ছোটবেলার রোজার মাসের কথা। তখন টেলিভিশন ছিলো না আমাদের। রাতে তাই এমনিতেই তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুমাবার আগে আম্মাকে বার বার বলতাম, আম্মা ভোর রাত্রে কিন্তু ঘুম থেকে জাগিয়ে দিবেন, রোজা রাখবো। আম্মা একটু ইতস্তত করতেন। আমি একটু জেদিই ছিলাম। বলতাম, অবশ্যই ডাক দিবেন।

আম্মাকে ডাক দিতে হলো না। তার আগেই কিসের শোরগোলে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বাইরে থেকে আওয়াজটা আসছে। অনেকগুলো মানুষ সুর করে কি যেনো বলছে। ব্যাপারটা কি! এই মধ্যরাতে তাদের আবার কি হলো?

ঘুমের ঘোর একটু কেটে যেতেই তাদের সুর শ্লোগান বুঝতে পারলাম। তারা বলছে,

“এলো রে দেখ ঐ মাহে রমজান, জাগোরে মুসলমান…”

আবার বলছে…

“আমরা কাসিদাওয়ালা যাই ডেকে যাই…ওঠো ওঠো মমিন সেহরির সময় নাই।”

মধ্যরাতে আলস্যমাখা ভঙ্গিতে শুয়ে তাদের এই গান কিংবা গজলের গমগম আওয়াজ শুনতে খুব সুন্দর লাগছিলো। একজন প্রথমে কয়েকটি বাক্য বলেন, তারপর সবাই সম্মিলিত ভাবে সুর তোলেন। সুরের সাথে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে থালা, লাঠির ব্যবহারও থাকতো। ব্যাপারটার মধ্যে নিশ্চিতভাবেই অভিনবত্ব খুঁজে পেয়েছিলাম। ছোটবেলায় রমজান মাসের প্রতিটি মধ্যরাতে এই গজল শুনে ঘুম ভাঙ্গাটা যেনো রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিলো।

এখন বালিশের পাশে দুইটা ফোন থাকে। শুয়ে শুয়ে ফোন নিয়ে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ইন্টারনেটে সময় কাটাতে কাটাতেই ভোর হয়ে যায়, সেহরির সময় হয়ে যায়। কোনো রাতে ঘুমিয়ে গেলেও সমস্যা নেই, এলার্ম দেয়া থাকে। এলার্মের কর্কশ শব্দে ঘুম পালিয়ে যায়। তাছাড়া টেলিভিশন তো আছেই, চব্বিশ ঘন্টা নিজে সজাগ থাকে, মানুষকেও জাগিয়ে রাখে। এখন আর মধ্যরাতে কেউ আসে না, গজলে গজলে বলে না, সেহরির সময় হয়েছে, জাগো সকলে। শৈশবের মতো একটা ঐতিহ্যও কোথায় যেনো হারিয়ে যেতে বসলো! গজল গেয়ে গেয়ে মানুষকে সেহরির আগে ডেকে তুলার সেই ঐতিহ্যের নাম “কাসিদা”।

কাসিদার ইতিহাস:

ঢাকার পথে পথে কাসিদার সুরে ঘুম ভাঙ্গানোর রেওয়াজ কয়েকশত বছরের পুরানো। ফারসি শব্দ কাসিদার অর্থ- প্রিয়জনের প্রশস্তিমূলক কবিতা।

আরবি সাহিত্যে কাসিদার যে প্রসার তা এক সময় বিস্তৃত হয়ে ছড়ায় ফারসি, তুর্কি, উর্দু সহ অন্যান্য ভাষায়।

ঢাকা শহরে কাসিদার আগমন হয়েছিলো মোঘলদের হাত ধরে। মোঘলদের দরবারি ও প্রশাসনিক ভাষা ফারসি হওয়ায় সেই সময়ের কাসিদাও রচিত হয়েছিলো ফারসি ভাষাতেই। ইসলাম খাঁ চিশতির মোঘল সেনাপতি মির্জা নাথানের ‘বাহারিসত্মান-ই-গায়বি’তে এ অঞ্চলের কাসিদার ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়।

কাসিদায় প্রিয়জনের প্রশংসা করে ছোট ছোট বাক্য রচিত হয়। ছড়ার মতো ছোট ছোট বাক্যগুলো পড়ার সময় ছড়ার মতো পড়া হয় না, বরং দলীয় সুরে সবাই মিলে পড়ে।

পুরান ঢাকার ক্বাসিদা উর্দু, ফার্সি, বাংলা, হিন্দি, আরবি এবং মিশ্র ভাষায় রচিত। রোজার ফযিলত, আল্লাহ্, রসূলের প্রশংসা, কেয়ামতের বর্ণনা এসব ক্বাসীদার মূল বিষয়বস্তু। সাধারণত সর্দার বা মহল্লার পঞ্চায়েতরাই এর রচিয়তা। যারা ক্বাসিদা রচনা করেন তাদের বলা হয় ক্বাসেদ। যারা ক্বাসিদার ‘কাফেলা’ বা দল পরিচালনা করেন তাদেরকে বলা হয় ‘সালারে কাফেলা’। ক্বাসিদা গাওয়ার জন্য ‘কাফেলা’ এবং ‘সালারে কাফেলা’ সারা রাতই জাগ্রত থাকেন। সেহরির সময় হওয়া মাত্রই তারা দলে দলে বেরিয়ে পড়েন অলি-গলিতে। ক্বাসিদার সুর শুনে ঘুম ভাঙে ঢাকাবাসীর। শুরু হয় আগামী দিনের রোজার প্রস্তুতি।

কাসিদার একদম প্রাচীন যে রূপটি, যেটাকে বলা যায় কাসিদার ধ্রুপদী রূপ। সেটি মূলত এ রকম- যে কোনো একটি বিষয়কে কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। কবিতার প্রতিটা লাইনে ছন্দ- অন্ত্যমিল থাকবে। আকারে পঞ্চাশ লাইনেরও বেশি হবে। কখনও কখনও ছাড়িয়ে যাবে একশ’ লাইনও। কাসিদার বিস্তার একশ’ লাইনেরও বেশি ছাড়িয়ে যাওয়ার এ রীতিটি মূলত পারস্যের কবিদের। আর যাই হোক, কাসিদার মূল উৎস তো পারস্য থেকেই। আরবের লেখক ইবনে কুতাইবাহ আরবি কাসিদাকে তিনটি অংশে বিভক্ত করেছেন। কাসিদা নিয়ে তিনি একটি বই লেখেন নবম শতকে। “বুক অব পোয়েট্রি অ্যান্ড পোয়েটস” নামের এই বইতেই রয়েছে তাঁর নিজস্ব কাসিদার গঠনতত্ত্ব।

কাসিদার প্রথম অংশ হচ্ছে “নসিব”। শুরুটা হতো নস্টালজিক। পরের অংশ “তাখাল্লাস”। এখানেও নস্টালজিক বর্ণনা থাকত। আর এই নস্টালজিয়ায় আচ্ছন্ন থেকেই বর্ণনা থাকত অভিযাত্রার। অভিযাত্রার এ অংশের নাম “রাহিল”। একই সঙ্গে গোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, প্রকৃতির বর্ণনাও থাকত। আর কাসিদার শেষ অংশে থাকত উপদেশ বা বাণী।

এই শেষ অংশেরও তিনটা ভাগ। প্রথমটুকু হচ্ছে গোষ্ঠীর গুণকীর্তন। এর নাম “ফাখর”। পরের অংশ হচ্ছে গোষ্ঠীর স্যাটায়ার। এর নাম “হিজা”। আর শেষটুকুতেও থাকে কিছু নৈতিক বাণী। এর নাম “হিকাম”।

কাসিদার কবিরা:

কাসিদার প্রথম দিকের কবিরা ছিলেন ফেরদৌসি’র সমসাময়িক। পারস্যে মহাকাব্য প্রচুর লেখা হলেও কাসিদা মহাকাব্যের চেয়ে কিছুটা যে ভিন্নতর সেটা প্রথম দেখা যায় কবি রুদাকির রচনায়। তিনি জন্মেছিলেন, ৮৫৮ সালে। এছাড়া আসজাদি, ফাররুখি, উনসুরিদের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে বিশেষভাবে।

গজনীর সুলতান মাহমুদের দরবারে ছিলেন ৪০০ কবি। বলা হয়ে থাকে তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন কবি ফাররুখি। এরা ফারসি ভাষায় রচনা করে গিয়েছেন অসাধারণ সব কাসিদা। বিভিন্ন ঘরানার কাসিদায় বিভিন্ন কবি খ্যাতি কুড়িয়েছেন। প্রশস্তি গাথা মূলক কাসিদা লিখে সবচেয়ে বেশি প্রশস্তি পান কবি আনভারি। আবার দার্শনিক কাসিদার লেখক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন নাসির খসরু। কবি নাসির খসরু ছিলেন আবার চতুষ্পদী কবিতার শ্রেষ্ঠ কবি ওমর খৈয়ামের সমসাময়িক।

কাসিদা বনাম গজল:

অনেকেই ধারণা করে কাসিদা এবং গজল সম্ভবত এক জিনিসই। ব্যাপারটি ঠিক তা নয়, কাসিদাকে যদি বলা যায় একটা পূর্ণাংগ ছবি, গজলকে বলা যেতে পারে একটা দৃশ্যকল্প। অন্তত, গজল যখন রচনা শুরু হয় কাসিদার অনুপ্রেরণায় তখনকার প্রেক্ষাপটে তো এই কথা বলাই যায়।

১৪ শতকের দিকে এসে গজল বেশ জনপ্রিয় হতে থাকে। এর কারণ হয়ত দুইটি। প্রথমত, কাসিদা বেশ দীর্ঘ কবিতার মতো, অন্যদিকে গজল এতোটা দীর্ঘতর নয়। আরেকটি কারণ, কাসিদার সেরা কবিদের স্বর্ণযুগ পড়তির দিকে, বিশেষ করে ফারসি ভাষায় কাসিদার কদর এই সময়টায় এসে কিছুটা কমে যেতে শুরু করে।

এই গজলের মধ্যে অবশ্য কাসিদার প্রভাব প্রত্যক্ষ। কাসিদার প্রথম অংশকে ঘষামাজা করেই গজল রচনা করতেন কবিরা। তারা যেটা করতেন, কাসিদার প্রথম অংশের সাথে আরও কিছু দৃশ্যকল্প ঢুকিয়ে সাথে কিছু শ্রুতিমধুর শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করে গজল রচনা করতেন।  ফারসিতে কাসিদা জনপ্রিয়তা খানিকটা হারালেও উর্দু ভাষায় কাসিদা রচনার ঝোঁক সৃষ্টি হয়। উর্দুতে কাসিদা স্তুতিমূলক এবং গজলের চেয়ে দীর্ঘতর হতো।

ঢাকার পথে প্রান্তরে কাসিদার আগমন:

এই অঞ্চলে কাসিদার আদিকথা সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। তবে, পূর্ববঙ্গে কাসিদার প্রাচীনতম তথ্যটি পাওয়া যায় মির্জা নাথানের “বাহারিস্তান-ই-গায়বি” গ্রন্থে। তিনি ছিলেন একজন মোঘল সেনাপতি।

১৬০৮ সালে ইসলাম খান চিশতির সঙ্গে মোগল নৌবহরের সেনাপতি হিসেবে বঙ্গে এসেছিলেন নাথান। এক সামরিক অভিযানে গিয়েছিলেন যশোরে। তাঁর সেই যশোরের আস্তানায় সে সময় এক বিশাল আনন্দোৎসবের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে কবিরা নিজেদের লেখা কবিতা বা কাসিদা পরিবেশন করেন। সবার অনুরোধে যশোরের আবহাওয়া নিয়ে স্বরচিত কাসিদা আবৃত্তি করেন কবি আগাহি।

শায়লা পারভীনের লেখা “হারিয়ে যাওয়া কাসিদা” বইতে জানা যায়  ঢাকার উর্দু রোড, কসাইটুলি, হোসনি দালান, বংশাল, বকশীবাজারসহ আশেপাশে এলাকাগুলোতে ভীষণ জনপ্রিয় ছিলো কাসিদা। তরুণরা দল বেঁধে পাড়া মহল্লায় ঘুরে ঘুরে হ্যাজাক বাতি জ্বালিয়ে আর কুকুর তাড়ানোর জন্যে হাতে একটা লাঠি নিয়ে গাইতেন কাসিদা। এই পুরাণ ঢাকাবাসীরাই মূলত কাসিদার ঐতিহ্যের ধারক বাহক, টিকিয়ে রেখেছেন এই শিল্পের মাধ্যমটিকে। যদিও এখন সেটির পড়ন্ত সময়।

ঢাকাবাসীদের মধ্যে দুটি দল এই ঐতিহ্যের চর্চা শুরু করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এক দল ছিল “সুব্বাসি” বা “সুখবাসী”। এই দলটি নিজেদের মধ্যে উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির চর্চা করতেন। ঢাকাই মোঘল ঘরানার শেষ ধারক বাহক ছিলেন এই সুব্বাসিরা। তারা নিজেদের মধ্যে উর্দু আর ফারসি চর্চা করতেন। আরেকটি দল হচ্ছে “কুট্টি”। এরা কথা বলতেন বাংলার সঙ্গে উর্দু ও হিন্দি শব্দ মিশিয়ে। তাদের কাসিদার ভাষাও উর্দু ও ফার্সি। তাদের থেকেই কাসিদার শুরু বলেই ধরে নেওয়া হয়।

ঢাকাই কাসিদার ধরণ:

ঢাকায় যে ধরণের কাসিদা গাওয়া হয় তা আসলে উপলক্ষ ভিত্তিক। যেমন- চাঁদ ওঠার খুশিতে গাওয়া হয় “চানরাতি আমাদ”।

রমজান মাসকে স্বাগত জানিয়ে গাওয়া হয় “খুশ আমদেদ” বা “সদা”। আবার রমজানকে বিদায় জানিয়ে গাওয়া হয় “আল বিদা”। রমজানের প্রথম ১৫ দিন গাওয়া হয় “সদা”। আর শেষ ১৫ বা ১৪ দিন গাওয়া হয় “আল বিদা”।

ঈদের পরদিন ঢাকায় হতো বিখ্যাত ঈদ মিছিল। সেই ঈদ মিছিলে গাওয়া হতো “ঈদ মোবারক” কাসিদা।

আমরা কাসিদার সবচেয়ে যে প্রচলিত রুপটির সাথে পরিচিত সেটি হলো সেহরির সময়কার কাসিদা। সেহরির সময় রোজাদারদের ঘুম ভাঙানোর জন্য যে সব কাসিদা গাওয়া হয় এগুলোর কিন্তু নির্দিষ্ট নিয়মনীতি নেই। এগুলোর অনেকগুলোই অনেক জনপ্রিয় গানের সুর অনুকরণে গাওয়া হয়।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুমের লেখা ‘চকবাজারের কেতাবপট্টি’ থেকে জানা যায়, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কাসিদা প্রতিযোগিতা হতো বেশ ঘটা করে। বিভিন্ন পাড়ার নিজস্ব কাসিদার দল গড়ে উঠেছিলো। কে কত সুন্দর কাসিদা রচনা করতে পারে, গাইতে পারে চলতো সেই প্রতিযোগিতা। অবস্থা এমন যে, যেনো এ দলগুলোর উপর নির্ভর করত পাড়ার সম্মান।

এশিয়াটিক সোসাইটির ঢাকা কোষ বইতে নবাবি আমলে মহল্লার সর্দারদের কাসিদার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার কথা পাওয়া যায়। ঈদের পর মহল্লার সর্দারদের নিয়ে কাসিদার বিশেষ প্রতিযোগিতাও হত। থাকত পুরস্কার। বিজয়ী দল তাদের মহল্লার জন্য বয়ে আনত সম্মান।

২০১৮ সালে এসে মানুষ এখন রাত জাগা এমন করে রপ্ত করেছে যে তাদের ঘুম থেকে আলাদা করে জেগে তোলার প্রয়োজন হয় না। তাই প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছে কাসিদারও। তবে, কিছু কিছু জায়গায় এখনো মহল্লার কিছু বখাটে ছেলেরা তথাকথিত কাসিদার কথা চাঁদা তুলে ঈদের আগে। এতে অনেকে হয়ত বিরক্তও হয়। কিন্তু, তাই বলে কাসিদার ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

একসময় হয়ত কাসিদার চল একেবারে উঠেই যাবে। তবে এখনো মধ্যরাতে পুরাণ ঢাকার কোনো অলি গলি দিয়ে উদাস মনের কিছু তরুণকে গাইতে শোনা যাবে-

“…পরোয়ারদিগারে আলম যাতা হে মাহে আকরাম,

ফুরকতেছ মাহে দিকে হ্যায় আব কাহা দম…”

অর্থাৎ,

“দুনিয়ার প্রতিপালক, চলে যাচ্ছে মাহে আকরাম

চলে যাচ্ছে মাহে রমজান, এখন আর দুঃখ কোথায়?

এখন আর দুঃখ কোথায়…”

Comments
Spread the love