রাত এগারোটা, নিউ ইয়র্ক।

পুরো বাড়িটা আলোয় আলোকিত, কিন্তু থমথমে একটা নিরবতা চারপাশে। পুলিশের গাড়িটার আলো দেয়ালে ছায়া ফেলছে, মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে বাড়িটার ভেতর থেকে। বাসার বাইরে অনেকগুলো গাড়ি, অনেক মানুষ। বাড়ির মালিক, ম্যানুয়েল পারনেল বসে আছেন ডাইনিং হলে। তাকে ঘিরে ছোট্ট একটা জটলা, ইন্সপেক্টর ভিক্টর নোট নিয়ে নিচ্ছেন মাঝে মাঝে।

মি. পারনেল ও রিভেরা, দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং বিজনেস পার্টনার। প্রায়ই একসাথে সন্ধ্যায় দাবা খেলতে বসেন, পরশুদিনও বসেছিলেন। সাথে চলছিলো হুইস্কি আর সিগারের রাউন্ড। খেলার মাঝপথে হঠাৎ বুক খামচে ধরে চিৎকার করতে শুরু করেন রিভেরা। তার নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, বলতে থাকেন তিনি। হার্ট এ্যাটাক সন্দেহে হাসপাতালে খবর দেন পারনেল। একসময় ছটফট করতে করতেই মেঝেতে এলিয়ে পড়েন রিভেরা। ডাক্তার এসে পরীক্ষার পরে মৃত ঘোষণা করেন ভিকি রিভেরাকে।

যদি এটা স্বাভাবিক মৃত্যু হতো, তাহলে হয়তো পুলিশ আসার প্রয়োজনই পড়তো না। কিন্তু মৃতের কিছু শারিরীক লক্ষণ দেখে সন্দেহ হয় ডাক্তারের, করোনারের রিপোর্টে আসে বিষক্রিয়াই মৃত্যুর কারণ। হুইস্কির গ্লাসে পরীক্ষা করে পাওয়া গেছে বিষ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিষ পাওয়া গেছে মি, পারনেলের গ্লাসটিতেও। যদিও সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক আছেন তিনি।

‘ইন্সপেক্টর, বিশ্বাস করুন। আমি জানিনা, কিভাবে এটা সম্ভব।’ মাথা নাড়ছেন ম্যানুয়েল পারনেল। শক্তসামর্থ মানুষ তিনি, ঝানু ব্যবসায়ী, এখন যদিও মনে হচ্ছে বয়সটা হঠাৎ করে বেড়ে গেছে।’ আমরা শুধু ব্যবসায় সঙ্গী নই, আমরা খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলাম। আমি জানি না কার এমন শত্রুতা ছিলো ভিকির সাথে যে ওকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করবে। আর বিষই যদি প্রয়োগ করে, আমার কিছু হলোনা কেন? একই বোতলের হুইস্কি খেলাম, আর এখন ভিকি মৃত।’

ইন্সপেক্টর ভিক্টর পোড়খাওয়া লোক। তিনিও আসলে বুঝতে পারছেন না,  কিভাবে এটা সম্ভব। তিনি মৃদুস্বরে বললেন, ‘দেখুন, আমরা তদন্ত করছি। নিশ্চয়ই অপরাধী যেই হোক, বেরিয়ে আসবেই। আমাদের একটু সময় দিন প্লীজ।’

সময় চাইলেও ইন্সপেক্টর কিছুতেই বুঝতে পারছেন না, কিভাবে এটা সম্ভব। মি. ভিকি রিভেরা শুধু একজন ধণাঢ্য ব্যবসায়ীই ছিলেন না,  ছিলেন মেয়র রবিনসনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন, কেসটা টপ প্রায়োরিটিতে এসে দাড়িয়ে আছে।

বাসার সামনে প্রায় নিঃশব্দে একটা লিমুজিন এসে থামলো। লিমো থেকে প্রথমে নামলো কেতাদুরস্ত বৃদ্ধ শোফার, তারপরে পুরো সাহেবী কায়দায় দড়জা খুলে ধরলো,  তিনজন স্বাস্থ্যবান, সুদর্শন যুবক নামলো গাড়ি থেকে। ‘ধন্যবাদ, স্যার’ বলে বাউ করলো শোফার।

তিনজনের মাঝে প্রথম ঘরে যে যুবক পা রাখলো তার মাথাভরা সোনালী চুল। ধুসর একটা স্যুট পরে আছে, একহারা গড়ন। নীল চোখ, পুরু গ্লাসের আড়ালে ঢাকা, সবসময়ই মনে হয় হাসছে। রমনীমোহন, কোন সন্দেহ নেই– এমন ছেলের জন্য সচরাচর মেয়েরা পাগল হয়ে থাকে। সে অবশ্য ঘরে ঢুকে সোজা এসে দাড়াল ইন্সপেক্টরের সামনে, হাতে একটা কার্ড আর একটা বিশেষ অনুমতি পত্র। 

তিন গোয়েন্দা, কিশোর পাশা, মুসা আমান, রবিন মিলফোর্ড

‘ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন, স্পেশাল ডিটেকটিভ ইউনিট’ কার্ডে পড়লো ইন্সপেক্টর। পাশের চিঠিটা মেয়রের অনুমতিপত্র, কেসে এই ইউনিটকে সর্বাত্নক সহায়তা প্রদান করবার জন্য পুলিশকে বলা হয়েছে।

‘জীবনে কোনদিন দেখিনি ফেডস্ রা লিমোতে আসা শুরু করেছে’ – বিড়বিড় করলো ইন্সপেক্টর।

‘আমরা স্পেশাল’- বললো দ্বিতীয়জন। এবার তার দিকে নজর পড়লো ইন্সপেক্টরের। প্রথমজন যদি ফ্যাশন মডেল হয়, দ্বিতীয়জন ফিটনেস ম্যাগাজিন থেকে উঠে আসা ক্যারেক্টার। পেটানো আফ্রিকান আমেরিকান দেহ, শার্টের নিচে থরে থরে সাজানো পেশী। লম্বা, সুন্দর করে ছাটা ঘন চুল আর সরল একজোড়া চোখ, সবসময় হাসছে।

এবার ইন্সপেক্টরের তাকালো দলের তৃতীয়জনের দিকে।

অন্য দুজনের মত স্যুট পড়লেও, বোঝা যায় পোশাকের দিকে তেমন যত্ন নেই তৃতীয়জনের। কবি বা শিল্পী চরিত্রে দারুন মানিয়ে যেত তরুনকে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত, কালো চোখ। মাথার চুল কোঁকড়া, মাথাটা শরীরের তুলনায় একটু বড়। সাদামাটা চেহারা, কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে গেছে তীক্ষ্ন একজোড়া চোখ। সবসময় চারপাশে ঘুরছে, পরীক্ষা করছে প্রতিটি ঘটনা। খুবই কম কথা বলে, বোঝা যায়; কিন্তু এটাও বোঝা যায় এই ছোট্ট দলটার দলনেতা সেই।

জানা গেল তিনজনের এই দলটা আসার আগেই কেসের সবগুলো ফাইল পেয়ে গিয়েছে। করোনারের রিপোর্ট থেকে শুরু করে সাক্ষীদের জবানবন্দী– সবকিছু রিভিউ করার পরেই মাঠে নেমেছে এফবিআই।

‘আমরা কি বাড়িটা একটু পরীক্ষা করে দেখতে পারি?’ সোনালীচুলো বলে উঠলো।

‘অবশ্যই।’ মাথা চুলকালো ভিক্টর। ‘আপনাদের তো অনুমতি রয়েছেই।’

‘ধন্যবাদ’, হাসলো সোনালীচুলো।

এক এক করে সবকিছু খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে কোকড়াচুলো। গ্লাসদুটি দেখলো খুব ভালো করে, তারপর ঠোট গোল করে বলে উঠলো– ‘ইন্টারেস্টিং’।

ইন্টারেস্টিং তো বটেই– ভাবলো ইন্সপেক্টর। নাহলে এমন অদ্ভুতুরে কেসে অদ্ভুত তিন নভিসকে কেন পাঠাবেন মেয়র। অন্য কোন সময় হলে ধমকে বের করে দিত সে, শুরু কার্ড আর মেয়রের চিঠিটার জন্য পারছে না কিছু বলতে।

‘মি. পারনেল, আপনারা কতোদিনের বন্ধু ছিলেন?’ জিজ্ঞাসা করলো দ্বিতীয়জন।

‘আমরা পরস্পরকে চিনি প্রায় বারো বছর। বন্ধুত্ব… সেটা তো বছরদশেক হবেই’।

‘যে সময় আপনারা খেলছিলেন, বাসায় কে কে ছিলো?’

‘আমার বাটলার ছাড়া আর কেউ না। এটা আমার প্লেযার হাউস বলতে পারেন। আমার স্ত্রী থাকেন সান্টা মনিকায়। ব্যবসায়িক ডিলগুলোর জন্য সাধারণত আমি নিউইয়র্কে আসি, আসলে থাকি এখানেই।’

‘হুমম’ মাথা নাড়লো কোকড়াচুলো। ‘খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু, মি. পারনেল, আমি কখনোই আপনাকে সন্দেহ করতাম না, যদিনা আজ সকালে আপনার স্টকগুলো চেক করবার কথা মনে পড়তো’।

শিরদাড়া খাড়া করে ফেললো ইন্সপেক্টর।

‘কি সব বাজে কথা বলছে এই ছেলে, কি বলতে চাও?’ ধমকে উঠলেন ম্যানুয়েল পারনেল।

হাত দিয়ে কোকড়া চুলগুলো চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দিল যুবক। সোজা হয়ে দাড়াল সে, এখন বোঝা যাচ্ছে, লম্বায়ও সে কারো চেয়ে কম না। ‘আপনার পার্টনারের মৃত্যু হলে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে লাভবান হন আপনি। প্রায় ৫ মিলিয়নের মত। অনেক টাকা।’

‘আর এজন্যই মদে বিষ মিশিয়ে হার্ট এ্যটাকের প্রচেষ্টা ছিলো খুবই যুক্তিসঙ্গত।’ সোনালীচুলের যুবক বলে উঠলো। তার নীল চোখের দিকে তাকিয়ে এ্যাকসেন্টটা বোঝার চেষ্টা করলো ইন্সপেক্টর, সম্ভবত বৃটিশ। আইরিশও হতে পারে।

‘কিন্তু, মাই ডিয়ার, বিষে তো তাহলে সবার আগে আমারও মারা পড়বার কথা’ – মি. পারনেলের গলা আশ্চর্যরকম শান্ত শোনাল। 

তিন গোয়েন্দা, কিশোর পাশা, মুসা আমান, রবিন মিলফোর্ড

‘অবশ্যই, আমিও আশ্চর্য হচ্ছিলাম এটা নিয়ে। কিন্তু এই গ্লাসদুটো দেখার পর হঠাৎ বুঝতে পারলাম, খটকাটার সমাধান কোথায়’ – গ্লাসদুটি দেখাল কোকড়াচুলো। 

খুবই সাধারণ দুটি গ্লাস, ইন্সপেক্টর অনেকবার দেখেছে এরইমাঝে। বিশেষ কিছুই চোখে পড়েনি তার।

যেন ম্যাজিশিয়ান তার জাদু ব্যাখ্যা করছে দর্শকদের মাঝে, যুবক বলে চললো, ‘ দেখুন, একটা গ্লাসে অনেকখানি ঈষদচ্ছ্ব তলানি, আর একটিতে নেই বললেই চলে। আপনারা তো হুইস্কি খাচ্ছিলেন, তাই না, মি.পারনেল?’

‘হুমম’ – বোঝা যাচ্ছে, শান্ত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন বৃদ্ধ।

‘আপনারা আসলে শুধু হুইস্কি খাচ্ছিলেন না। খাচ্ছিলেন হুইস্কি অন দ্য রকস্। বরফ দেয়া মদ। মদে বিষ মেশানো ছিলো না। বিষ মেশানো ছিলো বরফে। দীর্ঘদিনের বন্ধু হওয়ায় পারনেল জানতেন মি. ভিকি রিভেরা খুব আস্তে আস্তে ড্রিংক করেন। বরফ দুজনেই নেন, কিন্তু বরফ গলে বিষ ড্রিংকে মিশে যাওয়ার আগেই মি.পারনেল খেয়ে নেন তার ড্রিংক। মি. রিভেরা, এজন্য মারা যান বিষক্রিয়ায়, যেখানে সুস্থ আছেন মি.পারনেল । সম্ভবত, তার বাটলারও সহায়তা করে এই হত্যাকান্ডে । একটু জিজ্ঞাসাবাদ করলেই সত্যটা পেয়ে যাবেন, ইন্সপেক্টর।’

প্রথমে রাগে লাল হল মি.পারনেলের মুখ, ব্যাখ্যা শুনে রক্ত নেমে চেহারাটা সাদাটে দেখালো। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ চোখ থেকে ইন্সপেক্টর এখন নিশ্চিত বলতে পারেন, খুনটা মি. পারনেলই করেছেন।

আপরাধীদের গ্রেফতার করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেল। পুলিশের গাড়িতে তুলে দেবার সময়ও মনে মনে ভাবছিলেন ইন্সপেক্টর, এই সহজ ব্যাখ্যাটা কেন তার মাথায় আগে আসলোনা।

ত্রিমূর্তি তখন একসাথে দাড়িয়ে, ইন্সপেক্টর ভিক্টর এসে অভিবাদন জানালেন। ‘দারুণ, দারুণ আপনাদের এ্যানালাইসিস। চোখের সামনে ছিলো ক্লু, আমরা দেখেও দেখিনি। আপনাদের অশেষ ধন্যবাদ, অপরাধীকে ধরতে সাহায্য করার জন্য।’

হেসে উঠলো বিশালদেহী। ‘এ আর এমন কি, আমরা এরচেয়েও কতো কঠিন কেস… আউ’, সোনালীচুলোর গুতো খেয়ে থেমে গেল সে। নিখুত কেতাবী কায়দায় করমর্দন করলো সোনালীচুলো, ‘মাই প্লেজার, স্যার। আমরা গত সাত বছর যাবৎ এফবিআই এর স্পেশাল ইউনিট হিসেবে কাজ করছি। আপনার সহযোগিতার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।’

‘আরে, আপনাদের নামই তো জানা হলোনা। বাসায় গিয়ে বলতে তো হবে তো, আজকের হিরোদের নাম কি?’- সহাস্যে বললো ইন্সপেক্টর।

‘মূসা, মূসা আমান।’ একগাল হাসলো বিশালদেহী যুবক। ‘ভিক্টর ম্যাকমিলান’ বললো ইন্সপেক্টর।

সোনালীচুলের দিকে তাকাল ইন্সপেক্টর, ‘রবিন মিলফোর্ড’, হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য।

সামনে তাকিয়ে ইন্সপেক্টর লক্ষ্য করলো, হাসলে দারুণ প্রাণবন্ত লাগে কোকড়াচুলের যুবকটিকে। চোখ দুটো ঝকঝক করে, জানান দেয় পেছনের ধূসর কোষগুলির প্রাণবন্ত উপস্থিতি।

“আমার নাম কিশোর পাশা”

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-