ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে ওঠার যোগ্যতা অর্জন করেছে ক্রোয়েশিয়া। মাত্র ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করা বলকান রাষ্ট্রটির জন্য এ এক অনন্য অর্জন। আর মাত্র একটি ম্যাচ জিতলেই তারা হয়ে যাবে বিশ্বসেরা ফুটবল দল!

তাই সে-দেশের ৪১ লক্ষ মানুষ এখন আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই সে আনন্দে সামিল হতে পারছেন না একজন ব্যক্তি। বরং আফসোসে জ্বলেপুড়ে মরছেন তিনি।

তার নাম নিকোলা কালিনিচ। এসি মিলানের হয়ে খেলা স্ট্রাইকার ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার ২৩ সদস্যের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। কিন্তু নিজের অত্যধিক ইগোর বলি হয়ে তাকে বিশ্বকাপের মাঝপথেই রাশিয়া ছেড়ে নিজ দেশে চলে আসতে হয়। তাকে ছাড়া ২২ জনের স্কোয়াড নিয়েই ফাইনাল পর্যন্ত উঠে গিয়েছে জলাকতো দালিচের শিষ্যরা।

ঠিক কী কারণে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে কালিনিচকে? চলুন সে কাহিনীই জেনে আসি।

এবারের বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার প্রথম ম্যাচ ছিল নাইজেরিয়ার বিপক্ষে। সে ম্যাচে ২-০ ব্যবধানে অনায়াসে জয় পায় ক্রোয়েটরা। ম্যাচের একদম অন্তিম মুহূর্তে, যখন তারা ইতিমধ্যেই এগিয়ে ছিল ২-০’তে, কোচ দালিচ সিদ্ধান্ত নেন কালিনিচকে বদলী হিসেবে নামানোর।

নিকোলা কালিনিচ, দালিচ, ক্রোয়েশিয়া, ইগো, বিশ্বকাপ ফুটবল

কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার হয়ে ৪১ ম্যাচে ১৫ গোল পাওয়া এবং এক সময় ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের হয়ে খেলা কালিনিচের কাছে মনে হয়েছে, ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে স্রেফ লোক-দেখানোর জন্য মাঠে নামা তার জন্য খুবই অপমানজনক একটি ব্যাপার হবে। বরং কোচের উচিৎ ছিল তাকে ম্যাচের শুরু থেকে খেলানো।

তাই তিনি কোচকে সাফ জানিয়ে দেন, মাঠে নামতে পারবেন না তিনি। এর পেছনে কারণ হিসেবে পিঠে ব্যথার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু কোচ ভালো করেই জানতেন যে আসলে তার পিঠে কোনো সমস্যা নেই। শুধু ইগোর কারণেই মাঠে নামার ব্যাপারে অপারগতা জানাচ্ছেন তিনি।

কালিনিচের এমন উগ্র আচরণ ও স্পর্ধা বরদাস্ত করেননি দালিচ। তাই পরদিনই ক্রোয়েশিয়াগামী বিমানে করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেন তাকে।

এ ব্যাপারে দালিচের বক্তব্য ছিল, “আমি আমার স্কোয়াডে সব সুস্থ ও ফিট খেলোয়াড় চাই, যারা যেকোনো মুহূর্তে মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত থাকবে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে কালিনিচ ওয়ার্ম-আপ করছিল, এবং তার দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামার কথা ছিল।

“কিন্তু যখন আমি তাকে বদলী হিসেবে নামতে বললাম, সে জানাল তার নাকি পিঠে ব্যথা করছে, তাই সে মাঠে নামতে পারবে না। একই ঘটনা সে ইংল্যান্ডে ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের সময়ও ঘটিয়েছিল। গত রবিবারও সে প্রাকটিস সেশনে অংশ নেয়নি।

“আমি এগুলো শান্তভাবে মেনে নিয়েছি। কিন্তু যেহেতু আমি আমার দলে সকল খেলোয়াড়কে ফিট চাই এবং সে তা নয়, তাই আমি এই সিদ্ধান্ত (কালিনিচকে দেশে ফেরত পাঠানোর) নিতে বাধ্য হলাম।”

নিকোলা কালিনিচ, দালিচ, ক্রোয়েশিয়া, ইগো, বিশ্বকাপ ফুটবল

তবে কালিনিচের সতীর্থ মিলান বাদেলজ পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমের সামনে স্বীকার করেন যে কালিনিচের একটু ইগোর সমস্যা ছিল, আর এই ইগোর কারণেই শেষমেষ কপাল পোড়ে তার।

“সবার আগে হলো আপনার দল। দলের স্বার্থেই আপনাকে আপনার ইগো একপাশে সরিয়ে রেখে দলের কথা চিন্তা করতে হবে। ক্লাব পর্যায়েও এধরণের শ্রদ্ধার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এই ব্যাপারটি আরও বেশি করে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। কারণ এটি অনেক বড় একটি মঞ্চ, যেখানে আমরা সচরাচর খেলার সুযোগ পাই না। দলের সবার সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকা আর ড্রেসিংরুমে একটি বন্ধুত্বপূর্ব আবহাওয়া জারি রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

এখন হয়ত কালিনিচ নিজের ভুলটি বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু যখন বিষয়টি বোঝা তার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল, তখন তিনি অবুঝের মত নিজের ইগো নিয়ে পড়ে থেকেছেন। আর সে-কারণেই তার দল বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেলেও, সে আনন্দের অংশীদার হতে পারছেন না তিনি। বরং মাঠে থেকে দলের সাফল্যে অবদান রাখার বদলে নিজের বাড়ির কাউচে বসে টিভি সেটে দলের খেলা দেখতে বাধ্য হচ্ছেন। এই মুহূর্তে তার মত দুর্ভাগা বোধহয় খুব বেশি নেই পৃথিবীতে!

Comments
Spread the love