রঞ্জি ট্রফি, কর্ণাটকের বিপক্ষে দিল্লির ম্যাচ। আপনার দল তখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে, হুট করেই হোটেলে কোচ আপনার রুমে এলেন, খবর দিলেন, আপনার বাবা আর বেঁচে নেই, চলে গেছেন না ফেরার দেশে! খানিকটা সময় স্তব্ধ হয়ে রইলেন আপনি, বাবার কথা মনে পড়লো, সেই বাবা, যিনি আপনার স্বপ্নটা পড়তে পেরেছিলেন। যিনি আপনার স্বপ্ন পূরণের জন্যে হাতে এক স্বপ্নবাজ কিশোরের হাতে ব্যাট তুলে দিয়েছিলেন!

কোচ বললেন ব্যাগ গুছিয়ে নিতে, বাড়ি যেতে হবে। আপনি তখন দোটানায় ভুগছেন। একদিকে বাবা, অন্যদিকে দল। বাবা শিখিয়েছিলেন, যে কাজে হাত দেবে, সেটা শেষ না করে উঠবে না। সতেরো বছর বয়েসী সেই কিশোরের মাথায় সেই লাইনটা বেজে উঠলো হুট করে। আপনি কোচকে জানিয়ে দিলেন, আপনি থাকছেন! কোচ অবাক, পরদিন মাঠে আপনাকে দেখে অবাক দলের খেলোয়াড়েরাও! তারা ভাবতেই পারেননি আপনাকে দেখা যাবে সেখানে!

ব্যাট-প্যাড নিয়ে নামলেন আপনি, চোখে জল, মাথায় ওই একটা লাইনই বাজছে- “যে কাজে হাত দেবে, সেটা পুরোপুরি শেষ করে আসবে…” আপনার কাজ তখন ফলো-অনে পড়া দলকে বাঁচানো, ডুবু ডুবু তরীটা ঠেলে তীরে নিয়ে আসা। ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টিতেই মিনিটের পর মিনিট উইকেটে কাটিয়ে গেলেন আপনি। নব্বইটা রান যোগ হলো আপনার নামের পাশে, মাঠ ছাড়লেনও অশ্রুসিক্ত নয়নে, ততক্ষণে দল নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে গেছে! 

ডেডিকেশন, বিরাট কোহলি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নাসির হোসেন

অনেকগুলো বছর আগে এমনভাবেই একজন বাবাকে হারানোর শোক সামলে মাঠে নেমেছিলেন। সেঞ্চুরী তুলে আকাশের পানে তাকিয়ে খুঁজেছিলেন হারিয়ে যাওয়া বাবাকে। সেই শচীন টেন্ডুলকার ছিলেন আপনার আইডল, আপনি সবসময় শচীন হতে চেয়েছেন, তার মতো ব্যাটিং করতে চেয়েছেন, তার মতো করেই বিশ্বকে শাসন করতে চেয়েছেন। ক্রিকেট ছিল শচীনের কাছে ‘ফার্স্ট প্রায়োরিটি’ আপনার কাছেও তাই। বিরাট কোহলি, আপনি বিশ্বসেরা হবেন না তো আর কে হবে বলুন?

জাতীয় দলে আপনার আগমন নিয়ে খুব ধুমধাম হয়নি। বয়সভিত্তিক দলের হয়ে ভালোই করছিলেন, কিন্ত খেই হারালেন আইপিএলে গিয়ে। হয়তো প্রত্যাশার চাপটা বড় হয়ে গিয়েছিল অনেক। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডেতে অভিষেক, বাইশ বলে বারো রানের ইনিংস, স্পেশাল কিছুই নয়। সেই ‘অর্ডিনারি’ ছেলেটাই যে পরের বছরগুলোতে ভারতীয় ক্রিকেটের জন্যে ‘বিগেস্ট থিং’ হতে চলেছেন, সেটা হয়তো কেউই কল্পনা করেনি! যে টেন্ডুলকারকে সামনাসামনি দেখার পরে হা হয়ে তাকিয়ে ছিলেন আপনি, সেই টেন্ডুলকারের রেকর্ডগুলো এখন আপনার কারণেই হুমকির মুখে! কোহলি, এগুলো সব স্বপ্নের মতো মনে হয় না? কখনও কি মনে হয়, হুট করে ঘুমটা ভেঙে যাবে, আর দিল্লির দুই রুমের ঘুপচি একটা ফ্ল্যাটে নিজেকে আবিস্কার করবেন আপনি! 

শচীন টেন্ডুলকার, বিরাট কোহলি, ব্যাটিং ঈশ্বর, ভারতের বিশ্বকাপ জয়

এপিজে আবদুল কালাম বলেছিলেন, ‘রাত জেগে দেখা ঘটনাগুলো স্বপ্ন নয়, যে জিনিসটা তোমাকে ঘুমুতে দেয় না, সেটাই তোমার স্বপ্ন।’ আপনার স্বপ্ন ছিল ক্রিকেট, আপনার বন্ধু ছিল ক্রিকেট, আপনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সবকিছু ক্রিকেটেই ছিল। সেই স্বপ্নটা আপনি ঐশ্বরিক মেধার সঙ্গে কঠোর পরিশ্রমকে সমানভাবে মিশিয়ে পূরণ করেছেন! দিল্লির ছেলে হয়ে আপনি টানা চার বছর তেল-ঘি জাতীয় খাবার খান না শুনে যে কেউই আঁতকে উঠবেন! চার সংখ্যাটা এখন বেড়ে গিয়ে ছয় বা আটে পরিণত হয়েছে বোধহয়! মিষ্টির জন্যে পাগল ছিলেন আপনি, এখন সতীর্থদের কাউকে মিষ্টি খেতে দেখলেও অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় আপনাকে! আধুনিক ক্রিকেটে ফিট থাকাটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, সেই চ্যালেঞ্জে একটুও আপোষ করতে রাজী নন আপনি! মুনি-ঋষিদের মতোই আপনার ব্রত, একবেলার জন্যেও সেই ধ্যান ভাঙতে পারবে না কেউ! ঘন্টার পর ঘন্টা জিমে পড়ে থাকতে একটুও আপত্তি নেই আপনার, একটা শটে নিঁখুত টাইমিঙের জন্যে সারাদিন প্র‍্যাকটিস গ্রাউন্ডে পড়ে থাকতেও রাজী আপনি! সেই কোহলি সেরা হবেন না তো কে হবে বলুন?

শুরুর দিনগুলোতে আপনার অ্যাগ্রেশনটা বিরক্ত লাগতো খুব, মনে হতো, ধরে কানের নিচে আচ্ছা করে দিই কয়েক ঘা! সেই আপনাকে দেখেই আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, পারফরম্যান্স নয়, শুধু অ্যাগ্রেশন দিয়েও প্রতিপক্ষের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়া যায়, তাদের ওপর ডমিনেট করা যায়, কখনও ক্রুশাল মোমেন্টে ম্যাচও বের করে আনা যায়! এই অ্যাগ্রেশনটাই আপনার ভেতর থেকে সেরা পারফরম্যান্সটা বের করে আনে, আপনাকে তাঁতিয়ে দেয়, সেটা বুঝতে পেরেছি অনেক দেরীতে। জনসনের আগুণে বাউন্সারের জবাব আপনি হুক আর পুলেই দেবেন, ডিফেন্স করে নয়, আপনি চোখের দিকে তাকিয়ে লড়বেন, মাটির দিকে তাকিয়ে নয়! এই হার না মানার জেদটাই আপনাকে কোহলি বানিয়েছে, সেটা আমি এখন বিশ্বাস করি! 

বিরাট কোহলি, শচীন টেন্ডুলকার, ভারত ক্রিকেট দল, কোহলির রেকর্ড

আপনার একেকটা ইন্টারভিউ আমি পড়ি, সিনিয়র আর সতীর্থদের সম্পর্কে আপনার করা মন্তব্যগুলো মুগ্ধ হয়ে শুনি। একটা মানুষ, যাকে ক্রিকেটবিশ্ব সেরা খেলোয়াড়ের তকমা গায়ে জড়িয়ে দিচ্ছে, সেই মানুষটা নিজের ক্রেডিট নিতে অপারগ! অহংকারী, দুর্বিনীত, এই বিশেষণগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যায় হুট করেই! মাঠের বাইরের বিরাট অন্য মানুষ, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না একটুও। দলের জুনিয়রদের আপনি আগলে রাখেন, রানখরায় ভুগতে থাকা অজিঙা রাহানের কাঁধে হাত রেখে জানিয়ে দেন, পুরো দল নিয়ে আপনি তার পাশে আছেন। লোকে ভুলে যেতে পারে, কিন্ত আপনি ভোলেন না, গত দুই বছরে রাহানে আপনার দলকে কতখানি দিয়েছে!

অধিনায়কত্বের ভারটা আপনার ব্যাটের ধার যেন বাড়িয়ে দিল আরও! অথচ কত কথা উঠেছিল তখন, ধোনি নাকি আপনার কারণেই অধিনায়কত্ব ছেড়েছেন, ভারতীয় দলও ছাড়বেন তিনি অচিরেই! অথচ সেই ধোনি আপনার নেতৃত্বে কত গুলো ম্যাচ খেলে ফেললেন! দুজনে মাঠে খুনসুটি করছেন, পাশাপাশি দাঁড়াচ্ছেন ফিল্ডিঙের সময়, ব্যাটিঙে জুটি বাঁধছেন! সাংবাদিকেরা ধোনির অফফর্মের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে আপনি সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন- “ভারতের ক্রিকেটকে ধোনি যেটা দিয়েছে, সেটার ঋণ শোধ করা সম্ভব নয় কোনদিনই। সেই সম্মান হিসেবেই তার সব সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দিন প্লিজ…” কোহলি, স্রষ্টা কি আপনার মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী ঢুকিয়ে দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন?

আপনার মুখে ফিল্ডিঙের গাণিতিক সমীকরণ শুনে চমকে উঠি। গতি, স্থিতি, আর জড়তার অঙ্ক পদার্থবিজ্ঞানে করেছি, সেগুলো যে ক্রিকেটেও কাজে লাগতে পারে, সেসব জানা ছিল না। একটা ক্যাচের পেছনে যে পরিমিত খাবার, দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম থেকে রাতের ঘুম পর্যন্ত জড়িত থাকতে পারে, সেসব শুনে কেমন যেন ঘোর লাগে। ক্রিকেটটা হৃদয় দিয়ে খেলার কথা শুনেছি, মাথা দিয়ে খেলার কথাও শুনেছি। কিন্ত আপনি ক্রিকেট খেলেন মন আর মাথা সমানভাবে ব্যবহার করে! আপনার কথা শুনে ক্রিকেটটাকেও বিজ্ঞান বলেই মনে হয় যেন! 

দুটো ম্যাচে রান না পেলেই আপনার সমালোচনা হয়, কারণ আপনি একাই প্রতিপক্ষকে ধ্বসিয়ে দেন, ওয়ান ম্যান আর্মির মতো গুঁড়িয়ে ফেলেন বিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে। আপনার হেটার বেশি হওয়াই তো স্বাভাবিক! আপনার উইকেটটা পেলে দুনিয়ার যে কোন বোলার বর্তে যায়, প্রতিপক্ষের কোচ-অধিনায়ক আপনার জন্যে হোমওয়ার্ক করে মাঠে নামে, শত্রুপক্ষের এতখানি মনযোগ ক্রিকেটে কবে কে পেয়েছিলেন কে জানে!

রানের পর রান করার পরেও দুয়েকজন ঠিকই মিনমিন করে বলেন, তাতে কি, কোহলি তো ইংল্যান্ড-আফ্রিকায় রান পায়নি! আপনি শুনে হাসেন। আপনি আফ্রিকায় গিয়ে সেঞ্চুরী করেন, ওয়ানিডেতে স্বাগতিকদের ঘোল খাওয়ায় আপনার দল। ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্টে আপনার গড় ছিল চৌদ্দর ঘরে, সেই চৌদ্দর নামতা ভুলিয়ে দিয়ে আপনি সেঞ্চুরী হাঁকান, আপনার হাসিতে ‘আর কিছু বলার আছে?’ টাইপের কোন বার্তা আমরা খুঁজে পাই না। ক্যারিয়ারের দশ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরে বিরাট কোহলি কাউকে জবাব দেয়ার জন্যে খেলেন না, কাউকে দেখিয়ে দেয়ার বা নিজের সামর্থ্য প্রমাণের জন্যে মাঠে নামেন না। সবাই জানে, কোহলি কি জিনিস, কোহলি কতখানি ভয়ঙ্কর। এই কোহলি মাঠে নামেন সবাইকে ছাপিয়ে যেতে, সবকিছু জয় করতে। সেটা আপনি পারবেন কোহলি, আমি জানি… 

আরও পড়ুন-

 

Comments
Spread the love