অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

ব্যর্থতা থেকে বিশ্বজয়ের গল্প

পঁচিশ বছর বয়সে তিনি মা’কে হারিয়েছিলেন। সাতাশ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। কিন্ত মদ্যপ স্বামীর অত্যাচার সইতে না পেরে তাকে ছেড়ে চলে আসেন বৃটেনে। কোলে ছোট্ট সন্তান, চাকুরী নেই, পকেটে টাকা নেই, পেটে খাবার নেই, এমন একটা মানবেতর জীবন তিনি কাটিয়েছেন বছরের পর বছর। লেখিকা হতে চাওয়া এই মানুষটা পেটের দায়ে কাজ করেছেন কফি শপে, রেস্টুরেন্টে।

তবুও তিনি হাল ছেড়ে দেননি, নিজের স্বপ্নের পেছনে ছোটা বন্ধ করে দেননি। অনেকগুলো বছর পরে তার হাতেই লেখা হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত হ্যারি পটার সিরিজ, যে উপন্যাস আমাদের শৈশব আর কৈশরকে রাঙিয়ে দিয়েছিল। বলছি হ্যারি পটারের লেখিকা জে কে রাওলিং- এর কথা। জীবনের প্রথম দিনগুলোতে ব্যর্থতায় ডুবে থাকা এই মানুষটা ব্যর্থতাকেই সাফল্যের মূলমন্ত্র বানিয়েছিলেন। ফোর্বস তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে ধনী লেখিকা হিসেবে!

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে এসে জে কে রাওলিং শুনিয়েছিলেন নিজের জীবনের গল্প, ব্যর্থতার গল্প, আর সেই ব্যর্থতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সফল হবার গল্প। আজ জে কে রাওলিং এর জন্মদিন। ‘এগিয়ে চলো’র পাঠকদের জন্যে সেই বক্তৃতাটা তুলে ধরা হলো আজ।

শুভ সকাল, সবাইকে স্বাগতম। নিজেকে নিয়ে আমার খুব গর্ব হচ্ছে আজ, তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরে। একুশ বছর আগে আমার জীবনেও এমন একটা দিন এসেছিল, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুক্তির প্রহর গুণছিলাম আমি তখন।

তোমাদের সামনে এসে কি বলবো, সেটা নিয়ে অনেক ভাবতে হয়েছে আমাকে। আমি ভেবেছি, তোমরা যেখানে বসে আছো, সেখানটায় বসে আমি কোন কথাগুলো শুনতে চাইতাম? ভারী উপদেশ? নাকি বন্ধুর মতো কিছু পরামর্শ? বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছি একুশ বছর হয়ে গেছে, এখন আমার কি মনে হচ্ছে জানো? এই যে এতগুলো বছর কাটিয়ে ফেললাম জীবনের, যে জার্নিটা করেছি, সেখান থেকে কি শিখেছি, কি পেয়েছি, এটুকু অন্তত তোমাদের জানানো উচিত। এই কথাটা অন্তত তোমাদের কাঁধে হাত রেখে জানিয়ে দেয়া উচিত যে, হেরে যাওয়া মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়!

এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি যখন একুশ বছর আগের সেই সময়টাতে ফিরে যাই, তখন বুঝতে পারি কতটা বদলে গেছি আমি, সময় কতখানি বদলে দিয়েছে চারপাশটাকে। সেদিনের সেই চঞ্চল তরুণী আর আজকের আমার মধ্যে বিশাল পার্থক্য। ওই বয়সটা ছিল ভীষণ অনিশ্চিত, কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কিছুই ছিল না তখন। নিজের আকাশে উড়তে থাকা একটা স্বাধীন ঘুড়ির মতো ছিলাম আমি। অথচ আমার কাছে আমার পরিবার বা কাছের মানুষদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। দুটোর পার্থক্য ছিল আকাশচুম্বী।

আমার জীবনে একটাই স্বপ্ন আমি দেখেছি, সেই কিশোরী বয়স থেকে সেটাকে আমি মনের ভেতরে লালন-পালন করেছি। একটা উপন্যাস লিখবো আমি, বিশাল কলেবরে, অনেকগুলো চরিত্র নিয়ে। মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়বে আমার লেখা উপন্যাস পড়তে, বইয়ের দোকানে ভীড় লেগে যাবে, আর আমি দূর থেকে সেই দৃশ্যটা দেখবো।

আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে যা হয়, ছেলে বা মেয়ে লেখালেখি ব্যাপারটাকে নেশা কিংবা পেশা হিসেবে নিতে চাইলে বাধা আসবেই। আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। আমার বাবা-মা কেউই চাইতো না আমি লেখক হই, কারণ এতে জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। আমার বাবা মা দুজনেই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছেন, কেউই কলেজ পর্যন্ত লেখাপড়া করেননি। আর তাই আমার ইচ্ছেটা তাদের কাছে একটা ছেলেমানুষী জেদ ছাড়া আর কিছুই মনে হলো না। লেখালেখি করে যে টাকা-পয়সা আয় করা যায়, সেটা তখন তাদের বিশ্বাসই করাতে পারিনি আমি।

আমি কলেজে ভর্তি হবার সময় ইংরেজী সাহিত্য পড়তে চেয়েছিলাম। কিন্ত সেটা আমাকে পড়তে দেয়া হলো না, আমাকে ভর্তি করানো হলো আধুনিক ভাষাশিক্ষায়(মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজ)। ভর্তির কাজ শেষ করে বাবা-মা কলেজ গ্রাউন্ড থেকে বেরুনোর সাথে সাথেই অ্যাডমিশন অফিসে ছুট দিলাম আমি, বিভাগ পাল্টে সাহিত্য নিলাম। পুরো চারটা বছর আমার বাবা-মা জানতেন যে আমি মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজে পড়ছি। সমাবর্তনের দিন এসে তারা দেখলেন আমি সাহিত্যে গ্র‍্যাজুয়েশন করেছি!

তোমরা ভাবছো, আমি বুঝি আমার বাবা-মা’কে দোষারোপ করছি আমার ইচ্ছেগুলো পূরণে বাধা দেয়ার জন্যে? একটুও না। আমার বাবা-মা আর পাঁচজনের মতোই সোজা পথে চিন্তা করতেন। সেটা হয়তো আমার ভাবনার সাথে মিলতো না সবসময়, কিন্ত কখনও, কোনদিন আমি তাদেরকে এজন্যে দায়ী মনে করিনি। খাবারের যেমন একটা মেয়াদোত্তীর্ণের সময়সীমা থাকে, তেমনই তোমার জীবনের সিদ্ধান্তগুলোর জন্যে বাবা-মা’কে দায়ী করারও একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। তুমি যখন বড় হয়ে যাবে, তখন তোমার জীবনের, তোমার ক্যারিয়ারের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর জন্যে শুধু তুমিই দায়ী থাকবে। সেটা ভালো হলেও, খারাপ হলেও। পৃথিবীর আর কেউ তোমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, কারো এখতিয়ার নেই এখানে।

অনেক বছর পরে, যখন আমি নিজে সন্তানের মা হয়েছি, তখন বুঝতে পেরেছি কেন আমার বাবা-মা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা ভালো একটা বিষয়ে পড়াশোনার ওপরে এত জোর দিয়েছিলেন। আমাকে যেন কখনও তাদের মতো অভাবী জীবন কাটাতে না হয়, সেজন্যেই তারা এতকিছু করেছিলেন। তারা সারাটা জীবন কাটিয়েছেন অভাবে, আজ এটা নেই তো কাল সেটা নেই, দুই বেলার খাবার জোগাড় করতেও প্রতি মূহুর্তে সংগ্রাম করতে হয়েছে তাদের। এজন্যেই আমি ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি, দারিদ্র‍্য কি অসহ্য রকমের ভয়ংকর একটা জিনিস!

লোকে বলে না, অভাব ঘরের দরজায় এলে নাকি ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়? কথাটা খানিকটা সত্যি। দারিদ্র‍্যতা জিনিসটা খুব কঠিন, খুবই খারাপ। মানুষের মানসিক শক্তি কমিয়ে দেয় এটা, স্বপ্ন দেখতে বাধা দেয় বারবার। আর অদৃশ্য একটা শিকলে আটকে ফেলে মানুষকে। অভাবের সেই নিকষ কালো অন্ধকার জায়গাটা থেকে একা নিজের উদ্যোগে হাতড়ে আলোয় বেরিয়ে আসতে পারাটা যে কি আনন্দের, কতটা খুশীর, সেটা যে কখনও এই অনুভূতিটা উপভোগ করেনি, তাকে বলে বোঝানো যাবে না। এটা বিশ্বজয়ের মতো একটা ব্যাপার।

তবুও, একুশ বছর আগে দারিদ্র‍্যতা আমার ভয়ের কারণ ছিল না। মোটামুটি খেয়ে-পরে চলার মতো অবস্থা আমাদের তখন ছিল। আমি ভয় পেতাম অন্য একটা জিনিসকে, সেটা হচ্ছে ব্যর্থতা! বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমাকে। ক্লাসে খুঁজে পাওয়া যেতো না, ছেলে-মেয়েদের আড্ডায় আমি থাকতাম না, আমার জায়গা ছিল কফিশপে। সেখানে বসে আমি গল্প লেখার চেষ্টা করতাম। আমার পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ ছিল না, কিন্ত পরীক্ষার খাতার এই নাম্বারগুলো আমাকে তৃপ্তি দিতো না একটুও। পরীক্ষার নাম্বার দিয়ে আসলে জীবনে খুব বেশিকিছু আসে যায় না।

সাফল্য জিনিসটা অনেকটা মরীচিকার মতো। তুমি হয়তো উচ্চশিক্ষিত, তুমি মেধাবী, তার মানেই যে তুমি সফল হবে, এটা কেউ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবে না। ভাগ্য খুবই অদ্ভুত একটা জিনিস, কখন যে এটা তোমাকে আকাশে তুলে দেবে, আর কখন ধুম করে মাটিতে নামিয়ে আনবে, সেটা তুমি বুঝতেও পারবে না হয়তো। আমাদের সবার জীবনেই তাই কমবেশি কষ্টের গল্প আছে, হেরে যাওয়ার গল্প আছে।

তুমি যখন জীবনে প্রথম কোনকিছুতে হেরে যাবে, তখন হঠাৎই আবিস্কার করবে এ পৃথিবী ভীষণ নিষ্ঠুর একটা জায়গা। এখানে পরাজিত মানুষদের জন্যে কোন ঠাঁই নেই। সবাই বারবার তোমার দিকে আঙুল তুলে তোমাকে মনে করিয়ে দেবে যে তুমি হেরে গিয়েছো। চলার পথে অসংখ্যবার তোমাকে সূক্ষ্ণভাবে অপমান করা হবে, সেসব তোমার গায়ে শেলের মতো এসে বিঁধবে। কিন্ত এটা করা উচিত নয়। ব্যর্থতার দিনগুলোতে অপমান গায়ে মাখানোটা খুবই বাজে রকমের একটা বিলাসিতা, আমি আমার নিজের জীবন থেকে এই শিক্ষাটা পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সাত বছর পর যখন আমি ব্যর্থতার চোরাবালিতে সাঁতরে যাচ্ছি, তখন এই জিনিসটা আমি প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম।

আমার বিয়েটা খুব বেশিদিন টেকেনি। চাকুরি ছিল না, আয়-উপার্জনের কোন ব্যবস্থাও ছিল না তখন। একমাত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে একা একটা মহিলা বিশাল একটা মেগাসিটিতে সংগ্রাম করছে, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম, সেটা যে কি দুঃসহ একটা পরিস্থিতি ছিল, কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। আমার বাবা-মা সারাজীবন যে ভয়টা করে এসেছিলেন, সেটাই সত্যি হয়েছিল তখন। দারিদ্র‍্যতার শক্ত শেকলে তখন আমি আগাগোড়া বাঁধা পড়ে গিয়েছি! সেই শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সাধ্য আমার ছিল না। তখন নিজের কাছেই নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে অপদার্থ আর ব্যর্থ মানুষ বলে মনে হতো।

আজ তোমাদের খুব আনন্দের একটা দিন, খুশীর দিন। এই দিনে এসে আমি কেন ব্যর্থতার গল্প শোনাচ্ছি জানো? কারণ এই ব্যর্থতাই তোমাকে সফল হবার রাস্তা দেখাবে। সমাজে বাস করে আমরা অনেক ধরনের নিয়মকানুন মেনে চলতে বাধ্য হই। চাইলেও অনেক কিছুই করা যায় না। কিন্ত যখন তুমি টানা ব্যর্থ হতে থাকবে, একটা সময় হারানোর মতো আর কিছুই থাকবে না তোমার, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে, তখন নিজেকে মুক্ত পাখির মতো মনে হবে তোমার। আর সেখান থেকেই সাফল্যের রাস্তা শুরু হবে, যদি তুমি চাও।

কে কি ভাবছে, আশেপাশের কে কি বলছে সেসবকে একটুও আমলে নেয়ার দরকার নেই। লোকের কাজ বলা, তারা বলবেই। বেঁচে থাকার জন্যে কিছু একটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা লাগে। তুমি তোমার অপূর্ণ স্বপ্নটাকে আঁকড়ে ধরো। সেই স্বপ্নটাকে পূরণ করার পথে ছুটে চলো। ব্যর্থ মানুষের এই একটা সুবিধা, নিজের ভেতরে অদ্ভুত একটা জেদ চেপে যায়, যারা বলে এসেছে তাকে দিয়ে কিছুই হবে না, সেইসব নিন্দুকদের দেখিয়ে দেয়ার জেদ। সেই জেদটাই সাফল্যের মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করে।

একদিন ঘুম থেকে উঠে আমার মনে হলো, এই পৃথিবীতে আমার মতো ব্যর্থ মানুষ আর একটাও নেই। কিন্ত আমি তো বেঁচে আছি, মরে তো যাইনি! আমার কোলজুড়ে একটা পরীর মতো বাচ্চা আছে, ঘরের এককোণে একটা সচল টাইপরাইটার আছে, আর বুকের মাঝে আছে লেখক হবার অদম্য বাসনা।

তোমার পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যাবে, ঠিক সেই মূহুর্তে তুমি বুঝতে পারবে, তুমি আসলে কতটা শক্তিশালী। কতখানি জেদ তোমার ভেতরে লুকিয়ে আছে, কতখানি বারুদ তোমার মনের ভেতরে জমা আছে। সাফল্যের জন্যে তুমি কি দারুণ ক্ষুধার্ত, সেটা তুমি তখন বুঝতে পারবে। পানিতে ভেসে যাওয়া মানুষ যেমন বাঁচার আশায় খড়কুটো আঁকড়ে ধরে, তুমিও তেমনি তোমার স্বপ্নটাকে আঁকড়ে ধরবে তখন। যে মানুষ ব্যর্থতার অনলে পোড়েনি, সে এই অনুভূতিটা কখনও বুঝতে পারবে না।

তাই আমি বারবার বলি, হেরে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়। হেরে যাওয়া মানে জীবনটাকে নতুন করে আবার শুরু করা, একদম প্রথম স্টপেজ থেকে। হেরে যাওয়া মানে নিজের সুপ্ত প্রতিভাগুলোকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা, নিজের অপার সম্ভাবনার বন্ধ দরজাটা খুলে দেয়া, হেরে যাওয়া মানে নিজের স্বপ্নের পেছনে নতুন করে ধুমকেতুর মতো ছুটে চলা।

ব্যর্থতাকে আমি তাই ভীষণ ভালোবাসি। ব্যর্থতাকে আমি বুকে টেনে নিয়েছি ভালোবেসে। এই ব্যর্থতাই আমাকে সাফল্যের পথে নিরন্তর ছুটে চলার প্রেরণা যোগায়, মানসিক শক্তি দেয়। ব্যর্থতাকে তাই আমার জীবনের আশীর্বাদ হিসেবে মেনে নিতে আমার একটুও আপত্তি নেই।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close