ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

শোকরানার অদ্ভুত নজরানা!

কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদ দাওয়ায়ে হাদিসকে (তাকমীল) মাস্টার্সের সমমান দিয়েছে সরকার। কওমি মাদ্রাসায় পাস শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরির সুবিধার আওতায় এসেছেন- এমন অনেক সুবিধা পেয়েছে তারা। এগুলো পৃথিবীতে কোথাও নেই, কিন্তু বাংলাদেশে আছে। এবং সেটা স্রেফ রাজনৈতিক কারণে হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না; কারণ কওমি মাদ্রাসার মাওলানাদের দ্বারা প্রভাবিত দেশের অনেক মানুষ এমনই ভাবনা আওয়ামী লীগ সরকারের। তারা ভোটের প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষায় সে পথে পা বাড়িয়েছে, যদিও সম্ভাবনার জায়গাটা সীমিত খুব, খুবই।

দাওয়ায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়ায় কওমি মাদ্রাসাগুলোর ছয় বোর্ডের সমন্বিত সংগঠন আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়্যাহ বাংলাদেশ রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ‘শোকরানা মাহফিলের’ আয়োজন করেছে। ৪ নভেম্বরের এই শোকরানার উদ্দিষ্ট মূলত সরকার। এটা লেনদেনের ব্যাপার। তবে তাদের এই লেনদেনের খেসারত দিতে হচ্ছে দেশকে। স্রেফ এই দুপক্ষের দেওয়া-নেওয়ার তরিকায় স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে পুর্বনির্ধারিত জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার সূচি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে ‘অনিবার্য কারণবশত’ এই দুই পরীক্ষা নির্ধারিত সূচিতে হবে না। রোববারের (৪ নভেম্বর) পরীক্ষা হবে ৯ নভেম্বর। অথচ এই পরীক্ষা গ্রহণের সূচি নির্ধারিত হয়েছিল এ বছরের ৩০ আগস্ট আন্তঃশিক্ষাবোর্ড থেকে। এই পরীক্ষা ষাণ্মাসিক কিংবা অন্য কোনো ছিল না, এটা বার্ষিক পরীক্ষা; এবং সারাবছরের পাঠগ্রহণ শেষে চূড়ান্ত মূল্যায়নের পরীক্ষা। বছরজুড়ে শিক্ষার্থীরা যে পাঠ ও প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে যাচ্ছিল পরীক্ষার ঠিক আগের দিন সে পরীক্ষাই স্থগিত হয়ে গেল।

এরপর এই পরীক্ষার যে সূচি পুনর্নিধারিত হয়েছে সেটা ৯ তারিখ শুক্রবারে; আর খেয়াল করলে দেখা যায় এর আগে-পরেও শিক্ষার্থীদের আরও পরীক্ষায় বসতে হবে। পুনর্নিধারিত সূচিতে পরীক্ষা নেওয়ার আগের দিন যেমন পরীক্ষা আছে ঠিক তেমনিভাবে পরীক্ষা আছে শনিবার ও রোববারেও। ফলে টানা ৪ দিন পরীক্ষায় বসতে হবে এবারের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৬ লাখ ৭০ হাজার ৩৩৩ জন শিক্ষার্থীকে।

এর ফলে এখনই প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটানোর পর উপর্যুপরি পরীক্ষা গ্রহণের যে যে সূচি নির্ধারণ করল শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাতে করে অনতি-তরুণ সেই শিক্ষার্থীদের বেকায়দায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না, এমনটা করা অনুচিত যেখানে নীতিনির্ধারকেরা শিক্ষার্থীদের স্বার্থের ব্যাপারটাই দেখার দরকার ছিল। কিন্তু সেটা তারা দেখেন নি, দেখেছেন স্রেফ রাজনৈতিক লেনদেনের ব্যাপারকেই। যার বলি হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, বলি হচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা।

কাগজেকলমে ‘অনিবার্য কারণ’ বলা হলেও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার কারণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘রোববার সকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের একটি কর্মসূচি রয়েছে। সারাদেশ থেকে তারা ঢাকায় আসবে। ফলে রাস্তাঘাটে বাড়তি চাপ থাকবে। এতে করে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে আসতে বিঘ্ন ঘটতে পারে। তাই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’

সরকারের এই সিদ্ধান্ত মূলত হেফাজত ইসলামকে তোষণ করা সরকারের নতজানু নীতির ফল। স্রেফ ধন্যবাদ আকাঙ্ক্ষায় ভোটের জন্যে দেশের পৌনে এক কোটি শিক্ষার্থী- অভিভাবকদের প্রতি যে অন্যায় করা হলো সেটা সরকারের শুভবুদ্ধির নয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই সমাবেশের প্রভাব সারাদেশে হওয়ার কথা নয়। তবু হুজুরদের শোকরানার বিপরিতে আওয়ামী লীগ সরকার নজরানা দেওয়ার এমন অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলো। যে নজরানায় সরাসরি নজিরবিহীন ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায় রাষ্ট্রীয় বিষয়আশয়। লজ্জা-ক্ষোভ-দুঃখ প্রকাশের জায়গাও সীমাবদ্ধ হয়ে যায়; কারণ ক্ষোভের প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ তুল্য। এই অনুভূতি আবার স্থূল চিন্তকদের ব্যাখ্যায় ব্যাপৃত। তাই সমালোচনা কিংবা প্রতিবাদের শব্দ-বাক্যে শেকল থাকলেও এই শেকলবদ্ধ শব্দগুলোও একটা সময়ে শক্তিমান হয়ে যায়, সমূহ প্রতিবন্ধকতা শেষে।

মাদ্রাসা পড়ুয়াদের একটা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পাবলিক পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিলো সরকার সেটা কোনোভাবেই সমর্থনের মত নয়। এই বাজে সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা; প্রকাশ হয়েছে সরকারের নতজানু নীতি। যদিও পরীক্ষা পেছাতে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক আয়োজক সংগঠন সরকারকে চাপ দিয়েছে এমন খবরও আসেনি। এখানে চাইলেও তাদেরকে দায় দেওয়া যায় না। এটা এককভাবে সরকারের সিদ্ধান্তে হয়েছে।

এমনিতেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রায়। প্রশ্ন ফাঁস, দুর্নীতি সহ নানা কারণে শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা; তার ওপর এখন সরকারের নতজানু নীতি। এমন অবস্থায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কী ভবিষ্যৎ?

জানেন কিছু, জানাবেন কিছু; সরকার, ‘কমরেড’!

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles