ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

কেওক্রাডং- পাহাড়চূড়ার হাতছানি!

কয়েক বছর আগেও সাধারণ জ্ঞানের বইতে ‘বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ’ কোনটি- এই প্রশ্নের মুখস্ত জবাব একটাই ছিল- কেওক্রাডং। তবে এখন সবাই জানে, কেওক্রাডং নয়, দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের নাম তাজিংডং বা বিজয়। সে যাই হোক, তাতে কেওক্রাডংয়ের আবেদন কিন্ত কমেনি একটুও। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় দুর্গম এলাকা হলেও কেওক্রাডং এখন পর্যটকদের নাগালের একেবারে বাইরেও নয়। বান্দরবান জেলার রূমা উপজেলা হয়ে বগালেক পাড়ি দিয়ে যেতে হয় এই অপরূপ সৌন্দর্য্যমন্ডিত পর্বতচূড়ায়, যেখানে মেঘের দলের সঙ্গে মিতালী হয় সবুজে ঢাকা পাহাড়ের। হাতে সময় থাকলে আর দেরী কেন, বেরিয়ে পড়ুন কেওক্রাডংয়ের উদ্দেশ্যে!

যেভাবে যাবেন- ক্রেওক্রাডঙের অবস্থান বান্দরবানের রুমা উপজেলায়। আর তাই ঢাকা থেকে প্রথমে উঠতে হবে বান্দরবানের বাসে। সায়দাবাদ-কলাবাগান-ফকিরাপুল থেকে প্রতিদিন সরাসরি বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় বেশ কয়েকটি কোম্পানীর অনেকগুলো বাস। নন এসি ভাড়া পড়বে ৬২০ টাকা। সন্ধ্যায় বাসে উঠলে পরদিন ভোরে আপনি পৌঁছে যাবেন বান্দরবান শহরে। কেউ চাইলে ট্রেনে চট্টগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে আবার বাসে করেও বান্দরবান যেতে পারেন, এটা যার যার ইচ্ছে।

বান্দরবান থেকে আপনাকে যেতে হবে রুমা উপজেলায়। শহরের রুমা বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি বাসে উঠতে পারেন, কিন্ত লোকসংখ্যা বেশী হলে চান্দের গাড়ী বা জীপও ভাড়া করতে পারেন। বাস ভাড়া জনপ্রতি ১২০ টাকা করে। বারো-তেরোজন বসার মতো চান্দের গাড়ির ভাড়া পড়বে চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা। এটা কিন্ত শুধু যাওয়ার খরচ।

বগালেক, কেওক্রাডাং, বান্দরবান, ভ্রমণ, পাহাড়

রুমা পৌঁছে আপনাকে প্রথমে গাইড ভাড়া করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয়, আগে গিয়েছে এমন পরিচিত কারো থেকে গাইডের নাম্বার নিয়ে নিলে, এতে গাইড সম্পর্কে একটা পূর্বধারণা পাওয়া যায়। এছাড়া রুমা বাজারে গাইড সমিতি আছে, সেখানে গিয়েও গাইড ভাড়া করতে পারবেন। গাইডের ভাড়া দিনপ্রতি ছয়শো টাকা। এটা সমিতি কর্তৃক নির্ধারিত। মনে রাখবেন, গাইড ছাড়া কোনভাবেই আপনি বগালেক বা কেওক্রাডং এর দিকে পা বাড়াতে পারবেন না, সেনাবাহিনী আপনাকে সেই অনুমতি দেবে না।

এবার আর্মি ক্যাম্পে যান গাইডসহ, সবার নাম নিবন্ধন করে নিন। এটা বাধ্যতামূলক, নাম-ঠিকানা-ফোন নম্বর ইত্যাদি তথ্য দিতে হয় সেখানে। সঙ্গে আইডি কার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্র/স্টুডেন্ট/চাকুরীস্থলের পরিচয়পত্র) থাকতে হবে। রুমা-বগালেক-কেওক্রাডং যাবার পথে বেশ কয়েকবারই আর্মি ক্যাম্পে সাইন করতে হবে, বিরক্তি প্রকাশ করবেন না দয়া করে। আপনার নিরাপত্তার জন্যেই এই ব্যবস্থা। ফর্ম পূরণের জন্যে ১২৫ টাকা দিতে হয়। এটা জনপ্রতি নয়, একজন হলে যা, দশ-পনেরোজন হলেও তা’ই।

আরও পড়ুন- সড়কপথেই ঘুরে আসুন ভূটান থেকে!

এবার জীপ/চান্দের গাড়ি ভাড়া করে নিন রুমা বাজার থেকে। গাইডই আপনাকে সাহায্য করবে। শীতকালে বগালেক পর্যন্ত চান্দের গাড়ি যায়, ইচ্ছে করলে বগালেকের একটু আগে কমলাবাজারেও নেমে যেতে পারেন, পাহাড়ী রাস্তায় হাঁটার স্বাদ নেয়ার জন্যে। কমলাবাজার থেকে বগালেকের দূরত্ব সামান্যই, হেটে যেতে ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট লাগে। বগালেক পর্যন্ত চান্দের গাড়ির ভাড়া ২৭০০ টাকা, কমলাবাজার পর্যন্ত গেলে পড়বে ২৫০০ টাকা। রাতে বগালেকে বারবিকিউ করতে চাইলে রুমা বাজার থেকেই মুরগী নিয়ে যেতে হবে।

বগালেক একটা প্রাকৃতিক লেক, তিনপাশে পাহাড়ে ঘেরা এই জায়গাটায় জন্ম হয়েছে বিশাল এই লেকের। এখানে থাকার ব্যবস্থা আছে, বেশ কয়েকটা কটেজ স্থাপিত হয়েছে পর্যটকদের জন্যে, এরমধ্যে সিয়াম দিদির কটেজটা পর্যটকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। প্রতি রুমে সাত-আটজনের থাকার ব্যবস্থা, মহিলাদের জন্যেও আলাদা রুম আছে। প্রতিরাতের ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ টাকা। আর প্রতিবেলার খাবার ১২০ টাকা করে। তবে বগালেকে পানিতে নামার ব্যপারে সাবধান, বেশী সাহসিকতা দেখাতে যাবেন না যেন। পানিতে ডুবে বেশ কয়েকটা অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটার পরে সেনাবাহিনী বগালেকে সাঁতার কাঁটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। গোসলের জন্যে নির্ধারিত জায়গা আছে, সেখানে গোসল করতে পারবেন।

বগালেক, কেওক্রাডাং, বান্দরবান, ভ্রমণ, পাহাড়

বগালেকে একরাত কাটিয়ে পরদিন খুব সকালে যাত্রা করতে পারেন কেওক্রাডঙের দিকে। বগালেক থেকে কেওক্রাডং যেতে সময় লাগবে সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা। পুরোটাই পাহাড়ী রাস্তা, কষ্টসঙ্কুল, বন্ধুর, সেই সঙ্গে দারুণ উপভোগ্যও। ট্র্যাকিং করার অভ্যাস না থাকলে খানিকটা কষ্ট হতে পারে, কিন্ত বিরতি দিয়ে দিয়ে উঠলে খুব একটা গায়ে লাগবে না সেই কষ্ট, তাতে অবশ্য সময় একটু বেশী লাগতে পারে। কেওক্রাডাং যাবার পথে পড়বে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রামগুলোর একটি, দার্জিলিংপাড়া। এখানে বসে খানিকটা বিরতি দিয়ে পেঁপে-কলা বা অন্য ফল খেয়ে নিতে পারেন। দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসলে কেওক্রাডঙের আসল সৌন্দর্য্যটা আপনি উপভোগ করতেই পারবেন না, কাজেই এখানে একরাত থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তাতে শরীরের ওপর ধকলটাও কম পড়বে।

বগালেকের মতো কেওক্রাডঙেও কটেজে থাকার ব্যবস্থা আছে। প্রতিরাতের ভাড়া ২০০ টাকা জনপ্রতি, আর খাবার প্রতিবেলা ১৩০ টাকা করে।। তবে পানি খুব হিসাব করে খরচ করবেন এখানে। রাতে পর্বতচূড়ায় শুয়ে আদিগন্ত বিস্তৃত আকাশের তারা গুনে সময় কাটাতে পারেন, প্রকৃতি এখানে অন্য একটা রূপে ধরা দেবে আপনার চোখে, এই সৌন্দর্য্যের সন্ধান আপনি বাংলাদেশে আর কোথাও পাবেন না। খুব সকালে ঘুম ভাংলেই দেখবেন মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে আপনার পায়ের নীচে, ভূপৃষ্ট থেকে প্রায় ৩২০০ ফুট(প্রায় ১০০০ মিটার) ওপরে দাঁড়িয়ে আপনি স্বাগতম জানাবেন ভোরের সূর্যকে। পুরো আকাশটা যখন লাল হয়ে ওঠে, সেই মূহুর্তটা আপনার মনে ফ্রেমবন্দী হয়ে থাকবে সারা জীবনের জন্যে।

আরও পড়ুন- দার্জিলিং যখন হাতের নাগালে!

কেওক্রাডং থেকে বগালেকে ফেরার পথে চিংড়ি ঝর্ণা দেখে ফিরতে পারেন। গাইডকে বললেই নিয়ে যাবে। এছাড়াও চলতি পথে দেখা মিলবে সাঙ্গু নদী, ব্লু বার্ড ঝর্নার। বগালেক থেকে আবার রুমা বাজার, সেখান থেকে আবার বান্দরবান। এটাই ফেরার রাস্তা।

বগালেক, কেওক্রাডাং, বান্দরবান, ভ্রমণ, পাহাড়

কিছু জিনিস মনে রাখবেন, বগালেক-কেওক্রাডংয়ে একটা দলের যতোজন সেনাবাহিনীর কাছে নাম এন্ট্রি করে ঢুকেছেন, সবাইকেই একসঙ্গে ফিরতে হবে। একা বা দলছুট হয়ে ফেরা যাবে না। বর্ষাকালে অবশ্যই পাহাড়ে চড়ার উপযোগী জুতা সঙ্গে নিয়ে যাবেন, না নিয়ে থাকলে রুমা বাজার থেকে কিনে নেবেন। সেই সময় পাহাড়ি পথ ভীষণ পিচ্ছিল হয়ে থাকে, জোঁকের উপদ্রবও থাকে অনেক। আর কেওক্রাডং যাবার সময় একদম প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া কিছুই নেবেন না, কারণ পাহাড়ে চড়ার সময় দুই কেজির বোঝাকেও বিশ কেজি ওজনের মনে হয়। সাথে পানি/গ্লুকোজ রাখতে পারেন, কাজে আসবে। কেওক্রাডংয়ে মোবাইল/ক্যামেরা চার্জের ব্যবস্থা নেই, কাজেই ছবি তোলার কথা মাথায় রেখে পাওয়ারব্যাংক সঙ্গে নিলে ভালো। পাহাড়ি অধিবাসীদের সবাই একরকম নয়, কেউ বন্ধুবৎসল, আবার কেউবা অন্তর্মুখী; তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন, অনুমতি ছাড়া তাদের ছবি তুলবেন না।

সবচেয়ে বেশী যেটা দরকারী, সেটা হচ্ছে- দয়া করে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল, সিগারেটের খোসা/প্যাকেট বা এরকম কোন অপচনশীল দ্রব্য পাহাড়ে ফেলে আসবেন না। অযথা নিজের নাম পাথরে বা অন্য কোথাও লিখে আসার মধ্যে বাহাদুরি নেই কোন, নাম লিখে কেউ বিখ্যাত হয়েছে বলে জানা যায়নি আজ পর্যন্ত। পাহাড় আমাদের সম্পদ, প্রকৃতির অপূর্ব একটা নিদর্শন। সেটাকে নোংরা করবেন না। খাগড়াছড়ির সাজেককে তো ইতিমধ্যেই বস্তি বানিয়ে ফেলছে লোকে, দয়া করে কেওক্রাডং বা অন্য যেসব জায়গা এখনও মোটামুটি পরিস্কার আছে, সেগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সহায়তা করুন।

ছবি কৃতজ্ঞতা- ট্রাভেলার্স অফ বাংলাদেশ ফেসবুক গ্রুপ এবং আসিফ ইমতিয়াজ।

আরও পড়ুন-

 

Comments

Tags

Related Articles