মধ্য এশিয়ার দেশ কাজাখাস্তান। ২০১৩ সালের বসন্তে এ দেশের ছোট্ট গ্রাম কালাচির কিছু বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিল এক রহস্যজনক রোগের প্রকোপ। যদিও বলছি রোগ, তবু কোন শারীরিক সমস্যার লক্ষণ ছিল না রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের। শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ এ মানুষদের, সমস্যা কেবল এতটুকুই যে তারা কিছুতেই জেগে থাকতে পারছিল না। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল তারা। ঘুমের প্রচন্ডতা এত বেশি যে, কোনরকমে খাওয়া আর টয়লেটে যাবার সময়টুকু তারা জেগে থাকতে পারত। দিনের বাকি সময় তাদের কাটাতে হত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। ঘুমের কারণে তারা কোনকিছু মনে রাখতেও পারছিল না। যখন ঘুম থেকে জেগে উঠত তখন আগের কথা কিছুই মনে রাখতে পারত না। সেসময় দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় কাজাখাস্তানে আবির্ভূত হওয়া এ রোগকে, স্লিপিং সিকনেস বা ঘুম ব্যাধি নামে আখ্যায়িত করা হয়।

প্রথমবার, এ রোগের দেখা মেলে ২০১০ সালে কালাচির নিকটবর্তী এক গ্রামে। ২০১৩ সালে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এ ঘুম ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় কালাচির আঠার জন মানুষ। কালাচি নামের ছোট্ট গ্রামটির মোট জনসংখ্যা ই মাত্র ৬৪০ জন। এর মধ্যে ১৮ জনই যদি একই সময়ে, একই সমস্যায় পরে, তবে সে সমস্যাকে আর ছোট বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আঠার জন মানুষের প্রত্যেকের চোখেই রাজ্যের ঘুম। ঘুমের প্রকোপে তারা তো কোন কাজ করতেই পারে না, খাওয়া-দাওয়াও ঠিকমত করতে পারে না। একবার ঘুমোলে ঘন্টার পর ঘন্টা, এমনকি, দু-চারদিনও কেটে যায়।

কাজাখাস্তান, ঘুম, মহামারী, স্লিপিং ডিজঅর্ডার

সুস্থ-সবল কিছু মানুষ, যাদের আপাতদৃষ্টিতে কোন সমস্যাই চোখে পড়ে না, তারা কেন এমন বেঘোরে ঘুমোবে! ঘুম তো ঘুম, ঘুমের মাঝে যে স্বল্প সময়ের জন্য তারা সজাগ হয়, খাওয়া-দাওয়া করে, কারো সাথে কথা বলে- এসবের কিছুই পরে মনে রাখতে পারে না তারা। সপ্তাহব্যাপী তাদের পর্যবেক্ষণ করে পত্রপত্রিকায় তাদের খবর ছাপা হতে থাকে। ঘুম ব্যাধিতে আক্রান্ত এক লোক তো, ঘুমের মাঝেই কখন সজাগ হয়ে প্লেনে চড়ে গ্রাম থেকে কাজাখাস্তানের রাজধানী আস্তানায় চলে যায়। অথচ ঘুম ভাঙলে সে মনে করতে পারে না কিভাবে আস্তানায় গেল।

ঘুম ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষদের, সারাক্ষণ অস্বাভাবিক ঘুম আর ঝিমানির কারণে হেলুসিনেশন হতে শুরু করে। তারা ভুল বকতে শুরু করে এবং বদমেজাজী হয়ে ওঠে। এবং সময়ের সাথে কালাচি গ্রাম ও এর আশেপাশের এলাকায় ঘুম ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একশ’জনেরও বেশি মানুষ একসময় ঘুম ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। মানুষ তো মানুষ, একটি বিড়ালের মধ্যেও এ সমস্যা দেখা দেয়।

কাজাখাস্তান, ঘুম, মহামারী, স্লিপিং ডিজঅর্ডার

২০১৩ সালের শেষের দিক থেকে শুরু হয়ে ২০১৪ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত কয়েকমাস ব্যাপী এ রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকে। অথচ কেন এই অদ্ভূত ঘুম ব্যাধি, তার কারণ খুঁজে বের করতে পারে না কেউই। এ রোগের কারণ খুঁজে বের করার জন্য অনেকগুলো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের বয়স, জীবনধারা, কালাচি গ্রামের বাতাস, খাদ্য, পানি প্রভৃতি নিয়ে বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। কিন্তু ঘুম রোগের কোন কারণই খুঁজে বের করা যায়নি প্রথমদিকে।

বিজ্ঞানীরা ধারণা করে, কাজাকিস্তানের কালাচি গ্রামের নিকটবর্তী অঞ্চলের ইউরেনিয়ামের খনিই দায়ী এ ঘুমের মহামারীর পেছনে। একারণে তারা সেখানকার মাটি, পানি, এবং খাবারে রেডন নামক একপ্রকার ক্ষতিকর দাহ্য পদার্থের অস্তিত্ব আছে নাকি তা পরীক্ষা করে। বাতাসে কার্বন মনোক্সইডের অস্তিত্ব আছে কিনা তা পরীক্ষা করে। এবং মানুষের চুল আর নখে রেডিয়েশনের চিহ্ন পাওয়া যায় কিনা তাও পরীক্ষা করে দেখে। কিন্তু এমন কিছুরই অস্থিত্ব তারা পায় না, যা দিয়ে তারা তাদের মতামতকে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

কাজাখাস্তান, ঘুম, মহামারী, স্লিপিং ডিজঅর্ডার

তাহলে কি ঘুম ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষগুলো কোন প্রকার বিষাক্ততায় আক্রান্ত! নাকি “ড্যান্সিং প্লেগ” এর মত এটাও এক ধরণের মন্স্তাত্ত্বিক মহামারী, যার কারণ কখনোই জানা যাবে না! এমন বিভিন্ন আশঙ্কা ও জল্পনা-কল্পনা দানা বাধতে থাকে মানুষের মধ্যে।

কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত সাঙ্ঘাতিক খারাপ কিছু ঘটেনি কাজাখাস্তানে। বছরখানিকের নিরলস প্রচেষ্টায় ২০১৫ সালের গ্রীষ্মে ঘুমের এ মহামারীর কারণ বের করা সম্ভব হয় বিজ্ঞানীদের পক্ষে। বাতাসে কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এবং খনি থেকে আসা হাইড্রোকার্বনের কারণে কালাচি ও ইউরেনিয়াম খনির নিকটবর্তী অন্যান্য এলাকার বাতাসে অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দেয়। আর এ কারণেই দেখা দেয় ঘুমের এ মহামারী।

কারণ জানা গেলে, প্রতিকারও একসময় বের করে ফেলে কাজাখাস্তান সরকার। এভাবেই ঘুমের মহামারী থেকে মুক্তি ঘটে সেখানকার মানুষদের। তবে, যতদিনে রোগের কারণ নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল, ততদিনে কালাচি ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার ১৫০ জনেরও বেশি মানুষ ঘুমের যন্ত্রণায় দেশের অ্ন্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়েছিল বলে জানা যায়।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-