খেলা ও ধুলা

ফুটবল মাঠের এক জাফর ইকবালের গল্প

প্রথমার্ধেই তিন গোলে এগিয়ে গেল ভারত। ২০১৭’র ২০শে সেপ্টেম্বর সাফ অ-১৮ চ্যাম্পিয়নসিপের ম্যাচটির এমতাবস্থায় মাথায় এসে ঢুকলো ১৯৯৪ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর কাতারের ইনডিপেনডেন্স কাপে ভারতেরই বিপক্ষে ম্যাচের কথা। অবশ্য ওটা ছিল সিনিয়রদের খেলা এবং তারাও প্রথমার্ধে তিন গোলে পিছিয়ে ছিল, ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত হারে ২-৪ এ। হতাশ আমি চিন্তা করছিলাম যে তাই বলে বয়সভিত্তিক ফুটবল থেকেই এখন এতবড় পার্থক্য থেকে গেলে সিনিয়র পর্যায়ে গিয়ে কি হবে। আর আজ হারের ব্যবধান শেষ পর্যন্ত কততে গিয়ে ঠেকবে? অবশ্য ২০০২ অ-২০ এশিয়া কাপের চূড়ান্ত পর্বে ভারতের বিপক্ষে হাফ ডজন গোল হজমের রেকর্ড আছে বাংলাদেশের। ওটা খানিক অঘটন ধরে নেয়া যায়। বিশ্ব ফুটবলে এরকমটা ঘটে থাকতে দেখি আমরা মাঝে মধ্যেই। সেখানে ভারত সর্বশেষ ২ ম্যাচে ১১ গোল হজম করেছিল। যাই হোক, বর্তমান ফুটবলের দূরবস্থার প্রেক্ষিতে এখন ভারতের কাছে বিশাল ব্যবধানে হারলে তাকে আর অঘটন বলা যাবে না। দলটিতে প্রিমিয়ার লীগে নিয়মিত খেলা ৫ জন আছে, বাকিদের কিছু অংশ প্রিমিয়ারে অনিয়মিত। আর কিছু অংশ এসেছে দ্বিতীয় ডিভিসন বিসিএল থেকে। বাকিরা বিকেএসপি ও জেলা দল থেকে। কাগজে কলমে ভারী লাগলেও দলটা দুই সপ্তাহেরও কম সময় অনুশীলন করেছে যা চিন্তিত হবার মত কথা। ভূটান রওনা হবার মাত্র দিন দুয়েক আগে পুরো স্কোয়াড একসাথে পাবার ঘটনা মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে এসেছে কোচ রক্সি’র জন্য।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭ হাজার ফুট উচ্চতার ভেন্যুতে পাহাড়ী খেলোয়াড় সমৃদ্ধ ভারতের বিপক্ষে ০-৩ এ পিছিয়ে আমরা। টিটুর ‘ভূটান আমাদের চেয়ে টেকনিকেলি বেটার’ কথা মনে পড়ছিল আর ভেতরটা জ্বলে পুড়ছিল। যে টিটু’র সমালোচনা করে আসছিলাম বছর দুয়েক আগে তার নেতিবাচক মানসিকতায় ধ্বংস হওয়া অ-১৯ দলটির জন্য, ম্যাচের হাফ টাইমের সময় তার কথাই তিতে সত্য মনে হচ্ছিল। দুই বছর আগে এই সাফ অ-১৯ চ্যাম্পিয়নসিপের সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে তার যে নেতিবাচক ফুটবল খেলানো দেখে মাথা নিচু হয়ে গিয়েছিল আর পেটের খাবার গলায় উঠে আসছিল, মনে মনে রক্সিকে বলছিলাম যে কোচ এবারে টিটু’র ঢঙয়ে খেলিয়ে মান-সম্মানটা বাঁচাও।

কিন্তু রক্সি’র মানসিকতা যেন অন্য ধাঁচে গড়া। যে দলটা পর্যাপ্ত সময় পায়নি বোঝাপড়া গড়ে নিতে, সেই দলটাকেই মানসিকভাবে উজ্জীবিত করে আক্রমণাত্মক ফুটবলের টোটকা দিলেন মাঝ বিরতিতে। দলটা রীতিমত আহত বাঘের মত ভারতের বিপক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ল দ্বিতীয়ার্ধে।

এবং সেই আহত বাঘের থাবা হয়ে আক্রমণের আগ্রভাগে নেতৃত্ব দিলেন এক তরুণ। নাম তার জাফর ইকবাল।

প্রথমার্ধে আর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে নিজে কর্ণার কিক নিলেও ভালো হেড হচ্ছিল না দেখে বক্সে সরে এসে বিপলু কে কর্ণার নিতে পাঠান জাফর। এই কৌশলে ৫৫তম মিনিটে হেড থেকে গোল করে ম্যাচে দলকে ফিরিয়ে আনেন জাফর। ৭৪তম মিনিটে নিখুত ক্রসে মাহবুবুরকে দিয়ে সমতা আনিয়ে ইনজুরি টাইমে সেই কর্ণার থেকেই হেডে গোল করে বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি জয় এনে দেন জাফর।

টিপিক্যাল জাফর!

যে ছেলেটা একটা দিনও মাঠ না মাড়িয়ে থাকতে পারতো না, সেই জাফর ইকবালের উঠে আসাটা বেশ নাটকীয়। সবে অষ্টম শ্রেণীতে থাকা অবস্থাতেই বান্দরবান জেলা দলের হয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় পর্যায়ে খেলেন জাফর যেখানে তার দল হয় রানার আপ। সেখান থেকে চট্টগ্রাম পাইওনিয়র লীগে মাদারবাড়ি শোভনিয়া ক্লাবের হয়ে আরও একটি রানার আপ ট্রফি। তারপর চট্টগ্রামের দ্বিতীয় ডিভিসনে আগ্রাবাদ কমরেডের হয়ে ৩ ম্যাচে লীগের ব্যাক্তিগত সর্বোচ্চ ৬ গোল করে দলকে চ্যাম্পিয়ন করে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রিমিয়ার লীগে নিয়ে যান দলকে।

অ-১৮ বাফুফে ডেভলাপমেন্ট ফুটবলে ফেনী সকারের হয়ে খেলবার সময় কোচ জিলানী’র নজরে পড়ে বাফুফে একাডেমিতে সুযোগ পান জাফর। কিন্তু অসময়ে একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ায় মাত্র ৫ হাজার টাকায় যোগ দেন তৃতীয় বিভাগের দল দিলকুশা তে। সেখানে ১১ ম্যাচে তার ৯ গোল দিলকুশা কে চ্যাম্পিয়ন করে দ্বিতীয় বিভাগে উন্নীত করে। কিন্তু পরবর্তী মৌসুমের দ্বিতীয় বিভাগে তার খেলা হয়নি! কারণ সেই চলমান মৌসুমে কোচ টিটু’র নজরে পড়ে ৪০ হাজার টাকায় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের আরামবাগে যোগ দেন জাফর। আরামবাগে দারুণ পারফরম্যান্স সহ ৫ গোল করে সিনিয়র জাতীয় দলেও জায়গা করে নেন। সেই মৌসুমে ফেডারেশন কাপে রানার আপ হয় আরামবাগ এবং লীগে ষষ্ঠ। এই মৌসুমে ১৫ লাখ টাকায় চট্টগ্রাম আবাহনীতে যোগ দেন জাফর। একই কোচ টিটু’র অধীনে এবারে অবশ্য বেঞ্চেই বেশিরভাগ সময় কাঁটাতে হচ্ছে ১৮ বছর বয়সী জাফরকে। কারণ দলটিতে সিনিয়র জাতীয় দলের খেলোয়াড় প্রচুর।

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মতো মাঠ জাফরের মতো ফুটবলারের স্কিল দেখানোর জন্য উপযুক্ত না 

একটি তুলনা টানতে চাই যা আপনাদের অনেকের কাছেই বিতর্কিত লাগতে পারে। কিন্তু আমি অনেক ভেবে চিন্তা করেই তা বলতে চলছি। জাফরের খেলার ধরণ ও কার্যকারিতা মালদ্বীপ ফুটবলের ‘ম্যান অফ স্টীল’ আলী আশফাকের মত। আশফাকের মত আউটসাইড ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের সাথে মুহূর্তেই দুই হাত ব্যবধান তৈরি করে বেরিয়ে আসতে পারে জাফর। এটা সে নিয়মিত করে থাকে। গত অ-২৩ এশিয়া কাপের বাছাইতে জর্দানের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের প্রথম হুমকিমূলক আক্রমণ কিংবা এই অ-১৮ সাফে ভারতের বিপক্ষে দলের সমতাসূচক গোল করা মাহবুব কে ক্রস করার পূর্বে ডিফেন্ডারকে যেভাবে কাঁটিয়ে জায়গা করে নিয়েছিল এবং ভূটানের বিপক্ষে দ্বিতীয় গোলটি দেখুন। আশফাকের মত বক্সের বাইরে থেকে ‘বার্স্ট’ শটে গোল করতে পারে জাফর যা আমরা অ-১৮ সাফে মালদ্বীপের বিপক্ষে দেখলাম। আশফাকের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সে লেফট উইং থেকে আড়াআড়ি তিন-চার জন ডিফেন্ডারকে ফলস্ শটে ডজ দিয়ে সাথে ড্রিবল করে বক্সের ভেতর থেকে ডান বা বাম পায়ে শট নেয় সুবিধামত। এটা আমি জাফরকে করতে দেখেছি গত মৌসুমে শেখ জামাল ও উত্তর বারিধারা’র বিপক্ষে। উভয় ক্ষেত্রেই তিন জন ডিফেন্ডারকে কাঁটিয়ে সেকেন্ড পোস্টে ডান পায়ে শট নিয়েছিল সে এবং উভয় ক্ষেত্রেই অল্পের জন্য গোল হয়নি। আশফাকের বডি ডজ নিয়ে তো কিছু বলার নেই। গত লীগে ঢাকা মোহামেডানের সাথে খেলার ৭২তম মিনিটে প্রতিপক্ষ গোলকিপারের উদ্দেশ্যে এক ডিফেন্ডারের ব্যাক পাস সে পা না ছুঁয়েই ওই সোজা বলটি যেভাবে বডি ডজে গোলকিপারকে ছাড়িয়ে নিয়ে গোল করেছিল তা এক কথায় অনন্যসাধারণ। আশফাক কে অনেক বাজে ফাউলের শিকার হতে দেখেছি আমরা। আরামবাগের টিন এজ জাফর কে আটকাতেও তাকে অনেক বাজেভাবে ফাউল করতে দেখেছি গত মৌসুমে। এর ভেতর সবচেয়ে নির্লজ্জজনক ছিল ব্রাদার্সের এক খেলোয়াড় তাকে দুই পায়ে ট্যাকল করে যা সরাসরি লাল কার্ড পাবার মত শাস্তিযোগ্য অথচ রেফারি শুধু হলুদ কার্ড দেখিয়েছিল। ঢাকা মোহামেডানের বিপক্ষে ওই ম্যাচের ইনজুরি টাইমে দুই জনের মাঝ দিয়ে দারুণভাবে বল নিয়ে বেরোতেই তৃতীয় একজন এসে তার বুকে কনুই মেরে ফেলে দিয়েছিল।

মজার ব্যাপার হচ্ছে জাফরের গোল উদযাপনটাও আলী আশফাকের মত। সেও দুই হাত দুই পাশে প্রশমিত করে উড়াল দেবার ভঙ্গিতে উদযাপন করে।

পার্থক্য বলতে গেলে আশফাকের মত শারীরিকতা নেই ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার জাফরের। এগ্রেসন ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজে খানিক পিছিয়ে। আর বাংলাদেশিদের চিরায়ত দুর্বলতা যেটা যে সব ঠিকঠাক করলাম কিন্তু পোস্টের সামনে গিয়ে শটটা ঠিকমত নেয়া হয় না- জাফরেরও এরকম হয় মাঝে মধ্যে। শ্যুটিং পাওয়ার আশফাকের মত ভালো না। তবে এই বয়সে দেশিদের থেকে শ্যুটিংয়ে যথেষ্ট ভালো আছে সে। দিন দিন অভিজ্ঞ হয়ে উঠবে সে এবং পরিশ্রম করে প্রাপ্ত গুণাবলী ধরে রাখলে জাতীয় দল যে কতটা উপকৃত হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই সাথে আশা রাখবো যে তার ভেতর যেন আশফাকের মত সর্বদা খুনে মানসিকতা বিরাজ করে। মরিয়া হলে জাফর কতটা খুনে হতে পারে তা অ-১৮ সাফে ভূটান টের পেয়েছে। ৪ ম্যাচে ৫ গোল (সাথে ১ এসিস্ট) করে গোল্ডেন বুট অর্জন করেছে জাফর সেখানে।

এবারে আরও কিছু তুলনায় আসি। গত মৌসুমে জাফর যেন আরামবাগের মামুনুল ছিলেন। নিয়মিত ফ্রি কিক আর কর্ণার নিয়েছেন, মাঝে মধ্যেই ফরোয়ার্ডদের উদ্দেশ্যে মাঝারি পাল্লার বল বিলি করেছেন। তবে হ্যা সে খেলে উইংয়ে আর মামুনুলের মত হোল্ডিং মিডফিল্ডারের মত কাজ করে না। তার ফ্রি কিক আর কর্ণার ডেলিভারিগুলো মামুনুলের মত কার্যকর ও ক্ষুরধার না হলেও প্রতিপক্ষের জন্য যথেষ্ট অস্বস্তির উদ্রেক করে। জাহিদের মত ‘ইঞ্চ পারফেক্ট’ না হলেও জাফরের ক্রসগুলো যথেষ্ট ভালো। ড্রিবলিংয়ে জাহিদের সমস্যা হচ্ছে সে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে নিজেকে ‘শো’ করে অর্থাত্‍ তার গতিবিধি ও নড়াচড়া থেকে বোঝা যায় যে সে কখন ও কোন দিক দিয়ে ড্রিবলিং করে বেড়োতে পারে। এতে করে দুর্বল বা সমমানের দলের বিপক্ষে সফল হওয়া গেলেও উঁচুমানের দলের বিপক্ষে জাহিদের কার্যকারিতা কম এবং ড্রিবলিং করে বার বার বল হারিয়ে দলকে চাপে ফেলে দেয় সে। এদিক দিয়ে আলফাজের মত অল্প জায়গায় ও মুহূর্তের সিদ্ধান্তে পায়ের কারিকুরিতে বল নিয়ে বেরিয়ে আসবার ক্ষমতা আছে জাফরের। অ-১৮ সাফ থেকে তার হেডিং দক্ষতারও প্রমাণ পেয়েছি আমরা। উইদাউট দ্য বল মুভমেন্ট ভালোই। তার চেজিং ও বল রিকোভার করবার ক্ষমতা ও ধরণ একজন বিশেষ ফুটবলারের কথা মনে করিয়ে দেয় তবে আপাতত তার নাম নিতে চাচ্ছি না, বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।

সাফ অনুর্ধ্ব-১৮ চ্যাম্পিয়নশিপের সর্বোচ্চ গোলদাতা

এত সব তুলনা টানছি সবাইকে বোঝাতে যে কতটা সম্ভাবনাময়ী এই জাফর, এটা বোঝাতে না যে সে সব কিছু উদ্ধার করে ফেলেছে ইতিমধ্যে। তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে নিখুত হতে এবং ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসার স্বার্থে। ফুটবলের প্রতি নিষ্ঠা ও ভালোবাসা কমলে হবে না। সর্বশেষ সাফ চ্যাম্পিয়নসিপে ভূটানের বিপক্ষে মামুনুলের ভূড়ি অত্যন্ত দৃষ্টিকটু লেগেছিল। তখন ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিকভাবে এতো ব্যস্ত সময় গিয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবলের যে এর ভেতর ভূড়ি হবার সুযোগ হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। অবিশ্বাস্য প্রতিভা থেকে প্রাপ্ত খ্যাতি ফুটবলের প্রতি মামুনুলের প্যাশনে তথা নেশাতে ঘাটতি তৈরি করেছিল যার জন্য এই অঘটন। সবাই খেলাটা শুরু করে খেলাটার প্রতি নেশা থেকে, ভালোবাসা থেকে- টাকার জন্য না। অথচ এই অঢেল টাকা ও খ্যাতির খপ্পরে পড়ে সেই ভালোবাসা ও শপথ উবে যায়, নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশ ফুটবল। ফুটবলকে ভালোবেসে যে কথা দিয়েছে জাফর, সে কথার বরখেলাপ যেন না হয় সেদিকে তার সজাগ দৃষ্টি কাম্য। তুমি হারিয়ে যেও না জাফর! বাফুফে আর ক্লাবগুলোর কথা আর নাই-বা বললাম!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close