খেলা ও ধুলা

কেউ গৃহকর্মীকে পেটায়, কেউ জন্মদিন পালন করে!

ফেসবুকে গতকালের হট টপিক ছিলেন সাকিব আল হাসান। আইসক্রীম নিয়ে তার দেয়া পোস্টে কমেন্ট করার জন্যে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সবাই। এই ফাঁকে অনেকেরই হয়তো নজর এড়িয়ে গেছে কয়েকটা ছবি। ক্রিকেটার তাসকিন আহমেদের বাবার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আপলোড দেয়া সেই ছবিগুলোতে বাবা-ছেলের মাঝখানে হাস্যোজ্জ্বল এক কিশোরীকে দেখা যাচ্ছিল। সবাই মিলে বেলুন ফুলিয়ে, মোমবাতি জ্বলে, কেক কেটে জন্মদিন পালন করছিলেন তার। আসরের মধ্যমণি হয়ে থাকা কল্পনা নামের সেই কিশোরীর পরিচয়, তিনি তাসকিনদের বাসার গৃহপরিচারিকা, সহজ বাংলায় আমরা যাদেরকে ‘কাজের মেয়ে’ বলে থাকি।

ছবিটা দেখে অদ্ভুত একটা ভালো লাগায় আক্রান্ত হলো মন। সেইসঙ্গে হ্যাপী নামের এক কিশোরীর কথা মনে পড়লো। হ্যাপীর ভাগ্যটা কল্পনার মতো ভালো ছিল না। তাসকিন বা তার পরিবারের মতো কাউকে পাশে পায়নি সে, বরং তার ভাগ্যে জুটেছিল দেখতে মানুষের মতো চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এক পিশাচ দম্পতি, বাসার কাজে সামান্য এদিক সেদিক হলেই যারা এই ছোট্ট মেয়েটার গায়ে হাত তুলতো। যাদের কথা বলছি, সেই ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন রাজীব আর তার স্ত্রী, তারা তো সমাজের উঁচুতলার মানুষ, ভদ্রলোকের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ান সব জায়গায়। তারাও সন্তানের বাবা মা। কিন্ত একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে যে তারা এমন আচরণ করতে পারে, সেটা অনেকের কল্পনাতেও ছিল না।

ঘটনাটা ২০১৫ সালের। সেপ্টেম্বরের ছয় তারিখ রাত আটটার দিকে মিরপুরের পল্লবী এলাকায় আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল মাহফুজা আক্তার হ্যাপীকে। ১১ বছর বয়েসী এই মেয়েটার জন্ম হয়েছিল গরীব পরিবারে, দু’মুঠো ভাত আর বেতনের লোভ দেখিয়ে নিজেদের সন্তানের দেখভাল করানোর কথা বলে তাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিল শাহাদাত হোসেন রাজীব আর তার স্ত্রী। ছোট্ট এই মেয়েটার ওপরে অকথ্য নির্যাতন চালাতো দুজনে, পান থেকে চুল খসলেই হাতের কাছে যা পেতো তাই দিয়ে হ্যাপীকে পেটাতো দুজনে।

হ্যাপীকে যখন উদ্ধার করা হয়েছিল, তখন তার চেহারা দেখে আঁতকে ওঠেননি, এমন মানুষ নেই বোধহয়! শরীরজুড়ে মারের দাগ, খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে চামড়া, রুটি বানানোর বেলন দিয়ে মেরে হ্যাপীর হাঁটু ভেঙে দিয়েছিল এই দম্পতি। হাসপাতালে বেশকিছুদিন চিকিৎসা নিতে হয়েছিল ছোট্ট এই মেয়েটাকে। সংসারে অভাবের যন্ত্রণা সইতে না পেরে কাজের সন্ধানে তাকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল পরিবার, একজোড়া অমানুষের হাতে যে মেয়েকে তুলে দিচ্ছে, সেটা হ্যাপীর বাবা-মায়ের কল্পনাতেও ছিল না। পশুরাও বোধহয় এতটা জঘণ্য স্বভাবের হয় না, যতোটা মানুষ হতে পারে!

হ্যাপী যখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তখনই মামলা করা হয়েছিল শাহাদাত হোসেন রাজীব আর তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে। দুজনেই তখন গা ঢাকা দেন। তবে পালিয়ে বাঁচতে পারেননি তারা, পুলিশের হাতে ধরা পড়েন দুজনেই। আদালতে এই দম্পতির বিরুদ্ধে জবানবন্দী দেয় হ্যাপী, তার জবানবন্দীতেই উঠে আসে ভয়াবহ সেই নির্যাতনের কথা। যেদিন হ্যাপী বাসা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, সেদিন এই দম্পতির ছোট শিশুর জন্যে সুজি বানাতে বলা হয়েছিল তাকে। কোন কারণে সুজির রংটা সাদা না হয়ে খানিকটা বাদামী হয়ে গিয়েছিল। সুজিতে অন্য কিছু মেশানো হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে বাচ্চা এই মেয়েটাকে অমানুষের মতো পিটিয়েছিল স্বামী-স্ত্রী দুজনেই। সেদিন দুপুরেই সুযোগ পেয়ে দরজা খুলে বাসা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল হ্যাপী। 

তিন মাস জেল খেটে জামিনে বেরিয়ে এসেছিলেন শাহাদাত আর তার স্ত্রী। বিসিবিও নিষিদ্ধ করেছিল শাহাদাতকে। এসব ক্ষেত্রে আমাদের দেশে বিচার হয় না কখনও, টাকা ঢেলে সব ম্যানেজ করে ফেলে আসামীরা। শাহাদাতের টাকা আছে, ক্ষমতা আছে, হ্যাপীদের তো কিছু নেই, এমনকি মামলা চালানোর খরচটাও নেই। সংসারে অভাব, পেটে খাবার নেই, ওদের কিনে ফেলা খুব সহজ। টাকায় কাজ না হলে হুমকি তো আছেই। শাহাদাতেরাও টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছিলেন সবকিছু। আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের আগের জবানবন্দীকে অস্বীকার করেছিল হ্যাপী, বলেছিল, তার ওপর কোন নির্যাতন হয়নি, পড়ে গিয়ে পা ভেঙে ফেলেছিল সে। ভিক্টিমের মুখের কথা আমলে না নিয়ে উপায় ছিল না আদালতের। মামলার রায়ে খালাস দেয়া হয় শাহাদাত আর তার স্ত্রীকে। 

অমানুষদের কথা তো অনেক বললাম, এবার একটু ভালো মানুষদের কাছে ফিরি আবার। তাসকিন আর তার পরিবার যেটা করেছেন, সেটা আমাদের সমাজে খুব বেশি মানুষকে করতে দেখা যায় না। রেস্টুরেন্টে গেলে প্রায়শই দেখি, ছোট বাচ্চাকে সামলানোর দায়িত্ব গৃহকর্মীর হাতে ছেড়ে দিয়ে লোকজন গপাগপ গিলছে সুস্বাদু সব খাবার। খাওয়া শেষ হয়ে গেলে বিল মিটিয়ে দিয়ে বেরিয়েও আসছে, যেন সাথে থাকা মানুষটির পেটে ক্ষুধা থাকতে নেই। এত দামী খাবার ‘কাজের ছেলে/মেয়ে’র পেছনে খরচ করতে যে এসব লোকজনের বড়ই আপত্তি। এটা তো কেবল ঘরের বাইরে দৃশ্য, অন্দরমহলে যে কত হাজার রকমের নির্যাতন এই অসহায় মানুষগুলোকে করা হয়, সেটার লিস্ট বানাতে বসলে শেষ হবে না কখনও। 

তাসকিন আর তার পরিবারের সদস্যরা এখানেই অনন্য, এখানেই তারা অসাধারণ। কল্পনা নামের মেয়েটাকে তারা ‘কাজের মেয়ে’ না ভেবে মানুষ ভেবেছেন, গৃহপরিচারিকার জায়গায় না রেখে নিজেদের পরিবারের সদস্য হিসেবে ট্রিট করছেন। নিজের বোনের জন্মদিনে তাসকিন যেমন দামী কেকের অর্ডার দেন, কল্পনার জন্মদিনেও তেমনটাই করেছেন। বাবা আর নিজের মাঝখানে কল্পনাকে নিয়ে কেক কেটেছেন, খাইয়ে দিয়েছেন, নিজেরা খেয়েছেন, তুলেছেন ছবিও। সেই ছবিতে কল্পনার হাসিমুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, স্বর্গসুখ কাকে বলে সেটা এই মেয়ে বুঝে গেছে সেই মূহুর্তে। অথচ এই তাসকিনকেই কিছুদিন আগে বাবা হবার পরে ফেসবুকে কি বিরূপ একটা পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল কিছু অশিক্ষিত বর্বরের কারণে… যাক, সেই অপ্রিয় প্রসঙ্গে আর না যাই। 

তাসকিন আহমেদ, সৈয়দা রাবেয়া নাঈমা, তাসকিনের স্ত্রী, তাসকিনের সন্তান, নোংরা মন্তব্য

তাসকিন ক্রিকেটার, শাহাদাতও তা-ই। তাসকিন ফাস্ট বোলার, শাহাদাতও একই। দুজনের শারিরীক গড়নেও মিল আছে। তবে পার্থক্যটা অন্য জায়গায়। তাসকিনের দীর্ঘাকায় শরীরের ভেতরে তারচেয়েও বিশাল একটা হৃদয় আছে, যে হৃদয় দিয়ে তিনি বাসার গৃহপরিচারিকাকেও মানুষ ভাবতে পারেন, তার জন্মদিনে কেক কেটে উদযাপন করতে পারেন, তাকে পরিবারের সদস্য হিসেবেই গ্রহণ করতে পারেন। হৃদয় নামের সেই বস্তুটা শাহাদাতের ভেতরে নেই। আর এটাই বোধহয় মূল পার্থক্য। 

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles