এমন একটা সমাজ ব্যবস্থা কল্পনা করতে পারবেন, যেখানে জন্মদাতা রয়েছে কিন্তু নেই কোন পিতা। নেই কোন বিয়েশাদি-সংসার? পরিবার রয়েছে, তবে সেখানে পুরুষের কোন ক্ষমতা নেই। সন্তান রয়েছে পরিবারে, তবে সেখানে সন্তানের বাবার কোন অস্তিত্ব নেই। আছে শুধু মা আর মায়ের পরিবার। বাচ্চারা বেড়ে ওঠে মায়ের পরিচয়ে, মায়ের শাসনে। কেমন হবে সে সমাজব্যবস্থা? কল্পনা করতে পারেন?

জানি, আমাদের জন্য এমন একটা সমাজের কথা কল্পনা করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কারণ আমরা বেড়ে উঠেছি পিতৃতান্ত্রিক সমাজে। যে সমাজে  পুরুষরাই হর্তা-কর্তা। পুরুষের হুকুমে, শাসনে আর নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রিত হয় নারীদের জীবন। যেখানে নারীদের ছোট-খাট অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। এমন সমাজের মানুষ হয়ে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ কেমন হবে তা কল্পনা করা কষ্টসাধ্য’ই হবার কথা।

তাই আজ পিতৃতান্ত্রিক আমাদের সমাজের মানুষকে জানাতে চাই এক মাতৃতান্ত্রিক সমাজের গল্প। যে সমাজে নারীরাই সব। যে সমাজে পুরুষদের কোন কর্তৃত্ব নেই। নেই কোন নেতৃত্ব। যে সমাজকে অনেক সময় বলা হয় পৃথিবীর সর্বশেষ মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। জানতে কী আগ্রহী আপনারা? আগ্রহী হলে চলুন জেনে আসি।

কিংডম অব উইমেন, তিব্বত, চীন, মজো সম্প্রদায়, মাতৃতান্ত্রিক সমাজ

তিব্বতের সীমানার কাছাকাছি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউনান প্রদেশের পার্বত্য এলাকায় হিমালয়ের পাদদেশে লুগু লেকের পাশ্ববর্তী অঞ্চলে রয়েছে ছোট্ট এক গ্রাম। সে গ্রামে বাস এক ক্ষুদ্র উপজাতী সম্প্রদায়ের। যে সম্প্রদায়ের  নাম “মজো”। মজো নামের এই উপজাতি সম্প্রদায়ের সদস্য চল্লিশ হাজারেরও বেশি। ছবির মত সুন্দর মজোদের গ্রামটি দেখার মতই সুন্দর। সমুদ্র সমতল থেকে ২৭০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এ গ্রামটি নিকটস্থ শহর থেকে ৬ ঘন্টার পথ। দূর্গমতার কারণেই  সম্ভবত, এ গ্রামের মানুষদের জীবনব্যবস্থা আর সামাজিক রীতিনীতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রয়েছে আজও।

মজো সম্প্রদায়ের লোকেরা তিব্বতীয়ানদের মত বৌদ্ধধর্মের অনুসারী এবং এদের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। মজোদের সমাজব্যবস্থাকে বলা হয়, “কিংডম অব উইমেন” বা “নারীদের সাম্রাজ্য”। তাদের গ্রামও এ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে বর্তমানে।  

তাদের সমাজে মেয়েরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষের থেকে বেশি ক্ষমতাবান। যেসব ক্ষেত্রে নয়, সেসব ক্ষেত্রেও পুরুষদের সমকক্ষ তারা। সে সমাজে নারীরা ইচ্ছেমত, নিজের পছন্দে পুরুষ সঙ্গী বাছাই করতে পারে, সন্তান ধারণ করতে পারে, তাদের নিজের পরিচয়ে লালন-পালন করতে এবং সমাজের হর্তাকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে।

কিংডম অব উইমেন, তিব্বত, চীন, মজো সম্প্রদায়, মাতৃতান্ত্রিক সমাজ

মজোদের মধ্যে অনেক ধরণের স্বতন্ত্র রীতি-নীতির প্রচলন রয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত ঐতিহ্যবাহী যে প্রথার প্রচলন রয়েছে, তা হলো “ওয়াকিং ম্যারেজ”। নির্দিষ্ট একটা বয়সের পরে মজো সম্প্রদায়ের নারীরা নিজেদের পছন্দ মত এক বা একাধিক সঙ্গী বাছাই করতে পারে। এই প্রথায়, নারীদের আমন্ত্রণে পুরুষরা আসে তাদের বাড়িতে এবং রাত কাটায় সাজানো গোছানো “ফুল ঘরে”। সেসময় পুরুষের মাথার টুপি নারীর ঘরের দরজার বাইরে আটকানো থাকে। যা দেখে সবাই বুঝতে পারে সেই নারীর ঘরে একজন পুরুষ রয়েছে, সেখানে অন্য কারো প্রবেশ নিষেধ। রাত কাটিয়ে দিনের আলো ফুটলেই, পুরুষেরা ফিরে যায় তাদের নিজের বাড়িতে। নারী-পুরুষ  বিয়ে করে একসাথে থাকার রীতি নেই মজোদের সমাজে। সে সমাজে সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব সম্পূর্ণভাবেই মেয়ের পরিবারের লোকজনের। সে পরিবারে মেয়ের ভাই বা মামারা সন্তানের বাবার ভূমিকা পালন করে থাকে।

মজো সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা কেবলমাত্র মায়ের পরিচয়েই পরিচিত হয়। তাদের জন্মদাতা পিতাও নিজের মায়ের বাড়িতে মায়ের পরিচয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই বাবার সাথে তাদের তেমন কোন লেন-দেন থাকে না। ছোট বেলা থেকেই মজো সম্প্রদায়ের বাচ্চারা তাদের মা, নানী, খালা, মামার সংস্পর্শে বেড়ে ওঠে।

মজো সমাজের বাইরে অনেকেই অনেক সময় তাদের অনূঢ়া মায়ের সন্তান বলে ভৎর্সনা করে। তাতে অবশ্য, মজোদের কিছু যায় আসে না। কোন বিয়ে-শাদি ছাড়াই সে সমাজে সন্তানের জন্ম হয়, যেটা চীনের সাধারণ সমাজে এখনও ঠিক সহজ বলে মেনে নেওয়া হয়না। মজোদের কাছে এটা তেমন কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। তাদের কাছে বিয়ে-শাদির ধারণাটাই অস্বাভাবিক। তাদের সমাজে যেহেতু পিতৃতন্ত্রের কোন জায়গা নেই, তাই বিয়ে করাটা তাদের কাছে বাহুল্য মনে হয়।

কিংডম অব উইমেন, তিব্বত, চীন, মজো সম্প্রদায়, মাতৃতান্ত্রিক সমাজ

বিয়ে বলতে যে একটা চলতি প্রথার প্রচলন আছে মজো সমাজে সেটার নাম “এক্সিয়া” বা “ওয়াকিং ম্যারেজ”। যার কথা আগেই বলেছি।  সেটাকে ঠিক বিয়ে বলা যায় না। সন্তান ধারণের বা জৈবিক চাহিদা মেটাবার একটা উপায় বলা যায়। বিয়ে করলে একসাথে বাস করার, সংসার করা বা দায়বদ্ধতার যে একটা ব্যাপার থাকে, তার বালাই নেই মজোদের ওয়াকিং ম্যারেজে। 

মজো সম্প্রদায়ের নারীরাই তাদের সকল সম্পদের মালিক এবং উত্তরাধীকারী। কৃষিপ্রধান সে সমাজে জমিতে বীজ বোনা, হাল-চাষ করা, রান্না করা, ঘরদুয়ার পরিষ্কার করা, সন্তান লালন-পালন সবকিছুতেই নারীদের কর্তৃত্ব। পুরুষরা কেবল তাদের শারীরিক শক্তি দিয়ে নারীদের সাহায্য করে থাকে। চাষাবাদে, ঘরবাড়ি তৈরিতে, কোন কিছু মেরামত করতে, পশু জবাই করতে, এবং অনেক সময় সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রেও পুরুষরা কেবল নারীদের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। মূল দায়িত্ব বা সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা কেবল নারীদের। বিশেষত, পরিবারের বয়োজোষ্ঠ নারীদের। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ নারীদের হাতেই থাকে পরিবারের সকল ক্ষমতা।

সন্তানের জীবনে বাবার একটু-আধটু ভূমিকা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে মজো সমাজের নারীরা ঠিকভাবে বলতেই পারেনা তাদের সন্তানের পিতা কে। সেটাকে অস্বাভাবিক ভাবেও নেওয়া হয় না সে সমাজে। বাবার পরিচয় জানা যাক বা না যাক মজোদের বাবার ভূমিকা পালন করে তাদের মায়ের পক্ষের কোন বয়স্ক পুরুষ, আত্মীয় বিশেষত মামারা।

কিংডম অব উইমেন, তিব্বত, চীন, মজো সম্প্রদায়, মাতৃতান্ত্রিক সমাজ

বিয়ে করাতে আপত্তি থাকলেও, বাচ্চা জন্ম দেওয়ার ব্যাপারে মজো সম্প্রদায়ের নারীদের কিন্তু আবার খুবই উৎসাহ। তারা বাচ্চা জন্ম দিতে এবং লালন-পালন করতে পছন্দ করে। যদি তাদের নিজেদের কোন সন্তান না হয় বা কেবল ছেলে সন্তান হয় তবে তারা নিকট আত্মীয় বা অন্য কোন মজো পরিবার থেকে সন্তান দত্তক নিয়ে থাকে। ফলে তাদের বংশগতি অব্যাহত থাকে।

মাতৃতান্ত্রিক মজো সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে নানা রকম কুসংস্কার। যেমন, কুকুরকে ঘিরে তাদের মধ্যে অদ্ভূত এক ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তারা বিশ্বাস করে, একসময় কুকুরের জীবনকাল ছিল ৬০ বছর আর মানুষের ১৩ বছর। মানুষ আর কুকুর নিজেদের মধ্যে জীবনকাল বিনিময় করেছে। কুকুর তার আয়ূ মানুষকে দিয়েছে, বদলে মানুষ কুকুরকে দিয়েছে সন্মান। একারণে, মজো সম্প্রদায়ের লোকেরা কুকুরকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখে।

আবার লুগু লেক, যে লেককে ঘিরে মজোদের জীবনপ্রবাহ আবর্তিত, তাকে ঘিরে মজো সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে এক কিংবদন্তী। লুগু লেকের পাড়ের জেমুর পর্বতকে মজো’রা মনে করে দেবী। দেবী জ্ঞানে হাজার হাজার বছর ধরে এ সম্প্রদায় জেমুর পর্বতের পূজা করে। পর্বতটি তাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। কথিত আছে, এই পর্বতটি একসময় ছিল খুব সুন্দর, দয়ালু আর সম্ভান্ত এক নারী। জেমুর পর্বতের পাশ রয়েছে আরো একটি পর্বত, যেটা সেখানকার গ্রামের সবথেকে সুদর্শন পুরুষ ছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। ছেলেটি এবং মেয়েটির মধ্যে একসময় ভালবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়। তারা প্রতিরাতে দেখা করতে আসত সেই জায়গায় যেখানে পর্বতদুটি আজ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক পাজী দেবতা তাদের ভালবাসায় ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে এবং তাদেরকে পর্বতে রুপান্তরিত করে। তার পর থেকে আজ অবধি তারা একই জায়গায় পাশাপাশি পর্বত রুপে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে জেমু’র চোখের পানি ঝরে ঝরে সৃষ্টি হয়েছে লুগু লেক। লুগু লেক এবং একে ঘিরে কিংবদন্তী চীনের পর্যটকদের খুবই পছন্দের। একারণে লেককে ঘিরেই এ এলাকায় দ্রুত উন্নতি হচ্ছে।

অবশ্য, এ উন্নতি মনঃপুত হচ্ছে না মজো সম্প্রদায়ের অনেকের। তাদের পবিত্র পাহাড় এবং লেক অতিরিক্ত পর্যটকদের ভীড়ে দিন দিন দূষিত হয়ে পড়ছে, এটা মেনে নিতে পারছে না অনেক মজো আদিবাসীরা। শুধু তাই তো নয়, পর্যটকদের কারণে পাল্টে যাচ্ছে মজো সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনব্যবস্থা। পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে তাদের হাজার বছরের ধ্যান-ধারণা, রীতি-নীতি যার সাথে মানিয়ে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মজোদের।

২০১৫ সালের দিকে মজোদের গ্রামের পাশে তৈরি হয়েছে সড়কপথ। সেখানকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে নির্মিত হয়েছে একটি বিমানবন্দর। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে, মজোদের গ্রাম, গ্রামকে ঘিরে রাখা পর্বতশ্রেণী এবং লুগু লেককে ঘিরে সেখানকার পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। বর্তমানে প্রচুর পর্যটকদের ভীড় হয় সে এলাকায়।

কিংডম অব উইমেন, তিব্বত, চীন, মজো সম্প্রদায়, মাতৃতান্ত্রিক সমাজ

পর্যটকদের প্রভাবে মাতৃতান্ত্রিক মজো সমাজে আসছে পরিবর্তন। অনেক মজো নারী এখন বিয়ে ও সংসার জীবনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। নিজেদের সমাজের বাইরেও তারা আজকাল বিয়ে করছে। ওয়াকিং ম্যারেজের ধারণা থেকে বের হয়ে তারা অনেকে স্থায়ীভাবে বিয়ে-শাদি করে সংসারী হচ্ছে। যদিও এখনো তারা স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ করছে এবং সংসারে নিজেদের কর্তৃত্ব বহাল রেখে চলেছে, তবু তাদের সমাজ ব্যবস্থায় অনেকটা পরিবর্তন এসেছে।

শুধু সামাজিক নয় মজোদের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে আজকাল পর্যটন শিল্পের প্রসারের ফলে। পর্যটকদের জন্য গেস্টহাউস নির্মান ও রক্ষণাবেক্ষণ, টাক্সি চালানো, ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করা- এমন অনেক ধরণের পেশা মজোদের অর্থনৈতিক অবস্থায় পরিবর্তন আনছে।

মজো সম্পদায়ের বাইরেও তারা এখন অনেক ধরনের মানুষদের সাথে মিশছে, অনেকের জীবন-ব্যবস্থা, শিক্ষা, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারছে। ফলে তাদের সমাজও বদলে যাচ্ছে সময়ের সাথে।

চীন সরকারের স্বীকৃত ৫৫ টি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে মজো’দের নাম নেই। তারা সংখ্যায় খুব অল্প বলে তাদেরকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়নি। প্রাচীন ঐতিহ্য আর আধুনিকতার দোলাচলে দুলতে থাকা মজো সংস্কৃতি, এভাবেই হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বিলুপ্তির পথে যাত্রা করবে। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, সম্ভবত, পৃথিবীর সর্বশেষ মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা।

Comments
Spread the love