানো হয়েছে স্রেফ দুইটি দৃশ্যের সাহায্যে। কিন্তু সার্বিকভাবে কুকু চরিত্রের ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব আরও অনেক বেশি। তাই এই চরিত্রে অভিনয় করার জন্য যৌন পরিচয় ছাড়াও অভিনেত্রীর অভিনয়দক্ষতা, লুক, ফিগার সবকিছুই বিবেচনা করার প্রয়োজন ছিল, এবং সেগুলো সব মাথায় রেখেই তিনি কুব্রা সেইটকে বেছে নিয়েছেন।

এ ব্যাপারে কুব্রা সেইট বলেন, “আমি নিজে ট্রান্সজেন্ডার নই এ বিষয়টি নিয়ে আমি একদমই চিন্তিত ছিলাম না। নগ্নদৃশ্যে অভিনয় করার ব্যাপারেও আমার দিক থেকে কোনো সমস্যা ছিল না। কেবল একটি বিষয় নিয়েই আমি চিন্তা করছিলাম যেন পর্দায় নিজেকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে পারি। আমি নিজে যা নই, তা দেখানোটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল।”

এবং সেই চ্যালেঞ্জে ঠিকই জয়লাভ করেছেন এর আগে সালমান খানের সাথে রেডি (২০১১) ও সুলতান (২০১৬) ছবিতে অভিনয় করা এই অভিনেত্রী। তাই অনলাইন স্ট্রিমিং এর জন্য সেকরেড গেমস উন্মুক্ত করে দেয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়ই কুব্রা সেইট এখন পরিণত হয়েছেন বলিউডের অন্যতম সেনসেশনে, আর তাকে অসাধারণভাবে পর্দায় উপস্থাপনের মাধ্যমে অনুরাগ কাশ্যপও আরও একবার প্রমাণ করে দিয়েছেন তিনি ‘কী জিনিস’!

Comments
Spread the love