ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

তলাবিহীন ঝুড়ি ও একটি সেলফির গল্প

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন বিমানের অত্যাধুনিক সংযোজন ড্রীমলাইনার আকাশবীণার উদ্বোধন করতে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাটও উপস্থিত ছিলেন সেখানে। বিমানের ইকনোমি ক্লাস পরিদর্শনের সময় বার্নিকাট নিজের মোবাইলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকটা সেলফি তুলেছিলেন, সেই মূহুর্তগুলো আবার আলোকচিত্রীরা বন্দী করেছেন ক্যামেরায়। ছবিগুলো দেখতে দেখতে হুট করেই একটা লোকের কথা মনে পড়লো, হেনরি কিসিঞ্জার, সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্ত এই সেলফির সাথে পঁচানব্বই বছর বয়েসী এই লোকের কি সম্পর্ক?

সম্পর্ক আছে, বেশ গভীর একটা সম্পর্ক আছে। পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় মার্কিন রাজনীতিবিদেরা মেনে নিতে পারেননি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিকামী বাঙালীদের সঙ্গে যুদ্ধে কেবল পাকিস্তানই হারেনি, হেরেছিল তাদের গডফাদার আমেরিকাও!

বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার সংগ্রামে লড়ছে, কিসিঞ্জার তখন আমেরিকান সরকারের নিরাপত্তা বিশ্লেষকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমেরিকার বন্ধুরাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙে আলাদা হয়ে যাক, এটা তারা কোনভাবেই চায়নি, তাই রিচার্ড নিক্সনের আমেরিকা সরকারের পাশাপাশি হেনরি কিসিঞ্জারের পূর্ণ সমর্থন ছিল পাকিস্তানের প্রতি। বাংলাদেশকে সাহায্য করায় ভারতীয়য় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে বাজে মন্তব্যও করেছিলেন তিনি। তার পরামর্শেই নাকি পাকিস্তানকে রক্ষার জন্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে বঙ্গোপসাগরে পাঠাতে চেয়েছিল আমেরিকা! 

হেনরি কিসিঞ্জার, তলাবিহীন ঝুড়ি বাংলাদেশ, মার্শিয়া বার্নিকাট, শেখ হাসিনা, সেলফি, বিমান আকাশবীণা

কিন্ত তাদের সেই ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। বাঙালী আদায় করে নিয়েছিল তাদের প্রাণের দাবী, জন্ম হয়েছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। তবে বিশ্বের মানচিত্রে সদ্য জন্ম নেয়া এই দেশটার প্রতি আমেরিকার বৈরি আচরণ পাল্টায়নি তখনও। নৈতিক পরাজয়ের ক্ষোভটা ভুলতে পারছিল না তারা। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ তখন ধ্বংসস্তুপ, হাঁটি হাঁটি পা পা করে ধীর গতিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। যুদ্ধের সময় পুরো দেশের অবকাঠামোই ভেঙে পড়েছিল, বৈদেশিক সাহায্যের তখন প্রয়োজন ছিল ভীষণ।

বিশ্বের ক্ষমতাশালী দেশগুলোর অনেকের মধ্যেই বাংলাদেশকে নিয়ে নেতিবাচক একটা ধারণা ছিল তখনও। তারা ভাবতো, তাদের করুণা ছাড়া বাংলাদেশ কখনও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। আরেকটা দল মনে করতো, বাংলাদেশকে সাহায্য দিয়েও লাভ নেই, হেনরি কিসিঞ্জার এই দলেরই একজন ছিলেন। তিনি তখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একবার তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে একটা তলাবিহীন ঝুড়ি, এখানে যতো অর্থই ঢালা হোক না কেন, সবটাই বিফলে যাবে!

হেনরি কিসিঞ্জার এখনও বেঁচে আছেন। পঁচানব্বই বছর বয়েস তার। পত্রপত্রিকা পড়েন কিনা কে জানে! পড়ে থাকলে তার জানার কথা, যে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে তিনি উপহাস করেছিলেন সাড়ে চারযুগ আগে, সেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সেলফি তোলার জন্যে তার দেশের রাষ্ট্রদূত লাইনে দাঁড়িয়ে যান। বছর চারেক আগে তারই দেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা তো এক অনুষ্ঠানে কিসিঞ্জারের কথা টেনে এনে বলেছিলেন, বাংলাদেশকে এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি বলার কোন সুযোগ নেই, বাংলাদেশ এখন পরিপূর্ণ ঝুড়ি! 

হেনরি কিসিঞ্জার, তলাবিহীন ঝুড়ি বাংলাদেশ, মার্শিয়া বার্নিকাট, শেখ হাসিনা, সেলফি, বিমান আকাশবীণা

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে বিশাল প্রতিবেদন ছাপা হয়, সেটার শিরোনামটা দেখে বুক ফুলে ওঠে গর্বে- ‘Bangladesh, basket case, No more!’ হেনরি কিসিঞ্জার কি সেই প্রতিবেদন পড়েছিলেন? সকালবেলার চায়ের সাথে পত্রিকা পড়তে পড়তে বিষম খেয়েছিলেন কি তিনি?

তৈরি পোষাকশিল্পে আমাদের দেশ এগিয়ে গেছে অনেকদূর, আমাদের ছেলেমেয়েরা বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ছে কৃতিত্বের সঙ্গে, আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগীতায় দেশের নাম উজ্জ্বল করছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আমরা রেকর্ড করেছি, শান্তিরক্ষা মিশনে অনেক বছর ধরেই সর্বোচ্চ সংখ্যক সৈন্য পাঠাচ্ছি আমরাই। দেড়কোটি মানুষ বিশ্বের নানা দেশে কাজ করছেন, সেখান থেকে অর্থ পাঠাচ্ছেন, সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের রেমিট্যান্স। বৈদেশীক সাহায্য এখন আমাদের না হলেও চলে। দেশে এখন মঙ্গা নেই, দারিদ্র‍্যতা থাকলেও সেটার প্রকোপ কমে এসেছে ধীরে ধীরে।

হেনরি কিসিঞ্জার তলাবিহীন ঝুড়ি বলে উপহাস করেছিলেন বাংলাদেশকে, সেই বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার এখন ৭.৬৫%, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় আমরা নাম লিখিয়েছি সম্প্রতি, নিজেদের স্যাটেলাইট উড়েছে আকাশে। আমরা এখন কারো মুখাপেক্ষী নই, বিশ্বব্যাংক লোন না দিলে গাটস দেখিয়ে নিজেদের টাকায় আমরা পদ্মাসেতু বানিয়ে ফেলি, অন্যকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়ার আর অন্যের ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার সাহস কিংবা ক্ষমতা, দুটোই আমাদের আছে। পায়ের তলার শক্ত জমিনটা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি, সেই জমিনে দাঁড়িয়ে আমরা পরাশক্তিদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলি এখন! 

হেনরি কিসিঞ্জার, তলাবিহীন ঝুড়ি বাংলাদেশ, মার্শিয়া বার্নিকাট, শেখ হাসিনা, সেলফি, বিমান আকাশবীণা

আমাদের দেশে এখনও হাজারটা সমস্যা আছে, অল্প একটু জায়গায় কোটি কোটি মানুষ বাস করি, শিক্ষা বা চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো সবার ক্ষেত্রে পূরণ হয় না সবসময়। আমাদের জীবনযাত্রার মান ইউরোপ আমেরিকার মতো উন্নত নয়, আরবদের মতো পেট্রোডলারের ঝনঝনানি নেই আমাদের। সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা বেঘোরে প্রাণ হারাই, লঞ্চডুবিতে মরে যাই, আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটা জায়গায় কমবেশি অনিয়ম আর দুর্নীতি আছে- সবকিছুই সত্যি। কিন্ত তারচেয়ে বড় সত্যি হচ্ছে, এতসব প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি ঠিকই। 

কিসিঞ্জারের দেশের রাজনীতিবিদেরা এখন বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন, বাংলাদেশকে অনেকক্ষেত্রেই ‘রোল মডেল’ বলে উল্লেখ করেন, হিলারী ক্লিনটন আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে তার বন্ধুর জন্যে সুপারিশ করেন! মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেলফি তুলে আনন্দে আত্মহারা হন, বাংলালিঙ্কের বিজ্ঞাপনের মতোই ‘দিন বদলে গেছে’ ভীষণরকম! সেই বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে হয়তো মার্কিন মুল্লুকে বসে হেনরি কিসিঞ্জার দেখছেন। মুন্নী সাহার মতো আমাদের খুব জানতে ইচ্ছে করে, তলাবিহীন ঝুড়ির এমন বদলে যাওয়া দেখে কিসিঞ্জারের অনুভূতিটা কী?

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close