একটু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করা যাক। অনেকে অনেক কিছু ভাবতে পারেন, তবে আমি যতবার বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়েছি, কলকাতাকে ঠিক অন্য একটা দেশ হিসেবে (বা তার অংশ হিসেবে) মনে হয়নি। কিছু কিছু জায়গায় উলটো খারাপ লাগছে যে ওরা বাংলায় কথা বলাটাকে অন্তত ইদানীংকালে আমাদের চেয়ে বেশি উদযাপন করে। আর আমরা নিরাপত্তা থেকে মৌলবাদ- এরকম অনেক ইস্যুতে বাঙ্গালী উৎসবগুলোতে রঙ হারাচ্ছি। আরেকটা জিনিস প্রায় আলাদা করাই যায় না। সেটা হল সড়কপথে কলকাতা যাওয়ার সময় দুইপাশের সবুজ। যশোর রোড নামের রাস্তাটার চারদিকে ১০০-২০০ বছরের পুরাতন গাছগুলো এদিকে যেমন, ওইদিকেও একদমই তাই।

১৯৭১ সালে এলেন গিন্সবার্গ কলকাতায় এসেছিলেন। তাঁর চোখে পড়েছিল যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ থেকে দলে দলে আসা শরনার্থী। তিনি একটা বিখ্যাত কবিতা লিখেন যার নাম September on Jessore road, যার শেষ ভার্সটা এরকম-

Wet processions Families walk
Stunted boys big heads don’t talk
Look bony skulls & silent round eyes
Starving black angels in human disguise 

বব ডিলান পরে এই কবিতা থেকে সংগীতে রূপ দেন। সাম্প্রতিককালে আমাদের ভারতবিদ্বেষ এমনই যে ভারতে মানুষ প্রকাশ্যে মলত্যাগ করে বা প্রচুর ধর্ষন হয়ে বলে আমরা যে তৃপ্তি পাই, এটা মনে হয় আমাদের দেশে এই দুইটা জিনিস একদম না হলেও বোধ করতাম না। যারা ভারতের কয়েকটা জায়গায় গেছেন, তারা সত্যটা জানেন। তাদের বিশ্বশক্তি হিসাবে সামনে আগানোর বয়ানে মূল একটা ব্যাপার হলো, তারা নিজেদের পায়ে কুঠার মারে না। এমনকি কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত রাজ্যের কল্যানের বিপক্ষে গেলে রাজ্য সরকার প্রকাশ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতা করে।

যশোর রোড ধরে যে কয়বার আমি গিয়েছি- কোনোদিন জ্যামের মোকাবেলা করতে হয়নি। দিনে ১৫-২০টা বাস এদিক ওদিক যাত্রী নিয়ে আসে। মানুষের জন্যে পোর্টও ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে না। তা সত্ত্বেও যখন খোলা থাকে দুইবার আলাদা কাস্টমস আর ইমিগ্রেশান পার হওয়াটা বড়জোর ৪০ মিনিটের একটা প্রক্রিয়া। এর বাইরে বেশিরভাগই ট্রাক, যারা আমদানী রপ্তানীর কাজ করে। ভোগ্যপন্য থেকে খেলনা, অনেক কিছুই আসে এবং সারিবদ্ধভাবে প্রায় ধীরগতিতেই সেগুলো চলাচল করে। এই রাস্তাটা কেন ছয় লেনে উন্নীত করতে হবে, সেটা কোনভাবেই বোধগম্য না। বিশেষত, যে রাস্তা কাস্টমসে গিয়ে শেষ হয় এবং দুই দিকের দীর্ঘ কাস্টমস-জটের কারণে গাড়ি গিয়ে থামবেই। আর এটি যেহেতু আন্তর্জাতিক হাইওয়ে, আমরা ছয় লেন করলেই অন্য দেশটি ছয় লেন করবে ব্যাপারটা এরকম না। ওইদিকের রাস্তা (যেটি বারাসাত হয়ে কলকাতা পৌছায়) আমাদের চেয়ে কিছুটা ছোট বলা যায় চওড়ায়। এর পরেও কারা যেন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ২০০-২৫০ বছরের কয়েক হাজার গাছ কেটে ফেলতে হবে। গাছ কাটার ব্যাপারে আমাদের যে আগ্রহ এটাকে কেন যেন বেশ উৎকটভাবে চোখে পড়ে।

স্থাপত্যের (বি আর্ক) চতুর্থ বর্ষে ‘আরবান ডিজাইন’ নামে একটা বিষয়ের উপরে ফোকাস করে কারিকুলাম তৈরি। এর অধীনেে যখন ফার্মগেটের মেট্রো স্টেশন নিয়ে একাডেমিক প্রজেক্টে কাজ করি, দেখলাম এলাকার সবচেয়ে পুরাতন (এবং টিকে থাকা শেষ একদল) গাছ এর মধ্যে স্টেশান বসানো করা হয়েছে। সুতরাং কাটা পড়বে প্রচুর গাছ। এবং সেটার ক্ষতিপূরনের কোন প্রক্রিয়া বা পরিকল্পনা নেই। উত্তরার ৪,৬ বা ৮ নং সেক্টরের গহীনে কেন ১০ ফিট চওড়া রাস্তা বড় করার দরকার হলো, সেই রাস্তার দুইদিকে বাস করা লোকই এখনো ধরতে পারেননি। আমার কৈশোরে দেখা উত্তরা যদি ভরা হয় শ্যামলিমায়, সেটা এখন প্রায় ন্যাড়া। ফাঁকা রাস্তার পাশে ফাকা সাইড ওয়াক। শীতে বেশি শীত পড়ে, গরমে হয় অনেক বেশি গরম।

ফিরে যাই যশোর রোডে। এখন যশোর রোডের গাছ কেটে হাইওয়ে চওড়া করতেই হবে এর কারণ সম্ভবত নতুন হতে যাওয়া পদ্মা সেতুর সাথে যোগ হওয়া ৬ লেনের রাস্তা। অতি অবশ্যই পদ্মা সেতু আমাদের যোগাযোগে নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে এবং বিশ্ববাসীর কাছে এটা একটা বার্তা যে আমরাও পারি। কিন্তু ভাঙ্গার মোড় পার হয়ে এই রাস্তাটিকে ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত ছয় লেন করাটা কোনভাবেই খুব দরকারী না।

আমরা এমনিতেই গাছপালা নিয়ে বুঝি কম। তাড়াতাড়ি ফল/কাঠের আশায় ভুল গাছ লাগাই। এক সময় ইউক্যালিপটাস নামের গাছ তাড়াতাড়ি বাড়ে বলে আমরা দেশ ভরে ফেলতে শুরু করেছিলাম ইউক্যালিপটাস রোপন করে। অথচ জলডুমুরের মতো প্রজাতি যা দেশের জন্য সবচেয়ে উপযোগী তা বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শালবনে গড়ে তুলছি আমরা কারখানা। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই ব্যাপারে জ্ঞানী ছিলেন। আদি বাংলাদেশের মাটি ও প্রকৃতি উপযোগী গাছ লাগানোর জন্য আমাদের যে সচেতনতা দরকার, সেটা এখনো বহু দূরের পথ। অথচ তাদের লাগানো উপযোগী গাছগুলোও আমাদের কেটে ফেলার ব্যাপারে এত বেশি আগ্রহ!

পাঠ্যপুস্তকে প্রতি বছর লেখা হচ্ছে বনভূমি মাত্র ১৭% (সেও কয়েক দশক ধরে) একটি দেশের সুষম প্রাকৃতিক অবস্থা রক্ষা করতে ২৫% বনভূমি দরকার। এই জ্ঞানটা আমাদের সবার কম বেশি আছে। কিন্তু কারখানা থেকে বাসাবাড়ি, রাস্তাঘাট থেকে নতুন স্থাপনা, architecture থেকে infrastructure, কনক্রিট বা ইটের কিছু বানাতে হলে প্রথমে সেই গাছ কাটতে শুরু করি এই প্রাথমিক জ্ঞানটিই ভুলে! প্রথমে যা দিয়ে শুরু করেছিলাম, উৎসব রঙ হারাচ্ছে আমাদের অসতর্কতায়, একইভাবে প্রকৃতিও সবুজ রঙ হারাবে আমাদের অসচেতনতায়।

অনেক বোদ্ধা ভাবতে পারেন একটি উন্নয়নমূলক কাজের বিরোধিতা করছি। তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি ছয় লেনের একটি বাংলাদেশ-ভারত মহাসড়ক একটা সময়ের দাবী, সেটা যদি হয়ও, তাহলেও এই গাছগুলো না কেটে এই কাজটি করা সম্ভব। সেই রূপরেখা তৈরি করতে উপযোগী পরিকল্পনাবিদ্, স্থপতি এবং প্রকৌশলী এই দেশেই আছেন। এবারের প্রশ্নটা হতে পারে- কেন? অর্থাৎ গাছগুলোকে রাখতে হবেই কেন? রাখতে হবে কারণ ২৫০ বছর বয়সী প্রায় আড়াই হাজার গাছ এই দেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। এবং হেলাফেলার মত বিষয় নয়। আমরা যদি প্রতিদিন ঢাকার সাথে তুলনা করা শহর কলকাতার দিকে তাকাই তার iconic হাওড়া ব্রিজ হতে পারে একটি উপযোগী উদাহরন। যারাই হাওড়া ব্রিজ দেখেছেন তারা জানেন যে হাওড়া ব্রিজ এর কোন কলাম নেই। অর্থাৎ এটির স্ট্রাকচার নদীর পানি স্পর্শ করে না। সরাসরি ট্রাস ব্যাবহার করে বিশাল উচ্চতা অর্জন করে হলেও নদীর দুই ধার বেধে ফেলা হয়েছে নদীর পানির প্রবাহের কোন ধরনের ক্ষতি না করে। প্রকৃতির প্রতি এই sensitivity যদি আমাদের প্রতিবেশিরা এত আগে শিখে থাকে তাহলে গাছ কেটে ফেলতে আমাদের বিবেকে কেন বাধে না? আমরা কেন ক্ষতিটা ধরতে পারি না?

আর কয়দিন পরে স্বাধীনতার ৫০ বছর হবে। গিন্সবার্গ আমাদের তখন যে চেহারা দেখেছিলেন সেটা এখনো বদলায় নি।

Look bony skulls & silent round eyes
Starving black angels in human disguise

এই-ই রয়ে গেছে আমাদের চেহারা। আগে সেটা শরীরের চেহারা ছিল। এখন সেটা বিবেক, বোধবুদ্ধি আর ভবিষ্যতের চেহারা। ভারত থেকে দেশে আসার পথে যার পাশেই বসতাম তাকেই বলতে শুনতাম- বাংলাদেশের সবুজটা ভারতের নাই। এখন সেইদিনের অপেক্ষা যেদিন বর্ডার পার হয়ে ওই পাশে গিয়ে লোকে বলবে- আহ এই সবুজ তো ওই দিকে নাই…

 

Comments
Spread the love