খেলা ও ধুলা

এমন মধুর সমস্যায় আগে পড়েনি বাংলাদেশ!

মাসখানেক আগেও বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম ছিল ওপেনিং পার্টনারশীপ। ওয়ানডেতে তামিমের যোগ্য সঙ্গী খুঁজে পাওয়াই যাচ্ছিল না। ইমরুল অফফর্মে, লিটনের ব্যাটে ছিল না রান। আর সৌম্য তো কবে থেকেই হারিয়ে খুঁজছেন নিজেকে! এর মাঝে আমিরাতে এশিয়া কাপে তামিম চোট পেলেন, উদ্বোধনী জুটির দৈন্যতা যেন আরও নগ্নভাবে সামনে এসেছিল তখন! দশ-পনেরো রানের বেশি কোনভাবেই এগোতে পারছিল না প্রথম উইকেটের স্থায়িত্ব। এমনটা চলতে থাকলে বিশ্বকাপে কি হবে, সেই দুশ্চিন্তা তখন পেয়ে বসেছিল টিম ম্যানেজমেন্টকে। অথচ মাসখানেক পরে এসে উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানেরাই যেন টেনে নিচ্ছেন দলকে!

ইমরুল কায়েস তো পুরো সিরিজেই দুর্দান্ত, দারুণ সঙ্গ দিয়েছেন লিটন দাসও। শেষ ম্যাচে সুযোগ পেয়ে সেটা কি দারুণভাবেই না কাজে লাগালেন সৌম্য, হাঁকালেন দৃষ্টিনন্দন একটা সেঞ্চুরি! সময় তো এখন ওপেনারদের! এখন তামিমের সঙ্গে ইনিংস উদ্বোধন করতে কাকে বাদ দিয়ে কাকে পাঠানো হবে, এটা নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটাতে হবে কোচ আর অধিনায়ককে। এই মধুর সমস্যায় কি বাংলাদেশ দল আগে পড়েছে? নিকট অতীতে যে পড়েনি কখনও, এটা তো নিশ্চিত! 

সিরিজের তিন ম্যাচেই ইনিংস উদ্বোধন করতে নেমেছেন ইমরুল, রান করেছেন ৩৪৯! তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড এটা, এর আগে ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে তামিম করেছিলেন ৩১২ রান। সেই রেকর্ড আড়াই বছর পরে এসে ভাংলেন তারই সতীর্থ ইমরুল। দুই সেঞ্চুরী আর এক হাফসেঞ্চুরীতে এসেছে এই রান, দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যক্তিগত নব্বই রানের মাথায় উইকেট বিলিয়ে দিয়ে না এলে টানা তিন ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি হাঁকানো ব্যাটসম্যানদের ছোট্ট তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলতেন ইমরুল কায়েস। সেই কীর্তি গড়া হয়নি, কিন্ত যা হয়েছে সেটুকুই বা কম কি! একটা দ্বিপাক্ষিক সিরিজে বাংলাদেশী এক ব্যাটসম্যানের মোট রান সাড়ে তিনশো, গড় ১১৬ রানের বেশি, ভাবতেও তো অবাক লাগে!

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই সিরিজটায় ইমরুল কায়েস নিজেকে চিনিয়েছেন নতুন করে। আগে ইমরুল মানেই ছিল নড়বড়ে ব্যাটিং, যে কোন মূহুর্তে আউট হয়ে যাবার শঙ্কা, ফিফটিকে সেঞ্চুরীতে পরিণত করতে না পারার হতাশা; আর ষাট-সত্তর রান করলে পায়ে ক্র‍্যাম্প তো ছিল নিত্যনৈমিত্যিক ঘটনা। এই সিরিজে ইমরুলের ব্যাটিঙের সাথে আগের ইমরুলের কোন মিলই খুঁজে পাবেন না। এখন তিনি আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটছেন, সেই আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে যাচ্ছে তার ব্যাটের আনাচে কানাচে, তার শটে। আউট হবার আগে পর্যন্ত একবারও মনে হচ্ছে না যে তিনি আউট হতে পারেন! 

ইমরুলের আত্মবিশ্বাসের ঢেউ লেগেছে দলের ভেতরেও। লিটন তো এশিয়া কাপের ফাইনালে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংসটা খেলেই এসেছিলেন। প্রথম ম্যাচে রান পাননি, পাননি শেষ ম্যাচেও। কিন্ত সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে খেলেছেন ৮৩ রানের দৃষ্টিনন্দন এক ইনিংস। সেই ইনিংস মনকে শান্তি দেয়, লিটনের সেই ব্যাটিং দেখে চোখের আরাম হয়। দ্বিতীয় ম্যাচে লিটন-ইমরুলের উদ্বোধনী জুটিতে রান এসেছে ১৪৮, বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের পঞ্চম সর্বোচ্চ উদ্বোধনী জুটি ছিল সেটা! 

এমনিতে লিটন দাসের ব্যাটিং দেখাটাই একটা চিত্তাকর্ষক ব্যাপার। যেদিন তার হাত থেকে একটার পর একটা শট বেরুতে থাকে, সেদিন তো তাকে মনে হয় ক্রিকেট মাঠের পিকাসো। মার্ক ওয়াহকে নিয়ে শেন ওয়ার্ন বলেছিলেন, ওয়াহ’র ব্যাটিং দেখতে মাইলের পর মাইল কষ্ট করে হেঁটে আসা যায়, অতৃপ্তি থাকে না তবুও। লিটনও অনেকটাই মার্ক ওয়াহ’র গোত্রেই পড়েন। নিজের দিনে তিনি ভুলে যান প্রতিপক্ষ কে, বোলারের নাম কি। লিটনের দিন মানেই তাই বাংলাদেশের দিন। এশিয়া কাপের ফাইনালে তো প্রায় একাই লড়েছিলেন তিনি। তামিমের সঙ্গে উদ্বোধনী জুটিতে তার ডানহাতি-বাঁহাতি কম্বিনেশনটাও জমবে দারুণ। 

শেষ ম্যাচে ফজলে রাব্বীর বদলে সুযোগ পেলেন সৌম্য সরকার। যে সৌম্য ব্যাটিংটাই প্রায় ভুলে গিয়েছিলেন, দর্শকেরা ভুলে গিয়েছিলে সৌম্য’র ব্যাটের ভয়ঙ্কর চেহারা, সেই সৌম্য ফিরলেন চেনা রূপে, একটা সুযোগ পেয়েই। ফুটওয়ার্কে সমস্যা আছে, শট সিলেকশনও শতভাগ অ্যাকুরেট নয়, তবুও সৌম্যের ব্যাটটা যেদিন চওড়া হবে, সেদিন বাংলাদেশ হাসবেই, প্রতিপক্ষ পুড়বেই- এটাই নিয়ম। সৌম্যের রূদ্রমূর্তি আগে দেখেছিল পাকিস্তান, দেখেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এবার জিম্বাবুয়েও দেখে নিলো।

এভাবেই কুড়িয়ে পাওয়া সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হয়, এভাবেই জানান দিতে হয় নিজের সামর্থ্যের। সৌম্য নিজের কাজটা ঠিকঠাক করে রাখলেন। নিয়মিত এটা করে যেতে পারলেই হবে। আজ প্রথম বলেই লিটনের বিদায়ের পরে বিপদ যখন চোখ রাঙাচ্ছিল, ২৮৭ রানের টার্গেটটা যখন ৩২০/৩৩০ রানের মতো মিনে হচ্ছিল, তখন ব্যাটের শাসনে ভয় দূর করেছেন সৌম্য আর ইমরুল। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে এসেছে ২২০ রান, ওভারপ্রতি সাড়ে ছয়ের বেশি গড়ে রান তুলেছেন দুজনে! 

ওপেনিং-এ তামিম অটো চয়েজ। তার সঙ্গী হবার দৌড়ে পরিসংখ্যানেএ হিসেবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে এগিয়ে আছেন ইমরুল কায়েস। লিটন বা সৌম্যরাও খুব একটা পিছিয়ে নেই, অন্তত রেসে যে তারা আছেন, সেটার জানান তো দিয়েছেন দুজনেই। জিম্বাবুয়ে সিরিজটাই সবকিছু নয়। বিশ্বকাপের কথা যদি ধরি, বাংলাদেশের কণ্ডিশন আর ইংল্যান্ডের কণ্ডিশনে প্রায় আকাশ পাতাল তফাত। এর মাঝে নিউজিল্যান্ড সিরিজ আছে, আছে বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে আরেকটা সিরিজ বা টুর্নামেন্টও। সেই ম্যাচগুলোই মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে বিশ্বকাপের দলে জায়গা পাবার জন্যে। কিন্ত অগ্নিপরীক্ষায় নামার আগে জিম্বাবুয়ে সিরিজটা অন্তত তিন ওপেনারকেই আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে দারুণভাবে, আর এই তিনজনের সুস্থ প্রতিযোগীতাটাও দলের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে অনেকটাই।

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles