ফিচারটি যতবার পড়া হয়েছেঃ 156

কান্না-আকাঙ্খা-অপেক্ষা

Ad

মোর্শেদ স্যার একটু আগে পানি খেতে গিয়ে বিষম খেয়েছেন। এখনো গলা ঠিক হয়নি। সেই মুহুর্তে সাব্বির এসে দরজা নক করছে। মোর্শেদ স্যার গলা ঠিক করতে করতে সাব্বিরকে হাত নেড়ে ইশারা দিলেন ভিতরে আসার জন্য। সাব্বির কাঁচুমাচু মুখ করে ভেতরে ঢুকলো। রুমে এসি চলছে। সাব্বিরের এসির বাতাস সহ্য হয়না। দুই মিনিট যেতে না যেতেই হাত পা কাঁপতে শুরু করে। এর থেকে তাল পাতার পাখা হাজার গুনে ভালো।

মোর্শেদ স্যার বললেন, “বসো, টাকা জমা দিছো?”

“জ্বি স্যার দিছি, ক্লাসের প্রায় সবাই মিলে স্যার টাকাটা দিছে। আমি বুঝতে পারিনি যে সবাই এভাবে আমাকে হেল্প করবে।”

“হুম, এরাই আসল বন্ধু। এদের মনে রাখবা। একদিন তোমার টাকা হবে। তখন এদের ভুলে যাবা না। এরা না থাকলে আজকে তুমি অন্তত এই সেমিস্টার পাশ করতে পারতে না।”

“জ্বি স্যার। আমি জানি যে আপনিই ওদেরকে বলছেন আমার কথা।”

“আমি বলছি ঠিক আছে, কিন্তু ওরা যদি মন থেকে না চাইতো তাহলে কখনোই হতো না। আর তার থেকেও বড় কথা ওরা জানতোই না বিষয়টা। বল নাই কেন ওদের?”

“স্যার, আমি ভাবতাম আমি ওদের বন্ধু হতে পারবো না। এই কারনে আমি কারো সাথেই কথা বলি না। নিজের মতো করে চলি। কিন্তু আজ কেন জানি মনে হচ্ছে ওদের সাথে কথা বলা উচিত ছিল।”

মোর্শেদ স্যার উঠে দাড়াতে দাড়াতে বললেন, “হ্যাঁ যাও, ওদের সাথে কথা বলো। আমি এখন ক্লাসে যাবো। যে ঠিকানা দিয়েছি সেই ঠিকানায় কাল এক কপি সিভি নিয়ে চলে যেও। চাকরি হয়ে যাবে।”

বলেই পানি খেতে গিয়ে আবার বিষম খেলেন। তার সমস্ত গম্ভীরতা কেটে গেলো। বিষম খেয়ে মুখ দিয়ে পানি ফেলে সমস্ত টেবিল ভাসিয়ে ফেললেন। সাব্বির হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। এটা খুব সাধারণ ঘটনা। বেশিরভাগ সময়ে মোর্শেদ স্যার পানি খেতে গিয়ে বিষম খান এবং কোনো কোনো সময় মুখ ফসকে পানি বের করে টেবিল ভাসিয়ে ফেলেন। মোর্শেদ স্যার সাব্বিরকে হাত নেড়ে ইশারা দিলেন বের হয়ে যাবার জন্য। সাব্বির রীতিমতো মুখ কাঁচুমাচু করে বের হয়ে গেলো।

হুসাইন ফোনে কথা বলছে। চায়ের দোকানে সে একাই বসে আছে। আজ তাদের ক্লাস ছিল না বলে আর কেউ আসে নি। সাব্বির প্রায় দশ মিনিট ধরে হুসাইনের সামনে দাড়িয়ে আছে। এই দশ মিনিট সে কথা বলেই যাচ্ছে। তার কথায় কথায় মুখ খারাপ করার স্বভাব আছে। সে বলছে, “বান্দির পুতরে আমি থাপরামু। সেই দায়িত্ব আমার। আপনারে যেটা বলছি সেটা করেন। ৫০ টন মাল পাঠানোর কথা। সলিড ৫০ টন পাঠাবেন। রংচং করবেন না। বুঝছেন?” হুসাইন ফোন রেখে সাব্বিরের দিকে তাকালো। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল, “বল কি অবস্থা?” সাব্বির মাথা নিচু করে দাড়িয়ে ছিল। তার চোখে মুখে কৃতজ্ঞতা। কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করতে পারছে না। সম্পুর্ন এক সেমিস্টারের টাকা তার এই বড়লোক বন্ধু ক্লাসের আরো কয়েকজনকে নিয়ে ব্যাবস্থা করে দিয়েছে। অথচ সে কখনই তাদের বন্ধু ভাবে নাই। সাব্বির বলল, “বন্ধু, তোরা আমার অনেক বড় একটা উপকার করলি রে। এর ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারবো না।” হুসাইন বলল, শোন, এইসব বালছাল শোনার জন্য আমি এখানে বসি নাই। চা খাবি? চা খা। আর আমারে ম্যাথস করাবি কবে সেটা বল। আর শোন এইসব ফ্যাচফ্যাচ রাজুদের সামনে করবি। আমার সামনে না। বুঝলি?”

সাব্বির হেসে দিলো। কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। চা খাওয়া যায়। অনেকদিন আয়েশ করে চা খাওয়া হয়না। আজ সেমিস্টারের টাকার ব্যবস্থা হইছে। কাল মনে হয় চাকরিটাও হয়ে যাবে। সে তার জীবনে এমন কিছু বন্ধু পাবে, এমন একজন স্যার পাবে। কখনোই আশা করে নাই।চাকরিটা হয়ে গেলে পরের সেমিস্টারে আর কারো সাহায্য নেওয়া লাগবে না। সে নিজেই নিজের খরচ চালাতে পারবে।

সাব্বির হন্তদন্ত হয়ে হাঁটছে। পকেটে পাঁচ টাকা ছিল। সেটা দিয়ে কিছুদুর গাড়িতে করে এসেছে। বাকি পথ হেটেই যেতে হবে। সাব্বির যখন বাড়ির বেশ কাছাকাছি এসে পৌছালো, গেটের বাইরে রাখা তার বাবার সাইকেলটা দেখতে পেলো।

সাব্বির চিন্তিত হয়ে দ্রুত পা চালালো। তড়িঘড়ি করে বাড়ির গেটের ভিতরে ঢুকেই দেখলো বাড়ির সামনে উঠানে তার বাবা সাদেকুর রহমান তার মায়ের চুলের মুঠি ধরে আছেন। তার মা আমেনা বেগমের মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। দু’চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “বাবা তুই আজকে এত আগে আসলি কেন?” সাব্বিরের মুখ থমথম করছে। রাগে থরথর করে তার হাত পা কাঁপছে। গেটের কাছে বেশ কিছু কাটা কাঠ সাজিয়ে রাখা আছে। প্রতিদিন সকালে সাব্বির কাঠ কেটে সেখানে রাখে। তার মায়ের রান্নার কাজে লাগে বলে। সাব্বির সেখান থেকে লম্বা দেখে বড় একটা কাঠ তুলে নিলো।

আমেনা বেগম বললেন, “খবরদার সাব্বির, তুই সরে যা, বের হয়ে যা এখান থেকে।” সাব্বির তখনো তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। বলছে, “কি চাও? তোমাকে আর আমাদের টাকা দিতে হবে না। চলে যাও এখান থেকে।” সাদেকুর রহমান তখনো তার মায়ের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে আছেন। আর বলছেন, “তাইলে টাকা পাবি কই? তোর মারে দিয়ে মাগিবাজি করাবি? বান্দির পোলা। হাতের তে কাঠ ফেলা। নাইলে কিন্তু তোর মারে জবাই দিমু।” সাব্বির বলল, “তুমি নিজে মাগিবাজ বলে কি সবাইরে মাগী ভাবো? বাবা, মারে ছাড়ো। আমি তোমার গায়ে হাত তুলতে চাই না। তোমার টাকা আর আমাদের লাগবে না। আমি কামাই করবো। আর শোনো, তুমি কই থাকো, না থাকো সব খবর কিন্তু আমি জানি। সুতারাং, মারে ছাড়ো, এখান থেকে চলে যাও।”

সাদেকুর রহমান আমেনা বেগমের চুলের মুঠি ছাড়লেন। ভয়ে ভয়েই ছাড়লেন। তার নিজের ছেলে যদি সত্যি সত্যি তার গায়ে হাত তুলে ব্যপারটা বেইজ্জতি হয়ে যাবে। তিনি সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন। তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আমেনা বেগম চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলেন। ব্যাথায় কাঁদতে শুরু করলেন নাকি তার ছেলে তার স্বামীর গায়ে হাত তুলতে গেছে বলে কাঁদতে শুরু করলেন, বোঝা গেল না।

সাব্বির হাত থেকে কাঠ ফেলে দিলো। গেটের কাছে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে বাড়ির পিছনে পুকুর পাড়ে চলে গেলো। এই পুকুর তাদের না। এই বাড়ির মত পুকুরটাও বাড়ির মালিকের। শহরের কোনো কিছুই কারো হয়না। সব হয় তাদের যাদের ব্যাংকে বড় কোনো অঙ্ক জমা থাকে। ভালো কথা মনে পড়ছে, দুপুরে খেয়ে উঠে হুসাইনের বাসায় যেতে হবে। ম্যাথস করানোর জন্য। বড়লোকদের বাসায় যেতে ইচ্ছে হয় না। নিশ্চয়ই হুসাইনের বাসায়ও এসি আছে। এই এসি জিনিসটা খুব বিরক্তকর একটা জিনিস। মোটেই সহ্য হয়না।

আমেনা বেগম কাঁদছেন। কিছুক্ষণ আগে চিৎকার করে কাঁদছিলেন আর এখন সুর করে কাঁদছেন। কাঁদুক। বড়লোকদের জীবন চলে বিলাসিতায়। মধ্যবিত্তদের জীবন চলে কাগজে। আর গরিবদের জীবন চলে এসব কান্নায়, আকাঙ্ক্ষায়, অপেক্ষায়। দুই বেলা ভাত খাওয়ার অপেক্ষা।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad