অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

এসব বুঝি রাজার কাণ্ড!

অসীম ক্ষমতা মানুষকে বেপরোয়া বানিয়ে দেয়। রাজা-রাজরাদের ইতিহাসের দিকে তাকালেই এর অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। আগেকার দিনে রাজারা ছিলেন বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। তারা যা খুশি করতেন, যেমন খুশি চলতেন, খেয়ালখুশি মত নিয়ন্ত্রণ করতেন তার অধীনস্ত সবকিছু। তবু, আজ আমরা এমন কিছু রাজার কথা শুনব, যারা বেপরোয়া তো ছিলেনই, ছিলেন এর চেয়েও বেশি কিছু- কিম্ভূত, পাগলাটে এবং মানসিক বিকারগ্রস্থ। তাদের স্বভাব যেমন ছিল অস্বাভাবিক, কার্যকলাপও ছিল তেমনি কিম্ভূতকিমাকার।

১. ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জর্জ (George IV-1762-1830)

ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জর্জ ভালো মানুষ ছিলেন না কখনোই। কিন্তু, তার অদ্ভূত এক খেয়াল ছিল, তিনি নারীদের সাথে কখনও জোর করতেন না। অর্থ্যাৎ নারীদের জোর করে ধর্ষণ করতেন না। যেখানে, ইতিহাসে নারীদের সাথে জোর করে সহবাস করা রাজাদের জন্য সবসময়ই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার, সেখানে চতুর্থ জর্জের এই ব্যাপারটাকে ভাল না বলে, অদ্ভূত খেয়াল বলছি কেন? সেটা বুঝবেন, তার স্বভাবের কথা জানলে।

তিনিও অসংখ্য নারীর সাথে সহবাস করতেন, কিন্তু বলপূর্বক নয়। তার যেই মেয়ের উপর চোখ পড়ত, তিনি তাকে যে কোন উপায়ে হোক রাজী করিয়ে শয্যা সঙ্গী বানাতেন। রাজা চতুর্থ জর্জ অস্বাভাবিক রকম মোটা ছিলেন এবং তার কৌশল নারীরা সহজেই বুঝতে পারত। এসব সত্ত্বেও আশ্চর্য ব্যাপার হলো, তিনি প্রায় সব নারীদেরই তার প্রস্তাবে এক সময় রাজী করিয়ে ফেলতেন। অর্থ দিয়ে, ভালবাসার ফাঁদ পেতে বা আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে যে ভাবেই হোক না কেন তিনি মেয়েদের রাজী করিয়ে ফেলতেন তার শয্যা সঙ্গী হওয়ার জন্য।

এখানেই কাহিনী শেষ নয়, রাজা জর্জ যে মেয়েদের শয্যা সঙ্গী বানাতেন তাদের প্রত্যেকেরই একগোছা করে চুল খামে ভরে নিজের সংগ্রহে রেখে দিতেন। কি কারণে রাখতেন তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, অনেকের ধারণা, কতগুলো নারীকে তিনি জয় করেছেন এর প্রমাণ হিসেবে সেই নারীর চুল সংগ্রহে রাখতেন রাজা।

২. পিটার দ্য গ্রেট (Peter the Great-1672-1725)

রাশিয়ার জার পিটার দ্য গ্রেট এর এক অদ্ভূত রকম টান ছিল খাটো মানুষদের প্র্রতি। বিশেষ করে বামুনদের প্রতি। যদিও তার জীবনকালে তিনি অসংখ্য মানুষদের কাছে জঘন্য শাসক বলে পরিচিত ছিলেন, তবু তিনি বামুনদের খুব খাতির যত্ন করতেন। বামুনদের বিয়ের আয়োজনও করে দিতেন তিনি। কোন বামুন মারা গেলে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করতেন ধুমধাম করে। সেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বামুন ঘোড়া আনা হত মৃতের কফিন বহন করার জন্য। এমনকি সে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পুরোহিতও আনা হতো বামুন।

পিটারের আরও এক অদ্ভূত শখ ছিল, সার্জারি দেখা। সেন্ট পিটার্সবার্গ হসপিটালে কোন জটিল অপারেশন করা হলে, জারকে খবর দেওয়া হত। তিনি দাঁড়িয়ে থেকে সেই সার্জারির দৃশ্য দেখতেন। অনেক সময় শুধু দেখেই ক্ষান্ত হতেন না, নিজেও হাত লাগাতেন, যদিও  চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানতেন না। ফলস্বরুপ যা হবার তাই হতো, রোগীকে জীবন দিতে হতো জারের অন্যায় শখ পূরণ করতে গিয়ে।

দাঁড়ান! শেষ হয়নি এখনো, এই সাইকোপ্যাথ জারের কাহিনী। দাঁতের চিকিৎসা করারও শখ ছিল তার। কেউ জারের সুনজরে পড়তে চাইলে, জারের শখ মেটাতে তাকে হারাতে হতো দু-একটা দাঁত। জার পিটারের শাসনামলে রাশিয়ার অনেক মানুষকেই তার শখ মেটাতে হারাতে হয়েছিল তাদের সুস্থ-সবল দাঁত।

৩. ফ্রেডরিক উইলিয়াম (Frederick William I-1688-1740)

রাশিয়ার জার পিটার দ্য গ্রেট এর ছিল খাটো মানুষদের প্রতি আকর্ষণ, আর পারস্যের শাসক প্রথম ফ্রেডরিক উইলিয়ামের ছিল লম্বা মানুষদের প্রতি আকর্ষণ। ভয়বহ আকর্ষণ। তিনি নিজের উচ্চতা একটু কম ছিল বলেই কিনা, লম্বা মানুষদের অস্বাভাবিক রকম পছন্দ করতেন।

এতটাই অস্বাভাবিক সে পছন্দ যে, তিনি লম্বা মানুষদের নিয়ে নিজের জন্য একটা সৈন্যবাহিনী তৈরি করেছিলেন, যার নাম ছিল, দ্য পটসড্যাম জায়েন্ট। সে বাহিনীর সদস্যদের একমাত্র যোগ্যতা হতে হত ৬ফুটের বেশি উচ্চতা। যে সৈন্যের উচ্চতা যত বেশি, তাকে তত বেশি বেতন দিতেন রাজা।

রাজ্যের সব জায়গায় লম্বা মানুষ খুঁজে খুঁজে তার সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগ করতেন রাজা ফ্রেডরিক উইলিয়াম। তিনি বাবা-মা দের কাছ থেকে লম্বা ছেলেদের কিনে নিতেন, অথবা তাদের কিডন্যাপ করে আনতেন। আশেপাশের অন্য কোন দেশ রাজার সুনজরে পড়তে চাইলে, লম্বা মানুষদের উপহার হিসেবে পাঠাতো রাজার সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগের জন্য।

এখানেই শেষ নয়, লম্বা বাচ্চা পয়দা করার জন্য রাজা ফ্রেডরিক উইলিয়াম, লম্বা নারীদের সাথে লম্বা পুরুষদের সহবাসের নির্দেশ দিতেন। তার সৈন্যবাহিনীকে যে তিনি কোন যুদ্ধে পাঠানোর জন্য তৈরি করেছিলেন তা কিন্তু নয়। সেই সৈন্যবাহিনী ছিল তার কাছে একটা পছন্দের খেলনার মত। যেটা চোখের সামনে দেখেই রাজা শান্তি পেতেন।

৪. রাজা ফারুক (King Farouk-1920-1965)

মিশরের শেষ রাজা, রাজা ফারুকের সকল কার্যকলাপই ছিল শিশুর মত। তার মা আশা করেছিলেন, একবার রাজা হলে ছেলে বুঝি তার বড় হয়ে উঠবে। কিন্তু মায়ের সেই আশা পূর্ণ হয়নি। রাজা হবার পরও ফারুকের আচার-আচরণের কোন পরিবর্তন হয়নি।

রাজা ফারুক, খাবার আগে তার সঙ্গে খাবার টেবিলে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের গায়ে এটা-সেটা ছুঁড়ে মারতেন এবং ঠিকঠাকমত লক্ষ্যভেদ করতে পারলে আনন্দে হইহই করে উঠতেন। গাড়ি চালাতে গেলে বার বার হর্ন বাজাতেন রাজা, যে হর্নের শব্দ ছিল কিম্ভুত। কুকুরকে তাড়া করলে সে যেমন ঘেউ ঘেউ শব্দ করে দৌঁড়ায়, গাড়ির হর্নের শব্দ ছিল অনেকটা সেরকম। একদিন এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গিয়ে এক মহিলার অন্তর্বাসের মধ্যে এক টুকরো বরফ টুকিয়ে দিয়েছিলেন রাজা দুষ্টুমি করে। একবার এক লোককে আইনমন্ত্রী বানিয়েছিলেন শুধুমাত্র তার গোঁফ পছন্দ হয়েছিল বলে।

যদি কোন কিছু রাজা ফারুকের পছন্দ না হতো, সে জিনিসের অস্তিত্ব ই তিনি রাখতেন না। একবার এক রেলস্টেশন গুড়িয়ে, অবিশ্বাস্য রকম অর্থ ব্যয়ে নতুন রেলস্টেশন বানিয়েছিলেন শুধু পুরনোটা তার ভাল লাগত না বলে। একদিন স্বপ্নে, এক সিংহ রাজাকে তারা করেছিল বলে, রাজা কায়রো চিড়িয়াখানায় থাকা দু’টি সিংহকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন।

এক দক্ষ চোরের কাছে রাজা ফারুক পকেটমারার কৌশল শিখেছিলেন শখ করে। ‍এই দক্ষতা তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের পকেটঘড়ি চুরি করতে। পরে যখন ধরা পরে যান, এমন ভান করেছিলেন যেন, তিনি চুরি যাওয়া জিনিসটা খুঁজে পেয়েছেন।

৫. মহারাজা জয় সিং (Maharajah Jai Singh-1882-1937)

ভারতের রাজস্থানের আলোয়ার রাজ্যের রাজা ছিলেন মহারাজা জয় সিং। ব্রিটিশরা ক্ষমতা দখলের আগে তিনি সেখানকার চরম প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। কিন্তু, তিনি ছিলেন খামখেয়ালী আর নিষ্ঠুর প্রকৃতির।

মহারাজা জয় সিং খেলতে পছন্দ করতেন, কিন্তু কিছুতেই হারতে পছন্দ করতেন না। একবার হলো কি, পোলো খেলতে গিয়ে হেরে গেলো তার দল। হেরে গিয়ে প্রচন্ড রেগে গেলেন রাজা। কিন্তু, কিসের উপর রাগ দেখাবেন তিনি! নিজের দোষ তো তিনি দেখেন না, তাই তার সব রাগ গিয়ে পড়ল খেলার ঘোড়ার উপর। গায়ে কেরোসিন ঢেলে নিরীহ প্রাণীটিকে জনসম্মুখে পুড়িয়ে মারলেন তিনি।

নিরীহ প্রাণীদের উপরই যে শুধু অন্যায় করতেন তিনি তা নয়, জয় সিং নারীদের সাথেও প্রচন্ড নিষ্ঠুর আচরণ করতেন। যুবতী মেয়েদের ধরে এনে তাদের যত রকম নির্যাতন করা সম্ভব, করতেন। ক্ষেত্রবিশেষে, অনেক মেয়েকে হত্যাও করতেন তিনি।

শুধু পাগলাটে আর দুশ্চরিত্রই ছিলেন তা নয়, জয় সিং ছিলেন প্রচন্ড প্রতিশোধপরায়ণ। একবার লন্ডনের রোলস রয়সী কোম্পানীর ডিলারের কাছে গিয়েছেলেন কিছু গাড়ি কিনতে। অনেক গাড়ি একসাথে কিনতে চাচ্ছেন দেখে, সে কোম্পানীর বিক্রেতা ভুলবশত তাকে দালাল মনে করে তেমন একটা পাত্তা দিচ্ছিলনা। এতে তিনি প্রচন্ড রেগে গেলেন। করলেন কি, সাতটা দামী কার কিনলেন তিনি সেই কোম্পানীর কাছ থেকে। মহা শোরগোলে সেগুলো তার রাজ্যে এনে ঘোষণা করলেন, কারগুলো আবর্জনা পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহার করা হবে। তার পরিবারের কেও সেই দামী গাড়িগুলো ব্যবহার করার সুযোগ তো পেলই না, সেই কোম্পানীর গাড়ি কেনার প্রতিই নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন মহারাজা জয় সিং।

৬. চিন শি হুয়াং (Qin Shi Huang-259-210 B.C.)

চিন শি হুয়াং ছিলেন অবিভক্ত চীনের প্রথম সম্রাট। ইনি চীনের সেই সম্রাট, যার কবর খুঁড়ে আস্ত একটা পোড়ামাটির সৈন্যবাহীনি পাওয়া গিয়েছে। বিশাল এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। অন্য সব যোদ্ধা শাসকের মত অনেক প্রাণ আর রক্তের বিনিময়ে চিন শি হুয়াংও তার বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেছিলেন।

শুধু যে রাজ্য বিজয়ের অভিযানে চিন শি হুয়াং মানুষ খুন করতেন তাই নয়, রাজ্য জয় শেষ হয়ে গেলেও মিটত না তার রক্তের পিপাসা। কারণে-অকারণে তিনি মানুষ খুন করতেন। যারাই তার বিরোধিতা করত তাদেরই তিনি নৃশংস ভাবে হত্যা করতেন।

বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কারে বিশ্বাস ছিল চিন শি হুয়াং এর। আকাশ থেকে যদি কখনও একটা উল্কা ঝরে পরত, তিনি সেটাকে অশুভ মনে করতেন এবং সেসময় আশাপাশে থাকা যাকেই সন্দেহ হত তাকেই খুন করতেন। অবশ্য ইতিহাসের অনেক শাসকই এমন রক্ত পিপাসু ছিল।

চিন শি হুয়াং অমর হতে চাইতেন। তাকেও যে মৃত্যুবরণ করতে হবে তা তিনি কোন ভাবেই মানতে চাইতেন না। তিনি মৃত্যুকে বরণ না করার জন্য দৃঢ়সংকল্প ছিলেন। এর জন্য ডাক্তার এবং অ্যালকেমিস্টদের বানানো বিভিন্নরকম তরল মিশ্রণ তিনি পান করতেন। যেগুলো পারদ মিশ্রিত ছিল বলে ইতিহাসবিদেরা ধারণা করেন। ফলস্বরুপ, জীবনকাল দীর্ঘায়িত করতে তো পারেনই নি, উল্টো নিজের হাতে জীবনের আয়ু কমিয়ে ফেলেছিলেন চিন শি হুয়াং।

চীনের এই শাসক অমর হতে চেয়েছিলেন বলেই বুঝি অকল্পনীয় জাঁকজমকভাবে তার সমাধিক্ষেত্র বানানো হয়েছিল। সমাধিতে অন্যান্য ধনদৌলতের সাথে সাথে রাখা হয়েছিল আস্ত এক পোড়ামাটির সৈন্যবাহিনী, যা আজও ঐতিহাসিকদের কৌতুহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

৭. রাজা দ্বিতীয় লুডউইগ (Ludwig II -1845-1886)

দক্ষিণপূর্ব জার্মানের বাভেরিয়া রাজ্যের রাজা দ্বিতীয় লুডউইগ ছিলেন খুবই অদ্ভূত স্বভাবের। তিনি সবসময়ই খোলা আকাশের নিচে খাবার খেতে পছন্দ করতেন, সে আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন। তিনি দিনে ঘুমাতেন এবং রাতে বাইরে বের হতেন। সবসময় ঐতিহাসিক পোশাক পরতেন। তিনি সেসময়ের একজন বিখ্যাত সুরকারের পাগলা ভক্ত ছিলেন রাজা এবং সম্ভবত সমকামী ছিলেন।

লুডউইককে রুপকথার রাজা বলা হত। কারণ, রুপকথার রাজ্যে বাস করতে চাইতেন তিনি। প্রাসাদ বানাতে পছন্দ করতেন, রুপকথার মত প্রাসাদ। তিনি তার রাজকোষের বেশিরভাগ অর্থই ব্যয় করে ফেলেছিলেন তার শখের প্রাসাদ তৈরির পেছনে। অথচ এই প্রাসাদগুলো তৈরি করার জন্য তিনি কোন স্থপতির সাহায্য নেননি। প্রাসাদের ডিজাইন করিয়েছিলেন অপেরার ডিজাইনারদের দিয়ে। অদ্ভূত ব্যাপার হলো, কোন স্থপতির সাহায্য ছাড়াই বানানো তার প্রাসাদগুলো, শ’খানেক বছর পরে আজও টিকে আছে বহাল তবিয়তে।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close