খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি ছিলেন অলরাউন্ডার। ব্যাট বল দুটোতেই ছিলেন সিদ্ধহস্ত। মুলতান টেস্টে হারের পর তার কান্না এখনও মন খারাপ করিয়ে দেয় এদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের। পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৯৯ বিশ্বকাপের স্মরণীয় জয়ে বড় অবদান ছিল তার। তবে নিজের অলরাউন্ডার সত্ত্বাটাকে তিনি বিকশিত করেছেন খেলা ছেড়ে দেয়ার পরে। একাধারে তিনি টিম ম্যানেজার, কোচ, বোর্ড ডিরেক্টর, বোর্ডের স্ট্যান্ডিং কমিটির মেম্বার, খেলোয়াড়দের সংগঠন কোয়াবের সহ-সভাপতির পদটাও ‘অলঙ্কৃত’ করে আছেন তিনিই। এমনকি এতসব কিছু সামলে একটা বেসরকারী ব্যাঙ্কে লাখ টাকা বেতনে চাকুরীও করেন তিনি! মানুষটার নাম খালেদ মাহমুদ সুজন, বাতাসে জোর গুঞ্জন- বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ভবিষ্যত অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হতে চলেছেন যিনি।

হুট করেই কোচের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। সামনে শ্রীলঙ্কা সিরিজ, এই অল্প সময়ের মধ্যে হাই-প্রোফাইল বিদেশী কোচ আনাটা কঠিন। আর তাই বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন আভাস দিয়ে রেখেছেন, বাংলাদেশী কারো কাঁধেই উঠতে পারে অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব। আর এক্ষেত্রে তাঁর প্রথম পছন্দ যে খালেদ মাহমুদ সুজন, সেটা বলে না দিলেও চলছে। এর আগে বোর্ডের কমিটি থেকে জাতীয় দলের ড্রেসিংরুম- সব জায়গাতেই নানা ভূমিকায় সুজনের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছিলেন তো নাজমুল হাসানই। কোচের খালি পদটাতেও তাই ব্যতিক্রমী কিছু না ঘটলে সুজনেরই আসার কথা।

সেটা হলে ব্যাতিক্রমী এক ঘটনার সাক্ষী হবে ক্রিকেটবিশ্ব, এমনটা আগে কখনও ঘটেনি কোন দেশে। বোর্ডের কর্মকর্তা থাকা অবস্থাতেই কেউ জাতীয় দলের কোচ হয়ে যাচ্ছেন- এটা বোধহয় বাংলাদেশ বলেই সম্ভব হচ্ছে। সুজনের কোচিং ক্যারিয়ার বাংলাদেশের বিবেচনায় মন্দ নয়। ঢাকা লীগের দল আবাহনীর দায়িত্বে আছেন বেশ কয়েক বছর ধরে, গত মৌসুম থেকে দায়িত্ব পালন করছেন বিপিএলের ফ্র‍্যাঞ্চাইজি ঢাকা ডায়নামাইটসের কোচ হিসেবে। কিন্ত সেসব দলে কতখানি যোগ্যতার বলে কোচের চেয়ারে বসেছেন সুজন, সেটা নিয়ে আছে বিতর্ক। দীর্ঘদিন আবাহনী লিমিটেডের সভাপতি ছিলেন নাজমুল হাসান পাপন, সেই আবাহনীতে সুজনের কোচ হওয়ার পেছনে যে তার হাত আছে, সেটা অনুমান করতে জ্যোতিষী হওয়া লাগে না। ঢাকা ডায়নামাইটসের ব্যপারটা তো আরও বেশী ওপেন সিক্রেট! বোর্ড প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন আর পরিচালক ইসমাইল হায়দার মল্লিক চাকুরী করেন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকোতে, তারাই ঢাকা ডায়নামাইটসের মালিকপক্ষ। ঢাকা তো এক অর্থে নাজমুল হাসানের নিজেরই দল। সেখানে ‘প্রিয়পাত্র’ সুজন ছাড়া অন্য কেউ কোচ হলেই বরং অবাক হতে হতো।

বাংলাদেশের ক্রিকেটবোর্ডে এখন এমনই একটা ‘সিন্ডিকেট’ভিত্তিক কার্যক্রম চলছে। সবকিছুর নিয়ন্ত্রন করছে একটা পক্ষ, তারাই ক্ষমতায় আছেন বছরের পর বছর ধরে, ভালো-মন্দ সবকিছু সিদ্ধান্ত তারাই নেন, কে থাকবেন কে থাকবেন না তার সর্বময় কর্তৃত্ব তাদের হাতে। এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ন্যে সত্যিকারের ক্রিকেট অনুরাগী বা ক্রিকেটকে ভালোবাসা মানুষগুলো বা ক্রিকেট অন্তপ্রাণ সংগঠকেরা হয়ে আছেন কোণঠাসা। অবস্থা কতটা ভয়াবহ, সেটার ইঙ্গিত পাওয়া যায় সাবেক বোর্ড প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরীর টুইটে। তার ভাষায়, ক্রিকেট বোর্ডে যেটা চলছে সেটার নাম স্বেচ্ছাচার। সিন্ডিকেট নিজেদের মন-মর্জি মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা ইচ্ছে করছে। আর সেই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে দেশের বড় একটা কর্পোরেট হাউজের ইশারায়! সাবের হোসেন চৌধুরীর মতো ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ মানুষ এখন বোর্ড থেকে বেরিয়ে যান নিজের সম্মান বজায় রাখতে, এই মগের মুল্লুকে তাদের কথা কে শুনবে!

বিসিবিতে ‘ডাবল-ট্রিপল রোল’ পালন করার নজির এটাই নয় শুধু। খেলোয়াড়দের একটা সংগঠন আছে, যার নাম কোয়াব। পেশাদার ক্রিকেটাদের দাবীদাওয়া বোর্ডের কাছে তুলে ধরাই যাদের কাজ। সেই কোয়াবের শীর্ষ দুই পদে আছেন দুই বোর্ড পরিচালক নাইমুর রহমান দুর্জয় আর খালেদ মাহমুদ সুজন। জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু বিপিএলে মেন্টর হিসেবে কাজ করছেন চিটাগং ভাইকিংসের সঙ্গে, আরেক নির্বাচক হাবিবুল বাশার আছেন খুলনা টাইটান্সে; এই খুলনা ফ্র‍্যাঞ্চাইজির মালিক কাজী ইনাম আহমেদ, তিনি আবার বোর্ড পরিচালক! তবে একই অঙ্গে কত রূপের একমাত্র নমুনা শুধু সুজন একাই। তার কাজের ফিরিস্তি শুনলে ভীরমি খেতে হয়। বোর্ড পরিচালক, আবাহনী-ডায়নামাইটসের কোচ, ব্যাংক কর্মকর্তার পরিচয় তো আগেই দেয়া হলো, এর পাশাপাশি প্রথম বিভাগের দল শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের হেড কোচও তিনিই। এই শাইনপুকুর ক্লাবের মালিকও বেক্সিমকো গ্রুপই। গত বছর দায়িত্ব পালন করেছেন বিসিবির ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে, তরুণ প্রতিভা তুলে আনাটাই যাদের কাজ ছিল। সেইসঙ্গে কোচ-অধিনায়কের পাশাপাশি জাতীয় দলের নির্বাচক কমিটির একজন সদস্যও তিনি! টিম ম্যানেজারের দায়িত্ব তো অনেকদিন ধরেই পালন করছেন।

এতগুলো দায়িত্বপ্রাপ্তি সুজনকে ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত করছে কিনা- সেই প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনে বোর্ড প্রেসিডেন্টের পর সম্ভবত সবচেয়ে বেশী ক্ষমতার মালিক খালেদ মাহমুদ সুজনই। সেই ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে থাকতেই পারে। বোর্ডে কি বিভিন্ন কাজের চাপ সামলানোর মতো দক্ষ মানুষজন নেই? থাকলে সুজনকে কেন এত কাজের ভার সামলাতে হচ্ছে? আর যদি যোগ্য লোকের অভাব হয় তাহলে বিসিবি এত কর্মকর্তা পুষছে কেন? সব দায়িত্বের ভার দুই একজনকে দিয়ে বাকীদের ছাটাই করে দিলেই তো ঝামেলা চুকে যায়, টাকাও বাঁচে।

সুজনের জাতীয় দলের কোচ হওয়া নিয়ে আমাদের কোন আপত্তি নেই। মানুষটা কিছুদিন আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, যমে মানুষে টানাটানি করে জীবন নিয়ে আবার মাঠে ফিরেছেন। জাতীয় দলের দায়িত্ব সামলানোর মতো শারীরিক অবস্থা তার আছে কি নেই, সেটা তিনিই ভালো জানেন। যেহেতু বিপিএলে ঢাকার ডাগআউটে তাকে দেখা যাচ্ছে নিয়মিত, ধরে নেয়া যায় তিনি পুরোপুরি সুস্থ। কিন্ত জাতীয় দলের কোচ হিসেবে তার নিয়োগ প্রক্রিয়াটা কতখানি স্বচ্ছ? ব্যক্তিগত পছন্দের পুরস্কার হিসেবে তিনি এই দায়িত্ব পাচ্ছেন, এটা কল্পনা করতে খুব কষ্ট হয়।

অল্প কিছুদিনের জন্যে চলতি দায়িত্ব দেয়া হবে একজন দেশী কোচকে। হয়তো শুধু একটা সিরিজের জন্যেই। কিন্ত সেক্ষেত্রে সুজনই কেন? ভালো দেশীয় কোচের কি এতই অভাব? সারওয়ার ইমরান বা সালাউদ্দিনের মতো যারা জীবনের অনেকটা সময় ক্রিকেট কোচিঙের সঙ্গে যুক্ত, তাদের কেন অবহেলা করা হচ্ছে? যারা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে কাজ করছেন, তরুণ ক্রিকেটার তুলে আনার পেছনে যাদের অসীম অবদান, সে মানুষগুলোকে ফেলে ‘অটোমেটিক’ চয়েজের দিকে কেন হাঁটছে বোর্ড?

খালেদ মাহমুদ সুজন জাতীয় দলের কোচ হতেই পারেন, সাকিব-তামিম-মাশরাফিদের সামলানোর যোগ্যতা তার আছে বলেই বিশ্বাস করি। কিন্ত সেই নিয়োগপ্রাপ্তিটা যাতে ‘সিন্ডিকেটে’র আঙুলের অবৈধ ইশারায় না হয়, সেটাই কামনা করবো। বাংলাদেশ ক্রিকেটবোর্ড নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা আর সংগঠকদের মিলনমেলা হয়ে উঠবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা, কোন কর্পোরেট হাউজের তথাকথিত সিণ্ডিকেট আমাদের বোর্ডে ঢুকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের নেশায় যথেচ্ছাচারে মেতে ক্রিকেটকে ধ্বংস করে দেবে- ক্রিকেটভক্ত হিসেবে সেটা কখনোই মেনে নেয়া সম্ভব নয়।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-