অনেকে মনে করেছিল ২০১৭ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাবেন হারুকি মুরাকামি বা কেনীয় লেখক ন্‌গুগি ওয়া থিয়াং কিংবা চেক প্রজাতন্ত্রের লেখক মিলান কুন্ডেরা। কিন্তু প্রতিবারের মতো সবাইকে অবাক করে দিয়ে নোবেল কমিটি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দিয়েছে জাপানী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ছোটগল্পকার কাজুও ইশিগুরোকে সুইডিশ একাডেমি তাঁর প্রশংসায় বলেছে, ‘জোরালো আবেগীয় শক্তির’ প্রকাশ ঘটে তাঁর উপন্যাসে, যেখানে ‘দুনিয়ার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের অধরা অনুভূতির গভীরতা’ প্রকাশিত হয়

ইশিগুরো শুধু উপন্যাসই লেখেন না, চিত্রনাট্য এবং ছোটগল্পও লেখেন ম্যান বুকার পুরস্কার পেয়েছেন তাঁর চারটি উপন্যাসের জন্য দ্য টাইমস ম্যাগাজিন তাঁকে ১৯৪৫ সালের পরের শ্রেষ্ঠ ৫০ জন ব্রিটিশ লেখকদের তালিকায় ৩২তম বলে সম্মান জানিয়েছিল

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার কোনো একটি সাহিত্যকর্মের জন্য নয়, লেখকের সামগ্রিক সাহিত্যকীর্তির জন্য দেওয়া হয়ে থাকে তবে তার সাহিত্যের যে ধরন যার জন্য তিনি নোবেল পেলেন তা সবথেকে বেশি ফুটে ওঠে রিমেইনস অফ দ্যা ডে উপন্যাসে কিভাবে এই উপন্যাসটি তিনি মাত্র চার সপ্তাহে লিখে ফেললেন তা নিয়ে দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকায় তিনি একটা লেখা লিখেছিলেন। এগিয়ে চলোর পাঠকদের জন্য সেটি অনুবাদ করা হলো।

*

অনেক লোকজনকেই দীর্ঘক্ষন ধরে কাজ করতে হয়। আর কাজটা যদি হয় উপন্যাস লেখা, তাহলে মোটের উপর চার পাঁচ ঘন্টা একটানা লেখালেখি করার পরে লাভ আসা শুরু হয়। আমি সবসময় মোটামুটি এই ভিউ নিয়েই চলতাম। কিন্তু ১৯৮৭ সালের গ্রীষ্মের শুরুতে আমার মনে হচ্ছিল, একটা বড়সড় এপ্রোচ নেয়া দরকার। আমার স্ত্রী লর্না, সেও একমত। যেসময়ের কথা হচ্ছে, আমি তার পাঁচ বছর আগেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। ফলে খুব সুন্দরভাবে আমার কাজ ও প্রোডাক্টিভিটির তাল রাখতে পেরেছি। কিন্তু আমার প্রথম উপন্যাসের মতোই পরের উপন্যাসটাও হঠাৎ সফলতা নিয়ে এলো। নিয়ে এলো আরও বিভ্রান্তি ও বিহ্বলতা।

ক্যারিয়ারের উন্নতি হতে পারে এরকম সব প্রস্তাব আসতে থাকল। ডিনার ও পার্টির দাওয়াত, বিদেশ ভ্রমণের মুগ্ধকর সুযোগ আসতে থাকল। জমে গেল এক গাট্টি ইমেইল। কিন্তু এসবই আমার ‘ঠিকঠাকভাবে’ কাজ করার অভ্যাসে ইতি টানল। আমি গত গ্রীষ্মে একটা উপন্যাসের শুরুর অধ্যায়টা লিখে রেখেছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রায় এক বছর ধরে আর এক ফোঁটা লিখিনি। ফলে আমি আর লর্না একটা পরিকল্পনা করলাম। আমাকে আগামী চার সপ্তাহব্যাপী নির্মমভাবে আমার ডায়েরি স্বচ্ছ রাখতে হবে এবং এমন কিছুর মধ্যে দিয়ে যেতে হবে যাকে আমরা কিছুটা রহস্যময় নামে বলি ”ক্রাশ”।

‘ক্রাশ’ চলাকালীন সময়ে আমি লেখালেখি ছাড়া আর কিছুই করবো না। সোম থেকে শনি, প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত। মাঝখানে খালি দুপুরের খাবারের জন্য ১ ঘন্টা আর রাতের খাবারের জন্য ২ ঘন্টা সময় নেব। এই সময়ে কোন মেইল চেক করবো না এমনকি ফোনের কাছাকাছিও যাব না। বাসায় লোকজন আসাও বন্ধ। লর্নার নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও, এইসময়ে সে আমার ভাগের রান্না-বান্নার ও ঘরের কাজগুলি করে দেবে। এই পন্থায় আমি যে অনেক বেশি কাজ করতে পারব শুধু তাই না, আমি এমন একটা মানসিক অবস্থায় পৌছে যেতে পারব যেখানে আমার তৈরী করা কাল্পনিক জগত আমার সত্যিকার জগতের থেকেও বেশী সত্যি মনে হবে।

তখন আমার বয়স ৩২ বছর। মাত্রই আমরা সাউথ লন্ডনের সিডেনহামে বাসা নিয়েছি। এখানেই আমি জীবনে প্রথমবারের মতো খুবই গভীর পড়াশুনা করেছিলাম। আমার প্রথম উপন্যাস দু’টি এর ডাইনিং টেবিলেই বসে লেখা। টেবিলটা অনেকটা বড় কাপ-বোর্ডের মতো, এক পাশ দেয়ালের সাথে লাগোয়া চাতাল এবং দরজাবিহীন। কিন্তু এটা আমাকে শিহরিত করতো। কেননা এটাতে যথেষ্ট পরিমান জায়গা পাওয়া যেত, ইচ্ছেমত কাগজপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখতে পারতাম এবং দিনশেষে পরিস্কার করার বাধ্যতাও থাকত না। আমি ছোট ছোট নোট ও চার্ট দেয়ালে পিন দিয়ে লাগিয়ে রাখতাম এবং মন দিয়ে লিখতে থাকতাম।

মূলত এভাবেই ‘রিমেইনস অফ দ্যা ডে’ লেখা হচ্ছিল। পুরো ক্রাশ জুড়ে আমি ফ্রি-হ্যান্ড লিখেছি, কোন স্টাইলের কথা মাথায় রাখিনি। সকালে যেরকম গল্প ভেবে রেখেছি বিকেলে যদি তার সম্পূর্ণ উল্টো কিছু মাথায় এসেছে তাও লিখে ফেলেছি।  যে আইডিয়ারা মনের মধ্যে ভাসছিল এবং ধীরে ধীরে বাড়ছিল, তাদের ধরে রাখাকেই আমি অগ্রাধিকার দিয়েছি। একেকটা আতঙ্কজনক বাক্য, বীভৎস সব কথোপকথন, অর্থহীন সব দৃশ্যগুলোকে আমি থাকতে দিয়েছি এবং নিজের মতো চলতে দিয়েছি।

তিন দিনের মাথায়, সান্ধ্যবিরতি চলাকালীন সময়ে লর্না আমার আচরণে কিছু অসংগতি খেয়াল করল। 

প্রথম রবিবারের ব্রেকে আমি অনেকটা সাহস করেই বাইরে বের হয়েছিলাম। লর্নার থেকে পরে শুনেছি, সেদিন সিডেনহিয়ামের বড় রাস্তায় হাটতে হাটতে একটানা খিল খিল করে হাসছিলাম একটা ঘটনা দেখে । ওই রাস্তাটা একটা ঢালের উপর বানানো; তাই যারা নিচের দিকে নামতে থাকে তারা একজন আরেকজনের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা হয়। আর অন্যদিকে উপরে উঠার সময় একেকজন টলতে থাকে। সহজেই হাপ ধরে যায়। এভাবেই আমাকে আরও তিন সপ্তাহ কাটাতে হবে তা নিয়ে লর্না বেশ উদ্বিগ্ন ছিল। আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম- আমি বেশ ঠিক আছি এবং প্রথম সপ্তাহটা তো যথেষ্ট সফল হয়েছে।

আমি চার সপ্তাহ এভাবেই চালিয়ে গেলাম। এই ক্রাশ চলাকালীন সময়ে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কল্পনাপ্রসূত বিষয়গুলো মাথায় এসেছিল। শেষেরদিকে মোটামুটি পুরো উপন্যাসটাই লেখা হয়ে গেল। যদিও এটা সম্পূর্ণ করতে আরও পরিচর্যার দরকার।

এখানে বলে রাখা দরকার যে, ‘ক্রাশ’ শুরু করার আগেই আমি বেশ ভালোরকম একটা রিসার্চ করে নিয়েছিলাম। ব্রিটিশ দাসদের নিজেদের লেখা জীবনীর পাশাপাশি তাদেরকে নিয়ে লেখা এবং যুদ্ধের রাজনীতি ও কূটনীতি বিষয়ে অনেক রচনা ও পুস্তক পড়েছি। তার মধ্যে হ্যারল্ড লাস্কির “দ্যা ডেঞ্জারস অফ বিয়িং অ্যা জেন্টেলম্যান” অন্যতম। উনিশশো ত্রিশ ও পঞ্চাশের দশকের ইংলিশ পল্লী-অঞ্চল (কান্ট্রি-সাইড) বোঝার জন্য আমি স্থানীয় সেকেন্ড-হ্যান্ড বইয়ের দোকানে হানা দিয়েছি। ঠিক কখন একটা উপন্যাস সত্যি সত্যি লেখা শুরু করতে হয়– কখন এসে গল্পটা সাজানো শুরু করা লাগে— এ সিদ্ধান্তটা আমার কাছে সবসময়ই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। এক ছত্র লেখার আগে লেখকের ঠিক কতটুকু জানা থাকা দরকার?

আগেভাগে লেখা শুরু করে দেয়াটা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি দেরিতে শুরু করাটাও সমান ক্ষতি করে। আমি মনে করি, রিমেইন্স লেখার সময়ে ভাগ্য আমার সহায় ছিল। গল্পটা বলার জন্য যতটুকু জানা দরকার, ঠিক ততটুকু জানার পরই আমি ক্রাশের কাজে হাত দেই। এখন যখন ফিরে তাকাই, অনেক অনুপ্রেরণা ও প্রভাবের সুত্র খুজে পাই। অল্প প্রভাব আছে এরকম দুটো উদাহরন দেই।

১) সত্তর দশকের মাঝামাঝি, একজন টিন-এজার হিসেবে, ফ্রান্সিস ফোর্ড কোপালা পরিচালিত থ্রিলার মুভি দ্যা কনভারসেশান দেখেছিলাম। এখানে জিন হ্যাকম্যান একজন ফ্রিল্যান্সার সারভেইল্যান্স বিশেষজ্ঞের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। যারা গোপনভাবে অন্যের আলাপ রেকর্ড করতে চায়, তারা তার কাছে এসে ভিড় করে।

হ্যাকম্যান তার ফিল্ডে সেরা হবার জন্য বদ্ধপরিকর। যেসব টেপগুলো তিনি তার ক্লায়েন্টের দেন, সেগুলো যেকোন মুহুর্তে ঘোর পরিনাম ডেকে আনতে পারে, এমনকি তা খুনের কারনও হতে পারে। এই চিন্তা তাকে আতংকগ্রস্থ করে ফেলে। আমার ধারনা, হ্যাকম্যান চরিত্রটি আমার উপন্যাসের স্টিভেন চরিত্রটির প্রাথমিক মডেল।

২) আমি ভেবেছিলাম আমার উপন্যাস লেখা শেষ। কিন্তু তারপর এক বিকেলে আমি টম ওয়েটসকে ” রুবি’স আর্ম” গানটি গাইতে শুনলাম। ঘুমন্ত প্রেমিকাকে ছেড়ে ট্রেনে উঠে যাবার আগে আগে এক সৈনিকের শোকগাথা নিয়ে এই গান। এখানে অস্বাভাবিক কিছু নেই। অথচ গানটি গাওয়া হয়েছে এমন একটা রাফ আমেরিকান হোবো টাইপ লোকের কন্ঠে যে তার নিজস্ব আবেগ প্রকাশে একদমই আনাড়ি। তারপর একটা মুহুর্ত আসল যখন গায়ক তার হৃদয় ভাঙ্গার কথা ঘোষনা দিলেন ।

বিশাল এক বাঁধা পার করে তাকে এই আবেগ মুক্ত করতে হয়েছিল। এ বাধা আর তার অনুভূতিগুলোর মধ্যে চাপা উত্তেজনার কারনে তা ছিল প্রায় অসহনীয়রুপে মর্মস্পর্শী।  

আবেগ মুক্তিকর এক ঔদার্য নিয়ে ওয়েটস লাইনগুলো গায়। একজন আজীবন শক্ত থাকা লোকের স্টোয়িক্সিজম অপরিরোধ্য দুক্ষের কাছে যেভাবে টুকরো টুকরো হয়ে যায় আপনারা তা অনুভব করতে পারবেন। 

আমি এটা শুনলাম এবং বিপরীত একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার চরিত্র স্টিভেন, একদম শেষ পর্যন্ত ইমোশনালি চাপা স্বভাবের হবে। তবে খুবই সতর্কভাবে গল্পের একটা মুহূর্ত বেছে নিলাম আমি– যে মুহূর্তে স্টিভেনসের অদম্য ডিফেন্স ভেঙ্গে যাবে, আর এ যাবত পর্যন্ত তার লুকিয়ে রাখা এক ট্রাজিক রোমান্টিকতা জ্বলে উঠবে ঝিলমিল করে।

Comments
Spread the love