তেরো সংখ্যাটা নাকি অশুভ! কেভিন ও’ব্রায়েনকে জিজ্ঞেস করুন, তিনি হেসেই উড়িয়ে দেবেন কথাটা। ইনিংসের একশো তেরোতম ওভার, বল হাতে দিনের শুরুতে আগুন ঝরানো মোহাম্মদ আমির, দারুণ একটা মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে খানিকটা নার্ভাসনেস তো কাঁপিয়ে দেয়ার কথা ও’ব্রায়েনকে! প্রথম দুটো বলে কি খানিকটা নড়বড়ে মনে হলো ব্রায়ান ব্রাদার্সের ছোটজনকে? কে জানে! তৃতীয় বলটা ডিফেন্স করতে চেয়েছিলেন, ব্যাটের কানায় লেগে ফিল্ডারদের মাঝের ফাঁক দিয়ে পালিয়ে গেল সেটা। ওপাশ থেকে টাইরন কেইন ততক্ষণে ঝেড়ে দৌড় শুরু করে দিয়েছেন। দৌড়াচ্ছেন কেভিনও। এই দৌড় স্বপ্নপূরণের দৌড়, কিংবা বিশ্বজয়ের দৌড়ও বলতে পারেন এটাকে! তিন অঙ্কের ম্যাজিকাল ফিগারে তো ততক্ষণে পৌঁছে গেছেন কেভিন ও’ব্রায়েন!

চার্লস ব্যানাম্যান শুরুটা করেছিলেন, ১৮৭৬ সালে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। তারপর দেড়শো বছরে পেরিয়ে গেছে প্রায়। একাদশতম টেস্ট খেলুড়ে দল হিসেবে নাম লিখিয়েছে আয়ারল্যান্ড, নিজ দেশের প্রথম টেস্টেই সেঞ্চুরিয়ানের খাতায় নাম লিখিয়ে ফেললেন কেভিন ও’ব্রায়েন, এমন কীর্তি আছে আর মাত্র তিনজনের! একজন ডেভ হটন, জাতীয়তায় জিম্বাবুইয়ান। অন্যজন আমাদের অতি পরিচিত- আমিনুল ইসলাম বুলবুল। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট ২০০০ সালের নভেম্বরে ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে। প্রথম ইনিংসে ১৪৫ রান করেছিলেন আমিনুল, সেই সেঞ্চুরীতে ভর করে বাংলাদেশের স্কোর ছুঁয়েছিল চারশো। দেড়যুগ ধরে তিনজনের তালিকায় সর্বশেষ নামটা ছিল আমিনুলের, সেখানে এখন চতুর্থ হিসেবে কেভিনের নামটাও জ্বলজ্বল করবে ওদের সঙ্গে।

কেভিন ও ব্রায়েন, টেস্ট সেঞ্চুরী, আয়ারল্যান্ড, অভিষেক টেস্ট

ম্যালাহাইড ক্রিকেট গ্রাউন্ডে যেন আরও একবার ব্যাঙ্গালোর ফিরে এলো। সাত বছর আগের স্মৃতি ফিরিয়ে নিয়ে এলেন কেভিন ও ব্রায়েনই। ২০১১ বিশ্বকাপের সেই ম্যাচটা তো আইরিশ ক্রিকেটে রূপকথার একটা অধ্যায়ই হয়ে আছে এখনও। যে ইংল্যান্ডের ছায়ায় আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেট ঢাকা পড়ে ছিল বরাবরই, সেই দলটার দর্প চূর্ণ করে ভারতের মাটিতে ইংরেজদের গুঁড়িয়ে দিয়েছিল আয়ারল্যান্ড। তাও যেমন তেমন জয় তো ছিল না সেটা। রানের পাহাড় তাড়া করে অবিশ্বাস্য এক জয়ের নজির গড়েছিল আইরিশরা। ইংরেজ বোলারদের বেধড়ক পিটিয়ে পঞ্চাশ বলে সেঞ্চুরী ছুঁয়ে তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কেভিন ও’ব্রায়েনই। কেভিন অবশ্য ব্যাঙ্গালোরের সেই সেঞ্চুরীকেই এগিয়ে রাখছেন পরিস্থিতির বিবেচনায়, তবে টেস্ট সেঞ্চুরীটাকে মানছেন সবচেয়ে সম্মানের বলে।

আজ পঞ্চাশ বলে তিন অঙ্কে ছোঁয়ার মিশনে নামেননি কেভিন। যখন উইকেটে এসেছিলেন, তখন ইনিংস হারের শঙ্কায় কাঁপছে দল। প্রথম ইনিংসেও দলের সর্বোচ্চ স্কোরার ছিলেন, কিন্ত দল গুটিয়ে গিয়েছিল ১৩০ রানেই! মাথার ওপর রানের বোঝা, ইনিংস পরাজয় এড়াতেই তখনও ৯৪ রান দরকার, স্কোরকার্ডে চারটে উইকেট ততক্ষণে হাওয়া! কি করতে পারতেন কেভিন? ওয়ান ম্যান আর্মি হয়ে কতটুকু করা সম্ভব ছিল তার পক্ষে? জবাবটা জানা হয়ে গেছে এতক্ষণে সবার। দিনশেষে অপরাজিত থেকে যখন মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন, তখন দলের স্কোরবোর্ডে মোটামুটি স্বাস্থ্যবান একটা সংগ্রহ। প্রায় পুরো কৃতিত্বটাই কেভিনের। তিনি নিজেও আয়ারল্যান্ডের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান হবার গৌরবটা মনে চেপে রেখেই হোটেলে ফিরেছেন। রাতে ভালো ঘুম হয়েছিল তো কেভিন? নাকি খুশীর চোটে ঘুমই আসেনি?

কেভিন ও ব্রায়েন, টেস্ট সেঞ্চুরী, আয়ারল্যান্ড, অভিষেক টেস্ট

মাইক্রোফোনের সামনে অবশ্য নিজেকে বেঁধে রাখার চেষ্টাই করেছিলেন, তবুও মাঝেমধ্যে বুনো আবেগ লাগামছাড়া হয়ে যাচ্ছিল হুটহাট। দেশের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরীটাই তার, এই অনুভূতিটা আসলেই অন্যরকম। সেটাই জানিয়েছেন কেভিন, বলেছেন- “এটা অবশ্যই বিশেষ কিছু। দলের আর নিজের টেস্ট অভিষেক বলেই নয় শুধু, যে অবস্থায় আমরা ছিলাম, সেখানে থেকে সেঞ্চুরী পাওয়াটা আসলেই অসাধারণ। গত সাত বছরে এটা আমার প্রথম ইন্টারন্যাশনাল সেঞ্চুরি। এতটা দেরী হবে ভাবিনি অবশ্য, তবে দুর্দান্ত একটা উপলক্ষ্যের জন্যেই হয়তো বিলম্বটা হচ্ছিল। আমি সারাদিন ব্যাটিং করে যেতে চেয়েছি, সেটা পেরেছি বলেই বেশী ভালো লাগছে। সর্বোচ্চ স্তরের ক্রিকেটেও নিজেদের কণ্ডিশনে যে আমরা চ্যালেঞ্জ নিতে পারি, সেটা আমরা দেখিয়ে দিয়েছি।”

বিনা উইকেটে ৬৪ রান নিয়ে দিন শুরু করেছিল আয়ারল্যান্ড। মোহাম্মদ আমিরের ঝড়ে ত্রিশ রান যোগ করতেই চার উইকেট হাওয়া! পাকিস্তানের পেসারেরা তখন আগুন ঝরাচ্ছেন ডাবলিনের ম্যালাহাইড ক্রিকেট গ্রাউন্ডে। সেখান থেকেই বিরুদ্ধস্রোতে বৈঠা চালানো শুরু করেছিলেন কেভিন ও’ব্রায়েন। স্টার্লিং-উইলসনও ফিরে গেলেন দ্রুতই। তবে থম্পসন সঙ্গ দিলেন দারুণ, জুটি জমে উঠলো দুজনের।

কেভিন ও ব্রায়েন, টেস্ট সেঞ্চুরী, আয়ারল্যান্ড, অভিষেক টেস্ট

ছ’খানা উইকেট তখন হাওয়া, তবুও আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই দুজনের। তাড়াহুড়ো ছিল না একদম। টেস্ট আঙিনায় একদম আনকোরা হলেও, ব্যাটিং সেকথা বলেনি মোটেও। ধৈর্য্য ধরে টিকে ছিলেন। বাজে বলকে শায়েস্তা করতেও ভোলেননি এরমধ্যে। পুরো দিনে ৯৪ ওভার খেলা হয়েছে, রান উঠেছে ২৫৫। ২১৬ বলের মোকাবেলায় ১১৮ রান, বারোটা বাউন্ডারি- আদর্শ টেস্ট ইনিংসই বলা চলে কেভিনের ইনিংসটাকে।

কেভিন ও’ব্রায়েন কিংবদন্তী নন। রেকর্ডবুকটাও দারুণ সমৃদ্ধ নয়। দশটা টেস্ট খেলুড়ে দেশের বাইরে সহযোগী দলগুলোর সেরা খেলোয়াড়ের তালিকা করতে বসলেও তারচেয়ে ভালো খেলোয়াড় পাওয়া যাবে হয়তো। তবে আয়ারল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসে নিজের নামটা চিরস্থায়ীভাবে খোদাই করে নিলেন তিনি, গতকালের এই একটা ইনিংস দিয়েই। ধ্রুপদী ইনিংস অবশ্যই নয়, কিন্ত সব প্রথমই বিশেষ কিছু। কেভিনের সেঞ্চুরীটাও তাই আইরিশ ক্রিকেটের হল অব ফেমে স্পেশাল হয়েই টিকে থাকবে আজীবন।

কেভিন ও ব্রায়েন, টেস্ট সেঞ্চুরী, আয়ারল্যান্ড, অভিষেক টেস্ট

কেভিন গড়েছেন গৌরবের রেকর্ড। অন্যদিকে অ্যান্ডি বেলবার্নিও একটা রেকর্ডের জন্ম দিয়েছেন, যদিও সেটা তিনি ভুলেই যেতে চাইবেন হয়তো। অভিষেক টেস্টেই জোড়া শূন্যের এই রেকর্ড তো খুশী হবার মতো কিছু নয়। দুই ইনিংসেই মোহাম্মদ আব্বাসের শিকার হয়েছেন বেলবার্নি, দুবারই লেগ বিফোর! বেলবার্নিকে দিয়ে একটা চক্রপূরণও হয়ে গেল। এখনও পর্যন্ত টেস্ট খেলুড়ে এগারো দেশেরই কেউ না কেউ এই রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন। এরমধ্যে পাকিস্তানের সাঈদ আনোয়ার আর শ্রীলঙ্কার মারভান আতাপাত্তুর নাম দুটোই কৌতুহল জাগানিয়া। বাংলাদেশের হয়ে নিজের অভিষেক টেস্টের দুই ইনিংসেই ‘ডাক’ মেরেছেন আলমগীর কবির।

রেকর্ড তো হলো। ব্যাক্তিগত আত্মতৃপ্তিও আছে। দলীয় জয়টা এলেই এবার ষোলআনা আনন্দ উসুল হয়ে যায় আয়ারল্যান্ডের। বৃষ্টিতে ভেসে গেছে প্রথম দিনটা, কালই শেষ দিন এই টেস্টের। আইরিশদের লিড ১৩৯ রানের, হাতে এখনও তিনটে উইকেট আছে। দুশোর লিড দিয়ে আবার পাকিস্তানকে কাল দিনের মধ্যে অলআউট করা কি একদমই অসম্ভব? সম্ভাবনার বিচারে হয়তো পাত্তা পাবে না সেটা, তবে আয়ারল্যান্ড চাইলেই অনুপ্রেরণা নিতে পারে ২০০৭ বিশ্বকাপের ম্যাচটা থেকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্যাবাইনা পার্কে সেবার গ্রুপপর্বে তো পাকিস্তানকে ১৩২ রানেই গুটিয়ে দিয়েছিল আইরিশরা, জানান দিয়েছিল বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আগমনীধ্বনির! নিজেদের প্রথম টেস্টেও কি এমন কোন চমক অপেক্ষা করছে আইরিশদের তরফ থেকে?

Comments
Spread the love