খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

ইটস কামিং হোম?

ক্রীড়া দুনিয়ায় ‘ওয়ান হিট ওয়ান্ডার’ বলে একটি কথা বেশ প্রচলিত রয়েছে। কোন ব্যক্তি বা দল যদি আকস্মিকভাবে একটি টুর্নামেন্টে ভালো করে ফেলে, কিন্তু তারপর সেই সাফল্যের ধারা অব্যহত রাখতে না পারে, তাহলে ধরে নেয়া যেতেই পারে যে ওই একবারের সাফল্য নেহাতই একটি দুর্ঘটনা ছিল। এবং সেটি প্রকৃত বাস্তবতার প্রতিফলন ছিল না কখনোই।

ফুটবলের ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা প্রযোজ্য। হ্যাঁ, তারা একবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন বটে, কিন্তু সেটি তারা কবে জিতেছিল? সেই সুদূর অতীতে, আজ থেকে ৫২ বছর আগে, ১৯৬৬ সালে। এরপর তারা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেই উঠতে পেরেছে মাত্র একবার। সেটিও আজ থেকে ২৮ বছর আগে।

কোয়ার্টার ফাইনালে আফ্রিকান দল ক্যামেরুনকে ৩-২ গোলের ব্যবধানে হারানোর মাধ্যমে ১৯৯০ বিশ্বকাপের শেষ চারে উঠে গিয়েছিল তারা। কিন্তু ফাইনালে উত্তরণের লড়াইয়ে পশ্চিম জার্মানীর সাথে নির্ধারিত সময়ের খেলায় ১-১ গোলে ড্র করার পর পেনাল্টি শ্যুট আউটে ৪-৩ গোলে হেরে গিয়েছিল তারা। এরপর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও হতাশ হতে হয়েছিল তাদেরকে। স্বাগতিক ইটালির কাছে ২-১ গোলে হেরে গিয়ে আসরের চতুর্থ সেরা দল হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল তাদেরকে।

২০০৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে তারা প্যারাগুয়েকে হারাতে সমর্থ হয়েছিল। এরপর দুইটি আসরে তারা নিজেদের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেও জয়ের দেখা পায়নি। ২০০২ সালের পর থেকে তারা বিশ্বকাপের কোন নক-আউট রাউন্ডেও জিততে পারেনি। এমনকি এর আগে তিনবার বিশ্বকাপে খেলা পেনাল্টি শ্যুট-আউটে গড়ালেও, সেখানে শেষ হাসি হাসার সুযোগ হয়নি তাদেরকে।

সুতরাং সাম্প্রতিক অতীতে বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের যে রেকর্ড, তা একদমই আশাজাগানিয়া নয়। অথচ সেই তারাই কিনা নিজেদেরকে ফুটবল খেলার জনক হিসেবে দাবি করে! প্রতিবার বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইংলিশ মিডিয়া চরম মাতামাতি শুরু করে দেয় তাদের ঘিরে। কাগজে-কলমে তাদেরকেই সম্ভাব্য জয়ী হিসেবে ঘোষণা করে দেয়ার পাশাপাশি ‘ফুটবল ঘরে ফিরছে’ কথাটিও বারবার উচ্চারণ করতে থাকে।

এবার ৪৭ বছর বয়সী গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনে তারুণ্যে ভরপুর ইংল্যান্ড দলটিকে নিয়ে কেউই খুব একটা মাতামাতি করেনি বিশ্বকাপ শুরুর আগে। এমনকি ইংলিশ মিডিয়াকেও অনেক নিস্তেজ মনে হয়েছে। আর যেহেতু বিশ্বকাপ ইতিমধ্যেই কোয়ার্টার ফাইনাল পেরিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে, তাই বিশ্বকাপ প্রসঙ্গ এই মুহূর্তে ইংলিশ মিডিয়া থেকে একেবারেই হারিয়ে যাওয়ার কথা।

কারণ তাদের কাছে তো হিট পাওয়ার মত সংবাদের অভাব নেই! গ্রীষ্মের উষ্ণ রোদ উঠেছে, নির্মল হয়েছে প্রকৃতি। পুরোদমে চলছে উইম্বলডন টেনিস। স্ট্রবেরির মূল্য আশ্চর্যজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রিন্স হ্যারিও মাত্র কয়েকদিন আগেই এক সাবেক টিভি তারকাকে বিয়ে করেছেন। সবমিলিয়ে ইংলিশ মিডিয়ার কাছে জরুরী মনে হওয়ার মত সংবাদ উপাদান রয়েছে বিস্তর।

কিন্তু তারা সেই সবকিছুকে বাদ দিয়ে এখন শুধু বিশ্বকাপ নিয়েই পড়ে আছে। আবারও তারা নিজেদের দলকে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নের খেতাব দিয়ে দিচ্ছে। ‘ইটস কামিং হোম’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারিদিক।

ইংল্যান্ড, রোড টু ফাইনাল, ২০১৮ বিশ্বকাপ

এসবের কারণ কী? কারণ খুবই সহজ। এবারের বিশ্বকাপে সত্যি সত্যিই অতীতের সব গ্লানি ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছে হ্যারি কেইনের নেতৃত্বাধীন ইংল্যান্ড দলটিকে। ২৮ বছর পর তারা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে। আর সেই সেমিফাইনালে ওঠার পথে তারা ভেঙে দিয়েছে অপরাপর সকল অভিশাপও।

নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচেই তিউনিসিয়ার বিপক্ষে জয় তুলে নিয়েছে তারা। রাউন্ড অফ সিক্সটিনে তারা জয়খরা দূর করেছে কলম্বিয়াকে হারানোর মাধ্যমে। তাও আবার সেই জয়টি তারা পেয়েছে পেনাল্টিতে, যে পেনাল্টিতে জয় এতদিন তাদের কাছে হয়ে ছিল দুর্গম পর্বত জয়ের সামিল।

এতসব অসম্ভবকে সম্ভব করার পর ইংলিশ মিডিয়া ও ইংল্যান্ড সমর্থকরা যে আনন্দে উদ্বেল হয়ে যাবে, উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়বে, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে। সেমিফাইনালে উঠতে পারা অবশ্যই এই ইংল্যান্ড দলটির জন্য অসাধারণ একটি অর্জন। এতদূর যেহেতু তারা আসতে পেরেছে, শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাওয়াও অসম্ভব কিছু নয় আর।

তবে কাগজে কলমে ২৫ শতাংশ করে সুযোগ তো থাকছে সেমিফাইনালে খেলা চার দলেরই। কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা আলাদা। বেশিরভাগ ফুটবলবোদ্ধারই দৃঢ় বিশ্বাস, এবারের বিশ্বকাপ জয়ী দলটি আসবে ড্রয়ের অপর অর্ধ থেকেই। অর্থাৎ বেলজিয়াম ও ফ্রান্স দলই বিশ্বকাপ জয়ের জন্য শীর্ষ ফেভারিট। এই দুই দলের মধ্যকার সেমিফাইনালে জয় পাবে যে দলটি, ১৫ জুলাই মস্কোতে বিশ্বকাপে চুমু খাবার সম্ভাবনাও তাদের জন্যই সবচেয়ে বেশি। সে তারা ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে ক্রোয়েশিয়া কিংবা ইংল্যান্ড যাকেই পাক না কেন!

কিন্তু এত সব হিসাব-নিকাশ করার সময় কোথায়! সাউথগেটের অধীনে ঐতিহ্যবাহী সাদা জার্সি পরে মাঠে নামা ইংলিশদের মনে নতুন স্বপ্নের রঙ লেগেছে। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইডেনকে অনায়াসে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে দেয়ার পর, তাও আবার স্কোরশিটে হ্যারি কেইনের বদলে হ্যারি ম্যাগুয়ের ও ডেলে আলীর গোলের বদৌলতে, তারা এখন স্বপ্ন দেখছে বিশ্বজয়ের। ভালোবাসছে ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘ফুটবল ইজ কামিং হোম’ গানের তালে বুঁদ হয়ে থাকতে। সেই সাথে বিটলসের ‘অল ইউ নিড ইজ লাভ’এর সাথে একাত্ম হতেও।

দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত ফুটবল আসলেই ঘরে ফেরে কি না! শেষ পর্যন্ত ইংলিশ ফুটবল দল আসলেই দেশবাসী তো বটেই, সেই সাথে গোটা বিশ্ববাসীরও, ভালোবাসায় সিক্ত হয় কি না!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close