সিনেমা হলের গলি

দ্য শো মাস্ট গো অন!

মাহফুজ আনাম জেমস কাঁদছেন। যেমন তেমন কান্না নয়, একদম হাউমাউ করে যেভাবে কাঁদে লোকে, সেভাবে। শব্দ বেরুচ্ছে না গলা দিয়ে, দুচোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে শুধু গাল বেয়ে। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আছে, তবে হাতটা থেমে নেই। গিটারের ছ’টা তারে ছুটে বেড়াচ্ছে তার হাত, অদ্ভুত একটা আওয়াজ বেরুচ্ছে গিটার থেকে, সেই সুরে মিশে আছে খুব প্রিয় কোন বন্ধুকে হারিয়ে ফেলার বেদনা। আইয়ুব বাচ্চু তো জেমসের কাছে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যান্ড শিল্পীই ছিলেন না শুধু, ছিলেন বন্ধু, ছিলেন ভাই, ছিলেন খুব কাছের একজন। দুজনের আত্মার বন্ধনটা বেঁধে দিয়েছিল গান, এদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতকে তো ওঁরা দুজনই এগিয়ে নিয়ে গেছেন কতটা পথ! সেই পথের সহযাত্রীকে হারিয়ে জেমস যেন অনেকটাই একাকী হয়ে গেলেন, চেষ্টা করেও চেপে রাখতে পারলেন না আবেগকে!

বরগুনায় সরকারী একটা অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়েছিলেন জেমস। সেখানে থাকা অবস্থাতেই খবর পেয়েছেন, সকালে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন আইয়ুব বাচ্চু। শো না করেই ঢাকায় ফিরবেন বলে মনস্থির করে ফেলেছিলেন, পরে নিজেকে সামলেছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে কথা বলে কনসার্টটা উৎসর্গ করেছেন আইয়ুব বাচ্চুকে। কি ভেবে কনসার্টটা করছেন, সেটাও জানিয়েছেন মঞ্চে উঠে। ধরে আসা গলায় বলেছেন-

“পনেরো বছর আগের একটা গল্প বলি আপনাদের। একবার বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। আমরা বলাবলি করছিলাম, শিল্পীদের তো কোন অবসর নেই, বিরতি নেই। কারণ ইংরেজীতে একটা কথা আছে, দ্য শো মাস্ট গো অন… তাই চেষ্টা করবো…”

এটুকু বলার পরেই আবেগে রুদ্ধ হয়েছে জেমসের গলা। বাকীটা সময় সেই বুনো আবেগের বারান্দা থেকে বেরুতে পারেননি জেমস। গিটারে ঝংকার তুলেছেন, তার গাল বেয়ে নামছে অশ্রুর ধারা। তিনি গাইছেন, সুর-তাল কেটে যাচ্ছে হঠাৎ হঠাৎ, কখনও বা গলা দিয়ে বেরুচ্ছে না শব্দও, চোখভর্তি যেন অশ্রুর সাগর। কনসার্টে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শকও যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল এই দৃশ্য দেখে। টিভিতে তখন লাইভ সম্প্রচার হচ্ছে সেই দৃশ্য, টেলিভিশনের বদৌলতে জেমসের সেই আবেগী মূহুর্তগুলোর সাক্ষী হয়েছেন লক্ষ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার হয়েছে সেই মূহুর্তের ভিডিওটা, সেখানেও অজস্র মানুষ আরও একবার চোখের জল ফেলেছেন সেই দৃশ্য দেখে!

তারা ছিলেন বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের মানিকজোড়। দুজনেরই উত্থান চট্টগ্রাম থেকে। সোলস থেকে বেরিয়ে আইয়ুব বাচ্চু তখন এলআরবি নিয়ে মাতাচ্ছেন সবাইকে, জেমসও তার নগরবাউলের গান দিয়ে জয় করছেন গোটা বাংলাদেশ। নব্বইয়ের দশকের পুরো সময়টায়, কিংবা নতুন শতাব্দীর শুরুতেও বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তারা দুজনে মিলে। জেমস না বাচ্চু- কে এক নম্বর, এই প্রশ্ন নিয়ে দুজনের ভক্তদের মধ্যে হাতাহাতিও হয়ে যেতো। কিন্ত তাদের মধ্যে বজায় ছিল দারুণ সদ্ভাব। পত্রিকা বা ট্যাবলয়েডে কত গসিপ দুজনকে নিয়ে, দুজনের মধ্যেকার ‘কল্পিত’ রেষারেষি নিয়ে… অথচ তারা ঠিকই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গান গেয়েছেন, একই কনসার্টে এক মঞ্চ ভাগাভাগি করেছেন। ইগো ছিল হয়তো কোথাও, তারচেয়ে অনেক বেশি ছিল ভালোবাসাটা। 

নইলে কি আর নতুন অ্যালবাম বের করবেন না বলে ধনুকভাঙা পণ করে বসে থাকা আইয়ুব বাচ্চু বলতেন, শ্রোতারা চাইলে তিনি জেমসের সঙ্গে অ্যালবাম বের করতে রাজী! আইয়ুব বাচ্চুর বিদায়ের খবর পেয়ে জেমসই বা কেন বাচ্চাদের মতো কান্নায় ভেঙে পড়বেন? কেন তার গলা বসে যাবে, কেন তাকে মঞ্চ ছেড়ে নিচে গিয়ে দশ মিনিটের বিরতি নিতে হবে একটু স্বাভাবিক হবার জন্যে? এগুলো তো লোকদেখানো পাবলিসিটি স্ট্যান্ট নয়, জেমসের গালে যে অশ্রুর ধারা, সেটার জন্ম তো গ্লিসারিন থেকে হয়নি। পুরোটাই নিখাদ ভালোবাসা থেকে এসেছে, যে ভালোবাসায় সেতুবন্ধন হয়ে আছে সঙ্গীত, কিংবা ছয় তারের একটা গিটার, আর একটা মাইক্রোফোন।

দুজনের ক্যারিয়ারই শুরু হয়েছিল প্রায় একই সময়ে, আশির দশকের শুরুতে। দুজনের পরিচয়টাও তখন থেকেই। প্রায় চার দশক ধরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব। সেখানে মান-অভিমান ছিল, সুখ-দুঃখ সবই ছিল, কমতি ছিল না কোনকিছুর। একে অন্যকে ছাপিয়ে যাবার, অন্যের চেয়ে ভালো কাজ করার একটা সুস্থ প্রতিযোগীতা ছিল। সেই প্রতিযোগীতায় লাভবান হয়েছে বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতই। তবে দুজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বোধহয় ছিল টান। প্রিয় বাচ্চু ভাইকে নিয়ে জেমস যেমন বলছিলেন-

“বাচ্চু ভাই খুব উদার মনের মানুষ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক, সেটা আসলে বলে বোঝানো যাবে না। বিভিন্ন সময়ে কারণে-অকারণে আমরা একজন আরেকজনের পাশে সব সময় ছিলাম। সম্পর্কের এই গভীরতার কথা কখনো বোঝাতে পারব না। কেউ হয়তো জানবেও না যে আমাদের একজনের হৃদয়ে অন্যজনের জন্য কতটা জায়গা রাখা আছে। আমাদের মধ্যে সবসময় একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল। সেটা ভালো গান তৈরির প্রতিযোগিতা। সেখানে কোনো ঈর্ষা ছিল না। যখন যেখানে দেখা হতো, একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছি পরম ভালোবাসায়।”

জেমসের আর কোনদিন আইয়ুব বাচ্চুকে জড়িয়ে ধরা হবে না। একসঙ্গে কনসার্ট করা হবে না, অ্যালবাম বের করার স্বপ্নটা কখনও পূরণ হবে না। চট্টগ্রামে মায়ের কবরের পাশে চিরতরে শুয়ে থাকবেন আইয়ুব বাচ্চু, তার হাতে গিটার উঠবে না কোনদিন। প্রিয় বন্ধু, প্রিয় সহযাত্রীকে হারানোর শোক বুকে চেপে রেখে তবুও জেমস গাইবেন, কনসার্ট করবেন, টেলিভিশনে লাইভ শো-তে গান গাইতে আসবেন। জীবন চলবে, চলবে সবকিছুই। কারণ, শিল্পীদের তো থেমে যেতে নেই! দ্য শো মাস্ট গো অন!

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close