সিনেমা হলের গলি

যেমন দেখলাম নাজরিয়া নাজিমের কামব্যাক সিনেমা

মালায়ালাম সুপারস্টার নাজরিয়া নাজিম সিনেমা থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছিলেন। বিয়ের পর একটা লম্বা বিরতি৷ কেউ কেউ ভেবেছিল হয়ত আর সিনেমায় আসবেন না নাজরিয়া৷ সিনেমায় অভিনয় প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আসলে আমার কোনো তাড়াহুড়ো নেই। এমন না যে, সিনেমা না করলে দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে। জীবনে করার মতো আরো অনেক কাজও তো থাকতে পারে, তাই না?’ 

সেই নাজরিয়া এই বছর ফিরে আসেন আবার সিনেমায়, অঞ্জলি মেননের পরিচালনায় এই সিনেমাটির নাম ‘কোডে’। অঞ্জলি মেনন পরিচালক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন তার আগের সিনেমা ব্যাঙ্গালোর ডেইজে। সেটাও চার বছর আগের সিনেমা! সেই সিনেমা তো মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রিরই অন্যতম সেরা ব্লকবাস্টার।

‘কোডে’ এই বছরের জুলাইয়ের দিকে মুক্তি পায়। দেখা হয়নি এত দিনে। কিন্তু, শুধু নাজরিয়া কেমন করলেন সেটা দেখবার জন্যেই এই সিনেমা দেখবো বলে ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু, সময় সু্যোগ হচ্ছিল না। অবশেষে বাংলা সাবটাইটেল পাওয়ায় গত রাতে দেখে ফেললাম ‘দ্য এক্সপ্রেশন কুই’ নাজরিয়া নাজিম অভিনীত সিনেমাটি।

যদিও নাজরিয়াকে শুরুতেই মৃত। সিনেমার শুরুতেই দেখানো হয় ছোটবেলা থেকে রোগা, অসুস্থ নাজরিয়া সিনেমায় যার নাম থাকে জেনি সে মারা যায়৷ গল্পের এই নাটকীয় শুরু দেখেই খানিকটা মনমরা হয়ে গেলাম৷ কারণ, গোটা সিনেমায় যা-ই দেখানো হোক না কেন, এটা মেনে নিতে হবে যে এই সিনেমায় নাজরিয়া বেঁচে নেই। তিনি মৃত। এই বোধটা একটু কষ্ট দিচ্ছিল।

পৃথ্বীরাজ এবং নাজরিয়া এই সিনেমায় দুই ভাইবোন। বোনের অসুখ। বাবা গাড়ির মেকানিক৷ সংসারের খরচ উঠানো যাচ্ছে না। তাই বলি দেয়া হলো ১৫ বছর বয়সী ঘরের বড় ছেলেটাকে। বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলো ছেলেকে। তখন তার বোন সদ্য হাঁটতে শিখেছে৷ বোনকে নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায় ছেলেটি। ফুটবলের প্রতি তার টান। স্কুলে এক মেয়ে ভাল লেগে গিয়েছিল। মেয়েটাকেও সে ফুটবল খেলায় নিতে চেয়েছিল। সেই ফুটবল আর আদরের বোনকে পেছনে ফেলে বিদেশ পাড়ি জমালো সে। মনের ভেতর জমে জমে নীল হলো অনেক বেদনা। সব সুখ মুছে গেল। কারো প্রতি তার অভিযোগ নেই, কিন্তু অলিখিত এক বিতৃষ্ণা জন্মেছে তার। সে যেন এক টাকার মেশিন। বিদেশ বিভুঁইয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সে কাজ করছে, টাকা পাঠাচ্ছে। হারিয়ে গেছে সব স্বপ্ন।

এমনই এক সময়ে পৃথ্বীরাজের কাছে ফোন আসলো। জরুরি ডাক। দেশে ফিরে এসে জানলেন, কিছুই নেই আগের মতো। তার আদরের বোনটা জীবনের লড়াইয়ে হেরে গেল৷ মারা গেল৷

পৃথ্বীরাজ ঠাই নিলেন সেই ঘরে যে ঘরে তার বোন থাকতো। গিয়ে দেখলেন, তার বোনের আঁকা ছবি, উড়তে চাওয়া পাখিদের দল। কিছু উক্তি লেখা কোথাও কোথাও। বোনের প্রিয় কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে চলে আসলো, যেন এই ঘরে সে কাউকে প্রবেশের অধিকার দেবে না।

বাবার গ্যারেজে পড়ে থাকা এক মাইক্রোভ্যান নিয়ে পৃথ্বীরাজ ঘুরবেন এমনটাই মনস্থির করলেন। কিন্তু এক রাতে স্বপ্নে তিনি তার বোনকে দেখতে পান। স্বপ্নভাঙ্গার পর গাড়ির সামনে গিয়ে আলো ফেলতেই দেখলেন গাড়ির ভেতর থেকে কে যেন উঁকি দিচ্ছে। ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন তিনি। আলো ফেললেও চলে গেল না গাড়ির ভেতর থাকা মানুষ। ভাল করে তাকাতেই বিভ্রম লাগলো পৃথ্বীরাজের। আরে এ তো জেনি! ঘোরের মধ্যেই ঘুমিয়ে গেলেন। সকাল বেলা উঠেও দেখলেন গাড়ির মধ্যে জেনি। ভয় পেলেন। কিন্তু জেনি তাকে অভয় দিলো। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনিই একমাত্র জেনিকে দেখতে পাচ্ছেন, আর কেউ নয়। অবশ্য জেনির প্রিয় কুকুর ব্রাউনিও জেনিকে দেখতে পায়।

তারপর থেকেই মূল গল্প শুরু৷ এই গল্প নিখাদ ভাইবোনের ভালবাসার গল্প৷ জেনির জীবনের অপ্রাপ্তি, ভালবাসা সব উঠে এসেছে গল্পে৷ জেনির ভূমিকা অনেকটা ফিলোসফার গাইডের মতো এই গল্পে৷ পৃথ্বীরাজের সাথে আছেন পার্বতী, সিনেমায় যার নাম সোফি। তারও একটা প্রণয়ের সম্পর্ক, টানাপোড়েন দেখানো হয়৷

নাজরিয়া নাজিমকে দেখে মনে হয়েছে, তার যেন বয়স আরো কমে গিয়েছে! বিয়ে করেছেন, চার বছর নেই সিনেমায়, তবুও সেই একই মানুষটাই যেন! জেনি চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করেছেন, ফিরে এসেছে সেই চিরচেনা এক্সপ্রেশনগুলো। তিনি যখন কাঁদেন চিবুক উলটে, ঠোঁট বাঁকিয়ে তখন সেটাকে একটুও সিনেম্যাটিক মনে হয় না, বাস্তবে কাঁদলেও বোধহয় এরকম করে কাঁদতেন। যখন খুশি হন, যখন বিস্মিত হন সিনেমার পর্দায় তখন আমিও বিস্ময়ে অভিভূত হই। এতো সুন্দর মধুর অভিনয় কিভাবে করেন! সিনেমাবোদ্ধা নই আমি, কিন্তু ভাল-মন্দ বোধ আছে কিছুটা, সেই জায়গাটা বরাবরই ছুঁয়ে যায়, তাই নাজরিয়ার সিনেমা মানেই বিশেষ কিছু!

সিনেমায় একটা ডায়ালগ ছিল পৃথবীরাজের। বোন জেনি অর্থাৎ নাজরিয়ার বকবকে বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, এতো কথা বলিস কেন? নাজরিয়া হাসতে হাসতে নিজের ঢঙে জবাব দেন, আমি যদি চুপ করে থাকি তো এই সিনেমা এওয়ার্ড পাবে কি করে?

শেষমেশ এই গল্পে কত কী দেখা হয়ে যাবে, নিতে পারলে কিছু লাইফ লেসনও পেয়ে যেতে পারেন। এটা সত্যিই একটা ‘ফিলিং গুড’ সিনেমা। আড়াই ঘন্টা নষ্ট হবে না অন্তত। অনেকেই হয়ত দেখে ফেলেছেন ইতিমধ্যে এই সিনেমা, না দেখে থাকলে দেখতে পারেন সিনেমাটি।

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles