ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার চেয়ে শফি হুজুরের কৃতজ্ঞতা সমাবেশ বড়?

নভেম্বরের ১ তারিখ শুরু হয়েছিল জেএসসি, জেডিসি পরীক্ষা। শিক্ষাজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বোর্ড পরীক্ষা উপলক্ষে ছাত্রছাত্রীরা প্রস্তুতি নিয়ে আসছিলেন অনেকদিন ধরে। তারা রুটিন পেয়েছেন, সেই রুটিন অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখন পরীক্ষার মাঝখান দিয়ে যদি তারা শুনেন, কথা নাই বার্তা নাই হুটহাট তাদের একটা পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে, কেমন লাগবে তাদের? যে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন, সেটাতে কি একটুও ব্যাঘাত ঘটবে না? সবচেয়ে বড় কথা একটা বোর্ড পরীক্ষা তো ছেলেখেলা না, এখানে মানসিক প্রস্তুতিরও ব্যাপার আছে৷ সেই মানসিক প্রস্তুতিরও সুর কেটে যায় এরকম কিছু হলে।

সেটাই ঘটেছে এবারের জেএসসি, জেডিসির পরীক্ষার্থীদের সাথে। শিক্ষা মন্ত্রনালয় আগামীকালের পরীক্ষা স্থগিত করে সেটাকে পিছিয়ে নিয়ে গেছে নভেম্বরের ০৯ তারিখ। কারণ কি? কারণ একটা তারা দেখিয়েছে, মুখস্থ অজুহাত। তারা বলেছে, ‘অনিবার্য কারণবশত’ পরীক্ষা পেছানো হয়েছে।

কিন্তু, এর মূলে রয়েছে অন্য কারণ। আগামিকাল ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের “শোকরানা মাহফিল” হবে। এই মাহফিলে দেশের কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জমায়েত হবেন। সম্প্রতি কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদ দাওয়ায়ে হাদিসকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমান স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। এই খুশিতে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা শুকরিয়া জ্ঞাপন করবেন। আর তাদের শুকরিয়া জ্ঞাপনের সুবিধার্থে, জনগণ আর জেএসসি পরীক্ষার্থীদের অসুবিধা সৃষ্টি করে শিক্ষা মন্ত্রনালয় বোর্ড পরীক্ষাই পিছিয়ে দিলো!

জেএসসি, জেডিসি, কওমী, হেফাজত

এই শোকরানা মাহফিলের সভাপতি আবার শাহ আহমদ শফী৷ সারা দেশের প্রায় চৌদ্দ হাজার কওমি মাদ্রাসার চৌদ্দ লাখ শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছে এই সমাবেশ। শফী হুজুরের নেতৃত্বে তারা এই সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবেন! খুবই ভাল কথা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো মহৎ উদ্যোগ। আজকাল তো অনেকে কারণ ছাড়াও কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে থাকে। সেখানে, শফী হুজুর ভাল একটা কারণে কৃতজ্ঞতা জানাবেন। কিন্তু, তাদের তো এটাও মাথায় রাখা দরকার তাদের সমাবেশে যাদের ক্ষতি হবে তারাও শিক্ষার্থী। এক শিক্ষার্থীর সমস্যা করে আরেক শিক্ষার্থী তালি বাজাবে আর শুকরিয়া করবে, সেটা কতটুকু ভাল?

সরকার সভা সমাবেশের অনুমতি দেয়ার আগে অনেক কিছু চিন্তা করে। স্বাভাবিক। জনগণের সমস্যা হোক তা তো নিশ্চয়ই সরকার চায় না। এমনকি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগও ইদানিংকালের বেশিরভাগ সমাবেশ বন্ধের দিনে করে, যেন রাস্তায় যানজটে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। মানুষের ভোগান্তির কথা ভেবে যদি আওয়ামী লীগ ছুটির দিনে সমাবেশ করে তাহলে অন্যান্য দল কেন সাপ্তাহিক কার্যদিবসে এভাবে সমাবেশের অনুমতি পায়? এই সমাবেশ তো আর জোর-জবস্তি করে করবে না নিশ্চয়ই শফী হুজুর এবং তার প্রিয় ছাত্ররা। জোর-জবরদস্তি করতে গেলে কি হয় তারা সেটা শাপলা চত্বরেই দেখেছে এর আগে।

এখন অবশ্য ব্যাপার আলাদা। তারা এখন সরকারের গুণকীর্তন করবেন, শোকরানা আদায় করবেন। তাই একটু সাপোর্ট তারা পাবেন। তাছাড়া, এসব তো আবার অধিকার। যে কেউই যখন খুশি সমাবেশ, ধর্মঘট ঢেকে ঢাকা শহর স্থবির করে দিতে পারে আজকাল। যাই হোক প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দেয়ার জন্য এমন দিনকেই কেন বেছে নেয়া হলো! যারা অনুমতি দিলেন তারাও কেন কর্মব্যস্ত একটা দিনে এই সমাবেশ করার ছাড়পত্র দিলেন? সাধারণ মানুষের কথা না হয় বাদ, এই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যে একটা বোর্ড পরীক্ষা চলে সেটা তো অন্তত মাথায় রাখা উচিত ছিল।

নীতিনির্ধারকদের অবস্থান দেখলে মনে হয়, কিসের জেএসসি, কিসের জেডিসি, এর চেয়েও বড় একটা সমাবেশ যেখানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতার আমবয়ান চলবে। তাতে রাজনৈতিক কিছু সুবিধা তো আছেই, ভোটের বাজারেও প্রভাব আছে। এটাই তাই এখন মহাগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো তাদের কাছে। তাই, একটা বোর্ড পরীক্ষা এভাবে এক নোটিশে পিছাতেও তাদের গায়ে লাগলো না।

২০১৪ সালে বিএনপি, জামায়াতের তান্ডব তো দেখেছি। তাদের অগ্নি কর্মসূচীর কারণে কত প্রাণ ঝড়েছে। কত পরীক্ষার শিডিউল এলোমেলো হয়েছে। কি একটা বাজে অবস্থা ছিল তখন। এইসব রাজনৈতিক সন্ত্রাসের কারণে শিক্ষা যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমরা দেখেছি, হরতালের কারণে কত পরীক্ষা পিছিয়ে যেতে। এগুলো আমরা ঘৃণা করি।

আর এই একই কারণে শফী হুজুরের ডাকা এই সমাবেশ, যার জন্য পরীক্ষাই পিছিয়ে দেয়া হলো সেটাকেও পছন্দ করছি না। প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করবেন ভাল কথা, সেটার জন্য এতোগুলো শিক্ষার্থীর এই অসুবিধার দায়টাও তারা এড়াতে পারেন না। যারা অনুমতি দিয়েছেন তাদেরও মাথায় রাখা উচিত ছিল, এইদিনে সমাবেশ করলে কোন কোন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আপনারা প্রথমে এলার্ট দিলেন, যাদের পরীক্ষা তারা যেন হাতে সময় নিয়ে বের হয়। কেন, এই এলার্টটা শফী হুজুরকে বোঝাতে পারলেন না, তার সমাবেশের কারণে এতোগুলো শিশুর সমস্যা হবে? সাধারণ কারিকুলামের সমমান স্বীকৃতি পাওয়ায় যে গুণকীর্তনের আয়োজন, তার জন্য সাধারণ কারিকুলামের শিক্ষার্থীদেরই কেন সেক্রিফাইস করতে হলো একটা পরীক্ষা? আপনারা বুঝতে পারলেন, মহাসমাবেশ হবে। কারণ, শফী হুজুর ডাক দিয়েছে, সবাইকে তো আসতেই হবে। সব কওমি মাদ্রাসা বন্ধ থাকবে, শিক্ষার্থীরা থাকবে মাঠে। তাই, বুঝলেন পরীক্ষা নেয়াই সম্ভব না। দিলেন পরীক্ষাটাই স্থগিত করে। তবুও, আপনারা শফী হুজুরকে বোঝাতে পারলেন না, এই দিনে সমাবেশ করা উচিত হবে না।

শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা যদি পিছিয়ে শুক্রবারে নেয়া যায়, শোকরানা আর কৃতজ্ঞতা উৎসব কেন শুক্রবারে নেয়া গেল না? এটা কি শো অফ করার খেলা, সবাই দেখবে হাজার হাজার মাদ্রাসার ধর্মপ্রাণ শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানাতে রাস্তায় নেমেছে!

ভাল তো, মগের মুল্লুক হয়ে গেছে ব্যাপারগুলো। একটা পরীক্ষা বলে কথা না। কথাটা সিস্টেমের। যে দেশে কৃতজ্ঞতা জানানো আর শুনার জন্য লালায়িত লোকের কারণে পরীক্ষাই স্থগিত করতে হয়, সেখানে আসলে সিস্টেমটা কি? সিস্টেমের এই “অনিবার্য যান্ত্রিক ত্রুটি” সারবে কবে আর সুস্থ মানসিকতা আসবে কবে?

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles