ঘুরে আসুন অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় খৈয়াছড়া ঝর্ণা

Ad

14291703_1030806557018167_8965456230843832507_n

খৈয়াছড়া দেশের সবচেয়ে বড় ঝর্ণা- এই কথা জানার পর থেকেই মনস্থির করে রেখেছিলাম দেখতে যাব। এক বন্ধু বলেছিল সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কুমিল্লা আসবে দেখতে। তখন দুইজন একসাথে খৈয়াছড়া যাব। কিন্ত বেচারার বিসিএস পরীক্ষার জন্য পরিকল্পনা বদলে গেল। অবশেষে ৩ সেপ্টেম্বর ৪ জন মিলে যাই খৈয়াছড়া অভিযানে। এই ঝর্ণার যেমনটা বর্ণনা শুনেছিলাম, তাতে মনে কিছুটা ভয় ছিল। দেখার প্রচণ্ড আগ্রহ, মনে ভয় আর কৌতূহল নিয়ে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে পৌঁছে গেলাম ঝর্ণার নিচে। উপরে তাকিয়ে দেখি প্রকৃতি যেন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছে। অবিরাম ছন্দে পড়ছে পানি। নয়নাভিরাম সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে যেন বারবার ছুটে যেতে চাইব সে অমসৃণ পাহাড়ি পথে। এমন ঝর্ণা দেখলে ভেজা থেকে নিজেকে সামলানো কঠিন। আমি লুঙ্গি, গামছা পরে খাঁটি কৃষক বনে গেলাম। তাই লাফ দিয়ে পানিতে নেমে গেলাম। এরপর গিয়ে দাঁড়ালাম পানির স্রোতধারার ঠিক নিচে। প্রায় ১০০ ফুট উঁচু থেকে পানি পড়ে যেন পিঠ ফুটো করে দিবে!

14184368_1030806740351482_1743629905553702003_nনিচের ধাপ থেকে শুরু হলো আসল অভিযান। খাড়া পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরে উঠতে হয়েছে। বৃষ্টিতে পথের অবস্থা ছিল করুণ। অনেক পিচ্ছিল আর কাদা পথ। আমি উত্তেজনায় আগে আগে উঠে যাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গীরা আসছিল পিছনে পিছনে। আমি আগে গিয়ে ভুল করে আরেক পথে চলে যাই। অতঃপর পাহাড়ি পথ ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম আমরা ঝর্ণার একবারে উপরের ধাপে চলে এসেছি। পরে জানলাম এটা নাকি শর্টকাট পথ। একবারে উপর থেকে ৪/৫ টা ধাপ দেখা যায়। তবে উপরে থেকে দেখে মজা নেই। এরপর ৪জন মিলে শুরু করলাম ঝর্ণার ধাপে ধাপে নামা। 

একেকটা ধাপ নামছিলাম আর উপরের দিকে তাকিয়ে উপভোগ করছিলাম ভয়ানক সৌন্দর্য। আগের দিন বৃষ্টি হয়েছিল আবার সেদিন সকালেও কড়া বৃষ্টি হয়েছিল। ফলে ঝর্ণা ছিল তার পুরো যৌবনে! ৩য়/৪র্থ ধাপে নেমে উপরে তাকালে সবচেয়ে ভাল লুকিং আসে। ৪/৫ টা ধাপ একসাথে দেখা যায়। যেন ৫ তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে সৌন্দর্যের দৃশ্য কি আর লিখনিতে বুঝানো সম্ভব? সব ধাপ নামতে নামতে নিচের ধাপে এসে আবারও পানিতে নেমে পড়লাম। শুনেছিলাম ঐখানে জোঁক আছে। তাই লবণ নিয়া গিয়েছিলাম। কিন্তু জোঁকের দেখা পাইনি। পেলে ভাজি করে ফেলে দিতাম!

পাথর অত্যন্ত পিচ্ছিল ছিল বলে ঝর্ণার পানি প্রবাহের মুখে যেতে পারিনি। পা হড়কালেই নির্ঘাত মৃত্যু। মানুষের বর্ণনা শুনে ঝর্ণায় উঠা যতটা কঠিন মনে করেছিলাম ততটা কঠিন না। ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। গ্রামে যারা বড় হয়েছেন তাদের জন্য এসব সহজ ব্যাপার। খালি উচ্চতা দেখে ভয় না পেলেই হলো! ঝর্ণার ধাপ বেয়ে উঠা নামা করা সহজ। তবে যারা শহরে বড় হয়েছেন, কোন দিন লং রেসে হাঁটার অভিজ্ঞতা নেই তাদের জন্য একটু কঠিন হবে। আমার উচ্চতাভীতি ছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে একটুও ভয় করেনি।

14265016_1030806560351500_489815531351709266_n

ঝর্ণা দেখে কাছের বাড়িটায় আসতেই মাগরিবের আজান দিয়ে ফেলে। এরপরই শুরু তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টি থামতে আমরা ৪ দুঃসাহসিক তরুণ বৃষ্টিভেজা দুর্গম পাহাড়ি পথ বেয়ে মোবাইলের ফ্ল্যাশ দিয়ে বাঁশের লাঠিতে ঠেস দিয়ে দিয়ে সামনে এগোতে লাগলাম। একটা সামান্য বাঁশের লাঠিও যে এত বড় সহায় হতে পারে সেটা সেদিন বুঝেছিলাম। রাতের বেলায় এমনিতেই আমার মাথা ঘুরে। ঐ লাঠি না থাকলে কয়বার যে পড়ে যেতাম, আল্লাহ জানেন! পথে আবার বৃষ্টি হানা দেয়। আমরা একটা দোকানের নিচে আশ্রয় নেই। বৃষ্টি থামতেই হাঁটা শুরু করি। কিন্তু একটু সামনে যাওয়ার পরেই আবার বৃষ্টি আসে। তখন আর কোথায়ও আশ্রয় নেওয়ার উপায় ছিল না। ফলে বৃষ্টিতে ভিজেই হাইওয়েতে আসি। মিশন শেষ করে বাসায় যখন আসি তখন রাত ১১:২০।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের বাসে গেলে বড়তাকিয়া বাজারে নামতে হবে। এরপর একটু হেঁটে উত্তর দিকে আসলে ঝর্ণার সাইনবোর্ড দেখবেন। ঐখানে সারি সারি সিএনজি দাঁড়িয়ে থাকে। সিএনজিতে উঠুন। ঝর্ণার কাছাকাছি নামিয়ে দিবে। ২০ টাকা নিবে। এরপর একটা বাঁশ কিনে নিবেন ১০ টাকা দিয়ে। ব্যস পাহাড়ি পথ ট্রাকিং শুরু করুন। আর ফেনীর বাসে গেলে মহিপাল নেমে লোকাল বাসে বড়তাকিয়া যাবেন। হেল্পারকে বললে ওরাই ঝর্ণার সাইনবোর্ডের সামনে নামিয়ে দিবে। এরপর সিএনজি দিয়ে চলে যান।

যারা নতুন যাবেন তাদের জন্য কিছু টিপস

১। যাওয়ার আগে একটা বাঁশের লাঠি নিয়ে যান। পথেই পাবেন। ১০ টাকা করে।
২। জুতা নিয়ে যাবেন না। খালি পায়ে পাথরে গ্রিপ করাই অনেক সুবিধার।
৩। উচ্চতা দেখে ভয় পাবেন না। উঠানামা করা অনেক সহজ।
৪। পাহাড়ে উঠার সময় দড়ি ধরবেন না। দড়ির পথ খুবই পিচ্ছিল। তারচেয়ে লাঠির উপর ভর দিয়ে অন্য পথ দিয়ে যান।
৫। ঝর্ণার যেদিক দিয়ে পানি নিচে নামে সেখান সাবধানে পা ফেলবেন। পাথর খুব পিচ্ছিল।
৬। বেশি পানি দেখতে বৃষ্টির দিনে বা বৃষ্টি হওয়ার পরের দিনে যাবেন। তাতে অবশ্য পাহাড়ি পথ কর্দমাক্ত থাকবে। কিন্তু সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এইটুকু ত্যাগ স্বীকার করাই যায়।
৭। লাঠি ফালানোর সময় নিশ্চিন্ত হয়ে নিবেন নিচের মাটি/পাথর শক্ত কিনা যাতে ফসকে না যায়।
৮। খালি পায়ে পা টিপে টিপে হাঁটবেন। পায়ের তেলো আগে ফেলবেন। নাইলে পাথরে লেগে আঙ্গুলে মারাত্মক ব্যথা পেতে পারেন।
৯। ঝর্ণার ধাপে ধাপে উঠার সময় হাতে ভর দিবেন বেশি। যাতে পায়ে ওজনের চাপ পরে কম।
১০। ঝর্ণা দেখলে ভিজতে মন চাইবে। তাই এক্সট্রা কাপড় নিয়ে যাবেন। 
১১। যারা একটু স্বাস্থ্যবান আর হাটার অভিজ্ঞতা নেই, তাদের উপরে না উঠাই ভাল। সেক্ষেত্রে তৃতীয় ধাপ থেকে উপরের ৩/৪টা একসাথে দেখে ফিরে আসতে পারেন।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad