এবারের বিশ্বকাপে সবাইকে বেশ চমকে দিয়েই ফাইনাল খেলেছে ক্রোয়েশিয়া। শিরোপা জিততে পারেনি তারা, তবে ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করে নিয়েছে দলটা। বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন ক্রোয়েশিয়ান অধিনায়ক লুকা মডরিচ। দারুণ খেলেছেন রাকিটিচ, পেরিসিচ, ভারসালিকোরা। তবে বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা এদের কেউই নন। সেই খেতাবটা যিনি অর্জন করেছেন, তিনি ফুটবল খেলেন না, তবে খেলাটাকে ভীষণ ভালোবাসেন। আর সেই ভালোবাসা থেকেই দলকে সমর্থন দিতে দেশ সামলানোর গুরুদায়িত্ব ফেলে তিনি ছুটে এসেছেন রাশিয়ায়, ক্রোয়েশিয়ার জার্সি পরে মাতিয়েছেন গ্যালারী। ক্যামেরার চোখ বারবার খুঁজে নিয়েছে তাকে, ধারাভাষ্যকারদের মুখেও অনেকবার উঠে এসেছে তার কথা। তিনি ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট, কোলিন্দা গ্র‍্যাবার কিতারোভিচ!

দলকে শুভকামনা জানাতে তিনি ছুটে গিয়েছেন ড্রেসিংরুমে, খেলোয়াড়দের জড়িয়ে ধরে জানিয়েছেন ধন্যবাদ। ফুটবলারেরাও বিস্মিত হয়েছেন তাকে দেখে, তারা ভাবতেই পারেননি দেশের প্রেসিডেন্ট এভাবে বলা-কওয়া ছাড়াই ড্রেসিংরুমে হাজির হয়ে যাবেন! নিজের বিশেষ বিমানে না চড়ে সাধারণ যাত্রীদের সাথেই সাধারণ ফ্লাইটে রাশিয়ায় এসেছেন তিনি, গ্যালারীতে কোন প্রটোকল ছাড়াই খেলা দেখতে ঢুকে গিয়েছিলেন! পরে অবশ্য নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে ভিআইপি গ্যালারীতে নিয়ে গিয়েছেন। এমনকি ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া হেরে যাওয়ার পরে তিনিই পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দলের খেলোয়াড়দেত স্বান্তনা দিয়েছেন, তাদের বলেছেন, তারা যেটা করেছেন, তাতেই ক্রোয়েশিয়ার মানুষ তাদের নিয়ে গর্ব করে।

স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের নানাপ্রান্তের মানুষের দারুণ আগ্রহ জন্মেছে কিতারোভিচকে নিয়ে। এমন ক্রীড়াপ্রেমী রাষ্ট্রনায়ক তো খুব বেশি দেখা যায় না, যিনি দলকে উৎসাহ যোগাতে রাজকার্য ফেলে রেখে বিদেশে ছুটে যান বারবার! সেকারণেই হয়তো বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হবার পরে গুগলে সবচেয়ে বেশিবার সার্চ হওয়া নামগুলোর মধ্যে একদম ওপরের দিকে থাকা নামটা কিতারোভিচের। এগিয়ে চলো’র পাঠকদেরও নিশ্চয়ই আগ্রহ আছে তাকে নিয়ে জানার। কিভাবে তিনি ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট হলেন, তার অতীত অর্জনগুলো কি ছিল, দেশের জন্যে তিনি কি কি করেছেন, সেসব পাঠকদের জানাতেই আমাদের আজকের আয়োজন। 

ক্রোয়েশিয়া, প্রেসিডেন্ট, কোলিন্দা গ্র্যাবার কিতারোভিচ

১৯৬৮ সালের ২৯শে এপ্রিল যুগোশ্লাভিয়ার রিয়েকায় জন্ম কিতারোভিচের। এই জায়গাটা বর্তমানে ক্রোয়েশিয়ার ভেতরে পড়েছে। যুগোশ্লাভিয়া ভেঙেই জন্ম হয়েছে ক্রোয়েশিয়ার। কিতারোভিচের বাবা একটা র‍্যাঞ্চের মালিক ছিলেন, মাংসের একটা দোকান ছিল তাদের। র‍্যাঞ্চে গরু-মহিষের চাষ করা হতো, সেগুলোর মাংস বিক্রি করেই সংসার চলতো তাদের। বাড়ির কাছেই একটা স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল কিতারোভিচের। ১৭ বছির যখন তার বয়স, তখন উচ্চশিক্ষার জন্যে আমেরিকায় পাড়ি জমালেন তিনি। হয়তো কিতারোভিচ তখন ভাবতেও পারেননি, এই দেশটা তার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে যাবে। ক্রোয়েশিয়ার সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিতে তিনি পরিণত হবেন একদিন, এই দেশটার সাহায্যেই! সেসব কথাবার্তায় পরে আসছি।

১৯৯১ সালে স্বাধীনতা ঘোষনা করে যুগোশ্লাভিয়ার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ক্রোয়েশিয়া। সার্বিয়ান সৈন্যরা হামলা চালায় ক্রোয়েশিয়া আর বসনিয়ায়, শুরু হয় যুদ্ধ। কিতারোভিচ তখন দেশে ফিরে এসে ইউনিভার্সিটি অফ জাগরেব থেকে ইংরেজী আর স্প্যানিশ সাহিত্যে গ্র‍্যাজুয়েশন করছেন। তারপর ডিপ্লোমেটিক অ্যাকাডেমি অফ ভিয়েনায় তিনি ডিপ্লোমা কোর্স করেছিলেন, এরপরে আবার জাগরেব ইউনিভার্সিটি থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপরেও পড়ালেখা থামাননি তিনি, আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এবং জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী আছে তার নামের পাশে! এমনকি এখনও তিনি জাগরেব ইউনিভার্সিটির ছাত্রী, ২০১৫ সাল থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুষদের আওতাধীন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পিএইচডি করছেন তিনি।

দেশের ক্রান্তিলগ্নে ছাত্রাবস্থাতেই কর্মজীবন শুরু হয়েছিল কিতারোভিচের। ১৯৯২ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ সগুরু করেছিলেন তিনি। দেশ তখন যুদ্ধবিদ্ধস্ত। পরের বছর রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল ক্রোয়েশিয়ান ডেমোক্র‍্যাটিক ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিলেন কিতারোভিচ। সেবছরই তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৯৫ সালে তিনি ফরেইন মিনিস্ট্রি’র উত্তর আমেরিকা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৯৭ সালে তাকে পাঠানো হয় কানাডায়, সেখানকার ক্রোয়েশিয়ান দূতাবাসে সেকেন্ড ইনচার্জ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় তাকে। 

কোলিন্দা গ্র্যাবার কিতারোভিচ, ক্রোয়েশিয়া, প্রেসিডেন্ট, বিশ্বকাপ ফুটবল

২০০০ সালে ক্রোয়েশিয়ায় সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন দূতানাসে রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের নিয়োগ বাতিল করে দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দেয়। এই তালিকায় কিতারোভিচের নামও ছিল। তাকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে দেশে ফিরে আসার আল্টিমেটাম দেয়া হয়। কিন্ত সন্তানসম্ভবা হওয়ায় কিতারোভিচ ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানান। তার হাসপাতাকে ভর্তি হবার তারিখ ঘনিয়ে এসেছিল। কিন্ত দেশ থেকে তাকে ফিরে আসার জন্যে চাপ অব্যহত রাখা হয়। শারিরীক অবস্থার কথা বিবেচনা করে সময় খানিকটা বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থাতেই কিতারোভিচ আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্যে আবেদন করেন। সেখানে তার আবেদন মঞ্জুরও হয়। সন্তানের জন্মের পরে তিনি আমেরিকায় চলে যান। সেখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর পর দেশে ফিরে আসেন কিতারোভিচ।

২০০৩ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্রোয়েশিয়ান ডেমোক্র‍্যাট ইউনিয়নের হয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৫ সালে ক্রোয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইউরোপীয় অংশের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় কিতারোভিচকে। মন্ত্রী হিসেবে তার প্রধান কাজ ছিল ন্যাটোয় ক্রোয়েশিয়ার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। ২০০৭ এর নির্বাচনেও তিনি জয়লাভ করেন সাংসদ হিসেবে, তাকে আবারও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্ত কিছুদিন পরেই অজানা কারণে তার মন্ত্রীত্ব কেড়েও নেয়া হয়। তারপর তাকে ক্রোয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় আমেরিকায়। 

ক্রোয়েশিয়া, প্রেসিডেন্ট, কোলিন্দা গ্র্যাবার কিতারোভিচ

ওয়াশিংটন ডিসিতে ক্রোয়েশিয়ান দূতাবাসেই ছিল তার অফিস। সেখানে আরেক বিতর্কের সাথে জড়িয়ে যায় তার নাম। কিতারোভিচের স্বামী জ্যাকব বিনা অনুমতিতে তার প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে দূতাবাসের গাড়ি ব্যবহার করতেন। সেটা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়তে হয় কিতারোভিচকে। পরে অবৈধভাবে ব্যবহারকৃত গাড়ির খরচাপাতি পরিশোধ করতে হয়েছিল তাকে। দূতাবাসের যে কর্মচারী জ্যাকবের অবৈধভাবে দূতাবাসের গাড়ি ব্যবহার করার দৃশ্যগুলো ভিডিও করেছিলেন, তাকে বরখাস্ত করা হয়।

২০১১ সালে তিনি ন্যাটো’র অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। আমেরিকার সুদৃষ্টি ছিল তার ওপরে, সেকারণেই এই পদটা তিনি পেয়েছিলেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। ন্যাটোর এই পদে যে তিনি যোগদান করছেন, সেটা সম্পর্কে দেশের প্রধানমন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও অবহিত করেননি তিনি। কাজেই কিতারোভিচ যখন হুট করেই দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন, তখন তার শূন্যস্থান পূরণ করতে বেশ কয়েকমাস সময় লেগে গিয়েছিল ক্রোয়েশিয়ার। ফলে ওয়াশিংটনে ক্রোয়েশিয়ান দূতাবাসে মোটামুটি স্থবির একটা অবস্থা বিরাজ করছিল তখন। ন্যাটোর হয়ে আফগানিস্তান এবং ইরাকে একাধিকবার ভ্রমণ করেছিলেন কিতারোভিচ।

কিতারোভিচের প্রতিপক্ষ দল তখন ক্ষমতায়। ২০১৪ সালে তিনি ন্যাটো ছেড়ে চলে এলেন দেশে। পার্টির পক্ষ থেকে জানানো হলো, ২০১৫ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে কিতারোভিচই হবেন দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। এটার পেছনে অবশ্যই আমেরিকার হাত ছিল বলে ধারণা করেন অনেকে। কারণ, কিতারোভিচের চেয়ে যোগ্য এবং সৎ ইমেজের প্রার্থী দলের ভেতরেই ছিল। তাদের অনেকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও কিতারোভিচের চাইতে সমৃদ্ধ ছিল। কিন্ত কিতারোভিচের কাছে ছিল ওবামা প্রশাসনের সমর্থন, যেটা অন্য কারো কাছে ছিল না। সেই সমর্থনই তাকে নির্বাচনী বৈতরনী পার করিয়ে এনেছিল বলে ধারণা করেন অনেক সমালোচক। 

কোলিন্দা গ্র্যাবার কিতারোভিচ, ক্রোয়েশিয়া, প্রেসিডেন্ট, বিশ্বকাপ ফুটবল

মূলত উগ্র জাতীয়তাবাদকে আঁকড়ে ধরেই নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন কিতারোভিচ। ইউরোপজুড়ে তখন শরণার্থী সমস্যা চরমে। ক্রোয়েশিয়ায় তাদের জায়গা দেয়া উচিত নয় বলেই মত দিয়েছিলেন কিতারোভিচ। এই ঘোষণা দেশটির উগ্র জাতীয়তাবাদীরা লুফে নিয়েছিল। তবুও ভোটের ফলাফল অনুকূলে আনতে বেগ পেতে হয়েছে কিতারোভিচকে। মাত্র দেড় শতাংশেরও কম ব্যবধানে নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। এই বিজয়ের ক্ষেত্রে কিতারোভিচের দূরদর্শীতা বা রাজনৈতিক পরিপক্কতার চেয়ে প্রতিপক্ষের ভুল সিদ্ধান্তই বেশি দায়ী ছিল বলে দাবী করেন অনেকে। তবুও, নতুন ইতিহাস লেখা হয়ে গেল, ক্রোয়েশিয়ার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন কোলিন্দা গ্র‍্যাবার কিতারোভিচ!

২০১৯ সালে পরবর্তী নির্বাচন। দেশে কিতারোভিচ আর তার দল, দুটোরই জনপ্রিয়তা কমেছে গত কয়েক বছরে। আগামী মেয়াদে তার দল সরকার গঠন করতে পারবে না বলেই বেশিরভাগ বিশ্লেষকের ধারণা। আর সেকারণেই হয়তো হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধারের জন্যে কিতারোভিচ বেছে নিয়েছেন এবারের বিশ্বকাপকে। ক্রোয়েশিয়ার অনেক মানুষ কিন্ত এমনটাই মনে করে।

এই যে খেলোয়াড়দের জড়িয়ে ধরা, সাধারণ যাত্রীদের সাথে বিমানে চড়া, গ্যালারীতে দাঁড়িয়ে দলকে সমর্থন দেয়া, মিডিয়ার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা, এসবই পাবলিসিটি বলেই মত দেন ক্রোয়েশিয়ার অনেক মানুষ। তাদের মতে, দল ভালো খেলেছে, বিশ্বকাপে দ্বিতীয় হয়েছে, সেটা অবশ্যই সাধুবাদ জানানোর মতো। কিন্ত প্রেসিডেন্টের কাজকে তারা সাধুবাদ জানাতে পারছেন না। কারন তিনি খেলোয়াড়দের মতো নিজেকে উজাড় করে দেয়ার জন্যে রাশিয়ায় যাননি, গিয়েছেন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে, নিজেকে আলোচনায় রাখতে।

কিতারোভিচ যা করেছেন, সেটা মন থেকে করে থাকুন আর পুরোটাই তার পরবর্তী নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবেই করে থাকুন, সেই কাজে কিন্ত তিনি সফল। পুরো বিশ্বের মনযোগ আকর্ষন করাটা চাট্টেখানি কথা নয়। রাশিয়া বিশ্বকাপে কিতারোভিচ সেটাই করে দেখিয়েছেন! 

তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া, ডিএনএ ইন্ডিয়া, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য সান।

Comments
Spread the love