২০১৫ সালের কথা। কিছু বিদেশী তরুণ তরুণী ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট পরিষ্কার করে বেড়াচ্ছে। আমাদের হাত দিয়ে ফেলা ময়লা, নোংরা সড়ক তারা অপার মায়ায় পরিষ্কার করছে। আমরা বেকুবের দল তাদের সাথে হাত না লাগিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি, এটাই আমাদের মানুষিকতা।

বিদেশীরা আমাদের দেশে এসে রাস্তা পরিষ্কার করছে, দেখার মতো দৃশ্য বটে! আমরা যারা লাইকখোর তারা লাইকের জন্য ফেসবুকে ভাসিয়ে দিয়েছি ছবিগুলো। অনেকে লজ্জিত হয়েছে, বিদেশীদের প্রশংসা করেছে। কিন্তু, আমরা আসল শিক্ষাটাই নিতে পারিনি।

ঢাকা শহর আবার যেই-সেই অবস্থা। রাস্তার পাশে সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিনগুলো উপতা করে রাখা। মানুষ ময়লা ফেলছে ডাস্টবিনের বাইরে। এ যেনো ডাস্টবিনকে ভার্জিন রাখার শপথ নিয়েছে সব ময়লাবাজরা।

বাংলাদেশের সব জায়গায় এই অবস্থা। কদিন আগে টেকনাফ গিয়েছিলাম। বাস থেকে নামার পর এমনিতেই শরীর গুলাচ্ছিলো। টেকনাফ শহরের বাজে দূর্গন্ধে আর টিকা গেলো না, হড় হড় করে বমি করে দিলাম। রাস্তাঘাট ভীষণ নোংরা, পচা মাছের গন্ধ সব মিলিয়ে যা তা অবস্থা। একটা মসজিদে গিয়েছিলাম, তার অবস্থাও সুবিধাজনক না।

চন্দ্রনাথ পাহাড় তো এখন ফেসবুকের কল্যাণে অনেক জনপ্রিয় ঘুরার জায়গা। এখানে গিয়েও সবাই বাঙ্গালিয়ানা স্বভাবের স্বাক্ষর দিয়ে এসেছে। পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট যেখানে ইচ্ছা সেখানে ফেলে যাচ্ছে সবাই।

মানুষ এমন উন্মাদ!

দেশের ট্যুরিজম নিয়ে স্বপ্ন দেখে লাভ কি? রাস্তাঘাটের কথা বাদই দিলাম, সিকিউরিটির কথাও বাদ দিলাম, বাহ্যিক পরিবেশই যদি নোংরা হয় আপনি আর গর্ব করবেনটা কি নিয়ে? কি জোরে ট্যুরিস্টদের নিমন্ত্রণ দিবেন এমন পরিবেশে?

মানুষ অতিরিক্ত স্বার্থপর হয়ে উঠেছে দেখেই এই অবস্থা। কেউ দেশটাকে নিজের বলে ভাবে না। ক্রিকেট ম্যাচে দলের সাপোর্ট দেয়াই শুধু দেশপ্রেম না। ওখানেও তো স্বার্থপরতা দেখায় সবাই, নিজের পছন্দের একাদশ চায়, নিজের পছন্দের খেলোয়াড়কে দলে চায়, অপছন্দের খেলোয়াড়কে স্যোসাল মিডিয়ায় অপমান করে, এগুলো দেশপ্রেম?

দেশপ্রেম আসলে কি সেটার একটা নজির জাপানিজদের দেখে বোঝা যায়। বিশ্বকাপে নেইমার কেনো একশবার গড়াগড়ি খেলো, মেসি কেনো পেনাল্টি মিস করলো এসব নিয়ে আলোচনা ট্রলের শেষ নেই। অথচ, এই বিশ্বকাপের অন্যতম সুন্দর মুহুর্ত যাকে ভাবা হচ্ছে সেটি নিয়ে বাঙ্গালীরা কথাই বলবে না। কারণ, এরা স্বার্থপর, এরা নেইমার মেসির গোল কিংবা গোল মিসকে উপলক্ষ্য করে ব্যাক্তিগত মানসিক সুখের জায়গা খুঁজে নিতে ব্যস্ত।

এই বিশ্বকাপের অন্যতম সুন্দর মুহুর্তের জন্ম দিয়েছে জাপানি দর্শকরা। জাপান বনাম কলম্বিয়া ম্যাচের দিনে। কলম্বিয়াকে ২-১ গোলে হারানোর ম্যাচের শেষে স্টেডিয়াম যখন প্রায় খালি তখন একদল জাপানিজ দর্শক মাঠ পরিষ্কারের কাজে লেগে গেলো, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়। স্টেডিয়ামে পড়ে থাকা প্লাস্টিক বোতল, কাপ, খাদ্যবর্জ্য সব কিছু তারা পরিষ্কার করে মাঠকে তেমন অবস্থায় নিয়ে গেলো যেমন ছিলো ম্যাচ শুরুর আগে!

তাদের এই অসাধারণ কাজে প্রভাবিত হয়েছিলো সেনেগালের দর্শকরাও। পোল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর জাপানিজদের মতো তারাও মাঠে তাদের অংশ পরিষ্কার করে যায়।

বাঙ্গালি ডিটেকটিভ ও ফেসবুক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন হতে পারে, জাপান কি শো-অফ কিংবা আলোচনায় আসার জন্য করেছে? নাকি প্রথমবার কোনো লাতিন এমেরিকার দলের বিপক্ষে জয়ের আনন্দে এটা করেছে?

একদম না। এই একই কাজ তারা ২০১৪ সালেও করেছিলো। ব্রাজিল বিশ্বকাপে আইভরিকোষ্ট এর সাথে ম্যাচে হারার পর তারা একই রকম ভাবে ফুটবল মাঠ পরিষ্কার করেছিলো।

এটি জাপানি ফুটবল না আসলে এটি জাপানিজ সংস্কৃতিরই অংশ। খেলার পর মাঠ পরিষ্কার রাখার ব্যাপারটা খুব ছোট থেকেই জাপানিজরা শিখে। স্কুলেই বেসিক বিহেভিয়ার এর অংশ হিসেবে এটি তাদের শিখানো হয়। বার বার এই কাজটা করতে করতে এটা তাদের অভ্যাসের মতো হয়েছে।

আর বার বার আগানে বাগানে ময়লা ফেলতে ফেলতে আমাদের অভ্যাস হয়েছে, ডাস্টবিন উপতা করে রাখার!

হায়রে! আমরা মানুষ হবো কবে?

Comments
Spread the love