সিনেমা হলের গলি

রাত ১০টার খবর পড়লেন জয়া-চঞ্চল!

দ্য কারাটে কিড নামে হলিউড থেকে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রটির কথা অনেকে মনে করতে পারবেন। জ্যাকি চ্যানের মুভি বলে অনেকে এই ছায়াছবিকে রেখেছেন পছন্দের কাতারে। তবে এই মুভির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলো অল্পয়স্ক একটা ছেলে। তার নাম জ্যাডেন স্মিথ। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার অনেক আগে থেকেই জীবনের প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে আসা ছেলেটি কেড়ে নিয়েছিলো অনেকটা আলো। কারণ, জ্যাডেন স্মিথ যে আর কেউ নয়, আরেকজন বিখ্যাত হলিউড তারকা উইল স্মিথের ছেলে।

এমন যখন অবস্থা, তখন আলাদা করে প্রমোশন কিংবা মার্কেটিংয়ের মনে হয় আর দরকার পড়ে না। জ্যাকি চ্যান নামটাই এক জলজ্যান্ত প্রমোশন, তার সঙ্গে যখন যুক্ত হয় উইল স্মিথের ছেলে – এখানে আর নতুন করে বলার কিছু থাকে না। রমরমা সাড়া পড়ে গেছিলো হলিউডপাড়ায়, ভক্তদের মনে, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে। ঠিক তখনই ইউটিউবে রিলিজ পেলো জাস্টিন বিবারের একটা গান। গানটির নাম “নেভার সে নেভার।”

জাস্টিন বিবার তখন সময়ের ইয়াং সেনসেশন। তাঁকে নিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে চলছে নানারকম আলোচনা, সমালোচনা। কেউ কেউ তাঁর অল্পবয়সের দারুণ পারফর্ম্যান্স নিয়ে ছিলেন দারুণ চমৎকৃত, আবার কেউ কেউ মনে করছিলেন অল্পবয়সে অধিক খ্যাতির ভার নিতে না পেরে ছেলেটা অকালেই ঝরে যাবে। মোদ্দা কথা, জাস্টিন বিবার যা করেন তা-ই তখন আলোচনার বিষয়। নেভার সে নেভার গানটিও ইউটিউব রিলিজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্বাভাবিক এক সাড়া ফেলে দিলো।

নেভার সে নেভার গানটি রিলিজ হয়েছিলো ৮ই জুন, ২০১০ তারিখে। কয়েক বছর আগের তথ্য থেকেও দেখা যায়, এই গানটি দেখা হয়েছিলো ৬১ কোটি বার। ৬১ কোটি বার দেখা হয়েছে যে গানটি, তার ব্যাপারে আলাদা করে বলার নেই। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশই জানতে পেরেছে গানটির ব্যাপারে তা বলাই বাহুল্য।

এই গানটি নিয়ে এখানে কথা বলার কারণ কি? পাঠক নিশ্চয় এতক্ষণে ভ্রু কুঁচকে ফেলেছেন? নেভার সে নেভার, মুক্তি পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে ৬১ কোটি বার দেখা এই গানটিতে যে একজন সহযোগী শিল্পী ছিলো জাস্টিন বিবারের সঙ্গে! এই দ্বিতীয় গায়কটি আর কেউ নয়, উইল স্মিথের ছেলে জ্যাডেন স্মিথ। ক্যারাটে কিডের প্রধান চরিত্র।

গানটি রিলিজ হওয়ার ঠিক দু’দিন পর, ১০ই জুন মুক্তি পায় “দ্য কারাটে কিড” মুভিটি।

লক্ষ্যনীয় বিষয় এই যে, জ্যাকি চ্যানের মতো বড় একজন স্টার এবং বহুল আলোচিত জ্যাডেন স্মিথের হলিউড জগতে ফেলা প্রথম পদক্ষেপের পরও জাস্টিন-জ্যাডেন শো’টা করা হয়েছে। কারণটা কি?

এই গানটির দরকার ছিলো না, আপাতদৃষ্টিতে। ৬১ কোটিবার এই গান দেখা হবে তা নিশ্চয়ই আগে থেকে কেউ জানতেন না। তবে ৮ জুনের আগেই হলিউড পাড়ার সবাই জানতেন, দ্য কারাটে কিড আসছে। হলিউডের ভক্তরা জানতেন, দ্য কারাটে কিড আসছে। এমনকি বাংলাদেশের সোশাল মিডিয়াতেও বেশ আলোড়ন উঠে গিয়েছিলো এই মুভি নিয়ে। একে তো জ্যাকি চ্যানের মুভি, তার ওপর জ্যাডেন স্মিথের জন্য ছিলো এক চাপা উত্তেজনা। তাহলেই বোঝা যায় মুভিটির টার্গেট কাস্টোমার যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কেউ এই মুভিটির ব্যাপারে জানতে বাকি ছিলো না।

তবুও কেন জাস্টিন বিবারের সঙ্গে গানের মঞ্চে তুলে দেওয়া? কেন আরও মার্কেটিং? কেন আরও প্রচার-প্রচারণা?

কারণ, এর দরকার আছে। যত বড় তারকা নিয়েই ঢেলে সাজানো হোক একটা চলচ্চিত্র, যতই বড় হোক বাজেটের অঙ্কটা, তারপরও এই প্রচারণার দরকার আছে। যদিও বাংলাদেশি একাধিক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এই দিকটি নিয়ে চরম অবহেলা আমরা লক্ষ্য করেছি স্থানীয় প্রযোজক ও পরিচালকদের মধ্যে। উদাহরণ? অজ্ঞাতনামা। স্বপ্নজাল।

অজ্ঞাতনামা নিয়ে চরম হাহাকার পড়ে গেছিলো ফেসবুকের মুভি রিলেটেড গ্রুপগুলোতে। অনেকে দুষেছেন আমাদের দর্শকদের। অনেকে দুষেছেন হলগুলোকে। কারণ, বেশি হল পায়নি নাকি তারা। কেন পায়নি, সে দায় কি দর্শকের না হল মালিকদের? কে জানতো অজ্ঞাতনামার ব্যাপারে? ক’জন জানতো? কয়জন মুভি রিলিজের আগে দেখেছেন স্বপ্নজালের ট্রেলার? কয়টা টিজার বেরিয়েছিলো এই মুভিগুলোর? একটা বিজ্ঞাপনের কথা মনে করতে পারেন এদের নিয়ে? একটা গান দেখেছেন কেউ মুভি রিলিজের আগে? একটা চমক দিতে পেরেছে মুভিগুলোর নির্মাতারা? ক’জনকে জানাতে পেরেছে?

আয়নাবাজি নিয়ে চারপাশে ঝড় উঠে গেছিলো চায়ের কাপে। উঠেছে ঢাকা অ্যাটাক নিয়ে। এখন চলছে দেবী-জ্বর। “দেবী” মুক্তি পাবে ১৯শে অক্টোবর। এখনও আছে দুদিন। এর মধ্যে কি কি করেছে দেবীর মার্কেটিং টিম? দেবী টিম হিমু মেলায় গেছে, বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের ফাইনালে গেছে, সেখানে দেবীর ট্রেলার-গান দেখানো হয়েছে! মিট দ্য প্রেসের আয়োজন করেছে তারা, আমাদের সিনেমা পাড়ায় যেটা অবিশ্বাস্য। শত কাজ, ডাবিংয়ের ঝামেলা সামলেও সাংবাদিকদের সময় দিয়ে গেছেন চলচ্চিত্রটির সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকে, প্রতিটি টিভি চ্যানেলে গেছে, সাক্ষাৎকার দিয়েছে বিখ্যাত-অবিখ্যাত সব পোর্টালে, যাতে দর্শক ছবিটা সম্পর্কে জানতে পারে। ইস্পাহানীর টিব্যাগে দেবী এসেছে, বিশ্বরং দেবীর প্রমোশনকে মাথায় রেখে নতুন কালেকশন ছেড়েছে শাড়ী-কামিজের। যমুনায় প্রোগ্রাম হয়েছে দেবী মঞ্চের, হয়েছে মডেল হান্ট।

এবং সবচেয়ে বড় ধামাকাটা মনে হয় ঘটে গেল এই কিছুক্ষণ আগে। “দেবী – মিসির আলী প্রথমবার” ফেসবুকে আজ জানানো হয়েছিলো, রাত ১০টায় বড় এক চমক আসছে মাছরাঙা চ্যানেলে। অনেকেই খেয়াল করেছেন, অনেকে তেমন একটা গুরুত্ব দেননি। আজকাল ইন্টারনেটের যুগ। ইউটিউব আছে, আর্কাইভস আছে। একটা চমক এলেও তা পরে দেখে নেওয়া যায়। অথচ এরপর যা হলো, তা রীতিমতো এক নতুন এক মাইলস্টোন সৃষ্টি করলো বাংলাদেশের সিনেমাপাড়ায়।

দেবী চলচ্চিত্রের মিসির আলি চরিত্রে অভিনয় করা চঞ্চল চৌধুরী এবং রানুর চরিত্রটি অসম্ভব সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা জয়া আহসানকে দেখা গেল মাছরাঙা টেলিভিশনের রাত দশটার সংবাদ পাঠ করতে!

চঞ্চল চৌধুরী কিংবা জয়া আহসানকে দেখে একবারের জন্যও মনে হয়নি তাঁরা পেশাদার সংবাদপাঠক নন। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তাঁরা একে একে বলে যাচ্ছিলেন দেশের রাজনৈতিক অবস্থার খবর, জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সব সংবাদ। কালো পর্দা দিয়ে স্টুডিওটা ঢেকে দেওয়ার হলে মাছরাঙা সংবাদের নিয়মিত দর্শকদের কেউ কোনভাবেই বুঝতে পারতেন না পেছনে রয়েছেন দু’জন পেশাদার অভিনয়শিল্পী। তবে সংবাদপাঠের এক পর্যায়ে মৃদু এক হাসি লক্ষ্য করা যায় চঞ্চল চৌধুরীর মুখে। তখন তিনি পাঠ করছিলেন বিনোদন অংশ। চঞ্চল বলে যাচ্ছিলেন, “এই প্রথমবারের মতো বড় পর্দায় আসছে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় চরিত্র মিসির আলি…”

চলচ্চিত্রটির শুভমুক্তির ঠিক যখন দু’দিন বাকি, এমন এক বিস্ফোরক সংবাদপাঠের খবর দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়লো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয়। ভক্তরা পাগলের মতো শেয়ার করে গেল সংবাদপাঠটি। সম্ভবতঃ বাংলাদেশের সংবাদ পাঠ ইতিহাসে কোনও সময়ের খবর এমন কাড়াকাড়ি করে দেখার ঘটনা আগে ঘটেনি।

সেই সঙ্গে দেবী উঠে গেল প্রমোশনের জগতে এক নতুন মাত্রায়। মাত্র কয়েকদিন আগে “এগিয়ে চলো”-কে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে এই প্রসঙ্গেই কি ইঙ্গিত দিতে চেয়েছিলেন জয়া আহসান? তিনি বলেছিলেন, “একটা জিনিস কি, আমাদের এখানে অনেকেই ভাবেন যে ডাবিং করলেই বুঝি সিনেমার কাজ শেষ। এটা খুবই ভুল একটা ধারণা। এই জিনিসটা আমি শিখেছি কলকাতায় কাজ করতে গিয়ে। আমি বিক্রির জন্যে খুব ভালো কাচ্চি বানিয়ে যদি মানুষকে না জানালাম যে, এখানে ভালো কাচ্চি পাওয়া যায়, তাহলে কিভাবে হবে?”

“দেবী – মিসির আলী প্রথমবার” অবশ্যই সুস্বাদু এক কাচ্চি। ঠিক যেমন সুস্বাদু কাচ্চি ছিলো অজ্ঞাতনামা, ছিলো স্বপ্নজাল। অথচ স্রেফ মানুষকে না জানানোর জন্য সেই কাচ্চি খাওয়ার জন্য মানুষ পাওয়া যায়নি। হল মালিকরা যেহেতু বিষয়টা লক্ষ্য করেছেন, তারা বেশি হল তাদের দেননি। এটা স্বাভাবিক, যদি বড় ধরণের প্রচারণা না থাকে কে ব্যবসার ঝুঁকি নেবে?

আয়নাবাজির প্রমোশন বাংলাদেশের মানুষ দেখেছিলো। অমিতাভ রেজা চৌধুরী তাঁর নিজস্বতা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বরাবর। তবে তাকেও যেন ছাড়িয়ে গেল এবার দেবী। গত একটা বছর ধরে সময়ে সময়ে এসেছে পোস্টার, ছাড়া হয়েছে টিজার, বানানো হয়েছে গান, এমন গান যার একটি আবার থাকছে না মূল ছবিতেই! সাক্ষাতকার, প্রেস কনফারেন্স, ট্যালেন্ট হান্ট, শো। কিছুই বাদ রাখেনি দেবী। সেই সঙ্গে এবার শেষ ধাক্কাটা তারা দিয়ে গেল মাছরাঙার দশটার সংবাদে।

একটা নিউজ শো যে এই দেশে এমন জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে তা আগে কে ভেবেছিলো? সেই সঙ্গে আমরা আশায় বুক বাঁধি, পরবর্তীতে দারুণ গল্প, অসাধারণ স্ক্রিপ্ট, প্রতিভাবান সব তুখোর অভিনেতা আর নিদারুণ এক কৌশলী পরিচালক থাকার গৌরবে আর কোনও টিম প্রচারণায় গাফলতি করবেন না।

জয়া আহসান যেমনটা বলেছিলেন, ভালো কাচ্চি রান্না করলে সেটা পরিবেশনও করতে হয় সেভাবেই। জয়া আহসান কাচ্চিটা (দেবীকে) পরিবেশন করেছেন ভালোভাবেই, তার পরিবেশন করা কাচ্চির গন্ধ এখন সিনেমাপাড়ায়। এবার আমাদের কেবল কাচ্চিটা খাবার (হলে গিয়ে দেবী দেখার) বাকী!

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles