ফিচারটি যতবার পড়া হয়েছেঃ 2,000

একজন আরজু মিয়ার গল্প | egiye-cholo.com

Ad

“কষ্ট ও দুঃখ” কত ছোট্ট দুটি শব্দ অথচ এর ব্যাপকতা আর ভয়াবহতা কতটা তীব্র আর অসহনীয় তা ভুক্তভোগীরাই জানেন। দারিদ্রতা কথাটি যেন দুঃখ আর কষ্টের বেড়াজালে আবদ্ধ। কথায় বলে, অভাব যখন আসে তখন ভালবাসা জানালা দিয়ে পালায়। কিংবা কবির ভাষায় বলি না কেন, ‘পূর্নিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’।

এই অভাবের তাড়নায় কত শত প্রতিভা যে অন্কুরে বিনষ্ট হয় তা আল্লাহই ভাল জানেন। আবার এই দারিদ্র্যতাকে জয় করে কত কত মহান মানুষ ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতন আলো ছড়াচ্ছেন।

মহীয়সিদের জীবন তো সবার জানা। কিন্তু আমাদের দেশেই কত মানুষ আছেন যারা দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে আজ জীবনে সফল। শুধু তাই না তারা আজ আমাদের অনুকরনীয়। “এগিয়ে চলো” কে আন্তরিক ধন্যবাদ আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে অনেক না বলা না জানা কথা বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

‘এগিয়ে চলো’র মাধ্যমে আমি আজ জানাতে চাই আমার শ্বশুরের জীবন সংগ্রাম কাহিনী। একটা মানুষ কি করে দারিদ্র এবং সমাজের সুবিধাবাদী মানুষদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে কতটা দূর্গম পথ পাড়ি দিয়েছেন একেবারে একা। এই একাকিত্বের সঙ্গী হয়েছিল আল্লাহর রহমত এবং তার অদম্য ইচ্ছা শক্তি।

আমার শ্বশুড়ের নাম মরহুম আনিসুর রহমান সাহেব। তার বাড়ি হবিগন্জ জেলা, চুনারুঘাট উপজেলা, আর গ্রামের নাম নরপতি । আমার শ্বশুড়ের ডাক নাম আরজু মিঞা। আমি আমার লেখায় আমার শ্বশুড়কে আরজু মিয়া নামেই সম্বোধন করে লিখছি পাঠকদের সুবিধার্থে। আর এই কিঞ্চিৎ বেয়াদবীর জন্য আমি আমার শ্বশুরকুলের সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

14329186_566500733522187_1428908864_oটুকু মিয়া চৌধুরী ও করিমুনন্নেসা চৌধুরীর ঘর আলো করে ১৯২৩ সালের ৩১শে ডিসেম্বর ফুটফুটে সুন্দর একটি ছেলের জন্ম হয়।বাবা নাম রাখলেন আরজু মিয়া চৌধুরী। আরজুর জন্ম হয় সম্ভ্রান্ত ও অবস্থাসম্পন্ন পরিবারে। আরজুরা তিন ভাই দুই বোন।

আরজুদের পরিবারের সবাই অসাধারন সুন্দর। গায়ের রং টকটকে গৌড়বর্নের, চেহারা সুরুতে যেন পটে আঁকা ছবি। এরমধ্যে আরজুর বড় বোন আর আরজু যেন গ্রীক উপখ্যানে বর্নিত দেবতাদের মতন অপরূপ সুন্দর। গ্রামের অভিজাত পরিবার আত্মীয় স্বজন আর নিজেরা মিলে জমজমাট অবস্থা। সুখ যেন উপচে পড়ছে। টুকু মিঞা চৌধুরী বরাবরই খেতে আর খাওয়াতে পছন্দ করেন। দুই হাতে টাকা কামান আবার স্রোতের পানির মতন টাকা খরচও হয়। ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনার প্রয়োজনও মনে করেন না।

কিন্তু বিধাতা হয়ত অলক্ষ্যে মুচকি হাসলেন। এই সুখের সংসার যেন দুমড়ে মুচড়ে গেল হঠাৎ করেই টুকু মিঞার মৃত্যুর পর। যখন আরজুর বড় ভাইয়ের বয়স ১৮ বৎসর, মেঝ বোনের বোনের বয়স ১৬ বৎসর ছোট বোনের বয়স ১৪, আরজুর বয়স ৩ আর ছোট ভাইয়ের বয়স দেড় বৎসর তখন অকস্মাৎ আরজুর বাবা মারা যান।

ভরা সংসার আরজুর মা সংসার সামলাতেই প্রান অতিষ্ঠ এর মধ্যে স্বামী মারা যাওয়াতে তিনি যেন অকুল সাগরে পড়লেন। কারন জমি প্রায় সবই এজমালীর অর্থাৎ অন্য শরিকদের সাথে যৌথ ভাবে। তাছাড়া নিজেদের একক যে জমি আছে তাও আরজুর বাবা নিজেই দেখাশুনা করতেন। কোথায় বর্গা দেওয়া বা কার কাছে টাকা পাবে তাও আরজুর মায়ের অজানা। আর তিনি জানবেনই বা কি করে? এতবড় পরিবার তার উপর সবাই খানেওয়ালা। তিনি তো হেঁসেল সামলাতেই ব্যস্ত।

14273542_566500770188850_1071989188_oএদিকে আরজুর বড় ভাই সে আবার একটু বাউন্ডুলে। এমনি অল্প বয়স তার উপর বাবার মৃত্যুর পর জমিজমা আর টাকা পয়সা এসে তার হাতে পড়ল। অবশ্য টুকু মিঞা বেঁচে থাকতেই দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল বলে যা রক্ষে। আর তখন মেয়েদের বাল্য বিবাহই হতো।

দেখতে দেখতে আরজুর বড় ভাই টাকা পয়সা প্রায় সবটাই খরচ করে ফেলল। তার উপর নিজেদের ভাল বেশ কিছু জমি বিক্রি করে সে টাকাও খরচ করে ফেলল। কথায় আছে, “অভাগা যেখান চায় সাগর শুকায়ে যায়”। মাত্র বিশ বৎসর বয়সেই আরজুর বড় ভাই হঠাৎ করেই মারা গেলেন। এইবার সত্যিই বড় বিপদে পড়ল আরজুর পরিবার। কারন আরজুর মা বর্গা দেওয়া জমির টাকা পেতেই জীবন অতিষ্ঠ। তার উপর শরীকদের সাথে জমির খোঁজ পাওয়া দুঃসাধ্য। বর্গা চাষীরাও সুযোগ বুঝে টাকা দেওয়া এক সময় বন্ধ করে দিল।

আস্তে আস্তে আরজুদের পরিবার দেখতে হলো দারিদ্রতা প্রখর রূপ। এদিকে যেহেতু সার্মথ্যে নেই তাই আরজুকে স্কুলে না ভর্তি করিয়ে, দেওয়া হল টং এ। এখানে পন্ডিত মশাইয়ের কাছে আরজু পড়াশুনা শুরু হল। অতটুকু ছেলে পড়ার কি আগ্রহ, কতটা পথ হেটে যেতে হয় পন্ডিত মশাইয়ের কাছে তারপরেও আরজু একটা দিনও অনুপস্থিত থাকে না। পন্ডিত মশাই আরজুর মাকে বললেন, এই ছেলে একদিন অনেক বড় হবে, এর যত্ন নিবেন। তখনকার পন্ডিতগন ছিলেন পাকা জহুরী। আরজু মা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়েন আর ভাবেন আর পড়ালেখা খাওয়াই জোটে, পড়ালেখা হল গরীবের বিলাসিতা।

এদিকে দেখতে দেখতে আরজু বেশ বড় হয়ে গেল। আরজু আরও পড়তে চায় দেখে  তার মাকে আশেপাশের মানুষজন টিপন্নী কেটে বলল, “রাঢ়ী (বিধবা) বেটির পোলার এত পড়ার দরকার কি, কাজে লাগাইয়া দাও’- এই কথাটি আরজুর ছোট মনে দাগ কেটে রইল। আরজু মা ছেলের জেদের কাছে হার মানলেন। তখন তাকে হবিগন্জের জিলা স্কুলে ক্লাস ফোরে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হল। বাড়ী থেকে স্কুলের পথ দশ মাইল। অতটুকু ছেলে রোজ ১০ মাইল পথ হেটে আসা যাওয়া করতো। টুকটুকে ফর্সা গ্রীক দেবতাদের মধ্যে চেহারা ছেলেটি যখন সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরত তখন দেখা যেত মুখটা শুকিয়ে ছোট হয়ে গিয়েছে। এত কষ্টের পরেও আরজু নিয়মিত স্কুলে যায়। শুধু তাই না পড়াশুনায় ফলাফলও ভাল করতে শুরু করল।14303957_566500746855519_1718306234_o

আরজুর আসা যাওয়াতে খুবই পরিশ্রম হতো।তাই দেখে তার মেঝবোন যার শ্বশুড়বাড়ি হবিগন্জেই সে তার স্বামীকে রাজী করাল আরজুকে তার কাছে রাখবে। এদিকে মেঝ বোনের শ্বশুর বাড়ী একান্নবর্তী পরিবার, ঘর ভর্তি মানুষ। এখন আরজু থাকবে কোথায়? অগত্যা আরজুর থাকার ব্যবস্থা হল গোয়াল ঘরে। এইটুকুতেই আরজু যেন হাতে স্বর্গ পেল। যাক অতটা পথ রোজ তো হাটতে হবে না। এই গোয়াল ঘরেই থেকেই পড়াশুনা করে মন দিয়ে। যদিও গরু ডাক, গোবরের গন্ধে  কষ্ট হয় তারপরেও বালক আরজু  খুশী, কারন এখন অন্তত পক্ষে আরজু দুই বেলা পেট ভরে তো খেতে পায় তাই বা কম কি? তাছাড়া বোন আর ভগ্নিপতি তো যথেষ্ট আদর করেন।

আরজু পঞ্চম শ্রেনীতে যখন পড়াশুনা করছে, তখন একদিন রাতে আরজু টের পায়  গোয়াল ঘরের নানা ধরনের পোকার মধ্যে একটি পোকা সম্ভবত তার কানে ঢুকে গিয়েছে। পরেরদিন কানে অসহ্য ব্যথা আর প্রচন্ড জ্বর। তবুও আরজু কাউকে বলে না, পাছে এই জায়গাটাও হারাতে হয়। কিন্তু যখন অসুস্থতা বেড়ে গেল তখন আরজুর মা আর বোন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তার কানের ব্যথা উৎস খুঁজে দেখে কানের ভিতর একটি পোকা মরে পরে আছে। এরপর আরজুর মা অনেক ভেবে ক্লাস ফাইভের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর, ছেলেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরিয়ে আনলেন।

আরজু ভাবছে এখন সে কি করে আবার পড়াশুনা শুরু করবে? বিধাতা বোধহয় আরজুর প্রতি কিছুটা সদয় হলেন। আরজুর বড় বোন স্বামীর কর্মসূত্রের কারনে  শিলং থাকে। আরজু বড়বোন তখন নাইওরি আসছে বাড়িতে। এদিকে এত বৎসরের দাম্পত্য জীবনে মেয়েটি মা হতে পারেনি। মেয়েটি ভিতর যেন মাতৃত্ব বোধের তীব্র আকাংখা নিরবে নিভৃতে বয়ে যাচ্ছিল। বড়বোন মায়ের কাছে আব্দার করল আরজুকে তাদের সাথে শিলং নিয়ে যাবে এবং ঐখানকার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিবেন।

আরজু আর তার মা যেন হাতে স্বর্গ পেলেন। আরজু তার বোনের সাথে শিলং চলে এল। আহ কি সুখের জীবন! স্নেহশীল বড় বোন আর দুলাভাই যেন সন্তান না হওয়ার দুঃখ কিছুটা হলেও ভূলে গেল।

কিন্তু আরজু জীবনে এই সুখ বেশীদিন সইল না। যখন আরজু ক্লাস এইটে পড়ে তখন হঠাৎ করেই বড় দুলাভাই মারা গেলেন। বড়বোন যেন দুচোখে আধার নেমে এল। এত সুন্দরী মেয়ে এই বয়সে বিধবা,  স্বামী যা উপার্জন করেছেন তা তারা দুজনেই শৌখিন জীবন যাপন করেছেন। হাতে তেমন পয়সা নেই। তবে আরজুর দুলাভাই উপার্জনের টাকায় বেশ ভাল রকমের সম্পত্তি করেছিলেন।  যেহেতু নিঃসন্তান ছিলেন তিনি তাই আরজুর বোনকে পুরো বন্চিত করে সব সম্পত্তি দখল করে নিল বোনের শ্বশুড়বাড়ির মানুষ জনেরা। একদম নিঃস্ব হয়ে আরজু বোনকে নিয়ে ফিরল গ্রামের বাড়ি অসহায় মায়ের কাছে।

সংসারের এমন পরিস্থিতিতে সবাই মতামত দিল, অনেক পড়েছ বাছা, এইবার কাজকর্ম করে রোজগার করে সংসারের হাল ধরো। এমনকি আরজুর মায়েরও তাই ইচ্ছে। এমনিতেই তার চলে না তার উপর মেয়েও বিধবা হয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু আরজু পড়বেই কারন সে জানে না পড়লে জীবনে উন্নতি করা যায় না।

অনেক তর্ক বিতর্কের পর আরজু ক্লাস নাইনে হবিগন্জ সরকারী স্কুলে ভর্তি হয়ে গেল। এইবার ভর্তি হওয়ার জন্য আরজুকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। তাই কিশোর ছেলেটি মনের দুঃখে নিজের নামটাই পাল্টে ফেলল। সে তার চৌধুরী উপাধি বাদ দিয়ে দিল। আরজু ভাবল আমি আমার নতুন পরিচয় নিজেই তৈরী করব আর তাই সে নিজের নাম দিল আনিসুর রহমান। সে এই নামেই ক্লাস নাইনে রেজিষ্ট্রেশন করল।

আবার সেই সংগ্রাম। বই নেই, খাতা নেই, ঘরে আলো নেই। ছেলেটা পড়বে কি করে? বন্ধুদের বই ধার করে আনে কিছু পড়ে কিছু লিখে রাখে। যখন সেই পড়াটা মুখস্ত হয়ে যায় তখন তা মুছে ফেলে কারন খাতা তো একটাই।সেই পাতায় আবার নতুন করে লিখে। পড়ার জন্য খোঁজে চাদের আলো অথবা ল্যাম্প পোষ্ট। অনাহারে অর্ধাহারে আরজু মেট্রিক পাশ করল তাও সেকেন্ড ডিভিশনে অল্পের জন্য ফার্ষ্ট ডিভিশনটা ফস্কে গেল।মেট্রিক পাশ করার পর আরজু মনোবল অনেকটাই বেড়ে গেল।

এইবার আরজু জেদ ধরল সে ঢাকায় যাবে কারন আরজু জানে গ্রামে থাকলে তার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। গ্রামের একজন দরদী মানুষ যিনি নেভীতে কাজ করতেন তার নাম ছিল জনাব ইউনুস। তিনি বললেন, আরজু তুমি যদি ঢাকা কলেজে ভর্তি হতে পার তবে আমি তোমার পড়াশুনার দায়িত্ব নিব। আরজু একেবারে খালি হাতে গ্রাম ছাড়ল।

ঢাকায় এসে আরজু ঠিকই ঢাকা কলেজে ভর্তি হল। তখন গ্রামের সে দূর সর্ম্পকীয় আত্মীয় মহৎ মনের মানুষটি জনাব ইউনুস সাহেব আরজুকে হাতির পুলের মেসে থাকা ও খাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা করে দিলেন। এই সহৃদয় মানুষ যেন আরজুর তপ্ত জীবনে একখন্ড মেঘের ছায়া হয়ে রইলেন। পরবর্তী জীবনে আরজু নানা ভাবে চেষ্টা করেছে তার ইউনুস চাচার উপকার করার জন্য।অবশ্য সেই অধ্যায় অনেক পরের।

with writer
with writer

আরজু নিজে অসম্ভব আত্মসম্মান বোধ সম্পন্ন ছেলে। ইউনুস সাহেব তার পিছনে যত টাকা খরচ করেছেন তার প্রতিটি হিসাব সে লিখে রেখেছে। দেখতে দেখতে আরজু বেশ ভালভাবে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে। সে জানত তাকে তার পরিবারের জন্য অতি শীঘ্রই রোজগার করতে হবে। তাই সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্নাস ভর্তি না হয়ে আরজু ভর্তি হল জগন্নাথ কলেজে বি.কমে। ভর্তি হয়েই আরজু বিজি প্রেসে চাকুরী নেয় সেই সাথে টিউশনি। কলেজের পড়া, চাকুরি, টিউশনি করে দম ফেলার যেন ফুরসত নাই। নিজের জন্য যৎসামান্য টাকা রেখে বাকী টাকার একাংশ মাকে পাঠায় আরেক অংশ সেই মহান মানুষ ইউনুস চাচাকে পাঠান। আরজুর জন্য তিনি যা খরচ করেছিলেন তার প্রতিটা পয়সায় আরজু শোধ করে ধীরে ধীরে। আরজু জানত এই মানুষটির ভালবাসা কখনও পয়সার হিসেবে বিনিময় চলে না। তাই আজীবন তিনি ইউনুস সাহেবকে পিতার মতন সম্মান করেছেন।

দেখতে দেখতে আরজু বিকম পাশ করে। এই সময় খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে কৃষি ব্যাংকে চাকুরির আবেদন করে। এত কষ্টের পর যেন জীবনে সুখের রং দেখা দিল আরজুর জীবনে।

আরজু এখন জনাব আনিসুর রহমান। অফিসার হিসেবে নিয়োগ পান কৃষি ব্যাংকে। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বড় বোনের আবার ভাল জায়গা বিয়ে হয়ে যায়। ছোট ভাইও রোজগার করে। আরজু সব গুছিয়ে বিয়ে করেন একটু দেরীতেই। তিনি যখন বিয়ে করেন তখন তার স্ত্রী ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছেন। বিয়ের পর আরজু তার স্ত্রীকে পড়াশুনা করতে উৎসাহিত করেছেন বরাবরই। তার স্ত্রী ফেরদৌস আরা বেগম বিয়ের পর বি,এ পাশ করেন, এরপর বি,এড পাশ করে স্কুলে চাকুরী নেন। স্বামীর অনুপ্রেরনায় তিনি দীর্ঘ বাইশ বৎসর স্কুলে চাকুরী করেন। শুধু তাই না ফেরদৌস আরা বেগম অনেক বৎসর স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন।

আরজু শুধু যে পড়াশুনা করেছে তাই না, সে ছিল অসম্ভব ধার্মিক ও সংস্কৃতিমনা। তাদের ঘর আলো করে আসে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে।আজ সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে আমলা, বর্তমানে যুগ্মসচিব হিসেবে কর্মরত আছেন মন্ত্রনালয়ে আর ছোট ছেলে বুয়েট থেকে পাশ করে, জাপানে পি,এইচ,ডি শেষ করে দেশে কর্পোরেট জগতে উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত।

জনাব আনিসুর রহমান কৃষি ব্যাংকে সততার সাথে চাকুরী করে এজিএম থাকাকালীন ১৯৮৯ সালে অবসরে যান। এরপর তিনি সব ছেলে মেয়ে বিয়ে দিয়ে নাতি নাতনীদের সাথে বেশ আনন্দের সাথেই ছিলেন। ২০০২ সালে তিনি স্ত্রী সহ হজ্ব পালন করেন। ২০০৫ সালে ৮ই অক্টোবর ৩রা রমজান আল্লাহ পাকের কাছে তওবা কেটে পরিবার পরিজন পরিবেষ্টিত অবস্থায় ল্যাবএইডে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

এই মানুষটি আছে আমার হৃদয়ে জুড়ে। তিনি তার বৌমাদেরকে ভালবাসতেন হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে। তিনি সব সময় চাইতে আমরা যেন চাকুরী করি বা নিজেদের আত্মপরিচয়ে পরিচিত হই। আমার শ্বশুড় সাহেব জনাব আনিসুর রহমান নিজের রোজগারে সারাজীবন চলেছেন এমনকি মৃত্যুর পরেও তার টাকায় তার দাফন, মিলাদ সবকিছুই হয়েছে।

আল্লাহ কাছে দোয়া করি আমার সন্তানরাও যেন তার দাদার যোগ্য উত্তরসূরী হয়। এই রকম আরজুরা প্রতিটি পরিবারে থাকলে ভয় কি পথ হারাবার!

-মুনিরা চৌধুরী

শিক্ষিকা, বি,এম, ল্যাবরেটরী স্কুল, ঢাকা।

উপদেষ্টা, প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad