আপনি-ই সাংবাদিকইনসাইড বাংলাদেশ

খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা, খাঁটি দেশপ্রেমিকেরা এমনই পাগলা হয়!

তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একাত্তরে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। তার যুদ্ধ যে এখনো শেষ হয়নি। এখন তিনি মানুষের জন্য যুদ্ধ করেন। একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল দেশকে মুক্ত আলোকিত করার যুদ্ধ, স্বাধীন করার যুদ্ধ আর এখন যে কাজটা করছেন সেটা মানুষের চোখের আলো বাঁচানোর যুদ্ধ। মানুষটার নাম খায়রুল বাসার খান। তার বাড়ি রাজবাড়ির বালিয়াকান্দি উপজেলার খোদ্দমেগচামী নামক এক গ্রামে।

আলহাজ্ব খায়রুল বাসার খান এমনিতে একজন অবসরপ্রাপ্ত আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা।ভিডিপি সেবার জন্য রাষ্ট্রপতি পদক পেয়েছিলেন তিনি। এর বাইরে তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টাই সবচেয়ে গর্বের। তারচেয়েও বড় কথা, যুদ্ধটা এখনো থামেনি তার। সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন মানুষের জন্য মানবিক কাজে যুক্ত হয়ে। সবচেয়ে মহতী যেই কাজটা দিনের পর দিন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা করে যাচ্ছেন তা হলো, বিনা পয়শায় চোখের ছানি অপারেশন করার ব্যবস্থা করছেন গরীব, দুস্থ রোগীদের জন্য।

তবে তিনি চিকিৎসক নন পেশায়, ছানির অপারেশনও তিনি করেন না। তিনি যা করেন, তা হলো, যাদের চোখে সমস্যা, যাদের চোখ ছানির কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় আছে তাদের চোখের ছানির অপারেশন করানোর ব্যবস্থা নিজেই করেন। রোগীর কাছ থেকে একটা পয়শাও নেন না। চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ নিজেই বহন করেন। আর এই মহান মানুষটা এখন পর্যন্ত ২৬১ জন মানুষের চোখের ছানির অপারেশনের ব্যবস্থা করেছেন! খাঁটি মুক্তিযোদ্ধারা বোধহয় এমনই হন, যে অবস্থাতেই থাকেন না কেন দেশ আর মানুষের কথা ভাবাটাই যেন তাদের প্রধান কাজ। খায়রুল বাসার খান তেমনই একজন মুক্তিযোদ্ধা!

খায়রুল বাসার বর্তমানে অবসরজীবন কাটাচ্ছেন, কৃষিকাজ করেন সময় পেলে। চাষাবাদ ছাড়া তার বিশেষ কাজ হলো, অসহায় মানুষদের খুঁজে তাদের চোখের ছানির চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। অনেকেই জানেন এখন, এরকম সমস্যায় পড়লে আর কাউকে খুঁজে না পাওয়া গেলেও রাজবাড়ীর এক পাগলা মুক্তিযোদ্ধা আছেন, যিনি সমস্যার কথা শুনে ফেরাবেন না। নিজেই সব বন্দোবস্ত করবেন। অনেকে আজকাল চোখের ছানির সমস্যা হলে ছুটে যান খায়রুল বাসার খানের কাছে। লোকটা চিকিৎসক নন, কিন্তু তবুও তার উপর লোকের ভরসা অগাধ।

এই যেমন ষাটোর্ধ্ব এক মানুষ ওমর আলী শেখ। চোখের ছানি ধরা পড়ার পর যিনি শরনাপণ্ণ হন খায়রুল বাসার খানের। বলেন, “আগে তালের পাখা তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতাম। এখন আর ওই ব্যবসা নেই। মাঠে কাজ করে সংসার চালাতে হয়। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলের আলাদা সংসার। চোখে কম দেখি। চিকিৎসক দেখিয়ে জানতে পারি চোখে ছানি পড়েছে। পরে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে খায়রুল বাসারের খবর পাই। তিনি চোখের অপারেশন করিয়ে দিয়েছেন।”

রোগীদের চোখের ছানির অপারেশন হয় মালেকা চক্ষু হাসপাতালে। ফরিদপুরের মধুখালী মালেকা চক্ষু হাসপাতালের সাথে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্পর্ক বেশ ভাল। সাধারণত এখানে চোখের ছানির অপারেশনের খরচ সাড়ে সাত হাজার টাকা নেয়া হয়। তবে, হাসপাতাল কতৃপক্ষ খায়রুল বাসার খানের মহান কাজকে সহযোগিতা করে। যখনই এই বীর মুক্তিযোদ্ধা কোনো রোগী নিয়ে আসেন তখন এক মাসের ঔষধ খরচ সহ অপারেশন চার্জ হিসেবে হাসপাতাল চার হাজার টাকা রাখে। অবশ্য রোগীকে এক টাকাও দেয়া লাগে না। পুরোটাই খায়রুল বাসার খান নিজে পরিশোধ দেন।

প্রশ্ন আসতেই পারে খায়রুল বাসার খানের অর্থের উৎস কি? আপনি জেনে অবাক হবেন, এই মানুষটা নিজের মুক্তিযোদ্ধা ভাতার অর্থ পুরোটা ব্যয় করেন গরীব মানুষের চিকিৎসার কাজে। রাষ্ট্রপতি পদক ভাতা হিসেবে এককালীন পেয়েছিলেন ৫০ হাজার টাকা, সেই টাকাও খরচ করেছেন চোখের ছানির অপারেশন করানোর কাজে। কখনো টাকার টান পড়লে নিজের সন্তান এবং মেয়ে জামাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে হলেও মানুষকে সাহায্য করেন এই মহান মানুষটি। তিনি এমন এক মাটির মানুষ যার কোনো চাওয়া পাওয়া নেই, স্বার্থটান নেই। তিনি বরং নিজের প্রাপ্যটাও বিলিয়ে দেন গরীব মানুষের কল্যাণে। তার এই চেষ্টায় কত মানুষ আজ আলোকিত ভুবন দেখছে, চোখের আলো হারাবার ভয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে না!

একজন মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাসার খানের যতজন মানুষের চোখে আলো জ্বালিয়েছেন, তাতেই বোঝা যায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আসলে কি! মানুষের তরে মানুষ এভাবে কাজ করলে তবেই না সুন্দর একটা দেশ পাওয়া যাবে। মানবতা তো এমনই হওয়া দরকার, যেমন হলে একজন মানুষ হোঁচট খেলে আরেকজন টেনে তুলবে, একজন মানুষ শুধু নিজেই আলোকিত হবে না, আলোকিত করবে তার চারপাশটাকে। এভাবেই তো দেশটাকে ভালবাসা যাবে। আর এই উপলব্ধিটাই বোধহয় খায়রুল বাসারের মতো একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে আমাদের শেখার আছে!

আমাদের এই প্রজন্মের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথার মর্মার্থ এখন কতটুকু গভীর দাগ কেটে যায় তা নিয়ে আমার সন্দেহ, এই প্রজন্মের কাছে তাই খায়রুল বাসার খান একটা বিশাল দৃষ্টান্ত! হ্যা, খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা, খাঁটি দেশপ্রেমিকরা এমনই পাগলা হয়! নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে যাদের বাঁধে না। যারা নিজের সবটা দেশের জন্য, এই মানুষের জন্য দিয়েও কিছু পাওয়ার আশা করে না, উলটো আরো কিভাবে দেশটাকে দেয়া যায় সেই ভাবনা ভাবতেই পাগল হয়ে যান তারা!

এই কাজটা যতদিন বাঁচবেন ততদিনই করে যেতে চান খায়রুল বাশার খান। তিনি পুরো দায়িত্বটা নিজেই দেখভাল করেন। কারো হাতে সরাসরি টাকা তুলে দেয়ার চেয়ে চিকিৎসার দায় দায়িত্বটুকু নিজেই নিয়ে নেন কাঁধে। নিজের কাজ নিয়ে তিনি বলেন, “টাকা দিলে হয়ত খরচ করে ফেলবে, কাপড় দিলে কিছুদিন পরে ছিঁড়ে যাবে। কিন্তু চোখ মানুষের অমূল্য সম্পদ। চোখের মাধ্যমে মানুষ এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে পায়। চোখে দেখতে না পেয়ে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কষ্টের। এই কারণেই অসহায় মানুষের চোখের ছানি দূর করার এই কাজটি করছি। যত দিন পারি করে যাব।”

খায়রুল বাসার খান এই কাজ যেন আরো অনেক যুগ ধরে করে যেতে পারেন, সেটাই চাই। এই মানুষটা দীর্ঘজীবী হোক, সবচেয়ে বড় কথা, এই সময়ে খায়রুল বাসার খানের মতো কিছু মানবিক মুক্তিযোদ্ধার জন্ম হোক, যারা মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের চেতনাটুকু বুকে লালন করে মানুষের তরে কাজ করবে, যে কাজের আলোয় আলোকিত হবে আমাদের বাংলাদেশ!

Comments

Tags

Related Articles