স্যার এলেক্স ফার্গুসন- নামটি ফুটবলের খোঁজখবর রাখা সকলেরই জানার কথা। স্যার এলেক্স ফার্গুসনকে মনে করা হয় সর্বকালের সেরা কোচ/ম্যানেজারদের একজন। ১৯৮৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৭ বছর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করা এই জিনিয়াস কেন তাঁর কোচিং লাইফে এতো সফল ছিলেন? ৩২ বছর বয়সে সপ্তাহে ৪০ ইউরোর বিনিময়ে কোচিং শুরু করা ফার্গুসন হয়তো জানতেনই না যে ম্যানেজার হিসেবে এতো সফলতা তাঁর পায়ে লুটাবে। এবারডিন ক্লাবে কোচিং করানোর সময় তাঁর বয়স টিমের খেলোয়াড়দের তুলনায় অতো বেশি ছিল না। তবুও এবারডিন ইউরোপিয়ান কাপে বায়ার্ন মিউনিখ, রিয়াল মাদ্রিদদের মতো জায়ান্টদের হারিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে শিরোপা জিতে নেয়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে আসা সেদিনই ঠিক হয়ে যায় হয়তো ফার্গুসনের। ২৭ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে তিনি অনেক চড়াই উতরাই দেখেছেন। কিন্তু ঠিকই শেষমেষ নিজের দলকে নিয়ে বিজয়ীর বেশে ফিরেছেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তথাকথিত ফুটবল লেজেন্ডদের প্রায় কেউই ছিল না একটা সময়। ছিল কেবল একাডেমি থেকে আসা কিছু ইয়ং ট্যালেন্ট। যাদের চিনতে ফার্গুসনের জহুরি চোখ ভুল করে নি। তাই তো স্কোলস, গিগস, কিন, রোনালদোরা লিজেন্ড হয়েছেন তাঁরই হাত ধরে।

স্যার ফার্গুসন, ফার্গি টাইম, এলেক্স ফার্গুসন

কিন্তু তাই বলে এতো দীর্ঘ সময় ধরে সাফল্য বজায় রাখার রহস্য কী? ম্যানেজার হিসেবে এমন কিইবা করেছিলেন তিনি যে এতটা সফল হয়েছিলেন। কেন তাঁর ম্যানেজার জবকে এতো ভালোবাসতেন ফার্গুসন, কেন তাঁর বিদায়ে কেঁদেছিল পুরো ফুটবল বিশ্ব? কারণ স্যার এলেক্স ফার্গুসন তাঁর কাজকে ইঞ্জয় করেছেন পরিপূর্ণভাবে। ফার্গুসন ৩ টি বিষয়ের দিকে খেয়াল রেখেছিলেন বলেই এতো সফল হয়েছিলেন তাঁর জবে। নিজের অজান্তেই হয়তো তিনি তাঁর জবকে মিজারেবল হতে দেননি। তিনি দলের মাঝে কোন Anonimity রাখেননি। অর্থাৎ, দলের প্রত্যেকে প্রত্যেকের সম্পর্কে অবগত ছিল। একাডেমি থেকে আসা ফুটবলাররা তো আগে থেকেই পরিবারের মতো ছিল, তারপর দলে থাকা বাইরের দেশের খেলোয়াড়-স্টাফদেরও এক সুতোয় গেঁথে রাখতেন ফার্গুসন। তাই তো রোনালদো পর্তুগাল থেকে এসেও সেখানে পরিবার খুঁজে পেয়েছিলেন। স্কোলস-নেভিল-গিগসরা হরিহর আত্মা ছিল। যে কারণে এক দল হয়ে তারা খেলতে পেরেছিল মাঠে। বুঝতে পেরেছিল যে তাদের মাঝে কোন Irrelevance নেই। অর্থাৎ, ফার্গুসনের দলটির সবাই জানতো যে তাঁরা কাদের জীবনে ইমপ্যাক্ট ফেলছে। গিগস জানতো যে, সে এসিস্ট করলে কেবল রোনালদো গোল পাবে না বরং পুরো টিমের জয় আসবে, তাঁর ভাইয়ের মতো আপন টিমমেটরা জয়ী হবে, তাঁর পরিবারের মতো ফ্যানবেস খুশি হবে। তাই সে বুঝতো যে ঠিকমতো এসিস্ট করাটা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই প্রতিদিনের প্র্যাকটিসে সেট পিস এড করে সে মেজার করতো তার খেলাটা, যেন মূল খেলায় কোন কমতি না থাকে। ফার্গুসনের এই টিমটাতে তাই Immeasurement এর কোন চিহ্ন ছিল না। ফার্গুসন খুবই কড়াকড়ি করতেন, যেন খেলোয়াড়রা নিজের প্রতিদিনের কাজগুলোকে নিজেরাই মেজার করতে পারে। এতে করে নিজের কাজ নিয়ে কনফিডেন্স আর নিজের প্রগ্রেস নিয়ে আত্মতৃপ্তি দুটোই থাকে। খালি চোখে মনে হতে পারে- আরে ভাই, এগুলা কিছুই না। কী ট্যাকটিকস ইউজ করেছেন, কী ফরম্যাশনে খেলিয়েছেন সেগুলো বলেন। কিন্তু আদতে এই কাজগুলোই প্রধান, বাকিসব গৌণ। এ কারণেই ম্যানেজার এলেক্স ফার্গুসন ‘স্যার’ হয়েছেন, এজন্যই তাকে সর্বকালের সেরা ফুটবল ম্যানেজার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফার্গুসনকে নিয়ে আসা নিছকই উদাহরণ দেয়ার জন্য। মূল আলোচনা জব মিজারেবল হওয়ার ৩ টি সাইন নিয়েই। প্রথম কথা হচ্ছে কোন জবটিকে আপনি মিজারেবল বলবেন?

  • জবে বেতন কম, এজন্য মিজারেবল?
  • জবে খাটুনি বেশি, এজন্য মিজারেবল?
  • বস খারাপ, সহকর্মীরা কথা কানে লাগায়, এজন্য মিজারেবল?

এই সবগুলো কারণই খুব গৌণ কারণ, মোটা দাগে এগুলো আপনার জবকে মিজারেবল করে না। আপনার জব মিজারেবল তখনই হয় যখন সকালে উঠে কর্মস্থলে আপনার যেতে ইচ্ছে করবেনা, আর গেলেও বারবার ফিরে আসার জন্য মন আকুপাকু করবে। আর জব মিজারেবল হওয়ার কিছু সাইন আছে, যেগুলো বিশ্লেষণ করলেই ছোটখাটো অপ্রাপ্তি আর বাঁধাগুলো ঢাকা পড়ে যাবে। একটি জব মিজারেবল হওয়ার ৩ টি কারণ-

* Anonymity (অস্তিত্বহীনতা)
* Irrelevance (অপ্রাসঙ্গিকতা)
* Immeasurement (অপরিমাপ্যতা)

অস্তিত্বহীনতা– আপনার জবে আপনি পূর্ণতা পাবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার সহকর্মীদের সম্পর্কে আপনি অজানা থাকেন। জবে বেশিরভাগ কাজই টিমওয়ার্ক ডিপেন্ডেন্ট, তাই একটা টিমের কাজ তখনই পূর্ণতা পায় যখন টিমের মানুষগুলো একে অপরের সম্পর্কে জানে। আপনি জানেন আপনার সহকর্মীটির পছন্দ-অপছন্দ, কোন ধরণের গান শুনে সে রিল্যাক্সড ফিল করে, কোন খাবারটি পেলে তার সাথে অবশ্যই শেয়ার করে খেতে হবে, কোন এটিচিউড দেখলে সে রেগে যাবে হুট করে। এর ফলে দলগতভাবে কাজ করতে গেলে একজন আরেকজনের কাজের প্যাটার্ন আন্দাজ করতে পারে ফলে কাজ স্মুথলি হয়ে যায়, কাউকে দায় চাপাতে হয় না। আপনি যদি ঘরে এক মানুষ হন আর কর্মস্থলে অন্য তাহলে আপনার দ্বৈত অস্তিত্ব আপনার কাজকেও অস্তিত্বহীনতা প্রদান করবে।

অপ্রাসঙ্গিকতা– আপনার কাজটা কারও না কারও জন্য ম্যাটার করে, এ বোধটা থাকতে হবে। আর এই বোধ তখনই আসবে যখন আপনি অস্তিত্বহীনতায় ভুগবেন না। অর্থাৎ, আপনি যে কাজ করছেন সেটির ফল আপনি ছাড়া আরও মানুষ পাচ্ছে। যেমন যেকোনো টিমওয়ার্কের পর দিনশেষে সে কাজের ফল হিসেবে প্রতিটা মানুষই বেতন পাচ্ছে বা স্বীকৃতি পাচ্ছে। এখন যদি আপনি আপনার কাজ ঠিকমতো না করেন তাহলে টিমওয়ার্ক হিসেবেও সেটি সফল হবে না, হয়তো জরিমানা বা ব্যর্থতায় সেটির ভুল চুকোতে হবে সবাইকে। অর্থাৎ আপনি যা’ই করেন না কেন সেটির একটা ইমপ্যাক্ট পড়ছে আরও মানুষের জীবনে। তাই আপনার করা কাজের জন্য কারও জীবনে যদিএকটা পজেটিভ চেঞ্জ আসে তাহলে সে কাজটা আপনাকে পূর্ণতা দেয়, তাকে আর দুর্দশা বলে মনে হয় না।

অপরিমাপ্যতা-
আপনার কর্মক্ষেত্রে আপনি আপনার মতোই, আপনি অন্যান্য মানুষের জীবনে ইমপ্যাক্টও ফেলছেন। কিন্তু কোন কাজগুলোর কারণে তা করতে সক্ষম হচ্ছেন সেগুলো যদি আপনারই জানা না থাকে তাহলে তো সে কাজগুলো দিয়ে আপনার কী উন্নতি হচ্ছে, কী পূর্ণতা পাচ্ছেন সেটিও অজানা থেকে যাবে। তাই আপনার কাজগুলো আপনারই পরিমাপ করতে হবে। আর যদি অপরিমাপ্য থেকে যায় সে কাজগুলো তাহলে তো জব দুর্দশাপূর্ণই হয়ে রবে।

প্যাট্রিক লিঞ্চিওনির The Three Signs of a Miserable Job বইটিতে এই সাইনগুলোই লেখক খুঁজে বের করেছেন একটি জবের মিজারেবল হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে। যদিও তিনি পুরো বইটি একটি ম্যানেজার বা সিইওর পারসপেক্টিভ থেকে লিখেছেন কিন্তু এটিও বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন যে পুরো ব্যাপারটিই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একজন ম্যানেজার এই সাইনগুলো খুঁজে সমাধান করে ইমপ্লয়িদের মিজারেবল জবগুলোকে ড্রিম জব বানিয়ে দিতে পারে। আবার ইমপ্লয়িরা নিজেও চাইলে তাদের নিজেদের ও ম্যানেজারের জবটিকেও স্বপ্নের মতো সুন্দর করে দিতে পারে। এখানে আমরা পাই ব্রায়ান বেইলি নামের একজন প্রাক্তন সিইওকে, যিনি কিনা সিইও ছিলেন একটি মিডিয়াম সাইজড এক্সারসাইজ ইকুইপমেন্ট কোম্পানির। তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান জেএমজি থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়ার পর তিনি অবসর যাপন করতে গিয়ে একটি ছোট্ট ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টের সাথে যুক্ত হয়ে যান। সেখানে গিয়েই তিনি আবিষ্কার করেন এই সাইনগুলোকে, এই সাইনগুলো নিয়ে আগেও তিনি কাজ করেছেন কিন্তু তখন সেগুলোকে আলাদা করে থিওরি বানাতে পারেননি। একটি স্বল্পব্যস্ত রেস্টুরেন্ট, সেখানকার কিছু অনিচ্ছুক কর্মী ও তাদের দুর্দশাপূর্ণ জবগুলোই তাকে এই সাইনগুলো স্ট্যাবলিশ করতে সহায়তা করেছে।

ব্রায়ান প্রথমেই আবিষ্কার করেছিলেন যে, তার রেস্টুরেন্টের স্টাফরা একে অপরকে জানে না, তাই তিনি ঘরোয়া আড্ডায়, উৎসবে আর পছন্দের মিল দিয়ে পরিচয় করে দিয়েছেন একে অপরকে। তারপর তিনি দেখেছেন যে ওদের কাজগুলো যে ম্যাটার করে সেটি সম্পর্কে ওদের কোন আইডিয়া নেই। তাই তিনি ওয়েট্রেস থেকে শুরু করে ডিশওয়াশার প্রত্যেককে তাদের কাজের ইম্পরট্যান্স বুঝতে সাহায্য করেন। এক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করে তার ইমপ্লয়িরাই কারণ তিনি তাদের মাঝে একটা বন্ড ততদিনে তৈরি করে দিয়েছিলেন। আর ব্রায়ান প্রথমে বেতন বাড়িয়ে ও পরে কাজের পূর্ণতা অনুভব করিয়ে তাদের কাজগুলোকে মেজার করতে শিখিয়েছেন যাতে করে তাদের প্রগ্রেস তারা নিজেরাই বুঝতে পারে এবং উন্নতির সুর এক স্কেল থেকে অন্য স্কেলে চড়ায় তুলতে পারে। ব্রায়ানের হাত ধরেই প্যাট্রিক আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন মিজারেবল জবের ৩ টি সাইনের সাথে। ম্যানেজার-ইমপ্লয়ির কো-রিলেশনের সাথে। এখানে ম্যানেজার যেমন ইমপ্লয়ির জব লাইফে ইমপ্যাক্ট ফেলতে পারে তেমনি ইমপ্লয়িও ম্যানেজারের লাইফে ইমপ্যাক্ট ফেলে।

আবার প্যাট্রিক যে সাইন ৩ টির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন সে সাইনগুলোর ক্রমানুসারের যৌক্তিকতাও বুঝিয়ে দিয়েছেন।

Anonymity 

Irrelevance

Immeasurement

Anonymity– makes you Irrelevant.
Irrelevance– makes you Immeasurable.
Immeasurement– makes you Anonymous.

অস্তিত্বহীনতা আপনাকে বুঝিয়ে দেয় যে, আপনি কারও জীবনে ইমপ্যাক্ট ফেলছেন না। কারও জীবনে আপনার প্রভাব না জানলে আপনার কাজ কী সেটাও আপনি জানবেন না ও পরিমাপ করতে পারবেন না, আর আপনি কী কাজ করেন না জানলে আপনার কোন অস্তিত্বও থাকবে না। আর এই সবগুলো মিলেই আপনার জবকে মিজারেবল করে তোলে। তাই তো একজন রকস্টার কোটি কোটি টাকা কামানো সত্ত্বেও অস্তিত্বহীনতায় ভুগে, নিজের কাজের ইমপ্যাক্ট না বুঝে মিজারেবল জবে জীবন ব্যয় করে আর একজন রিকশাওয়ালা তার গ্যারেজের রিকশাচালকদের সাথে আড্ডা দিয়ে, সারাদিন অমানুষিক পরিশ্রম করে, জমার টাকা দেয়ার পরেও প্যাসেঞ্জারদের হাসি ঝুলিতে করে আর বাকি টাকা দিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে সুখে শান্তিতে বসবাস করে।

এখন সিদ্ধান্ত আপনার! আপনি আপনার মিজারেবল জবকে সুখী বানাবেন নাকি সুখীকে মিজারেবল! আপনি স্যার এলেক্স ফার্গুসন হবেন নাকি স্যার মিজারেবল?

তথ্যসূত্র- The 3 Signs of a Miserable Job

আরও পড়ুন-

Comments
Spread the love