ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

এগারো বছরের কৃত্তিকা ত্রিপুরা এবং একদল বাঙালী ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইন!

মেয়েটার বয়স ছিল এগারো বছর। মাত্র এগারো বছর! স্কুল থেকে দুপুরের বিরতিতে বাড়িতে ভাত খেতে এসেছিল ছোট্ট মেয়েটা। আর স্কুলে ফিরে যাওয়া হয়নি তার। সেই মেয়েটাকে ধর্ষণ করেছে মানুষের চেহারার কয়েকজন নরপশু। ধর্ষণের পর মেরে ফেলার জন্যে ওর ছোট্ট শরীরটাকে এলোপাথাড়ি কুপিয়েছে পশুগুলো। তারপর গলা কেটে দিয়ে নিশ্চিত করেছে মৃত্যু।

ঝোপের পাশে মেয়েটার ছোট্ট শরীরটা পড়ে ছিল দিনের বাকীটা সময়। রাত হবার আগে কেউ খুঁজেই পায়নি ওকে! এই ঘটনাটা ঘটেছে গত পরশু, আপনি জানেন? এগারো বছরের একটা মেয়েকে এমন অমানবিকভাবে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, এই খবরটা ভাইরাল হবার কথা ছিল না? কিন্ত হয়নি, কেন জানেন? ফুলের মতো নিষ্পাপ এই মেয়েটা জাতীয়তায় ত্রিপুরা, একজন আদিবাসী। সোজা বাংলায় বললে পাহাড়ি,  আরও খারাপভাবে বললে উপজাতি। আর যারা ওকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে খুন করেছে, তারা আপনার আমার জাতভাই, বাঙালী! আসুন, তালি বাজাই!

যে মেয়েটার কথা বললাম, তার নাম ছিল কৃত্তিকা ত্রিপুরা। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার নয়মাইল নামের একটা জায়গায় ওদের বাড়ি। গত শনিবার রাত সাড়ে দশটার দিকে সেখানের একটা পাহাড়ের নীচ থেকে তার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। কৃত্তিকা দুপুরে বাড়িতে এসেছিল, তখন তার মা বাড়িতে ছিলেন না, জুম চাষের জন্যে পাহাড়ে গিয়েছিলেন। বিকেলে যখন তিনি ফিরে এলেন, তখন কৃত্তিকাকে কোথাও দেখতে পাননি। অথচ অনেক আগেই তার স্কুল ছুটি হয়েছে, এতক্ষণে বাড়িতে চলে আসার কথা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও যখন কৃত্তিকাকে পাওয়া গেল না, তখন সবাই মিলে খোঁজা শুরু করলেন। অবশেষে সাড়ে দশটায় পাহাড়ের নীচে একটা ঝোপের পাশে পাওয়া যায় তার মৃতদেহ।

পুলিশের ধারণা, দুপুরে কেউ বাড়িতে না থাকার সুযোগে একা পেয়ে কেউ কৃতিকাকে ধর্ষণের পরে হত্যা করেছে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, এগারো বছরের এই ছোট্ট মেয়েটার শরীরে কি এমন নেশা খুঁজে পেয়েছে বিকৃতমনস্ক কিছু মানুষ, যে তার ওপর কামবাসনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হলো? মেয়েটাকে এভাবে খুন হয়ে যেতে হলো! কৃত্তিকার পরিবারের পক্ষ থেকে সন্দেহভাজন কয়েকজনের কথা পুলিশকে বলা হয়েছে, তারা সবাই বাঙালী। পুলিশ বলেছে তারা এখনও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি সন্দেহভাজনেরা পলাতক!

পাহাড়ের হিসেবটা বড় অদ্ভুত। শত শত বছর ধরে এখানে বাস করে আসা আদিবাসীরা যেন নিজ ভূমেই পরবাসী। বাঙালী সেটেলারে ভরে গেছে পার্বত্য জেলাগুলো। বাঙালীরা সেখানে ব্যবসা করছে, গাছ কেটে পাহাড় ন্যাড়া করে ফেলছে, অবৈধ বসতি স্থাপন করে আরও বাঙালী নিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য এলাকায় এখন বিভিন্ন জাতিস্বত্ত্বার আদিবাসীর চেয়ে বাঙালীর সংখ্যা বেশি। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কোন সমস্যা ছিল না, যদি না বাঙালী এসব সেটেলারেরা নিজেদের পাহাড়ের রাজা ভাবতে শুরু করতো।

পার্বত্য জেলাগুলোতে দিনে দুপুরে মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়। শিশু থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ, সব বয়সের নারীদেরই ধর্ষনের মতো জঘণ্য ঘটনা অজস্রবার ঘটেছে। জীবনে কখনও শুনেছেন, আদিবাসীরা এসে বাঙালী কাউকে ধর্ষণ করেছে? কিংবা ধর্ষণের পরে কোন বাঙালী নারী খুন হয়েছেন কোন আদিবাসীর হাতে, এরকম খবর চোখে পড়েছে কখনও? ধর্ষণের শিকার হয়ে আদিবাসীরাই। আর করে কারা জানেন? বাঙালীরা। সমতল থেকে পাহাড়ে গিয়ে যারা পাহাড়ের ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠেছে দিনে দিনে!

এসব ঘটনার কোন বিচার হয় না। হবে কিভাবে? বিচার তো করবে বাঙালী বিচারক, অপরাধী তো ধরবে বাঙালী পুলিশই! এজন্যেই আদিবাসীরা সব বাঙালীকে এক চোখে দেখে, ওদের ভাষায়, সব বাঙালীর পাছা এক! উল্টো এসব ঘটনায় বিচারের দাবীতে আন্দোলন বা ধর্মঘট করলে আদিবাসীদের ওপর হামলা চালানো হয়, তাদের বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়, জুমের পাহাড় পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হয়, কখনও হয়তো তরুণ নেতাদেরই তুলে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য কোথাও! পাহাড়ের অবস্থা দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়, পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালীরা এই আদিবাসী মানুষগুলোর সাথে যা করছে, এরকমটাই বোধহয় ১৯৪৭-১৯৭১ সালের মধ্যে পাকিস্তানীরা করেছিল আমাদের সাথে। পাহাড়ে গিয়ে আমরা হানাদার হয়ে উঠছি কিনা, এটা একটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।

কিছুদিন আগে দুই মারমা তরুণীকে ধর্ষণ করা হলো। সেই ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার জন্যে কত নাটকই না সাজানো হয়েছিল! চিকিৎসার নামে তাদের আটকে রাখা হলো হাসপাতালে, মেয়েগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছেন চাকমা রানীও! এর আগে রোমেল চাকমার ঘটনাটাই মনে করুন। এরকম উদাহরণ আরও হাজার হাজার পাবেন। এসব ঘটনার সাথে কারা জড়িত, বা কাদের ছত্রছায়ায় এগুলো ঘটছে, কেন এসব ঘটনার বিচার হয় না, হচ্ছে না, সেসব বলতে গেলে চাকরী থাকবে না, হয়তো জীবনটাও থাকবে না! ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইনদের নাম যে নিতে নেই!

পাহাড়টা আমাদের কাছে বেড়ানোর জায়গা। বিনোদনের আশায় আমরা সেখানে যাই। আমরা সাজেক গিয়ে ‘চিল’ করি, নীলগিরি-নীলাচলে গিয়ে ফেসবুকে চেকইন দেই। আর আমাদের সেই বিনোদনের যোগান দিতে গিয়েই শত শত আদিবাসী পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে বিভিন্ন জায়গা থেকে। তারা তাদের ভিটেমাটি হারিয়েছেন, বাধ্য হয়েছেন আরও গভীর অরণ্যের দিকে চলে যেতে। তাদের রেখে যাওয়া পিতৃপুরুষের জায়গাটায় আমরা পিকনিক করতে যাই, বারবিকিউ পার্টি করি, ফটোসেশন করে আসি। এটা অত্যাচার নয়? নির্যাতন নয়?

এভাবেই কৃত্তিকা ত্রিপুরারা ধর্ষিত হবে, খুন হবে, মারমা তরুণীদের ধর্ষণ করা হবে, রোমেল চাকমারা হারিয়ে যাবে। এসবের বিচার হবে না, বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে মরে যাবে। সাতচল্লিশ থেকে একাত্তরে পাকিস্তানীরা আমাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন করেছিল। অত্যাচারের স্টিম রোলার চালিয়েছিল বাঙালীদের ওপর। আর পাহাড়ি আদিবাসীদের সঙ্গে আমরাও এখন প্রায় একই আচরণ করছি। সরকারী চাকুরীতে দুই-তিন পার্সেন্ট আদিবাসী কোটা দিলেই তাদের ভিটেমাটি দখল করার লাইসেন্স পাওয়া যায় না, তাদের মেয়েদের জোরপূর্বক ধর্ষণের অধিকার আদায় হয়ে যায় না। পাকিস্তানীদের যেমন আমরা ঘৃণার চোখে দেখি, কে জানে, হয়তো পাহাড়ি এসব আদিবাসীরাও আমাদের সেই একই দৃষ্টিতে দেখে!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close