কোন কোন খেলোয়াড় গোটা জীবন চেষ্টা চালিয়েও সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পারেন না। আবার কোন কোন খেলোয়াড় স্রেফ একটি ম্যাচের পারফরম্যান্স দিয়েই রাতারাতি বনে যান সুপারস্টার, গোটা বিশ্ব যেন চলে আসে তার পদতলে। কলম্বিয়ার হামেস ডেভিড রড্রিগেজ রুবিও, কিংবা কেবলই হামেস, দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত একজন খেলোয়াড়।

ব্রাজিল বিশ্বকাপের বছরখানেক আগে, ২০১৩ সালে তিনি পোর্তো থেকে মোনাকোয় আসেন। তখন পর্যন্ত তিনি ফুটবল বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত একটি নাম। ২২ বছর বয়স, মেধাবী ফুটবলার, ভবিষ্যতে ভালো কিছু করার সম্ভাবনা রাখেন – তার ব্যাপারে ফুটবল বোদ্ধাদেরও মতামত ছিল স্রেফ এটুকুতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু মোনাকোর হয়ে সেই মৌসুমটা বেশ ভালো করলেন তিনি। লিগ ওয়ানের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট সেই মৌসুমে তারই ছিল। এমন পারফরম্যান্সের বদৌলতে সহজেই ডাক পেয়ে যান কলম্বিয়ার বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। কিন্তু তখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ স্কোয়াডের অংশ হতে পারাই তার জন্য মনে হচ্ছিল বিশাল বড় একটি অর্জন। কারণ মানুষ যে বাস্তবে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নয়!

তবে বিশ্বকাপের শুরুটাই তিনি করলেন দারুণভাবে, এবং তাকে ঘিরে অপার সম্ভাবনার বীজ বুনে দিলেন ভক্ত-সমর্থকদের মনে। দুইটি গোলে অ্যাসিস্ট করার পাশাপাশি নিজেও একটি গোল করে গ্রিসের বিপক্ষে ম্যাচসেরা হলেন এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। এবং এই ফর্ম তিনি অব্যহত রাখলেন আইভরি কোস্টের বিপক্ষে পরের ম্যাচেও। সে ম্যাচেও একটি গোল করলেন তিনি, অপর একটি গোলেও অ্যাসিস্টের মাধ্যমে ছিল তার অবদান। ফলে আরও একবার জিতে নিলেন ম্যাচসেরার খেতাব। জাপানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে অবশ্য স্টার্টিং ইলেভেনে ছিলেন না তিনি। বদলী খেলোয়াড় হিসেবে দ্বিতীয়ার্ধ্বে মাঠে নামেন, এবং নেমেই দেখিয়ে দেন চমক। আরও একবার জোড়া গোলে অ্যাসিস্ট করলেন, পাশাপাশি নিজেও একবার বল জড়ালেন প্রতিপক্ষের জালে। মোটামুটি তার একার কাঁধেই অনেকটা ভর করে গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার করল কলম্বিয়া।

যে ম্যাচটি তার গোটা ফুটবল ক্যারিয়ারকেই খোলনলচে পাল্টে দিল, সেটি মূলত উরুগুয়ের বিপক্ষে রাউন্ড অফ সিক্সটিনের ম্যাচ। সেই ম্যাচে কলম্বিয়া আগেরবারের সেমিফাইনালিস্ট উরুগুয়েকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে দিয়ে আসরের অন্যতম বড় দুর্ঘটনার জন্ম দিল, আর সেখানে দুইটি গোলই এল হামেসের পা থেকে। এর মধ্যে একটি গোল আবার গোটা বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা গোল। বক্সের বাইরে থেকে ভলি করে লক্ষ্যভেদ করা সেই গোল হামেসকে জেতায় সেই বছরের পুসকাস অ্যাওয়ার্ডও। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা, সেই রাতে সুপারস্টারে পরিণত হন হামেস। আগের তিন ম্যাচেও আলো ছড়িয়েছেন তিনি। তবে প্রথমবারের মত গোটা বিশ্বের দৃষ্টি চুম্বকের মত নিজের দিকে আকৃষ্ট করলেন সেবারই প্রথম।

কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার প্রতিপক্ষ স্বাগতিক ব্রাজিল। এই ম্যাচে কলম্বিয়ার পক্ষে বাজি ধরার মত লোক ছিল না বলতে গেলে কেউই। তবু কলম্বিয়ার শেষ চারে উঠবার আশার বাতি যে টিমটিম করে জ্বলছিল, তা ওই এক হামেসের কারণেই। যদি হামেস আবারও অতিমানবিক কিছু করে দেখাতে পারেন… হামেস এই ম্যাচেও জারি রাখলেন নিজের অবিশ্বাস্য দৌড়। দলের পক্ষে একটি গোলও তিনি করলেন। কিন্তু শেষমেষ পেরে উঠলেন না বিজয়ীর বেশে মাঠ ছাড়তে। ১-২ ব্যবধানে হার মানল তার দল। ওখানেই ইতি ঘটল তার ও তার দলের স্বপ্নযাত্রার।

তবে ব্যক্তিগত অসাধারণত্বের জোরে গোল্ডেন বুট অ্যাওয়ার্ডটি টুর্নামেন্ট শেষে ঠিকই নিজের করে নেন হামেস। মাত্র কোয়ার্টার ফাইনাল অবধি খেলেই তিনি গোল করেন ছয়টি, যা কিনা টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ। পাশাপাশি অনেকেই তাকে মনে করেছিল টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার তথা গোল্ডেন বলেরও অন্যতম দাবিদার। এমনকি সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার, আর্জেন্টাইন কিংবদন্তী ডিয়েগো ম্যারাডোনাও নিজ দেশের লিওনেল মেসির চেয়ে এগিয়ে রেখেছিলেন হামেসকেই। যদিও শেষ পর্যন্ত সে পুরস্কার যায় মেসির ঝুলিতেই।

বিশ্বকাপ শেষে ৬৩ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে তাকে নিজেদের করে নেয় বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ। হামেসের ট্রান্সফার ফি ছিল সেই সময়কার চতুর্থ সর্বোচ্চ। অবশ্য রিয়াল মাদ্রিদে সময়টা খুব একটা ভালো কাটেনি হামেসের। জিনেদিন জিদানের কোচিংয়ে খুব বেশি গেম-টাইম পাননি তিনি। তাই দুই বছর মেয়াদী লোনে বায়ার্ন মিউনিখে পাড়ি জমান তিনি। এবং সেখানে গিয়েই সফলতার মুখ দেখেন। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দারুণ পারফরম্যান্স করে ক্লাবের লিগ ও কাপ টাইটেল জয়ের পথে বড়সড় ভূমিকা রাখেন তিনি।

বিশ্বকাপের আগে গেল মৌসুমটি এই কলম্বিয়ান প্লে-মেকার শেষ করেছেন সবধরণের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে নিজের নামের পাশে আটটি অ্যাসিস্ট ও ১৩টি গোল নিয়ে। তবে রাশিয়ায় তার কাছ থেকে কলম্বিয়ার চাওয়া নিঃসন্দেহেই আরও অনেক বেশি।

মিডফিল্ডের যেকোন পজিশনে সমান প্রভাব বিস্তার করে খেলার সামর্থ্য রাখেন হামেস – হোক তা উইংয়ে কিংবা ফরওয়ার্ডে। নিজের এই বৈচিত্র্যময় শক্তিই তাকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছে সময়ের সবচেয়ে ভয়ংকর অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারদের একজন হিসেবে। প্রতিপক্ষের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করে সেখানে ছোবল হানার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। একাধারে তিনি যেমন সতীর্থ স্ট্রাইকারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ পাস দিতে পারঙ্গম, ঠিক একইভাবে দলের প্রয়োজনে নিজেও আবির্ভূত হতে পারেন একজন গোলস্কোরারের ভূমিকায়, যার প্রমাণ বিশ্ববাসী পেয়েছে গত বিশ্বকাপেই।

গত বিশ্বকাপে হামেস ছিলেন নিতান্তই অনভিজ্ঞ একজন খেলোয়াড়, প্রতিভাই ছিল যার একমাত্র সম্বল। কিন্তু পরের চার বছরে তার অভিজ্ঞতা হয়েছে বিশ্বের সেরা দুইটি দলের হয়ে খেলার। ফলে বিগ ম্যাচে চাপ কীভাবে সামলাতে হয়, তা এখন খুব ভালো করেই জানা তার। পাশাপাশি চার বছরে বয়সটাও তো বেড়েছে, হয়েছেন আরও পরিণত। তাই ব্রাজিলে যা করে দেখিয়েছিলেন, রাশিয়ায় তার চেয়ে আরও ভালো কিছু করে দেখাবেন তিনি, তার কাছ থেকে এমনটিই প্রত্যাশা তার ভক্তদের।

গত বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল কলম্বিয়া। এবারও যদি তারা অন্তত শেষ ৮ পর্যন্ত পৌঁছাতে চায়, সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় রাউন্ডে তাদেরকে হারাতে হবে ইংল্যান্ড বা বেলজিয়ামের যেকোন একটি দলকে। নিঃসন্দেহে খুবই কঠিন হবে কাজটি। বর্তমান কলম্বিয়া স্কোয়াডে রাদামেল ফ্যালকাও, হুয়ান গিলের্মো কুয়াদ্রাদো কিংবা ডেভিডসন সানচেজের মত খেলোয়াড়রা আছেন হয়ত ঠিকই, তবু জ্বলে উঠতে হবে হামেসকেও। তবেই আরও একবার বিশ্বমঞ্চে দারুণ কিছু করে দেখাতে পারবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি।

দেখা যাক হামেস সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে কতটুকু প্রস্তুত।

*

এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনুন ক্যাসপারস্কি ল্যাবের সব পণ্য, খুব সহজে। অনলাইনে পেমেন্ট, অনলাইনেই ডেলিভারি!

Comments
Spread the love