জোকার।

সর্বগ্রাসী একটি চরিত্র, যা সত্ত্বার সতীত্ব হনন করতে সক্ষম। ডিসি কমিকের এই সুপারভিলেনের জন্ম ১৯৪০ সালের ২৫শে এপ্রিল। ব্যাটম্যানের ভয়ঙ্কর এই আতংকের জন্ম নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। বেশ কয়েকটি ব্যাকস্টোরি দেয়া হলেও জোকারের ডেফিনিট অরিজিন ডিসি কমিকেও ক্লিয়ার করা হয়নি। এ ব্যাপারে মহামতি জোকার নিজেই বলেন,

“Sometimes I remember it one way, sometimes another… if I’m going to have a past, I prefer it to be multiple choice!”

দাবি করা হয়, জোকার চরিত্রটিকে সৃষ্টি করেছেন তিন জন মিলে। বিল ফিংগার, বব কেইন, জেরি রবিনসন। বব আর জেরি ডিজাইন করেছেন; বিল লিখেছেন। তবে জোকারের জন্ম কিন্তু হয়েছে অন্য একটি চরিত্র দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে! ভিক্টর হুগো’র লেখা রোমান্টিক মেলোড্রামাটিক উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি একই নামের সিনেমা ‘দ্যা ম্যান হু লাফস্’ (১৯২৮) এর কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘গুইনপ্লেইন’ ভূমিকায় অভিনয় করা ‘কনরাড ভেইদ্ট’ এর আদলে জোকারকে আঁকা হয়। ১৯৫১ সালের ফেব্রুয়ারীতে, ডিসি কমিকের ডিটেকটিভ সিরিজের ১৬৮ সংখ্যায় দেখানো হয় যে জোকার একজন সাধারন ল্যাবরেটরি ওয়ার্কার। সে তার মালিকের কাছ থেকে মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করে রিটায়ার করতে চায়। তাই সে মুখোশ পরা সন্ত্রাসী সেজে ‘রেড হুড’ নামে ক্রাইম করতে গেলে ব্যাটম্যানের কাছে ধরা পড়ে। এবং ঘটনাক্রমে কেমিকাল ওয়েস্টের ভেতর ডুবে গিয়ে সাদা চামড়া, লাল ঠোঁট, সবুজ চুলের হয়ে যায় এবং মুখবিকৃতি হয়ে বিদ্রূপহাস্যে পরিণত হয়। এই হচ্ছে এখন পর্যন্ত দেখানো জোকারের সর্বোচ্চ উৎপত্তি।

j

সেলুলয়েডে জোকারের পথচলা শুরু হয় ১৯৬৬ সালের ব্যাটম্যান মুভিতে সিজার রমেরো’র হাত ধরে। এরপর ১৯৮৯ সালের ব্যাটম্যান মুভিতে জোকার হাল ধরেন লিজেন্ড জ্যাক নিকলসন। অতঃপর ২০০৮ সালে ক্রিস্টোফার নোলানের দ্যা ডার্ক নাইটে জোকারের ভূমিকায় অভিনয় করে নিজেকে লিজেন্ডের পর্যায়ে নিয়ে যান হিথ লেজার। ২০১৬ তে এসে জোকারের প্রত্যাবর্তন ঘটান মেধাবী অভিনেতা জ্যারেড ল্যাটো। এছাড়া এনিমেটেড সিরিজ এবং ভিডিও গেমসে জোকারের চরিত্রে কন্ঠ দিয়েছেন মার্ক হ্যামিল।

বলাবাহুল্য, জ্যাক নিকেলসনের জোকার ছিলো একদম কমিক বুক থেকে উঠে আসা জোকার। কমিক বুক অনুযায়ী, বেষ্ট জোকার। আর হিথ লেজারের জোকার ছিলো ইম্প্রোভাইসড, এবং সে জোকার নিজেকে এক আলাদা পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সুইসাইড স্কোয়াডের জোকার ডিজাস্টার দেখার পর মনে হচ্ছে, কেউ আর হয়তো হিথ লেজারের জোকারের উচ্চতায় পৌঁছুতে পারবে না। জ্যাক নিকলসনের সাথে হিথ লেজারের তুলনা করাটা হচ্ছে বোকামী। তুলনা করতে হলে পুরো ফিল্মোগ্রাফী টানতে হবে। যেখানে হিথের ক্যারিয়ার শুরু হবার আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। তবে এখানে মজার ব্যাপার হচ্ছে, নিকলসন যখন জোকারের চরিত্রে রুপদান করেন, তখন তার ক্যারিয়ার অলরেডি লিজেন্ডারি আর হিথ লেজার জোকার চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে লিজেন্ডারি বানিয়েছেন।

jj

জোকারের জন্য লিটারেলি প্রাণ দিয়ে গিয়েছেন এই অভিনেতা। মাসের পর মাস একা একটি মোটেলে থাকা, নিজেকে চরিত্রের সাথে একদম মিশিয়ে ফেলা, মেথড এক্টিংয়ের একদম রফাদফা করে দেয়া। জোকারের মেকআপ নিজে করা, ক্লোজ শটগুলা নিজে নেয়া, বলতে গেলে জোকার চরিত্রটা নোলানের কাছ থেকে ছিনতাই করে নিজের মতো পরিচালনা করেছেন। তার ফলাফলস্বরূপ, ২০০৮ সাল থেকে জোকারের অর্থই বদলে দেন তিনি। এটা যে সর্বগ্রাসী চরিত্র সেটা নিয়ে আগেই তাকে সাবধান করেছিলেন সিনিয়র নিকলসন। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি, দ্য ডার্ক নাইটের এডিটিং চলাকালে প্রেস্ক্রাইবড ড্রাগ ইন্টক্সিকেশনের কারণে কার্ডিয়াক এরেষ্টে মারা যান। এখানে আবারো বলাবাহুল্য, সেল্যুলয়েডের ইতিহাসে হিথ লেজারই প্রথম অভিনেতা যিনি কোনো কমিকবুক চরিত্রে অভিনয় করে অস্কার জয় লাভ করেন। তবে আফসোস, এই পাহাড়সম জনপ্রিয়তা দেখে যেতে পারেননি।

হিথ লেজার আর জ্যারেড ল্যাটো নিয়ে কথা বলতে গেলে একটা ব্যাপারে বলতেই হয়। হিথ জোকার হয়ে অস্কার জিতেছে, আর ল্যাটো অস্কার জিতে এসে তবে জোকার হয়েছে। হ্যাঁ, অস্কারকে এখানে কিছুর একক ধরা হচ্ছেনা। যেহেতু তাদের মুভি দেখি তাই তাদের কাজ নিয়ে তাদের নিজেদের মূল্যায়নকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। তবে জ্যারেড ল্যাটো জোকারের প্রতি একদমই সুবিধে করতে পারেননি, তাকে স্রেফ পাড়ার সেই পাতি মাস্তানের মতো লেগেছে যে কিনা ফ্যাশন ডিজাষ্টার হয়ে মেয়েদের পিছনে ঘুরতেই বেশি পছন্দ করে। যদিও তার চরিত্রটি ক্যামিও ছিলো, সেক্ষেত্রে স্যার এন্থনি হপকিস্নের রেফারেন্স দিতে হয়। ১৯৯১ সালে সাইলেন্স অফ দ্যা ল্যাম্বস্ মুভিতে হানিবল লেক্টারের ভূমিকায় পর্দায় অল্প কিছুক্ষণের উপস্থিতি এতটাই প্রভাব ফেলেছিলো যে অস্কার তো জিতেছিলেনই, সাথে চরিত্রটিকে নিজের সম্পত্তি বানিয়ে ছেড়েছিলেন। সুতরাং বাজে স্ক্রিপ্ট বা এডিটিং যাই হোক না কেন, জনাব জ্যারেড ল্যাটো আপাতত ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে জোকার হয়েই রইবেন, অন্তত আমার কাছে।

সোজা বাংলায় জোকার আসলে মানসিক বিকারগ্রস্থ। তবে ছোটবেলায় ব্যাটম্যানকে ভালো লাগলেও, বড় হবার সাথে সাথে এই বিকারগ্রস্থের কথাবার্তাই বেশি সেন্স মেইক করতে লাগলো। হয়তো ইটস্ নট এবাউট মানি, ইটস্ এবাউট সেন্ডিং আ ম্যাসেজ। আর তার ম্যাসেজগুলোয় ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে নিজের অজান্তেই কীভাবে যেনো জোকারভক্ত হয়ে গেলাম। ইভেন দ্য ডার্ক নাইটেও চাচ্ছিলাম ব্যাটম্যান হেরে যাক। একটা সময় ছিল, যখন আমার ফেসবুক আইডিতে আমার চাইতে জোকারের ছবি বেশি ছিল। এমনকি প্রোফাইল পিকচারেও জোকার ঝুলতো বেশিরভাগ সময়। আইডি পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু জোকারের প্রতি আসক্তি এখনো বিন্দুমাত্র কমেনি। ২০০৪ সাল থেকে নিয়মিত মুভি দেখি, শুধু দেখি বললে ভুল হবে, মুভি খাই আমি! সাইকোপ্যাথ, গ্যাংস্টার, ক্লাউন প্রিন্স বা এজেন্ট অফ ক্যাওয়াস… যা-ই হোক না কেন, এই এক যুগে জোকার চরিত্রটার মতো করে কেউ কখনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, কখনো পারবেও না বোধ হয়।

উইথ ডিউ রেস্পেক্ট টু জ্যাক নিকলসন’স জোকার, সরি। জ্যারেড ল্যাটো ইজ নট মাই জোকার, হিথ লেজার ইজ, অ্যান্ড অলওয়েজ উইল বি।

আরও পড়ুন-

Comments
Spread the love