অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

শৈশবের চেনা মানুষটি আর নেই…

কফি আনান আর নেই।

কথাটা শুনার পর মনে হলো ছেলেবেলার চেনা কেউ যেন চলে গেল। মানুষটার সাথে আমাদের একটা শৈশবের যোগাযোগ আছে। শৈশবে বিটিভির ‘এবারে আন্তর্জাতিক সংবাদ’ বলে সংবাদপাঠিকা যখন এক নাগাড়ে খবর পড়ে যেতেন তখন এই মানুষটাকে প্রায় প্রতিদিনই দেখতাম। “আজ জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান বলেছেন…” এরকম খবরগুলোতে দেখতাম কফি আনানের কথা। দিনের পর দিন তাকে দেখতে দেখতে মনে তার সাথে একটা মানসিক যোগাযোগ যেন হয়ে গিয়েছিল।

হয় না এরকম প্রতিদিন আপনি আপনার নিজের চেনা জগতেই কাউকে দেখছেন, হয়ত কোনোদিন কথা বলেননি, কিন্তু একদিন শুনলেন সে মানুষটা আর নেই! নিশ্চয়ই একটু হলেও খারাপ লাগবে। চেনা জগতের একটা জায়গা আগের মতো না থাকলে এক ধরণের শূন্যতা সৃষ্টি হয়। কফি আনানের প্রয়াণে সেই বোধটাই যেন মাথায় ঘুরছে। জাতিসংঘ এবং কফি আনান শৈশবের সমার্থক শব্দ। জাতিসংঘকে চিনেছিলাম কফি আনানকে দিয়ে।

তাছাড়া ছেলেবেলায় কফি আনানের নাম নিয়ে করা কিছু উদ্দেশ্যহীন নিস্পাপ রসিকতার কথাও এই মুহুর্তে মনে পড়ছে। কিন্তু, আজন্মই একটা শ্রদ্ধাবোধ কাজ করেছে এই মানুষটার প্রতি। ১৯৩৮ থেকে ২০১৮। মাঝে কেটে গিয়েছে আশি বছর। এই আশি বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে কফি আনান নোবডি থেকে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তদের একজন হয়েছেন। বিশ্বশান্তির জন্য লড়াই করে যাওয়া এই অসাধারণ মানুষটির জীবনের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

আফ্রিকার দেশ ঘানা। এই দেশে জন্মেছিলেন কফি আনান, কৃষ্ণাঙ্গ একজন মানুষ যিনি আফ্রিকার প্রতিনিধি তার জন্যে পথচলা নিশ্চয়ই সহজ ছিলো না এই বর্ণবাদী দুনিয়ায়। ১৯৯৭ সালে কফি আনান যখম জাতিসংঘের দায়িত্ব নেন মহাসচিব হিসেবে তখন তিনি ছিলেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ যিনি এই দায়িত্বটি পান। সপ্তম মহাসচিব হিসেবে তিনি কাজ করেছিলেন ২০০৬ সাল পর্যন্ত।

তিনি বলতেন,

“We may have different religions, different languages, different colored skin, but we all belong to one human race.”

মানুষের জীবন নিয়েই তার কাজ, তার ভাবনায় এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন যে পৃথিবীতে মানুষের মানবিকবোধই হবে সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়।

 

২০১২ সালে তার একটি স্মৃতিকথা প্রকাশিত হয়,”Interventions: A Life in War & Peace” নামে। কফি আনান গোটা জীবনই যুদ্ধ এবং শান্তির মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজে ব্যয় করেছেন। ইরাকে মার্কিনিদের যুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি এই যুদ্ধকে বলেছিলেন অবৈধ। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার শান্তি ফিরিয়ে আনতে তিনি বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করেছে। এইচআইভি ভাইরাসের ব্যাপারে গণসচেতনতা গড়ে তুলতে কফি আনান বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত একটি বিশ্বের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। তাই, সহস্রাব্দ উন্ময়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তিনি তার সবচেয়ে বেশি উচ্চকন্ঠ ছিলেন, কাজেও তারই প্রমাণ মেলে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করা নিয়েও কফি আনান কাজ করেছেন। মানবজাতির জন্য হুমকি এমন ব্যাপারগুলোই তার কাজ করার মূল জায়গা।

তবে কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন, যেমন নন কফি আনানও। ১৯৯৩ সালে একবছরে যখন ৮ লাখ মানুষ রুয়ান্ডায় অত্যাচারিত হয়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো তখন কফি আনান ছিলেন জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা বিভাগের প্রধান, মহাসচিবের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও সেইসময় তিনি কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছেন তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন সেসময়। ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার তথাকথিত জাতিসংঘের নিরাপদ জোনে ৮ হাজার মানুষের ফাঁসি কার্যকর হয়েছিলো অবৈধভাবে সার্বিয়ান বাহিনীর হাতে। এটি নিয়েও কফি আনান প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন। যদিও কফি আনান বলেছেন, তিনি সেসময় তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যা করেছেন তার চেয়েও বেশি চেষ্টা করতে পারতেন, এর চেয়েও গভীর ভূমিকা রাখতে পারতেন।

কফি আনান বাংলাদেশের বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারটি নিয়েও কাজ করেছেন। তার নেতৃত্বে আনান কমিশন সুপারিশমালা তৈরি করে। বাংলাদেশ সরকারও এই সুপারিশমালার বাস্তবায়ন দাবি করে আসছে। আনান কমিশনের সুপারিশের মূল কথা হলো- “রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং মিয়ানমার ও বাংলাদেশ মিলে যৌথ যাচাইপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের নিরাপদে (বাংলাদেশ থেকে) প্রত্যাবাসন করতে হবে।”

কফি আনানকে তাই বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের সকল শান্তিপ্রত্যাশী মানুষ স্মরণ করবে। ওপারে ভালো থাকবেন ছোটবেলার চেনা মানুষ, প্রিয় কফি আনান। যুদ্ধ, বিগ্রহ, অসহিষ্ণুতার এই সময়ে আপনার চলে যাওয়া আমাদের আজ মন খারাপের কারণ..

Comments

Tags

Related Articles