অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

সৌদি আরবই কি বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট রাষ্ট্র?

রামায়ণে বলা হয়েছিল- জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। বাক্যটার বাংলা মানে হচ্ছে, মা আর মাতৃভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। শিশু বয়সে একটা মানুষের জন্যে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল থাকে তার মায়ের কোল। বড় হলে তাকে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বটা তার দেশের। বাংলাদেশের একজন মানুষ নিশ্চয়ই ভারতে বা পাকিস্তানে গিয়ে নিরাপদ বোধ করবে না। নিজের দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতিটাই অন্যরকম, এটার সাথে আর কোনকিছুর তুলনা হয় না।

আর যদি কর্মসূত্রে বা অন্য কোন কারণে দেশের বাইরে কাউকে থাকতেই হয়, সেদেশে তার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা কোনটা জানেন? নিজের দেশের রাষ্ট্রীয় দূতাবাস। যে কোন সমস্যা, ছোট-বড় যেকোন রকমের বিপদে আপদে বিদেশ বিভুঁইয়ে একজন নাগরিক তার দেশের অ্যাম্বাসী থেকেই সর্বোচ্চ সাহায্যটা পেতে পারেন। কিন্ত ভাবুন তো, জরুরী কোন দরকারে বা কাগজপত্র নবায়ন করতে আপনি আপনার দেশের অ্যাম্বাসীত গেলেন, সেখানে আপনাকে অবর্ণনীয় অত্যাচার করে মেরে ফেলা হলো, জীবন্ত অবস্থায় কেটে পিস পিস করে মৃতদেহটা গুম করে ফেলা হলো মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে!

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগছে? এই ঘটনাটাই তো ঘটেছে সৌদি আরবের নাগরিক জামাল খাশোগি’র সঙ্গে, কয়েকদিন আগে। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে তুরস্কের সৌদি দূতাবাসের ভেতরে, আর পুরো ব্যাপারটাই ঘটেছে রাষ্ট্রীয় মদদে, রাজপরিবারের, কিংবা ক্রাউন প্রিন্স সালমানের সরাসরি আদেশে! সাংবাদিক জামাল খাশোগি’র অপরাধ ছিল, তিনি ক্রাউন প্রিন্স আর সৌদি রাজপরিবারের সমালোচনা করতেন। এজন্যেই তাকে এই বর্বরতার শিকার হতে হলো। 

জামাল খাশোগি পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। সৌদি রাজপরিবারের কঠোর সমালোচনা করতেন তিনি, সরকারের বৈরী আচরণের শিকার হবার আশঙ্কায় নিজের দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়েছিলেন খাশোগি। তার কলম থেমে থাকেনি কখনও, ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা কলামে বরাবরই সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন সৌদি রাজপরিবার আর ক্রাউন প্রিন্স সালমানের কার্যক্রমকে। গত কিছুদিন ধরে তুরস্কে অবস্থান করছিলেন তিনি। ২রা অক্টোবর তুরস্কের আঙ্কারায় অবস্থিত সৌদি দূতাবাসে যাওয়ার কথা ছিল তার, কাগজপত্র নবায়নের কাজে।

সেদিন সকালে নিজের বাগদত্তাকে নিয়ে সৌদি কনস্যুলেট ভবনে গিয়েছিলেন খাশোগি। কাজ শেষ হতে পনেরো-বিশ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা নয়, এই ভেবে বাগদত্তাকে বাইরে গাড়িতে রেখে ভেতরে ঢুকেছিলেন তিনি। খাশোগি নিজেও হয়তো কল্পনা করতে পারেননি, নিজের দেশের দূতাবাসে ঢোকাটাই কাল হবে তার জন্যে, সেখান থেকে আর ফিরতে পারবেন না তিনি; জীবিত অবস্থায় তো নয়ই, তার মৃতদেহটাও কখনও দেখতে পাবে না কেউ!

খাশোগি আর ফিরে আসেননি দূতাবাস থেকে। পুলিশ কেস করা হলে সৌদি কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, খাশোগি সেদিন দূতাবাসে আসেনইনি! কিন্ত রাস্তায় লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, গাড়ি থেকে বেরিয়ে খাশোগি প্রবেশ করছেন দূতাবাসে। কিন্ত সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোন ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তাই তুরস্কের পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত হন, খাশোগি দূতাবাসের ভেতরেই আছেন, জীবিত বা মৃত, যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন। তবে তুরস্কের সৌদি দূতাবাসের পক্ষ থেকে ভাঙা রেকর্ডের মতো এক কথাই বারবার বলা হয়েছে। 

তুরস্কের পুলিশ একসময় মোটামুটি নিশ্চিত হয়েই জানায়, খাশোগিকে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে হত্যা করা হয়েছে। আর এই হত্যাকাণ্ড যে ঘটেছে, সেটার পক্ষে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণও তাদের হাতে আছে। পুলিশ দাবী করে, হত্যাকাণ্ডের সময় খাশোগির হাতে ছিল অ্যাপল ওয়াচ, সেখানে রেকর্ডিং অপশনটাও অন করা ছিল। সেই রেকর্ডিং জমা হয়েছে অ্যাপলের আইক্লাউডে। খাশোগির বাগদত্তার সাহায্য নিয়ে তার আইক্লাউড অ্যাকাউন্টের অ্যাক্সেস পেয়েছেন তুর্কি পুলিশের কর্তারা, সেখানেই পাওয়া গেছে অডিও ক্লিপ। সেই অডিও ক্লিপ শুনেই তারা জেনেছেন, কি ঘটেছিল খাশোগি দূতাবাসের ভেতরে ঢোকার পরে।

তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ভেতরে ঢোকার মাত্র সাত মিনিটের মধ্যেই হত্যা করা হয় খাশোগিকে। তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় কনস্যুলেট ভবনের ভেতরের দিকে, যেটা কিনা কনসাল জেনারেলের লাইব্রেরী ঘর। খাশোগি যে সেদিন সৌদি দূতাবাসে আসবেন, সেটা আগে থেকেই জানা ছিল কর্তৃপক্ষের। সৌদি আরবেও সেই খবর পৌঁছে গিয়েছিল। সেখান থেকে পনেরো জনের একটা স্কোয়াড পাঠানো হয়েছিল তুরস্কে, শুধু খাশোগিকে হত্যা করার জন্যে। সেই স্কোয়াডে বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার থেকে সৌদি আরবের গোয়েন্দা কর্মকর্তা, এমনকি ক্রাউন প্রিন্স সালমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীও ছিলেন!

অডিও ক্লিপের বরাত দিয়ে তুরস্কের কয়েকটি গণমাধ্যম দাবী করেছে, জীবন্ত অবস্থাতেই কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয় খাশোগিকে! রেকর্ড করা অডিওতে খাশোগির প্রচণ্ড চিৎকারের শব্দ শোনা গেছে। আরও শোনা গেছে, তুরস্কে নিযুক্ত সৌদি কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ আল ওতায়বি কাউকে বলছেন- “যা করার বাইরে গিয়ে করো। আমাকে বিপদে ফেলো না।” অপরিচিত এক কণ্ঠস্বর থেকে তখন তাকে হুমকি দেয়া হয় চুপ করে থাকার জন্যে। এই অডিও ক্লিপ হাতে পাবার পরেই খাশোগির সন্ধানে সৌদি দূতাবাসে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনী। সেই খবর পেয়ে দ্রুত তুরুস্ক ত্যাগ করেন রাষ্ট্রদূত ওতায়বি!

অডিও ক্লিপটা তুরস্কের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের হাতে আসার পরে সৌদি আরব স্বীকার করে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় ‘ভুলবশত’ খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। অবশ্য, এতকিছুর পরে আর চুপ থাকাটা সম্ভবও ছিল না! তুরস্কের স্থানীয় দৈনিকগুলো এরইমধ্যে যে পনেরো জন খাশোগি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল, তাদের ছবি আর পরিচয়ও প্রকাশ করে দিয়েছে। দুটি ব্যক্তিগত বিমানে করে সৌদি আরব থেকে তুরস্কে আসে তারা, জামাল খাশোগি সৌদি দূতাবাসে ঢোকার কয়েক ঘন্টা আগেই তাদের তুরস্কে আনা হয়। খাশোগি হতাকাণ্ডে জিজ্ঞাসাবাদের কোন ব্যাপার ছিলই না বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমগুলো, খাশোগিকে হত্যা করা হবে, এই সিদ্ধান্ত অনেক আগে থেকেই নেয়া ছিল। 

পুরো ব্যাপারটাই ছিল অসম্ভব রকমের পরিকল্পিত, আর সেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল সৌদি আরবের রাজপরিবারের একদম উঁচু পর্যায় থেকেই। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া অন্য একটা দেশে গিয়ে রাষ্ট্রীয় দূতাবাসে এমন হত্যাকাণ্ড চালানোটা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ছাড়া আর কেউ দিতে পারেন না। একটা দেশ যখন তার সর্বশক্তি নিয়োগ করে, তারই দেশের একজন নাগরিকের মুখ বন্ধ করার জন্যে, এরচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার আর কি হতে পারে? সৌদি আরব সেটাই করে দেখিয়েছে।

জামাল খাশোগির অপরাধ ছিল, তিনি রাজপরিবারের সমালোচনা করতেন। তার অপরাধ ছিল, লেখালেখির মাধ্যমে তিনি সৌদি আরবের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি মোহাম্মদ বিন সালমানের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন। সেজন্যে তাকে নিজের জীবন দিয়ে ‘অপরাধের’ প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে, জীবন্ত অবস্থায় তাকে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছে, তাও কিনা তারই দেশের দূতাবাসের ভেতরে! ইসলামে আছে, এক মুসলমান নাকি আরেক মুসলমানের ভাই। ইসলামের ধ্বজাধারী সৌদি আরব সেই কথাটাকে হাসিঠাট্টাতেই পরিণত করলো!

আমাদের দেশে অনেক মানুষ আছে, যারা সৌদি আরব আর ইসলামকে একই জিনিস মনে করে। যেন সৌদি আরবই ইসলামের রক্ষাকর্তা, সৌদি আরব না থাকলে ইসলাম ধ্বংস হয়ে যাবে! কথায় কথায় তারা ইসরাইলকে গালি দেয়, অথচ সৌদি আরব যে ইজরাইলের সাথে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি করে, সেই অস্ত্র দিয়ে ইয়েমেনে মুসলমান মারে, সেটা তারা দেখে না। এসব ভণ্ড লোকগুলো গ্রামগঞ্জে ওয়াজ-মাহফিলে গিয়ে ফতোয়া দেয়, আইয়ুব বাচ্চু কেন জাহান্নামে যাবেন সেসব নিয়ে রসালো আলোচনা করে, তবে সৌদি আরবের এমন নৃশংস কীর্তিতে তারা চুপচাপ বসে থাকে কানে আঙুল দিয়ে। এই লেখাটা তাদের উৎসর্গ করা হলো।

আরও পড়ুন- 

Comments

Tags

Related Articles