“আমার বাবা মা কখনও বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও ঘুরতে যায়নি জানেন? এমন নয় যে আমরা অভাবী ছিলাম। কিন্ত দুজনের সময় হতো না। গ্রীষ্মে আমার স্কুলের ছুটিগুলো কেটে যেতো বাড়িতে বসে থেকেই। বড় একটা অ্যালসেশিয়ান কুকুর ছিল আমাদের, ওর সঙ্গেই সময় কাটতো আমার। ছুটির পরে আবার ক্লাস শুরু হলে বন্ধু-বান্ধবীরা আমাকে গল্প শোনাতো, ওরা ফ্লোরিডা থেকে ঘুরে এসেছে, লস অ্যাঞ্জেলসের সাগর দেখতে কেমন, সেসব ছবি আমি ওদের অ্যালবামে দেখতাম ক্লাসে বসে। একটু বড় হবার পরে আমিও বানিয়ে বানিয়ে বন্ধুদের গল্প বলার চেষ্টা করতাম, ছুটিতে আমরা এখানে সেখানে ঘুরতে গিয়েছি। কিন্ত ওরা ছবি দেখতে চাইলেই এটাসেটা বাহানা দিয়ে পাশ কাটাতাম।”

“বাবা মা একটা রোবটিক জীবন কাটিয়েছে। সেখানে শুধু কাজ আর কাজই ছিল। মাঝেমধ্যে অবশ্য জঙ্গলে ক্যাম্পিং করতে ছুটতাম আমরা, ভোক্সওয়াগনের ভ্যানে চড়ে। তাবু খাটিয়ে বনের ভেতরে রাত কাটানো, আগুণের কুণ্ডুলীর পাশে ডিনার- শুনতে বেশ রোমাঞ্চকর লাগে। কিন্ত সেটাও একসময় পানসে হয়ে গেল, কোন নতুনত্ব নেই, কোন চমক নেই। সেই একই রাস্তা, গাছপালা, ঝিঁঝির ডাক, সেই চিরচেনা অন্ধকার, হাজার বছরের পুরনো রাত… এসবের বাইরে একটা অন্যরকম জীবন আমি সবসময় চাইতাম। কিন্ত চাইলেই কি আর সবকিছু পাওয়া যায়? আর তাই আমাকেও রোবট হয়ে যেতে হলো একটা পর্যায়ে।”

“স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে আমি চাকুরীতে ঢুকলাম। ছাত্রী খারাপ ছিলাম না আমি, বরং ভালোই বলা চলে। সহপাঠীদের তুলনায় আমার প্রাপ্তির পাল্লাটা বেশ ভারীই ছিল বরাবর। সান ডিয়াগোতে এসে একটা ছেলের সাথে মন দেয়ানেয়া হলো। আড়াই বছরের সম্পর্ক ছিল আমাদের। ‘গুড গার্লফ্রেন্ড’ বলতে যেটা বোঝায়, আমি ঠিক সেরকম হয়তো ছিলাম না। তবে খারাপ ছিলাম না অবশ্যই। তবুও দুজনে আলাদা হয়ে গেলাম একসময়। মানসিক চাপ চেপে বসলো আমার মাথায়। তবুও আমি কাজ করে যাচ্ছিলাম। সাথে গ্র‍্যাজুয়েশনও চলছিল, সেখানেও ৪.০ সিজিপিএ ধরে রেখেছিলাম আমি। নিজের ঢোল কি একটু বেশি পিটিয়ে ফেলছি? কিছু মনে করবেন না প্লিজ…” 

“একটা সময় পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল। কিন্ত বছরখানেকের মাথায় বিরক্ত হয়ে গেলাম আমি। নয়টা-পাঁচটার চাকুরী আমাকে দিয়ে হবে না, সেটা আমি বুঝে গিয়েছিলাম। বেতনটা ভালো ছিল, এজন্যে জোর করেই নিজেকে ধরে রেখেছিলাম। কিন্ত সেটাও আর কতদিন! মনের সাথে যুদ্ধ চললো টানা কয়েকদিন। আমি চোখ বুজলেই তখন পাহাড় দেখতে পাই, কান পাতলেই সাগরের গর্জন শুনতে পাই! এরমধ্যে কলেজে দেখলাম একটা গ্রুপ স্পেনে যাচ্ছে স্প্যানিশ ল্যাঙ্গুয়েজের একটা কোর্স করতে। আমি জীবনে একবারই প্লেনে চড়েছি, নিউইয়র্কে আসার সময়। দেশের বাইরে কোনদিন যাইনি। সেই আমি ঝোঁকের বশে নাম লিখিয়ে ফেললাম সেই কোর্সে! অফিসে এসে বসকে বললাম, একমাস পর আমি জয়েন করবো আবার। পাসপোর্ট রেডি, ভিসাও হয়ে গেল, উঠে বসলাম বিমানে। আমার উড়নচণ্ডী জীবনের শুরুটা সেখান থেকেই।”

“একমাস পরে আমার ফেরার কথা ছিল স্পেন থেকে। আমি ফিরলাম না, উল্টো তিন সপ্তাহের ব্যাকপ্যাকিং ট্যুরে চলে গেলাম। আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, বৃটেন, জার্মানী আর ইতালী ঘুরে ফেললাম বিশদিনে। বাড়ি ফিরলাম একদম সতেজ আর তাজা হয়ে। এটা ২০০৮ সালের কথা, আমার বয়স তখন একুশ।”

“গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ হলো, লস অ্যাঞ্জেলসে একটা চাকুরী পেয়ে চলে গেলাম সেখানে। বড় শহরগুলো অনেক বেশি যান্ত্রিক হয়, লস অ্যাঞ্জেলসও তেমনই ছিল। আমি কোন বন্ধু খুঁজে পাইনি সেখানে, সবাই যেন যন্ত্রের মতো শুধু কাজ করে যায়। আমি আমার অফিসটাকে ঘৃণা করতে শুরু করলাম, এই জায়গাটা যেন জেলখানা! আমার শুধু পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করতো। যেখানে পাহাড় আছে, সাগর আছে, ঝর্ণা আছে, যেখানে মেঘ ছুঁয়ে দেখা যায়, তেমন কোন জায়গায়…” 

“২০১১ সালে সাহস করে আমি একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললাম। রিজাইন লেটার টাইপ করে সেটাতে সাইন করে পাঠিয়ে দিলাম বসের রুমে। তারপর বেরিয়ে এলাম অফিস থেকে। নিজেকে মুক্ত পাখির মতো মনে হচ্ছিল। আমার আর কোন পিছুটান নেই, কোন বাধা নেই। এখন আমি শুধু ঘুরে বেড়াবো, শুধু উড়ে বেড়াবো! এরপর থেকে তো ঘুরছিই শুধু। বিশ্বের একশোটার বেশি দেশ আমার দেখা হয়ে গিয়েছে। আইসল্যান্ডের ছবির মতো সাজানো শহরের ছোট্ট কফিশপে বসে সূর্যটাকে অস্ত যেতে দেখেছি আমি। নরওয়ের মিডনাইট সান- এর সাক্ষী হয়েছি আমি। রাতের বেলায় ভিক্টোরিয়া ফলসের পানির গর্জন শুনে আনন্দে মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছে আমার, আফ্রিকার জঙ্গলে তারাভরা রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পেয়েছি!”

“অনেকেই ভাবে, এই মেয়ে সারাবছর এত ঘুরে বেড়ায় কিভাবে? নিশ্চয়ই বাবা-মা কোটিপতি, নইলে কোন আরব শেখের সঙ্গে ডেট করছে! শুনে আমি হাসি। এগুলোর কোনটাই সত্যি নয়। ঘুরে বেড়ানোর জন্যে আরব শেখের সাথে প্রেম করা লাগে না, কোটিপতি বাবা-মা থাকাও লাগে না। আমি যেদিন চাকরী ছেড়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ানোটা মনস্থির করলাম, সেদিনই আমি আমার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কাবার্ডে থাকা দামী জামা আর জুতোর সংখ্যা আর একটাই বাড়েনি। দামী রেস্টুরেন্টের দিকে তাকানোও বন্ধ করে দিয়েছি আমি। বিমানের বিজনেস ক্লাসের টিকেটের কথা তো স্বপ্নেও ভাবিনি এরপর থেকে।” 

“কোথাও ঘুরতে গেলে আমি প্রথমে ব্যাকপ্যাকার্স হোস্টেল খুঁজি। কম খরচের মধ্যে এটাই থাকার সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা। সেটা না পেলে হোটেলের দিকে পা বাড়াই। দিনে পঞ্চাশ ডলারের বেশি খরচ করা যাবে না কোনভাবেই- এই নিয়মটা আমি নিজেই ঠিক করে দিয়েছি। ভ্রমণে আলিশান কোনকিছুই আমার পছন্দ নয়। আমি বাসে চড়ি, নৌকায় করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নদী পাড়ি দেই, ফেরীতে স্ট্যান্ডিং টিকেট কেটে উঠে পড়ি, ইউরোপে গেলে বিমানের বদলে ট্রেনে চড়ি। আমার নিজের ওয়েবসাইট আছে, সেখানে সহৃদয়বান কেউ কেউ দান করেন। আমি ভ্লগ বানাই, সেগুলো কোন সংবাদ সংস্থা কিনে নেয়, আমার তোলা ছবি আর ভিডিও বিক্রি করেও আমি টাকা কামাই। এগুলো দিয়েই আমি ঘুরে বেড়াই, সেটার জন্যে দুবাইয়ের কোন ধনীর সঙ্গে ডেটে যাওয়ার দরকার পড়ে না।”

“ঘুরে বেড়ানোর জন্যে নাকি সঙ্গী প্রয়োজন, টাকা প্রয়োজন, আরও কত অজুহাত আমি শুনি। আমার শুধু হাসি পায়। বেড়ানোর জন্যে সবচেয়ে বেশি দরকার ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ার সাহস। এটা থাকলে কোনকিছুই আপনাকে দমাতে পারবে না। আমি তো দমে যাইনি। একশোর বেশি দেশ আমি ঘুরে ফেলেছি। বিশ্বের সবগুলো দেশে আমি ঘুরতে চাই, প্রতিটা জায়গায় আমি আমার পায়ের ছাপ রেখে আসতে চাই। আপাতত এটাই আমার জীবনের লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য। আর আমি জানি, এটা পূরণ না করে আমি থামবো না…”

-কার্স্টেন রিক, আমেরিকান ট্রাভেলার এবং ভ্লগার।

তথ্যসূত্র- ফোর্বস ডটকম, সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস।

Comments
Spread the love