১৯৫৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে জন্ম নেন কলেজ শিক্ষক আব্দুস সাত্তার ও গৃহিণী জহুরা বেগমের প্রথম পুত্র সন্তান মুসলিম। ৩ কামরার আধপাকা বাসাটার ৬ফুট/৬ ফুট ঘরে আস্তে আস্তে বেড়ে উঠতে থাকে সে আরো ৪টি বোনের সাথে।
ছেলের প্রতিভা বাবা ছোটবেলাতেই ধরে ফেলেছিল। বুঝতে পেরেছিল, একে নিয়ে খুব বেশি ভাবতে হবে না, তাই তো বাধা দেননি তার কোনো কাজেই। খেলাধুলার প্রতি প্রবল নেশা ছিল, বাদ পড়েনি আঞ্চলিক কোনো খেলা। স্কুল জীবনে ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, দাবা তো খেলেছেনই। এছাড়া বিভিন্ন দেশীয় খেলা– কাবাডি, ডাংগুলি, বৌচি, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছিতে অংশগ্রহণ করেন। শৈশব কেটেছে লুকোচুরি, গাদন খেলা, বাঘবন্দি, বাগাডুলি, লুডু, সাত খাপরা/চারা, ঘুড়ি উড়ানো, লাটিম/লাট্টু, কক ফাইট বা মোরগ লড়াই খেলে। সারা দিন শুধু ছোটাছুটি আর ছোটাছুটি! স্কুলে ভর্তি করার আগেই শিক্ষক বাবা বুঝে ফেললেন ছেলের পড়ার গতি বেশ, তাই সরাসরি ৩য় শ্রেণিতে ভর্তি করে দিলেন। বাবা যখন ছাত্রদের পড়াতেন, মুসলিম প্রায়ই বাবার পাশে থাকতেন। ৫ম শ্রেনীতে পড়া অবস্থায় ৮ম শ্রেনীর অংক করে ফেলতে পারতেন নির্দ্বিধায়! অংক পরীক্ষা ১ ঘন্টার মধ্যে শেষ করে ফেলতেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এক পৃষ্ঠায় সব অংক শেষ করে ফেলতেন। ছেলের মেধা ছড়িয়ে গেল বিভাগ অব্দি। ৫ম ও ৮ম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষায় জেলায় প্রথম, এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে যশোর বোর্ডে ১৩তম, এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে যশোর বোর্ডে ১৪তম স্থান দখল করেন।
মুসলিমের নিজস্ব প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো কম ছিল বিধায় তার বাবাকে খরচ নিয়ে তেমন চিন্তা করতে হয়নি। দুটো জামা দিয়ে দিব্যি বছর পার করে দিয়েছে কোন অভিযোগ ছাড়াই। পড়াশোনার খরচটাও নিজেই চালিয়ে নিয়েছে বৃত্তি ও খেলার টাকা থেকে। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় তুখোড় থাকায় জেলা/আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলায় অংশগ্রহণ করে অনেক পুরষ্কার অর্জন করেছেন। সেই পুরষ্কারগুলো রাখারও জায়গা ছিল না। পুরস্কারগুলো রাখার ও কোন জায়গা ছিল না। সব জমা হত চৌকির তলায়। ছোট্ট ঘরটায় চৌকি থাকার পর যে আর কিছু রাখার অবস্থা ছিল না!
বাবা একজন আদর্শবান শিক্ষক হবা্র কারণে প্রাইভেট পরাতেন না। কলেজের বেতনটাই ভরসা। যেটা দিয়ে চলত ৭ জনের সংসার, ছোট চাচার খরচ এবং বাড়িতে দাদা-দাদির, ফুফুদের খরচ। এসব খরচ মিটিয়েও কলেজের কোনো মেধাবী দরিদ্র ছাত্রের বেতন বা পড়াশোনার খরচটাও নিজ কাঁধে তুলে নিতেন। বুদ্ধিমান ছেলে তাই বাবাকে কখনো কোন কিছুর জন্য জোর করেনি। নিজের প্রয়োজন গুলো নিজেই মেটাতে শিখে নিয়েছিল। এসএসসির পর ৩ মাস পত্রিকা বিক্রি করেন মুসলিম। নিজের ছোটখাটো চাহিদাগুলো পূরণ হতো এতে। বাদবাকি সময়টা কাটাতেন পাবলিক লাইব্রেরিতে। টেক্সট বই না, পড়তেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মানিক, সত্যজিৎদের। বাংলা সাহিত্যর শেলফটার কোনো বই আর বাদ থাকেনি। পুরোটা পড়ে শেষ করেন এসময়।
এইচএসসির পর বাবাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘বাবা কি চান আপনি, ডাক্তার হবো নাকি ইঞ্জিনিয়ার?’ বাবার কথা মেনে নিয়েই শুধুমাত্র মেডিকেলের ভর্তি ফর্ম তুলেন এবং পরীক্ষায় ৮২তম হয়ে ঢাকা মেডিকেলে নিজের জায়গা করে নেন। মেডিকেলের পড়ার চাপ ভীষন। বই, গাইড, নোট না থাকলে ইয়ার টপকানো কঠিন। কিন্ত মুসলিমের জন্য সে সময় বই কেনা মানে বিলাসিতা। ডিকশনারি নিয়ে পড়তে বসতেন, বারবার পড়ে পড়াটা আয়ত্ত করে নিতেন। যেখানে অন্যান্য ছাত্ররা গাইড/নোট/সাজেশন পড়ে ক্লাসে ভাল নম্বর পেত, সেখানে শুধু মেইন বই পড়ে কোনো রকম টেনেটুনে পাশ করতেন তিনি। স্পোর্টস পারসন হওয়ার কারণেই ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠতেন আর ঘুমাতে যেতেন ১০টায়। যেখানে পরীক্ষার আগে্র রাতে সবাই সাজেশন পেত, সেখানে মুসলিম বিভোর থাকতেন ঘুমে! রিটেনে ভাল নম্বর না পেলেও মেইন বই পড়ার কারণে বেসিক ছিল দুর্দান্ত, ভাইবাতে তাকে টক্কর দেয়া কঠিন ছিল। এমনকি সিনিয়ররাও তার কাছ থেকে পড়া বুঝে নিত, সহপাঠীরা তো অবশ্যই।
    
ভোর ৫টায় রোজ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চক্কর দিতেন ১ঘন্টা। সঙ্গের কেউ দৌড়ে পেরে উঠতো না বলে তাদের উৎসাহ দিতে প্রায়ই নিজের গতি কমিয়ে দিতেন। নিজের শরীরচর্চার অনুশীলন নিজেই করতেন, কোন কোচের সাহায্য বা ক্লাবে যুক্ত হয়ে নিজেকে আরো ঝালাই করার সুযোগ পাননি কখনো। তবে ১৯৭৬ ও ১৯৭৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২-১৯৮০ সাল পর্যন্ত কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ, কুষ্টিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সকল ৮০০মিঃ, ১৫০০মিঃ, দুরপাল্লার দৌড় ৫০০০মিঃ, ১০০০০মিঃ দৌড়ে প্রথম স্থান দখল করেন। ১৯৭৯ সালে ন্যাশনাল অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় ১০০০০মিঃ দৌড়ে আর্মি, নেভির কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন। মেডিকেলে পড়ার পুরো ৫ বছর এই খেলার টাকা এবং টিউশনী করে নিজের খরচ চালিয়ে নিয়েছেন।
ইন্টার্ণ শেষ করে বিয়ে করেন দূরসম্পর্কের আত্মীয়াকে। সবেমাত্র ১৯শে পা দেয়া যুথি নামক মেয়েটি ছিল ভীষণ রূপবতী। ঢাকা শহরে বেড়ে উঠা ভিকারুন্নিসায় পড়া মেয়েটি কুষ্টিয়ার আধপাকা বাসাতে এসে উঠে। মেয়েটির পরিবারও খুব স্বচ্ছল ছিল না, ৮ ভাই-বোন আর মা-বাবার সংসারটা ছিল বেশ কষ্টেরই। কিন্ত ছোট মেয়ে হওয়াতে বড় ভাইবোনগুলো তাকে আগলে রেখেছিল। তাইতো ৬ফুট/৬ফুট ঘরে গ্যাস বিদ্যুৎহীন বাসায় থাকতে কষ্ট হয়েছিল বেশ। কিন্ত অভিযোগ করেননি কখনো। চুলার ধারে না যাওয়া মেয়েটা এসে মাটির চুলায় ফুঁ দিয়ে রান্না করা শিখে গেল ধীরে ধীরে। ৩০ বছর সংসার জীবনে বিয়ের আংটি আর একটা ছোট হার ছাড়া আজ পর্যন্ত কোনো অলঙ্কার কিনেননি, সেই আব্দারটুকুও করেননি। বুঝেছেন নিজের দাবীর চেয়ে সমাজের দাবী মেটাতেই স্বামীর বেশি আনন্দ। আর সেই আনন্দটাই দুজনে ভাগাভাগি করে চলেছেন এখন পর্যন্ত।
with his daughter
ঢাকা মেডিকেল থেকে ইন্টার্নশিপ শেষ করে, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউট থেকে ১৯৮৭ সালে চক্ষুশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা (ডি ) পাশ করেন। এরপর মেহেরপুর হাসপাতালে চক্ষু কন্সালটেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। আধপাকা বাসার পাশে সুবিশাল দ্বিতল বাসভবন বানান, যার নিচতলার অর্ধাংশজুড়ে চেম্বার চিকিৎসা ফি ছিল মাত্র ৪০ টাকা, যারা দিতে পারতেন তারা দিতেন, যারা পারতেন না, তাদের কাছ থেকে নিতেন না। এমনকি সুবিধাবঞ্চিতদের বিনামূল্যে ঔষ সরবরাহ করতেন। সময়সুযোগ পেলেই ফ্রি ক্যাম্পিং/সার্জারিতে অংশগ্রহন করতেন অথবা নিজেই হয়ে উঠতেন উদ্যোক্তা। অর্ধ শতাধিক চক্ষু শিবিরে সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় স্বাস্থ্য বিষয়ক কলাম লিখেছেন। শুধু তাই নয়। মাঝে মাঝে প্রবন্ধ, গল্প, সমাজসচেতন বিষয়ক লেখাও লিখতেন। তাঁর গর্বিত পিতা সেদিন পত্রিকা নিয়ে পুরো শহর হেঁটে বেড়াতেন সবাইকে লেখা পড়ানোর জন্য।
বদলি হয়ে ঢাকায় আসার পরও আরো সমাজসেবামূলক সংগঠনে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। যেখানে বাকি চিকিৎসকেরা প্রাইভেট চেম্বার বা হাসপাতালে বসে মোটা অংকের টাকা গুনতেন,সেখানে সমাজের অসংগতি ঠিক করতে নিজের পয়সা খরচ করতেন তিনি। প্রাইভেট চেম্বার তাকে কখনো টানতে পারেনি। রাত ৩টার সময় চলে গেছেন পাশের বস্তির মানুষের চিকিৎসা সেবা দিতে।
দেশের বাইরে যাবার লোভনীয় অফার থাকার সত্ত্বেও দেশের মানুষের সেবা দেবার জন্য দেশেই রয়ে গেছেন। শুধুমাত্র একবার বদলি হোন সৌদিআরবে, বাবামা এর হজ্ব পালনের ইচ্ছাপুরন করতে। ১বছর থেকে আবার দেশে ফেরত আসেন। ২০১৪ সালে অবসর গ্রহন করেন তিনি। এরই মাঝে চক্ষু কনসাল্টেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মেহেরপুর হাসপাতাল, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, নরসিংদী হাসপাতাল, প্রিন্স সালমান হাসপাতাল-রিয়াদ, সৌদি আরব এবং সচিবালয় ক্লিনিকে। এছাড়া ১৯৮২ সাল থেকে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক ফেডারেশনের ক্রীড়া চিকিৎসক, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সকল সাফ গেমসে ক্রীড়া চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক ফেডারেশন আয়োজিত প্রতিযোগিতায় কর্মকর্তা (জাজ, রেফারী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের তথ্যাদির প্রোগ্রামার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সচিবালয় ক্লিনিকে রোগীদের অটোমেশনের মাধ্যমে সেবা প্রদান চালু করার ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
সামাজিক কর্মকান্ড লায়ন্স ক্লাব কুষ্টিয়ার সাধারণ সম্পাদক, রোটারী ক্লাব চক্ষু হাসপাতাল, কুষ্টিয়ার প্রথম চক্ষু চিকিৎসক। অর্ধ শতাধিক চক্ষু শিবিরে সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন। বৃহত্তর কুষ্টিয়া অফিসার্স কল্যাণ ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, উত্তরা ১১ নং সেক্টর কল্যাণ সমিতির দুইবার সাধারণ সম্পাদক দুইবার সভাপতি (বর্তমান মেয়াদসহ), উত্তরা এসোসিয়েশনের (২০১৩১৪) সাধারণ সম্পাদক, উত্তরা অফিসার্স ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক।
 
অজস্র ‘নেই আর নেই’-এর ভিড়ে খেই হারিয়ে ফেলেননি মুসলিম। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল চিকিৎসক, একজন দুর্দান্ত অ্যাথলেট এবং একজন মানবদরদী সমাজসেবক হিসেবে। এটি হতে পারতো এক দারিদ্র্যের গল্প। হতে পারতো এক সাধারণ মধ্যবিত্তের প্রথাগত জীবনচিত্র। কিন্তু প্রবল অধ্যবসায়, নিষ্ঠা আর সততার জোরে একজন মুসলিম থেকে ডাঃ মঈনউদ্দীন আহমদ হয়ে উঠার অসাধারণ জীবনগল্পটি আজ অফুরান অনুপ্রেরণার উৎস।
বাবাকে নিয়ে লিখেছেন মৌরি মুসতারি 
(পেশায় ফিজিওথেরাপিস্ট। বর্তমানে একটি এনজিওতে কর্মরত আছেন। এছাড়া বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড উইমেন্স দলের আয়োজিত লীগ/প্রতিযোগিতায় স্পোর্টস ফিজিও হিসেবে কাজ করছেন।)

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-