খেলা ও ধুলা

কৌশিক থেকে মাশরাফি: গল্পটা ক্রিকেটের, কিংবা জীবনের!

ফেলে আসা সময়গুলোর দিকে ফিরে তাকালে গোলাম মর্তুজার খুব অবাক লাগে। পড়াশোনায় মন ছিল না বলে ছেলেকে কত শাসন করেছেন একটা সময়ে! সারাদিন মাঠে পড়ে থাকতো ছেলেটা, শুকনো মৌসুমে ক্রিকেট, বর্ষায় ফুটবল। পাড়ার ম্যাচ বা টুর্নামেন্ট থাকলে তো কথাই নেই, স্কুলে ক্লাস থাকুক কিংবা পরীক্ষা; কৌশিক সেদিন স্কুল পালাবেই, ধরেবেঁধেও রাখা যাবে না তাকে! সেসবের জন্যে কতবার মেরেছেন ছেলেকে!

সময় বদলে গেছে। গত দেড়যুগ ধরে লোকে তাকে তার নামে চেনে না, বরং চেনে কৌশিকের বাবা হিসেবে! তাতে অবশ্য তার আপত্তি নেই একটুও। ছেলের অর্জনে গর্বিত হতে অপছন্দ করেন কোন বাবা? সারাদিন মাঠে পড়ে থাকার অপরাধে যে ছেলেটাকে তিনি শাসন করতেন একটা সময়ে, তার সেই ছেলেটা এখন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক। বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলোয়াড়ও কি নয়? অপরিচিত কারো সামনে তিনি ‘মাশরাফির বাবা’ পরিচয়টা কেউ দিলে গর্বে তাই তার বুকটা ফুলে ওঠে! 

মাশরাফির গল্পগুলো সবাই জানেন। অজস্রবার শুনেছেন, পড়েছেন। কতশত লেখা হয়েছে তাকে নিয়ে! তার অর্জন, তার কীর্তি সবকিছু নিয়েই। আজ আমরা মাশরাফির গল্প বলবো না, আজ শোনাবো কৌশিক নামের এক দুরন্ত কিশোর কিংবা তরুণের গল্প। যে গল্পগুলো অনেকেই জানে না, যে গল্পগুলো মাশরাফির গল্পের আড়ালে থেকে যায় সবসময়।

রাজধানী ঢাকা থেকে ২১৪ কিলোমিটার দূরের জেলা নড়াইল। বাংলাদেশের আর দশটা মফস্বল শহরের মতোই নদীনির্ভর জীবন এখানে, ধমনীর মতোই এই শহরটার সাথে জড়িয়ে আছে চিত্রা নামের নদীটা। চিত্রার ঢেউ আর নদীপাড়ের শান্ত বাতাস ছাড়া নড়াইলের অস্তিত্বও কেউ কল্পনা করেনি কখনও। এই শহরেই জন্ম আর বেড়ে ওঠা মাশরাফি বিন মুর্তজার। যদিও মাশরাফি নামটা এখানে অনেকটাই অপ্রচলিত, এই শহরে এলে তিনি কৌশিক হয়ে যান!

বাড়ি আর চিত্রার মাঝে ছোট্ট একটা পায়েচলা পথ, সেটা ধরে দৌড়ে এসে বন্ধুদের সাথে চিত্রায় আছড়ে পড়তেন ছোট্ট কৌশিক। দুরন্ত ছেলেটার প্রধান কাজ ছিল দলবল নিয়ে চিত্রায় ঝাঁপ দেয়ার জায়গাগুলো খুঁজে বের করা। কখনও আবার বিপজ্জনক পথেও হাঁটা হয়েছে; বেড়িবাঁধ থেকে খেজুর গাছ, কিংবা নতুন ব্রীজ থেকে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো- আমাদের অধিনায়কের দুরন্ত কৈশরের সাক্ষী ছিল এরা সবাই, পুরো নড়াইল শহরটাই।

মাশরাফি বিন মুর্তজা, মোহাম্মদ সালাহ, জর্জ উইয়াহ, রাজনীতি

চিত্রা ছিল কৌশিকের প্রাণ। ভরদুপুর কিংবা পড়ন্ত বিকেল, কিংবা সূর্য পাটে যাওয়ার সময়টা- সুযোগ পেলেই কৈশরের সবটুকু দুরন্তপনা গায়ে মেখে চিত্রায় ঝাঁপ দিতেন কৌশিক। একবার তো বিশাল দু’টো বজরার মাঝে চোরাবালিতেও ডুবে যাচ্ছিলেন। ভাগ্য সেবার সুপ্রসন্ন ছিল, নিয়তি হয়তো ঠিক করেই রেখেছিল পোর্ট অফ স্পেনে শেবাগের স্ট্যাম্পের ছত্রখান মাশরাফির হাতেই ঘটবে- তাই কৈশরের এসব দুরন্তপনা তার পথচলায় বাধা হতে পারেনি কোথাও।

নড়াইল গেলে এখনও মাশরাফি সোজা ছুটে যান ইউসুফ মামার চায়ের দোকানে। এই পথ ধরে হেঁটে চলেই বড় হয়েছেন তিনি। তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়েত গল্পগুলো লেখা আছে এই এলাকায়, এই মানুষগুলোর সাথে। ইউসুফ মামার দোকানটাও এমনই একটা জায়গা। এখানে এলে তিনি আর মাশরাফি থাকেন না, কৌশিক হয়ে যান। এই দুনিয়াটা তার নিজস্ব, এখানে তিনি রাজা।

দোকানের সামনে ছোট একটু বসার জায়গা আছে, লম্বা দুটো বেঞ্চ পাতা, আর মাশরাফির জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা। বেঞ্চের সামনে গোল একটা আসনে তিনি বসেন, তাকে ঘিরে থাকেন বন্ধুরা। তিনি তাদের গল্প বলেন। খেলার গল্প, ক্রিকেট, সতীর্থ, কিংবা তার অদ্ভুত জীবনবোধের গল্প। বিকেল গড়ায়, সন্ধ্যা নামে, রাত বাড়ে। মাশরাফির গল্প ফুরোয় না। আড্ডাবাজ এই মানুষটা নড়াইলে এলে যেন তার মুখে আরও বেশি করে খই ফোটে। কিংবা পরিচিত পরিবেশ আর আপন মানুষগুলোকে কাছে পেয়ে কথা শেষ হতে চায় না তার! 

এশিয়া কাপ, সময়সূচী, মাশরাফি বিন মুর্তজা

মাশরাফি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন, ভীষণ জনপ্রিয়, অজস্র মানুষ তার গুণমুগ্ধ ভক্ত। ঈদে বা ছুটিতে যখন তিনি নড়াইলে যান, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন ছুটে আসে তাকে এক নজর দেখতে। ঈদের সময় সেই রংপুর বা কুড়িগ্রাম থেকে ট্রাক ভাড়া করে লোকজন এসেছে মাশরাফিকে এক নজর দেখবে বলে, এমন নজিরও আছে! বাড়ির সামনে ভীড় লেগে থাকে সারাক্ষণ।

এতসব খ্যাতি, সাফল্য, অর্থ-বিত্ত কিংবা চাকচিক্যের ডামাডোলে মাশরাফি নিজের ভেতরের মানুষটাকে হারিয়ে যেতে দেননি। তিনি দূর গ্রহের তারা হয়ে যাননি, সামান্য অহংবোধের জন্মও হতে দেননি নিজের মধ্যে। তার বন্ধুরা সবাই হয়তো জীবনে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি, কারো হয়তো নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। মাশরাফি সেই মানুষগুলোর কাঁধেও হাত রাখেন অবলীলায়। আড্ডা দিতে বসে তারা খুনসুটি করেন, ছেলেবেলার মতো গালি দিয়ে সম্বোধন করেন একে অন্যকে, বাইকের পেছনে চাপিয়ে ছুট দেন দূর-দূরান্তে।

মাশরাফি তখন ভুলে যান তিনি বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক, তিনি তখন কৌশিক হয়ে যান। তার বন্ধুরাও ভুলে যান, তাদের সামনে বসে থাকা মানুষটা বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য একজন। তাদের কাছে কৌশিক মানে এমন একজন, যার পিঠে দুম করে কিল মেরে ‘শালা’ বলে সম্বোধন করা যায়। কৌশিক এমন একজন, যাকে সব বিপদে আপদে পাশে পাওয়া যায়। তাদের কাছে কৌশিক মানে বন্ধু, কিংবা বন্ধুত্বের আরেক নামই কৌশিক!

গোলাম মর্তুজাকে দিয়ে শুরু করেছিলাম, তাকে দিয়েই শেষ করি। একবার দাঁতে ব্যাথা হওয়ায় কৌশিককে তিনি নিয়ে গেছেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার বললেন, ইনজেকশন দিতে হবে মাড়ীতে। কৌশিকের তো ইনজেকশনের নাম শুনেই তিন মূর্ছা যাবার জোগাড়! কোনভাবেই তাকে রাজী করানো যায় না, দাঁতের ব্যাথা সে সহ্য করত রাজী আছে, কিন্ত ইনজেকশন সে নেবে না! 

গোলাম মর্তুজা সেদিন জানতেন না, এই ছেলেটাই কয়েক বছর পরে নিজের হাতে ইনজেকশন দিয়ে হাঁটু থেকে রক্ত আর পুঁজ বের করবে। বারবার সার্জনের ছুরির নিচে যেতে হবে তাকে, তবুও হার না মানা মনের জোর নিয়ে বল হাতে কলারটা উঁচিয়ে রানআপ নিয়ে ছুটে আসবে মাশরাফি, তার আদরের কৌশিক। বাবা হয়ে ইনজুরি আক্রান্ত মাশরাফির কষ্টটা তো খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। অসহ্য ব্যাথায় ছেলেকে বালিশে মুখ চাপা দিয়ে কাঁদতে দেখেছেন, একুশ বছরের ছেলেটা সেদিন বাবার সামনে কাঁদতে লজ্জা পাচ্ছিল। নিজেকে তখন ভীষণ অসহায় মনে হয়েছিল গোলাম মুর্তজার, তার নিজেরও কান্না পাচ্ছিল সেই সময়ে। সেই কান্নাগুলো এখন আনন্দাশ্রুতে রূপ নিয়েছে। গোলাম মুর্তজা এখনও কাঁদেন, বাংলাদেশের জয়ের দিনে, যে জয়ে মিশে থাকে মাশরাফির অবদান!

কৌশিক থেকে একটু মাশরাফিতে ফিরি। বিরাট কোহলিকে নিয়ে সৌরভ গাঙ্গুলি একটা কথা বলেছিলেন কিছুদিন আগে, বলেছিলেন-

“কোহলিকে কখনও পরিসংখ্যান দিয়ে মাপতে যাবেন না। সে কত রান করলো, ক’টা সেঞ্চুরি হাঁকালো, তার গড় কত, এসব দিয়ে তাকে বিচার করতে পারবেন না। ওকে জাজ করা হবে ওর অবসরের পরে, ভারতীয় ক্রিকেটটাকে ও কোথায় নিয়ে যেতে পারলো সেটা দেখে,,,”

সৌরভের এই কথাটাই, একদম হুবহু মেলানো যায় মাশরাফি বিন মুর্তজার বেলাতেও। তার চেয়ে বেশি উইকেটের মালিক বাংলাদেশ দলে আছে, তারচেয়ে বেশি ম্যাচ সেরা হওয়া খেলোয়াড়ও আছেন আমাদের দলে। কিন্ত ওই যে, ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বলে একটা টার্ম আছে ক্রিকেটে। সেদিক থেকে মাশরাফি সেরা, মাশরাফি অনন্য। ম্যাচ জেতানোর জন্যে মাশরাফিকে রান করতে হয় না, উইকেট নিতে হয় না। মাশরাফি যখন কবজি ভেঙে যাওয়া তামিমের গ্লাভস কেটে দিয়ে বলেন, “তুই নামবি”- তখনই ম্যাচটা জিতে যায় বাংলাদেশ। 

বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান, ক্রিকেট-ফুটবল, জয় বাংলা, পাকিস্তান বধ

মাশরাফি যখন পায়ে ক্র‍্যাম্প নিয়ে খোঁড়াতে থাকা মুস্তাফিজের হাতে বল তুলে দিয়ে বলেন, “তোকে বল করতে হবে”- তখন জিতে যায় বাংলাদেশ। কিংবা টানা ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া লিটন যখন সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ইশারায় মাশরাফিকে ধন্যবাদ জানান, আর ড্রেসিং রুমের দরজায় দাঁড়ানো মাশরাফি যখন বুকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করেন ইনিংস লম্বা করে আসার, তখনও জিতে যায় বাংলাদেশ। রিয়াদকে দল থেকে বিতর্কিতভাবে বাদ দেয়ার পরে মাশরাফি যখন তার পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, “রিয়াদ দলে না থাকলে আমি শ্রীলঙ্কা যাবো না”- তখন ক্রিকেট মাঠের বাইরের প্রতিপক্ষের সঙ্গে এককটা অলিখিত লড়াইতে জিতে যায় বাংলাদেশ! মাশরাফি এমন একজন, যিনি বাকীদের আগলে রাখেন, পুরো দলকে এক সুতোয় বাঁধেন। এজন্যেই তো তিনি ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক! 

আরও পড়ুন-

মাশরাফির জন্মদিন উপলক্ষ্যে এগিয়ে চলো’র বিশেষ নিবেদন- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close