মাত্র দুই বছর আগেও খারদুংলা পাস কোনো বাংলাদেশি জয় করতে পারেননি। ২০১৬ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে নিয়াজ মোর্শেদ খারদুংলা পাস জয় করেন, সাইকেল চালিয়ে। আর এ বছর খারদুংলা পাস জয় করে অসামান্য কৃতিত্বের নজির স্থাপন করলেন একজন বাংলাদেশি তরুণী। জিনিয়া তাবাসসুম প্রথম বাংলাদেশি নারী যিনি সাইকেল চালিয়ে এই দুঃসাধ্য খারদুংলা পাস জয় করলেন।

আপনারা যারা জানেন না, খারদুংলা পাস আসলে কি তারা আসলে বুঝবেন না এই খারদুংলা পাস বিজয়ের মাহাত্ম্যটা কী! খারদুংলা পাস সম্পর্কে তাহলে একটু বলি।

খারদুংলা পাস হচ্ছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতার হাইওয়ে। এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ ‘মোটরেবল রোড’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আঠারো হাজার তিনশ ফিট উঁচুতে এই খারদুংলা পাসের অবস্থান, যা কিনা এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের চেয়েও উঁচুতেও!

এই খারদুংলা পাস জয় করা সাইক্লিস্টদের কাছে এক পরম আরাধ্য ব্যাপার। আর এ কারণেই এটি জয় করা সহজ কোনো কাজ নয়, এর জন্য দরকার হয় প্রবল আরাধনার, নিজের মানসিকতার সাথে নিজের স্বপ্নের প্রতি ডেডিকেশন। আর সবচেয়ে প্রয়োজন হয় সাহসের, কারণ অনেকেই এই রুটটি এতটা কষ্টসাধ্য যে অনেকে শেষ মুহুর্তে হাল ছেড়ে দেন, আশা ছেড়ে দেন, ভাবেন আর পারবেন না। কিন্তু, জিনিয়া তাবাসসুম পেরেছেন। নারী পুরুষের পার্থক্য যারা করেন, যারা নারীদের বন্দী ভাবতে ভালবাসেন, যারা নারীদের সামর্থ্যকে অবিশ্বাস করেন, তাদের জন্য কী অসাধারণ এক জবাব হয়ে এসেছে জিনিয়া তাবাসসুমের এই অর্জন!

সবচেয়ে সুন্দর, অনুপ্রেরণার কথাটি হলো, এই অর্জনকে, এই স্বপ্নকে সত্যি করতে জিনিয়া তাবাসসুম পেরিয়ে এসেছেন অনেক বাধাবিপত্তি।

খারদুংলা পাস এমন একটি জায়গা যেখানে খাবারের সংকট থাকে, জলের সংকট থাকে আর সবচেয়ে বেশি যেটা হয় অক্সিজেনের সংকট! খারদুংলা পাসে নিঃশ্বাস স্তিমিত হতে থাকে, অক্সিজেনের অভাবে মানুষের দম আটকে যাওয়া অবস্থা। এই অবস্থায় শুধু অবিশ্বাস্য রকমের আত্মত্যাগ যিনি করতে পারেন, তিনিই কেবল খারদুংলার সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন।

জিনিয়া তাবাসসুমের এই যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। স্বপ্ন দেখার শুরুটা অনেক আগে। যখন সাইকেল চালানো শিখলেন, দুই চাকার এই বাহন নিয়েই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগতো তার। একদিন জানতে পারলেন খারদুংলা পাসের কথা। স্বপ্ন দানা বাঁধলো তার মনে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ মোটরেবল হাইওয়েতে দুই চাকার প্রিয় সাইকেলটা নিয়ে একদিন যাবেন, বাংলাদেশের নাম বুকে নিয়ে এই স্বপ্ন তাকে তাড়িত করলো।

কিন্তু খারদুংলা পাস জয় করতে হলে অনেক বিষয়কেই মাথায় রাখতে হয়। সেখানকার আবহাওয়াও সবসময় ভাল থাকে না। বেশিরভাগ সময়েই খারদুংলা বন্ধ থাকলেও বছরে একবার তিন মাসের জন্য খুলে দেয়া হয় এই পাস। ভারতের সিমলা থেকে জম্মু কাশ্মীরের খারদুংলা রোডে সাইকেল চালিয়ে জয়টা নিছক একটি স্বপ্নই না, এর সাথে মিশে থাকে প্রকৃতিকে বশ করার সাহস, নিজের জীবনের ঝুঁকি নেয়ার দৃপ্ত মনোবল। কারণ, এই রুটটি ভীষণ বিপদজনক ও দুর্গম। সাথে তীব্র ঠান্ডা ও বৃষ্টিপাত তো আছেই।

জিনিয়া তাবাসসুমকেও প্রকৃতির প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে জয় করতে হয়েছে খারদুংলা পাস। আর মোকাবেলা করতে হয়েছে অনেক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষকেও, যারা বিভিন্ন ভাবে খোঁচা দিয়েছে তাকে। সিদ্ধান্তগুলো সহজ ছিল না। কেন একজন মেয়ে হয়ে সাইকেল চালাতে হবে, কেন একজন মেয়ে এমন সাহস দেখাবে তা নিয়েও প্রশ্ন করতে ছাড়েনি কেউ কেউ। এই সমাজে মেয়েদের ভাল কিছুতে সহযোগিতা করার লোকের অভাব থাকলেও, বাঁকা চোখে দেখার মানুষের অভাব নেই।

কিন্তু, জিনিয়া তাবাসসুম সকল প্রতিকূলতা, ব্যাঙ্গ, খোঁচাকে মোকাবেলা করেই খারদুংলা জয় করলেন, পৃথিবীর সর্বোচ্চ মোটরেবল রোডে ছুঁয়ে রেখে আসলেন বাংলাদেশের পদচিহ্ন, রেখে আসলেন তার এগিয়ে চলার প্রতীক প্রিয় সাইকেলটির দাগ!

পাহাড়ের আকাবাঁকা সড়ক। যত উপরে উঠছেন তাবাসসুম ততই প্যাডেল ঘোরাতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিঃশ্বাস ভারী হচ্ছে। তিনি একদিকে অমানুষিক চেষ্টায় উপরে উঠছেন, অন্যদিকে যেন মনে হচ্ছে কেউ তাকে পেছন থেকে টেনে ধরছে। এ যেন এই সমাজের এক প্রতীকী দৃশ্য, নারী সকল বাধা ভেঙ্গে, শেকল কেটে সামনে এগুতে চায়, কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ তাকে উপরে উঠতে দেয় না, এমন। কিন্তু, হাল ছাড়েননি জিনিয়া, এই দিকে ঠান্ডায় যেন জমাট বেঁধে যাচ্ছে শরীর। গায়ে কাঁটা দেয়া মিহি শীতল বাতাস, শরীরে যেন খারদুংলার সড়কের ঠান্ডা বুলেটের মতো বিদ্ধ হচ্ছিলো। এত কষ্ট করেও সাইকেলের সর্বোচ্চ গতি মাত্র চার পাঁচ কিলোমিটারে সীমিত রাখতে হচ্ছে, তার বেশি আর পারা যাচ্ছে না। ঠান্ডায় নাক, কান সব বন্ধ, সর্দি লেগে অবস্থা খুব খারাপের দিকে। এর উপর শুরু হলো শ্বাসকষ্ট, নিঃশ্বাস নিতে কী যে কষ্ট হচ্ছিলো জিনিয়া তাবাসসুমের। এটা খারদুংলা। এখানে অক্সিজেন নিয়ে প্রতিযোগিতা, অল্প একটু অক্সিজেন পেলেই যেন কোনোরকমে বেঁচে যায় জীবন।

অনেক সবুজের মায়ায় ভরা মানালি শহর থেকে তাবাসসুমের যাত্রাটা শুরু হয়েছিল গত ১০ আগস্ট। সহযাত্রী হিসেবে ছিলেন হেদায়াতুল হাসান ফিলিপ আর পথে পরিচয় হয় ৬৫ বছরের এক উদ্যমী মানুষ সুইস নাগরিক এরুইনের সাথে।

তিনজনের দলটা যতই উপরে উঠছিল, ততই প্রকৃতি তাদের খেলা শুরু করলো। রুক্ষ হচ্ছিল প্রকৃতির ভাবমূর্তি। মানালির প্রথম পাসে আসার পর মেঘে, বৃষ্টিতে মাখামাখি। বৃষ্টিতে ভিজে সর্দি, জ্বর হয়ে গেলো তাবাসসুমের। শরীরে জ্বরের উত্তাপ নিয়ে ঠান্ডার সাথে যুদ্ধ করে জিনিয়া সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে আবার পাহাড়ি ঢলের কারণে রাস্তায় পানি জমে গিয়েছিল। ঢলের পানির সঙ্গে আসা পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার কারণে পায়ে ছোপ ছোপ কালো দাগ হয়ে গিয়েছিল তার।

টানা দশদিন সাইকেল চালিয়ে তিনজনের দলটা পৌঁছালো লেহ’তে। এই দশদিন পথে প্রান্তরে কত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন জিনিয়া তাবাসসুম তার হিসেব নেই। সারাদিন পর রাতের বেলায় কোথাও ভাড়া নেয়া তাঁবুতে গা এলিয়ে দিতেন, স্বপ্নালু চোখে বিভোর হয়ে ভাবতেন পরেরদিন আবার কখন শুরু হবে যাত্রা, নতুন আবার কি দেখবেন, এই পৃথিবী নতুন কী সৌন্দর্য নিয়ে অপেক্ষা করছে জানার জন্যেই আকুল এই প্রতীক্ষা। এই স্বপ্ন তাকে এতটাই তাড়িত করেছিল যে খাওয়ার কষ্টও তার কাছে ছিল তুচ্ছ ব্যাপার। ডাল, রুটি, সবজি কিছু একটা খেয়েই চলে যেত দিন। তিনি মনে করেন স্বপ্ন পূরণের জন্যে আসলে স্বপ্নের প্রতি ভালবাসাটুকুই জরুরী। এখানে খুব আহামরি কিছুর দরকার নেই, খুব দামি কোনো সাইকেল দরকার নেই, ইচ্ছেটুকুর প্রতি একাত্মতা থাকলেই হলো। সাইকেল চালাতে চালাতে মানালির কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ যখন তার দিকে তাকিয়ে নির্মল হাসি উপহার দিতেন তাতেই মন ভরে যেত একেবারে।

এই দশদিন তিনি আজীবন মনে রাখবেন। কারণ, পরিবারের সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না এক সপ্তাহের বেশি সময়। তিনি ছিলেন নেটওয়ার্কের বাইরের জগতে। এর মধ্যে জিনিয়াকে হাসপাতালেও যেতে হয়েছিল, জ্বর একটু কমতেও আবার দ্বিতীয় দফা জ্বরের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। এমনকি শ্বাসকষ্ট, উচ্চতাজনিত সমস্যার কারণে অক্সিজেনের অভাবে জিনিয়া তাবাসসুমের নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করেছিল। হয়ত জীবনের ঝুঁকিই নিয়ে ফেলেছিলেন কিছুটা, কারণ এরকম অবস্থা থেকে আরো খারাপ কিছুও যে হতে পারতো। কিন্তু, এক প্রকার জিদ চেপে গিয়েছিল তার। এ পথের শেষ কোথায় তিনি দেখতে চেয়েছিলেন। পেছনে জমে থাকা স্বপ্ন, অভিমান, সাহস, অবজ্ঞা সব কিছু মিলেমিশে জিনিয়া যেন একটা ঘোরের মধ্যেই চলে গিয়েছেন, ঘোরটা স্বপ্নপূরণের।

লেহ থেকে খারদুংলা পাসের দূরত্ব ৩৮ কিলোমিটার, কিন্তু অনুমতি ছাড়া কাউকে যেতে দেয়া হয় না সেখানে। এমনও হয়েছে অনেকে অনুমতি না পেয়ে ফিরে এসেছে। জিনিয়া তাবাসসুমের অনুমতি পেতে গোটা একদিন লেগে গিয়েছিল।

তারপর ২২ আগস্ট। সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ভোরের দিকে খারদুংলা সামিটের পথে রওনা হলেন। সারাদিন সাইকেল চালিয়ে বিকেল সাড়ে তিনটায় অবশেষে জয় হলো খারদুংলা পাস, পৃথিবীর সর্বোচ্চ মোটরেবল রোড!

জিনিয়া তাবাসসুম দেশের ভেতরেও সাইকেল দিয়ে অনেক ট্যুর দিয়েছেন। ভ্রমণের প্রতি যে তার এক বুক ভালবাসা। তার স্বপ্ন দেশ ঘোরা, বাংলাদেশ ঘুরে দেখা, তারপর নতুন মানচিত্র চষে বেড়ানো। আর সাথে যদি সাইকেল থাকে তাহলে তো কথাই নেই। দেশে এর আগে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সাইকেল চালিয়েছেন। ১১ দিনে ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। সাইকেল নিয়ে তিনি পার্বত্য এলাকা চষে বেড়িয়েছেন। আরও তিনটি ক্রস কান্ট্রির রেকর্ড (হালুয়াঘাট-কুয়াকাটা, ভোমরা-তামাবিল, দর্শনা-আখাউড়া) আছে জিনিয়া তাবাসসুমের!

রুপকথায় দেখা রাজকন্যারা জাদুর গালিচায় আকাশে ঘুরে বেড়ায়, তাতে আমরা বিমোহিত হই। স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হয়। কিন্তু, সাধারণ কন্যা হয়ে জিনিয়া তাবাসসুম জয় করলেন খারদুংলার সামিট, তাতে তিনি তো আকাশের একটু হলেও কাছে চলে যেতে পেরেছেন। তার গালিচা ছিল না, ছিল ছোট্ট একটি দুই চাকার বাহন। অনেক মেয়ে আজকাল ডিপ্রেশনে ভোগে, কিছু করার অনুপ্রেরণা পায় না, জীবনকে উপভোগ করতে পারেন না, তাদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারেন জিনিয়া তাবাসসুম, তিনি আমাদের রাজকন্যা! বাংলাদেশের রাজকন্যা!

আরও পড়ুন-

Comments
Spread the love