ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ঢাবি থেকে জিগাতলা, আমি যা দেখলাম…

নুসরাত জাহান-

সকাল এগারোটায় ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ থেকে একটা মিছিল ভিসি চত্বর, টিএসসি হয়ে শাহবাগের দিকে যায়। শাহবাগ মোড়ে পৌঁছানোর পর দেখি ওখানে আগে থেকেই প্রায় হাজার খানেক শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে স্লোগান দিচ্ছে। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের মিছিল তখন শাহবাগ জাদুঘরের মোড়ে দাঁড়িয়ে। শাহবাগে আগে থেকেই যারা ছিলো তাদের মাঝে পরিচিত কয়েকজন ফ্রন্টে দাঁড়িয়ে সবাইকে অর্গানাইজ করার চেষ্টা করছিলো। কার্জন এবং কলাভবনের এই ঢলের সাথে বুয়েটের কিছু প্রাক্তন শিক্ষার্থীও ছিলো।

শাহবাগে কিছুক্ষণ স্লোগানের পর মিছিল ধীরে ধীরে আজিজের পাশের রাস্তা ধরে সায়েন্সল্যাবের দিকে আগাতে থাকে। সায়েন্সল্যাব মোড় যখন ক্রস করে তখন আমরা মিছিলের প্রায় শেষের দিকে। এক জুনিয়র ফোন করে জিজ্ঞেস করে আমরা শাহবাগে আছি কিনা। কারণ ওরা বুয়েট থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিছিল তখন বিজিবি গেটের সামনে থেকে শুরু করে সায়েন্সল্যাব পর্যন্ত এবং তখনও ধীরে ধীরে জিগাতলার দিকে আগাচ্ছে। রাইফেলস স্কয়ারের ঠিক সামনে যখন তখন অপরিচিত নাম্বার থেকে কে যেনো ফোন করে বলে সামনে এগিয়ো না। এইদিকে ধাওয়া দিয়েছে। ফোন পেয়ে উল্টা রোড ধরে সামনের দিকে দৌড়াচ্ছিলাম কারণ একদম সামনে আমার ভাই ছিলো। ও ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট, রাস্তাঘাট ভালোমত চিনে না। দৌড়ে বড়জোর পাঁচ মিটার সামনে এগুতেই বিজিবি গেটের অপজিট থেকে একদল পুলিশ লাঠি নিয়ে ছুটে আসে এবং টিয়ারগ্যাস ছুঁড়তে থাকে। রাইফেলস স্কয়ারের গেট খোলা ছিলো। রাস্তায় মানুষের চিৎকার, ছোটাছুটি আর গুলির শব্দে নরকের মতো অবস্থা তখন। আমার বিভাগের একজন সিনিয়র আর একটা আপু সহ রাইফেলস স্কয়ারের ভেতরে কিছুক্ষণ থেকে রাস্তাঘাট একটু ফাঁকা হলে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে বের হই আমরা।

পুরো রাস্তা জুড়ে তখন টিয়ারশেলের শেল গুলো পড়ে ছিলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে। পপুলার এর সামনে যেতেই হঠাৎ দেখি সায়েন্সল্যাবের দিক থেকে ছাত্রছাত্রীরা প্রাণপণে দৌড়ে আসছে। আর তাদের মাঝে যাকে ধরতে পারছে তাকেই পেটাচ্ছে হেলমেট পড়া কিছু ছেলে। একটা ছেলের মাথা ফেটে রক্তে গা ভেসে যাচ্ছে। তাকে ধরাধরি করে নিয়ে দৌড়াচ্ছে কয়েকজন। ছেলেটাকে পপুলারের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হলো। সব শিক্ষার্থীরা দৌড়ে পপুলারের গেটে দাঁড়িয়েছে তখন। আমরা একটু সামনে এগিয়েছি ঝামেলাটা কোথায় হয়েছে দেখতে। সায়েন্সল্যাব মোড়ে গিয়ে দেখি রোড ডিভাইডারের উপর যে ব্যারিকেড দেয়া লোহার সেগুলো সব ভাঙা, সেগুলো হাতে একদল দৌড়ে আসছে। মানুষ আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছুটছে। ঠিক এই সময়, একদম দুই হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছেলে হঠাৎ পড়ে গেলো রাস্তার উপর। তাকিয়ে দেখি পায়ের গোড়ালি থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। গুলি/টিয়ারশেলের শব্দ। আমার কেমন বোধশূন্য লাগছিলো। কোথাও যাবো নাকি দাঁড়িয়ে থাকবো এসব ভাবার মতো জ্ঞান নেই। ইউনিভার্সিটির কে যেনো হাত ধরে টানতে টানতে পপুলারের ভেতরে ঢুকালো।

পুলিশের একটা দল তখন মারমুখী হয়ে পপুলারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে তেড়ে আসছে অযথাই। আমার মনে হলো সময়টা একাত্তর আর এরা পাকিস্তানী পুলিশ। আমার জানা নেই এই দেশের পুলিশ এমন খুনে চোখে মানুষকে শাসায় কি করে।

পপুলারের ভেতরে কাঁচের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের দৃশ্য ভিডিও করছিলো কলেজে পড়ুয়া একটা মেয়ে। এক মুহূর্তে কোথা থেকে যেনো দু’জন হেলমেট পড়া ছেলে ঠিক মেয়েটার মাথা বরারবর কাঁচের উপর স্ট্যাম্প দিয়ে বাড়ি দিয়ে বীভৎস মুখ করে কিছু একটা বললো। একজন ঠেলে ভেতরে ঢুকতে চাইছে আর গালি দিচ্ছে মেয়েটাকে। হসপিটাল অথরিটি মেয়েটাকে ভেতরের দিকে সরিয়ে ভিডিও করার জন্য চার্জ করতে শুরু করলে মেয়েটা লিটারেলি কাঁপছে তখন। আমি গিয়ে মেয়েটাকে ধরতেই সে আমার হাতের উপর পরে গেলো। মাথায় পানি ঢেলে, পানি খাইয়ে একটু ধাতস্থ করা হলে আমাদের বলা হলো উপরতলার দিকে চলে যেতে। মেয়েটাকে নিয়ে উপরতলায় গিয়ে দেখলাম সেখানে আরোও প্রায় শ দু’এক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটের শিক্ষার্থী আটকে আছে। পপুলারের ইমার্জেন্সি এক্সিটের সিঁড়িতে প্রচণ্ড সাফোকেশনে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে অবস্থা।

জিগাতলা, সায়েন্সল্যাব, হামলা, ছাত্রলীগ, পুলিশ, ছাত্র আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

জিগাতলা, সায়েন্সল্যাব, হামলা, ছাত্রলীগ, পুলিশ, ছাত্র আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

যে ফটো সাংবাদিক ছেলেটাকে পিটিয়ে মাথা ফাটানো হয়েছে, সেই ছেলেটা দেখি ফ্লোরে বসে আছে। চোখে মুখে শূন্য দৃষ্টি। কপালের ব্যান্ডেজ ছাপিয়ে রক্ত পড়ছে তখনও।

ওখানে আটকা পড়া মেয়েগুলো কখন কিভাবে বেরিয়েছে আমি জানিনা। কিছুক্ষণ পরে বন্ধুর সাথে বাড়ি ফিরতে পেরেছি আমি। একদিকে ন্যজিয়া অন্যদিকে বুক ফেটে যাওয়া তেষ্টা। এই অনিরাপত্তার অসহায়ত্ব, এই মুড়ি মুড়কীর মতো মরে যাওয়ার অসহায়ত্ব নিয়ে আমি আজীবন আওয়ামীলীগকে ঘৃণা করে যাবো। আমি জানি আমার এই ঘৃণা তাদের মুখের উপর থুথু হয়ে পড়বে না, তবু ঘৃণা করে যাবো।

বিঃ দ্রঃ- এই সাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। egiye-cholo.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে egiye-cholo.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close