সাতই মার্চ, ১৯৭১।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সাদা রঙের সেডান গাড়িটা রেসকোর্স ময়দানে এসে থেমেছে। জনসমুদ্রের শেষ মাথাটা দেখা যায় না, যেদিকে তাকানো যায়, শুধু মানুষ আর মানুষই চোখে পড়ে। মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছে পাকিস্তানী হেলিকপ্টার, রোটরের গমগম আওয়াজকে ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে লক্ষ মানুষের শ্লোগান- “মুজিব ভাইয়ের পথ ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো”… “বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো”… “তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ!”

সাদা পাঞ্জাবীর ওপরে কালো কোট পরিহিত সৌম্যদর্শন মানুষটা মঞ্চে উঠলেন, মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন নির্ভিক চিত্তে। জলদগম্ভীর গলায় সম্বোধন করলেন- “ভায়েরা আমার!” একটি কণ্ঠে ঘোষিত হলো বাঙ্গালীর প্রাণের দাবী, ডাক এলো স্বাধীনতার, একটা স্বাধীন দেশের অভ্যুদয়ের অকুতোভয় বাণী উচ্চারিত হলো সাড়ে সাত কোটি বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠে; সাতচল্লিশ বছর আগের সাতই মার্চে।

সাতই মার্চ, ২০১৮।

শান্তিনগর মোড়ে বাস না পেয়ে হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটা বাংলামোটরের দিকে গেল। গায়ে কলেজ ড্রেস, বাসায় যাওয়ার তাড়া। সাতই মার্চের সমাবেশ উপলক্ষ্যে রাস্তায় গণপরিবহণের সংখ্যা কম। হুট করেই একটা মিছিলের মাঝখানে পড়ে গেল মেয়েটা, সেই মিছিল থেকে বাঙালির প্রাণের শ্লোগানটা উচ্চারিত হচ্ছে, যে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটা একাত্তরে বিজয় ছিনিয়ে আনার মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছিল, সেই ‘জয় বাংলা’ শব্দ দুটো উচ্চারণ করতে করতেই কিশোরী ওই মেয়েটাকে ঘিরে দাঁড়ালো পনেরো বিশজন যুবক! তারপর? কলেজ ড্রেস পরা সেই মেয়েটার ওপর কাপুরুষগুলোর পৌরুষত্ব দেখানোর প্রচেষ্টা!

মেয়েটার জামার বোতাম ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, তার ওড়নার জায়গাটা টান মেরে খুলে ফেলা হয়েছে, তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে। এই অমানুষগুলো একটা নিরপরাধ মেয়ের গায়ে হাত তুলেছে, সেটা আবার মোবাইলের ক্যামেরায় ধারণ করার চেষ্টাও করেছে তাদের কেউ কেউ। আর পুরো কাজটাই করেছে এমন কিছু ছেলেপেলে, যারা বাঙালির প্রাণের শ্লোগানটা উচ্চারণ করতে করতে মিছিল নিয়ে কোন এক জনসমাবেশে যাচ্ছিল। এটা যে ‘জয় বাংলা’র কতবড় অপমান, সেটা কি এই নরাধম পশুগুলো বুঝতে পারবে কোনদিন?

সাতই মার্চ, নারী নির্যাতন

মিছিল করেন, সমাবেশ করেন, শো-ডাউন করেন, কোন সমস্যা নাই। সাতই মার্চের ভাষণটার কি অসীম গুরুত্ব, বাংলাদেশের জন্মের পেছনে শেখ মুজিবুর রহমান নামের মানুষটার কি ভূমিকা- এসবের নাড়ি নক্ষত্রও কি এরা জানে? এরা কীভাবে পারে রাস্তায় মেয়েদের ধরে টিজ করতে, তাদের বুকের সাইজ নিয়ে গবেষণা করতে, চলন্ত বা থেমে থাকা গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে মেয়েদের গায়ে পানি ছুঁড়ে মারতে! সাতই মার্চ দিনটার মহিমা নষ্ট করার জন্যে এরাই যথেষ্ট।

এদের গায়ে ট্যাগ লাগানো থাকে ছাত্রলীগের, টিশার্টের পেছনে ‘অমুক ওয়ার্ড ছাত্রলীগ’ কথাটা লেখা থাকে, কিংবা মাথায় থাকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের ব্যান্ডানা। এই ছেলেগুলো ছাত্রলীগ নামটার ভার বোঝে? যে ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর হাতে গঠিত হয়েছিল, যে ছাত্রলীগ বাংলাদেশের জন্মের সময়টায় সব ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল, যে ছাত্রলীগের ইতিহাস রঞ্জিত হয়ে আছে শহীদ নূর হোসেনদের পবিত্র রক্তে, সেই ছাত্রলীগের ব্যানারে যখন এরা সাতই মার্চের দিনটার গৌরব নষ্ট করে, তখন লজ্জায়, ক্ষোভে মাথাটা হেঁট হয়ে আসে।

গতকাল ঢাকার কোন এলাকায় মেয়েরা লাঞ্ছনার শিকার হয়নি এই পশুগুলোর হাতে? বাংলামোটর থেকে কলাভবন, নীলক্ষেত থেকে টিএসসি, কিংবা সায়েন্সল্যাব থেকে কাকরাইল- কোথায় ছিল না এদের অত্যাচার? নির্যাতিত মেয়েগুলোর কেউ কেউ তাদের কষ্টটা শেয়ার করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, এভাবেই দু-চারজনের কথা জানতে পেরেছে অনেকে। আরও কতশত মেয়ে যে সম্মানের ভয়ে সবকিছু চেপে গেছে, সেটা তো অজানাই রয়ে গেল। মানসিকভাবে ভয়াবহ বিপর্যস্ত একটা  মেয়ে লিখেছে- “আমি এই শুওরদের দেশে থাকবো না। জয় বাংলা বলে যারা মেয়ে মলেস্ট করে, তাদের দেশে আমি থাকবো না!” কতটুকু আঘাত পেলে কলেজ পড়ুয়া একটা মেয়ে এই কথাটা বলতে পারে, সেটা ওই মিছিলের ‘দেশপ্রেমিক’ যুবকেরা কি কখনও ভাববে? 

সাতই মার্চ, নারী নির্যাতন

কাল তরুণদের একটি বিশাল অংশ যারা এসেছিল শাহবাগে (যেভাবেই এসে থাকুক না কেন), তাদের যদি প্রশ্ন করা হতো- জাফর ইকবালের ওপর হামলা করাটা কি উচিত হয়েছে? আমি বাজী ধরে বলতে পারি, এদের মধ্যে অধিকাংশই ‘হ্যাঁ’ বলতো! আওয়ামী লীগ যদি কোনদিন খাদে পড়ে, তাহলে বোধ করি ছাত্রলীগের জন্যেই পড়বে। সৎভাবে রাজনীতি করলে আপনাকে কেউ চিনবে না এখন, অথচ আপনি বিশ হাজার টাকা খরচ করে একশোটা লোকের একটা মিছিল বের করেন, ঠিকই লোকে জানবে আপনার নাম, এলাকার পাতি নেতা হিসেবেও খ্যাতি পেয়ে যাবেন দুইদিনেই। যে মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকনাম জানে না, ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের একটা অনুচ্ছেদ জিজ্ঞেস করলে যে লোক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে, সেও এখন বিশাল নেতা। আর এই নেতা নামধারী কুলাঙ্গারদের আজেবাজে কাজের জন্যেই মানুষের মনে বিতৃষ্ণার জন্ম হচ্ছে এই দলটার প্রতি। সেটা হাইকমান্ডের কেউ কখনও খেয়াল করেছেন? কে জানে! আমার তো মনে হয় না!

সাতই মার্চ, নারী নির্যাতন

তাই বলে ছাত্রলীগে কি ত্যাগী নেতাকর্মী নেই? বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে দলটায় যোগ দিয়েছেন, অর্থের লোভে নয়, ক্যারিয়ার বানাতে নয়- এমন কেউ কি নেই? নিশ্চয়ই আছে! কিন্তু কজন ছাত্রলীগ নেতা কাল ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন, এই নরাধমদের খুঁজে বের করার পর ছাত্রলীগ স্বয়ং মামলা করবে ওদের বিপক্ষে? কজন ছাত্রলীগ নেতা আক্ষেপ করেছেন, দুঃখপ্রকাশ করেছেন? আদৌ কি কেউ আছেন? বরং প্রায় সবার কথার তো একটাই সুর, ‘এসবই ষড়যন্ত্র, প্রোপাগান্ডা…’ 

সাতই মার্চের সেই ভাষণের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে তিনি সবার সামনে এসেছেন। জাতির জনক কোনদিন কল্পনাও করেননি হয়তো, সাতচল্লিশ বছর পরে এক সাতই মার্চে তার দেশের কয়েকজন মেয়েকে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কিছু কুলাঙ্গারের হাতে নিজেদের অপমানের কথা লিখতে হবে, যারা কিনা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিতে দিতে মেয়েদের গায়ে হাত তোলে!

আমি বিশ্বাস করি, ‘জয় বাংলা’ কোনদিন কোন মানুষরূপী পশুর স্লোগান হতে পারে না। জয় বাংলা বাঙালির স্লোগান, কোন নারী নির্যাতনকারী অমানুষের নয়। গতকাল যারা ‘জয় বাংলা’ শব্দ দুটো উচ্চারণ করতে করতে মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছে, পানি ছুঁড়েছে, ধাক্কা দিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি ভেঙেছে, সেইসব কুলাঙ্গারদের সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা। ‘আপনারা’-ই এদেশের ভবিষ্যৎ… 

Comments
Spread the love