এবারের কুরবানীর ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পাওয়া সিনেমাগুলোর মধ্যে যেটি সবচেয়ে বেশি দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছিল, সেই সিনেমাটির নাম ‘জান্নাত’। ‘পোড়ামন’ সিনেমার দীর্ঘদিন পরে আবারও এই ছবি দিয়েই জুটি বেঁধেছিলেন সায়মন সাদিক এবং মাহিয়া মাহি, পরিচালনায় ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান মানিক। মুক্তির চতুর্থ সপ্তাহে এসে একদমই অনাকাঙ্ক্ষিত একটা পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে সিনেমাটাকে। সাতক্ষীরার সঙ্গীতা সিনেমা হলে আজ সকাল থেকে ‘জান্নাত’ প্রদর্শিত হবার কথা ছিল। কিন্ত ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এই সিনেমা’, এরকম ভুয়া অভিযোগ তুলে সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় কিছু মুসল্লী।

সঙ্গীতা সিনেমা হলের ম্যানেজার আবদুল হক সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, স্থানীয় মসজিদ কমিটির কয়েকজন হুজুর পুলিশ সুপারের কাছে ‘জান্নাত’ ছবি নিয়ে ধর্মানুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ দিয়েছেন। এমনকি সিনেমার নাম ‘জান্নাত’ কেন, সেটা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন হুজুরেরা। এরপর প্রশাসনের নির্দেশে তারা ছবির প্রদর্শনী বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, “আমরা চাইলে হুজুরদের অভিযোগ তোয়াক্কা না করেও ছবি চালাতে পারতাম। কিন্তু সামনে নির্বাচন আছে। এই সময়ে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, সেজন্যই ছবিটি প্রদর্শনী বন্ধ রেখেছি। আজ সকাল থেকেই ‘জান্নাত’ প্রদর্শনের কথা ছিল। কিন্তু সকালে শো শুরুর আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি ‘জান্নাত’- এর সব পোস্টার হল থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। জান্নাতের পরিবর্তে জিতের ‘সুলতান’ চালাচ্ছি।”

জান্নাত, লালসালু, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, সায়মন, মাহি, জান্নাতে নিষেধাজ্ঞা, সাতক্ষীরা, ধর্মানুভূতি

জান্নাত সিনেমার পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান মানিক। কাকতালীয় ব্যাপার, সাতক্ষীরা সদর থানার ওসির নামও মোস্তাফিজুর রহমান! তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন,

“আমাদের কাছে স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, ‘জান্নাত’ ছবি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে। এতে করে বিশৃঙ্খলা ঘটার আশঙ্কা আছে। তাছাড়া সাতক্ষীরায় ধর্মভীরুদের সংখ্যা বেশি। এর আগে একাধিকবার ধর্মীয় বিষয় নিয়ে এখানে হানাহানি হয়েছে। তাই এমন অভিযোগের ভিত্তিতে ‘জান্নাত’- এর প্রদর্শনী বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।”

এখন কথা হচ্ছে, জান্নাত সিনেমায় ইসলাম ধর্মকে কোথাও খাটো করে দেখানো হয়েছে, কিংবা মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে টানাহেঁচড়া করা হয়েছে বলে অভিযোগ আসেনি প্রথম তিন সপ্তাহে। জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি নিয়েই এই সিনেমার গল্প। সাতক্ষীরার কাঠমোল্লারা তাহলে কি ভেবে এই সিনেমার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ আনলেন? তারা কি সিনেমাটা আদৌ দেখেছেন? নাকি সিনেমার নাম জান্নাত দেখেই ক্ষেপে বোম হয়ে গিয়েছেন, জান্নাত সিনেমায় কেন গান-নাচ থাকবে, প্রেম থাকবে, এসব ভেবে? তারা কি ভেবেছেন, সিনেমার নাম জান্নাত হলে সেখানে কেবল ওয়াজ-মাহফিল দেখানো হবে? একটা সিনেমায় গান থাকবে না? প্রেম থাকবে না? 

জান্নাত, লালসালু, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, সায়মন, মাহি, জান্নাতে নিষেধাজ্ঞা, সাতক্ষীরা, ধর্মানুভূতি

সাতক্ষীরার ইসলামিক ফাউন্ডেশনও এই সিনেমার ব্যাপারে অভিযোগ জানিয়েছে। আমাদের জানতে ইচ্ছে করে, সাতক্ষীরার ইসলামিক ফাউন্ডেশনে যারা বসে আছেন, এরা কি আপাদমস্তক গর্ধব? এদের কি ন্যুন্যতম জ্ঞানবোধ নেই? কিসের ভিত্তিতে তারা সিনেমাটার প্রদর্শনী বাতিল করতে বললেন, সেটার পক্ষে অকাট্য কোন যুক্তি কি তারা দিতে পারবেন? নাকি চিলে কান নিয়েছে শুনেই চিলের পেছনে দৌড়ানো শুরু করে দিয়েছেন, কানের জায়গায় হাত দিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেননি হয়তো! সারা দেশে যখন সিনেমাটা চললো, কোথাও কোন সমস্যা হলো না, সাতক্ষীরায় এসে কি সিনেমার গল্প বদলে গেল? নাকি সাতক্ষীরার হুজুরদের ধর্মানূভূতি সারাদেশের মানুষের তুলনায় অতিরিক্ত সেন্সেটিভ?

স্থানীয় পুলিশও সাফাই গাইছে এসব বকধার্মিকের হয়ে। সেন্সরবোর্ড অনুমতি দেয়ার পরেও কেন প্রদর্শনী বন্ধ রাখা হয়েছে, এই প্রশ্নের জবাবে ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই ‘জান্নাত’ বন্ধ রাখতে বলেছেন তারা। এর বেশি তিনি কিছুই বলতে চাননি। 

জান্নাত, লালসালু, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, সায়মন, মাহি, জান্নাতে নিষেধাজ্ঞা, সাতক্ষীরা, ধর্মানুভূতি

আর প্রদর্শনী বাতিলের প্রসঙ্গে সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার সাজ্জাদুর রহমান বলেছেন, জেলার অনেক মুসল্লি এই ছবির বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন। তারা বলেছেন ‘জান্নাত’ একটি পবিত্র ইসলামী নাম। ‘জান্নাত’ নামের আড়ালে কোনো অশোভন অশ্লীল চিত্র দেখানো হলে তাতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আসতে পারে। জেলার বেশ কয়েকটি মসজিদের ইমামও বলেছেন একই কথা। সেকারণেই তারা ‘জান্নাত’ সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া এর আগেও সাতক্ষীরায় নাটক-সিনেমা প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে নাশকতা এমনমি বোমা হামলার ঘটনাও ঘটেছে। কেউ যাতে এমন সহিংসতা ছড়াতে না পারে, সেকারণেই তারা প্রদর্শনী বন্ধ রাখার অনুরোধ করেছেন বলে দাবী করেছেন তিনি।

জান্নাত তো কোন অশ্লীল সিনেমা নয়। এখানে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কোন গোষ্ঠীকে ছোট বা হেয় করে কোনকিছুই করা হয়নি। তাহলে মাথায় গোবর নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এসব কাঠমোল্লাদের কোপদৃষ্টিটা এই সিনেমার ওপর এসে পড়লো কেন? ‘জান্নাত’ জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছে বলে? জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সেটা ধর্মীয় অনুভূতিতে কিভানে আঘাত করে? ইসলামে তো জঙ্গীবাদের কোন ঠাঁই নেই। যে সিনেমাটাকে সেন্সরবোর্ড প্রদর্শনের অনুমতি দিয়েছে, সেটাকে যখন দশ-বিশ-পঞ্চাশজন ভণ্ড বকধার্মিকের কারণে বিপাকে পড়তে হয়, তখন আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। 

জান্নাত, লালসালু, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, সায়মন, মাহি, জান্নাতে নিষেধাজ্ঞা, সাতক্ষীরা, ধর্মানুভূতি

লালসালুরা নাকি যুগে যুগে ফিরে আসে। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ’র উপন্যাসের মজিদের মতো ভণ্ড ধার্মিকেরাও ফিরে আসে সময়ের পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। ধর্মকে তারা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, নিজের খেয়াল খুশি আর সুবিধামতো ধর্মের আইন-কানুন পরিবর্তন করে, উল্টোপাল্টা নিয়ম বানায়। এরাই মেয়েদের ফুটবল খেলার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, ফুটবল টুর্নামেন্ট বন্ধের দাবীতে মিছিল বের করে। এরা নারীকে ঘর থেকে বেরুতে দিতে চায় না, আর এরাই ধর্মের ধুয়া তুলে অপব্যাখ্যা দিয়ে জান্নাতের মতো সিনেমার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, হয়তো নিজেদের ধর্মব্যবসায় ভাটা পড়বে বলেই! পটেনশিয়াল টেরোরিস্টদের কাজ তো এমনই হয়!

Comments
Spread the love