তারুণ্যপিংক এন্ড ব্লু

ভালোবাসার ‘খেতাপুরি’!

নামটা শুনে ভিমরি খাবেন না। পুরান ঢাকার সন্ধ্যার এক মজাদার খাবার। নাম খেতাপুরি। এই নামের উৎপত্তির বাপ-দাদার ইতিহাস নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। তবে বাজারে রাস্তায় হাল আমলে পসরা সাজিয়ে বসা খেতাপুরি পুরান শহরের এক অভিনবত্ব বলেই মনে হয়। আমাদের মা-দাদিরা বাড়ীতে বিকেলে বা মাঝে মাঝে সকালে তৈরী করতেন ডালরুটি। কী অসীম ধৈর্য তাদের উপরওয়ালা দিয়েছিলেন, যা এ জামানায় দেখি আর ভাবি? সেই ডালরুটির স্বাদ বিগত ২৫ বছরেও পাইনি! যান্ত্রিক শহুরে জীবনে আমাদের সেই সময়টা আর নেই। সহজসাধ্য হাতের নাগালেই তো পাওয়া যায় সব খাবার। তাহলে আর কষ্ট কেন? মানে- ফেল কড়ি মাখো তেল অবস্থা! 

অনেকেই ডালরুটি আর খেতাপুরির মাঝে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। ভাবেন দুটো তো একই জিনিস! কিন্তু পার্থক্যটা হলো, রুটি তৈরী হয় তাওয়ায় সেঁকে আর পুরি তৈরি হয় তেলে ভেঁজে। দুটোর উপাদান একই, ডাল। ডাল হিসেবে খেসারি বহুল প্রচলিত। ডালরুটিতে ব্যবহার হয় চালের গুড়া এবং খেতাপুরিতে ময়দা। ডালরুটি তাওয়ায় সেঁকে এবং খেতাপুরি হালকা তেলে তাওয়ায় ভেঁজে তৈরী হয়। দুটোর স্বাদ ভিন্ন।

ভাবছেন এতকিছু থাকতে ডালরুটি আর খেতাপুরি কেন? কারণটা বেচু মিয়া!

নতুন ঢাকার নয়া পিঠা ব্যবসায়ী। আগে ভ্যানগাড়ীতে বেঁচতেন ফাস্টফুড জাতীয় খাবার। বিক্রিবাট্টাও ছিল বেশ। হঠাৎ একদিন মাথায় ব্যামো হলো। কয়েক মাস নিলো সন্ন্যাস জীবন। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে কয়দিন আগে এসে জানতে চাইলো, ‘কি করমু ভাইজান? দিনদুনিয়া কিছুই ভালা লাগে না। মনডা অস্থির অস্থির লাগে। এই শহরে তো বড় হইছি মাইনষের লাত্তিগুতা খায়া, ভাবতাছি আবার শুরু করুম কাম কাইজ। তয় বিদেশি খাওন না, এক্কেরে ঢাকাইয়া খাওন! পিঠা বেচুম লগে খেতাপুরি। কি কন?’ বললাম, ‘আগের ব্যবসাই চালু করো।’ উত্তর দিল, ‘না ভাইজান। হেই খাওন ভালা না, শুনছি মাইনষে কয়। আমার কাস্টমার আছিল স্কুলের পোলাপাইন। মায়েরা শখ কইরা কিনা দিত। হেইটা..ভালা না।’

বললাম, ‘তুমি খেতাপুরি না, শুরু কর ডালরুটি দিয়ে।’ দিলাম আমার বিশেষ রেসিপিটা। কথা দিলাম তার প্রথম কাস্টমার আমি হব। বেচুর বিদায়বেলায় ওর দৃষ্টিতে দেখলাম শুকরিয়া সূচক আবেদন। সাথে ভাবছিলাম শিক্ষিতের ভাবধারী আমরা বেচুদের তুলনায় এখনও কত চরম উদাসীন!

ডালরুটির বিশেষ রেসিপিটা যারা ঘরে তৈরী করতে চান তাদের জন্য বলে দেই-

২ কাপ চালের গুরো ১/২ চা চামচ লবন দিয়ে কুসুম গরম পানিতে সেদ্ধ করে ডো বানিয়ে নিন। ১ কাপ মসুর ডাল, সাথে ১/২ চা চামচ হলুদ, ১/২ চা চামচ লবন, ১ চা চামচ জিরা গুঁড়া মিশিয়ে সিদ্ধ করতে থাকুন। ডাল শুকিয়ে ঝরঝরে হয়ে এলে ২ টেবিল চামচ তেল (অলিভ হলে ভাল), সাথে পুদিনাপাতা এবং এক চিমটি অরিগেনো ডালে দিয়ে একেবারে হালকা আঁচে নেড়ে আরো কিছুক্ষন মিশে শক্ত হলে নামিয়ে রাখুন। এরপর, চালের গুরির ডো থেকে ছোট ছোট রুটি (পুরির সাইজ) বেলে তৈরী করুন। এভাবে অনেক গুলো রুটি তৈরী হলে একটি রুটির ওপর ঠেসে ডাল দিয়ে তার ওপর আরেকটি রুটির টুকরো দিয়ে রুটি বানান। রুটির পুরুত্ব বেশ মোটা হবে। চাইলে একটা রুটির ভিতরে ডালের পুর দিয়েও তৈরী করতে পারেন। তাওয়া গরম করে আবারো হালকা আঁচে সবগুলো রুটি সেঁকে নিন। ব্যাস, তৈরী হয়ে গেল ডালরুটি! ডালরুটি এমনিতেই খাওয়া যায়, আবার ঝাল আমের আচার বা পছন্দ অনুযায়ী যে কোন চাটনি দিয়ে মুখে পুরুন।

কি, আপনার জিহবা রেডি তো?

এটাই ডালরুটি তৈরীর আদি প্রক্রিয়া। সেই জামানায় তো আর ময়দা আবিস্কার হয়নি, আমাদের নানী-দাদীরা এভাবে তৈরী করতেন মজাদার ডালরুটি। তবে আমি এতে যোগ করি অরিগেনো আর তেল হিসেবে অলিভওয়েল। স্বাদ বৈচিত্র্যের ভিন্নতা আনতে। বলতে পারেন ফুড ফিউশন!

যাদের এত হ্যাপা আদায় করা সম্ভব নয় তাদের জন্য আছে নাজিরাবাজার মোড়, নাজিমুদ্দিন রোড়, লালবাগসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন অলিগলি।তবে সন্ধ্যার আগে মেলা ভার।

আলুপুরি, কিমাপুরি, ডালপুরি, ডিমপুরি, মাছের পুরি আবার পানিপুরি, ভেলপুরি- কত পুরির তো নাম শুনেছেন। মন চাইলে বিশেষ কিছু পুরির স্বাদ গ্রহন করতে পারেন পুরান ঢাকার অলিগলিতে। তবে সাবধান! পুরান ঢাকার এই পুরি কেউ সিলেট অঞ্চলে যেয়ে খেতে না চাওয়াই উত্তম। উত্তম-মধ্যমের সম্ভবনা বেড়ে যেতে পারে! জানেন তো, স্থানীয় ভাষায় পুরির অর্থ কি?

বেচু মিয়াদের জন্য শুভেচ্ছা আর শ্রদ্ধা!

Comments

Tags

Related Articles