অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

ষাট বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে রক্ত দান করছেন এই মানুষটা!

জেমস হ্যারিসন নামক ৮১ বছর বয়সী এক অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রলোক বিগত ৬০ বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে রক্ত দান করে আসছেন। আর রক্তদানের মাধ্যমে তিনি এই দীর্ঘ সময়ে ২৪ লাখেরও বেশি অস্ট্রেলিয়ান শিশুর জীবন বাঁচিয়েছেন। তিনি তার এই মহৎ দানের কারণে অস্ট্রেলিয়ায় “ম্যান উইথ গোল্ডেন আর্ম”(Man With the Golden Arm) নামে পরিচিত।

১৯৬৭ সাল থেকে শুরু করে বিগত ৬০ বছর ধরে রক্তদানের এই দীর্ঘ সফর শেষে, গত শুক্রবার(১১ই মে, ২০১৮) তিনি এ দানকার্য থেকে অবসরে যান। এ উপলক্ষ্যে সিএনএন, দ্যা গার্ডিয়ান সহ বিশ্বের আরো অনেক শীর্ষ সংবাদমাধ্যমে জেমস হ্যারিসন নামক এ মহৎ হৃদয়ের মানুষটিকে নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে।

আমরা অনেকেই জানি, একজন সুস্থ মানুষ প্রতি তিন মাস পরপর রক্ত দান করতে পারে। হ্যারিসনের কেসটা আলাদা। আমরা হয়ত অনেকেই ভাবছি, কি করে সে এতবার রক্ত দিল? কেনই বা দিল? আসুন জেনে নেওয়া যাক এসব প্রশ্নের উত্তর-

জেমস হ্যারিসনের রক্তের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এতে রয়েছে এক বিশেষ ধরণের রোগ প্রতিরোধক এন্টেবডি যা থেকে এন্টি-ডি নামক ইঞ্জেকশন তৈরি করা যায়। এ ইঞ্জেকশন রীস্যাস নামক রোগের সাথে লড়াই করতে পারে।

জেমস হ্যারিসন, রক্তদান

রীস্যাস রোগটি প্রেগন্যান্ট মহিলাদের একধরনের শারীরিক অবস্থা, যখন তাদের নিজেদের শরীরের অ্যান্টিবডি, তাদের গর্ভের সন্তানদের রক্তের কোষগুলোকে আক্রমণ করতে শুরু করে। এর ফলে, মায়ের গর্ভের সন্তানের মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে, এমনকি সন্তান মারাও যেতে পারে।

যখন কোন গর্ভবতী মহিলার শরীরে রিস্যাস নেগেটিভ রক্ত থাকে এবং তার গর্ভের সন্তানের রক্তে রিস্যাস পজিটিভ হয় তখন এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনটি ঘটে যদি সন্তানের বাবার রক্ত রিস্যাস পজিটিভ হয় তখন। অর্থ্যাৎ মায়ের মত না হয়ে সন্তানের রক্তের ধরণ বাবার মত হয়।

যদি মায়ের শরীরের রিস্যাস নেগেটিভ ব্লাডসেল, গর্ভের সন্তানের পজেটিভ ব্লাডসেলের ব্যাপারে সংবেদনশীল হয়, তবে গর্ভধারণের প্রথম পর্যায়ে মায়ের শরীরে এমন এন্টিবডি তৈরি হতে পারে, যা শিশুর শরীরের অচেনা ব্লাডসেলগুলোকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এটি শিশুর জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে।

যখন জেমস হ্যারিসনের বয়স সবে মাত্র ১৪ বছর তখন তার বুকে একটি বড় ধরণের অপারেশন করতে হয়েছিল। সেসময় অন্যের রক্তদানে জীবন বাঁচে তার। তখন থেকেই তিনি শপথ করেছিলেন যে তিনি নিজেও একজন রক্তদাতা হবেন।

এর কয়েকবছর পরে, ডাক্তাররা আবিস্কার করেন, জেমস হ্যারিসনের রক্তে এমন এক ধরণের অ্যান্টিবডি রয়েছে যা অ্যান্টি-ডি ইঞ্জেকশন তৈরি করা যেতে পারে। এরপরই ডাক্তাররা হ্যারিসনকে পরামর্শ দেন রক্তরস দান করতে, যাতে সে আরও অনেক বেশি মানুষের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করতে পারে।

জেমস হ্যারিসন, রক্তদান

ডাক্তাররা নিশ্চিত হতে পারেননি হ্যারিসনের রক্তে কি করে এই বিরল ধরনের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। তবে তারা ধারণা করেছেন, ১৪ বছর বয়সে জেমস হ্যারিসনের শরীরে যে অপারেশনটা হয়েছিল, তার কারণে রক্তের এধরণের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। পুরো অস্ট্রেলিয়াতে তার মতো খুব বেশি হলে এমন আর ৫০জন মানুষ আছেন যাদের রক্তে এই বিরল ধরণের অ্যান্টিবডি রয়েছে।

প্রতিব্যাগ রক্তই অমূল্য, কিন্তু বিশেষ করে জেমস হ্যারিসনের টাইপ রক্ত অতুলনীয়। তার রক্ত এক বিশেষ ধরণের জীবন রক্ষাকারী ঔষধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। গত ৬০ বছরে অস্ট্রেলিয়ায় যত ব্যাচ অ্যান্টি ডি ইঞ্জেকশন তৈরি হয়েছে, তার প্রত্যেকটিতে হ্যারিসনের রক্ত রয়েছে। প্রতিবছর ১৭ শতাংশেরও বেশি অস্ট্রেলিয়ান নারী এ ধরণের সমস্যায় আক্রান্ত হন। কাজেই, জেমস হ্যারিসনের রক্ত অসংখ্য জীবন বাঁচাতে সহায়তা করেছে।

জেমস হ্যারিসনের অ্যান্টিবডি থেকে যে অ্যান্টি-ডি ইঞ্জেকশন তৈরি হয় তা গর্ভবতী রিস্যাস নেগেটিভ রক্তের মায়েদের শরীরে রিস্যাস-নেগেটিভ অ্যান্টিবডি তৈরিতে বাধা দেয়। ১৯৬৭ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ার তিন মিলিয়ন গর্ভবতী মাকে এই অ্যান্টি-ডি ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে।

হ্যারিসনের নিজের মেয়েকেও দিতে হয়েছে এই অ্যান্টি-ডি ভ্যাকসিন। অন্য শিশুদের জীবন বাঁচানোর সাথে সাথে তার রক্ত যে নিজের নাতির জীবন বাঁচাতেও কাজে লেগেছে, এতে হ্যারিসন আনন্দিত।

জেমস হ্যারিসন, রক্তদান

জেমস হ্যারিসনের এই অবদান এক বড় ধরণের পরিবর্তনের পরিবর্তন এনেছে অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসা ক্ষেত্রে। ১৯৬৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হত অজানা কারণে। অনেক নারীর গর্ভপাত ঘটত এবং অনেক শিশুর জন্ম হত মস্তিষ্কের সমস্যা নিয়ে। অস্ট্রেলিয়া অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে অন্যতম যারা এই ধরণের রক্তদাতাদের কাছ থেকে অ্যান্টিবডি নিয়ে এ সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে।

রেস ক্রসের হিসাব মতে, দুই মিলিয়নেরও বেশি মানুষ হ্যারিসনের সহায়তায় নতুন জীবন পেয়েছে। তাই হ্যারিসনকে জাতীয় বীর বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। এই মহৎ কাজের জন্য জেমস হ্যারিসন জীবনে অনেক ধরণের পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। এসব পুরস্কারের মধ্যে, অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি বলে বিবেচিত, “দ্যা মেডেল অব দ্যা অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

হ্যারিসন তার অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে বলেন, যখন কেউ বলে তুমি এটা করেছ বা ওটা করেছ, সেটা শুনতে খুবই ভালো লাগে। এটা আমার একটা অর্জন। আমার একটা যোগ্যতা। আমি রক্তদাতা হয়ে অনেকের জীবন বাঁচাতে পেরেছি এটা সম্ভবত আমার একমাত্র যোগ্যতা।

অস্ট্রেলিয়ার আইন অনুযায়ী ৮১ বছর বয়সের পরে কেউ আর রক্ত দিতে পারে না। হ্যারিসনের বয়স ৮১ বছর পূর্ণ হয়েছে গত শুক্রবারে। একারণেই মহানুভব এই ব্যক্তি এবার রক্তদান থেকে অবসরে নিয়েছেন। রেডক্রস কর্তৃপক্ষের সাথে সাথে আরও অনেকেই আশা করছে, জেমস হ্যারিসনের মত আরও যাদের রক্তে এই বিরল অ্যান্টিবডি রয়েছে, তারা অন্যদের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসবে।

তথ্যসূত্র- সিএনএন

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close