ইনসাইড বাংলাদেশরক্তাক্ত একাত্তর

রক্তাক্ত ’৭৫: ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ!

‘সে দিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে আমার। খুব ভোরে আমাদের ঘুমে থেকে ডেকে তুললেন বাবা। তাকে খুব ব্যথিত দেখাচ্ছিলো। কান্নাভেজা গলায় বললেন – ওরা শেখ মুজিবকে মেরে ফেলেছে’। মুনতাসীর মামুনকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে অনেকটা এরকমই ছিলো বেনজীর ভুট্টোর স্মৃতিচারণ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দীর্ঘপ্রতিদ্বন্দ্বীর মৃত্যুর খবরে মেয়ের চোখে এমন প্রতিক্রিয়াই ছিলো জুলফিকার আলী ভুট্টোর। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন স্বাক্ষ্য দিচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের খবরটা ভুট্টোর কাছে প্রত্যাশিত ছিলো, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তার কাছে পৌছে যায় তা। নতুন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারকে সবার আগে স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান। স্বীকৃতির সঙ্গে নজরানাও ছিলো। অত্যন্ত খুশীর সংবাদে যেমন দেয় তার মতো সামন্তপ্রভুরা। ৫০ হাজার টন চাল, প্রচুর থানকাপড় এবং অন্যান্য উপহার সামগ্রী নিয়ে ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার প্রস্তুতি নেয় পাকিস্তানী জাহাজ সাফিনা-ই-ইসমাইল।

ভুট্টোর খুশী ডাবল হওয়ার কারণ ছিলো। ১৫ আগস্ট নির্মম সে হত্যাকাণ্ড শেষে বাংলাদেশের সুন্নতে খাতনাটাও সেরে ফেলে খুনীর দল। রক্তাক্ত সে ভোরে ইথারে ভেসে আসে: আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরাচারি শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। জননেতা খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে এবং সারাদেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশ এখন থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র। ভুট্টোর মনে পড়ে যাওয়ার কথা চার বছর আগের সেই জনসভা। না হয় একটু খুন-জখম হয়েছে। তাই বলে মুসলমান একটা দেশকে আলাদা হয়ে যেতে হবে! তাও জন্মশত্রু ভারতের কোলে চেপে! হিন্দুদের দালাল মুজিবের ধর্মনিরপেক্ষতার বড়ি গেলা স্বাধীনতাকামী বাঙালীদের উদ্দেশ্যে শুনিয়েছিলেন তার সেই অমর বাণী: শুয়োরকে বাচ্চে, জাহান্নামমে যাও…। সেই শুয়োরের বাচ্চাদের এখন বুকে তুলে নিতে বাধা নেই, হাজার হোক মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। 

উপরের কথাগুলো যাদের কাছে শ্লেষাত্মক মনে হচ্ছে, তাদের সবিনয়ে জানাই যে শুধু ভুট্টোই নয়, গোটা পাকিস্তানে মুজিব হত্যার প্রতিক্রিয়া ছিলো ঠিক এরকম। ১৫ আগস্ট রাতে পাকিস্তান সরকারের পাঠানো আনুষ্ঠানিক বিবৃতিটি সেদেশের পত্রিকাগুলোয় পৌছে, তাতে শেখ মুজিবের হত্যায় শোকও প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানের বিভক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাতে উল্লিখিত উপহারের ঘোষনা দেওয়া হয় এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আহবান জানানো হয়। বিবৃতিতে ভুট্টোর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়: As a first and spontaneous gesture to the fraternal people of Bangladesh, I have decided to immediately dispatch to Bangladesh as a gift from the people of Pakistan 50,000 tons of rice, 10 million yards of long cloth and five million yards of bleached mull. This is only a modest contribution of our people to our brothers in Bangladesh in their hour of need. We are prepared to make a greater contribution within our greater capacity for the well being of the people of Bangladesh with whom we have shared common nationhood and destiny. Let the world know that we stand together in weal and woe. We respectfully urge the state members of the Islamic conference to accord recognition to the new government of the Islamic Republic of Bangladesh and we appeal to all countries of the third world to do likewise. This appeal stems from our anguished awareness of how our country has dismembered by an international conspiracy culminating in aggression. I grieve that Sheikh Mujibur Rahman and members of his family have met a tragic end. মাসচারেক আগে পাকিস্তান থেকে আরেকটি শোকবার্তা গিয়েছিলো বাংলাদেশে, খোদ বঙ্গবন্ধুর কাছে। শেখ মুজিবের পিতার মৃত্যুতে ভুট্টো স্বান্তনা জানিয়েছিলেন।

স্বীকৃতির পাশাপাশি খন্দকার মোশতাকের কাছে একটি ব্যক্তিগত বার্তাও পাঠান ভুট্টো। তাতে সামরিক অভ্যুত্থানের নামে সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব যদি হুমকির মুখে পড়ে তাহলে সর্বশক্তি দিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাড়ানোর প্রতিশ্রুতি ছিলো। ভুট্টো লেখেন: Pakistan will resolutely undertake efforts to uphold and defend the political independence, the state soverignity and territorial integrity of Bangladesh.

এবার দেখা যাক পাকিস্তানের জনগন কিভাবে নিয়েছিলো খবরটা। ২০ আগস্ট ইসলামাবাদের মার্কিন দুতাবাস থেকে পাঠানো তারবার্তায় লেখা হয় : News of the murder of Mujib was received with satisfaction by press and many Pakistanis, only a few intellectuals seemed to regret the violent manner in which he was removed, but not the results. Mujib was widely characterized as a traitor to Pakistan and Islam whose establishment of a dictatorship was the immediate cause of his downfall and who had died as a traitor and dictator should. সেখানে জামাতে ইসলামীর আধ্যাত্মিক নেতা মাওলানা মওদুদীর প্রতিক্রিয়ায় ঘটনাকে আল্লাহর আশীর্বাদ এবং ইসলামের বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে পাকিস্তানী জনগণ মনে করে মুজিব হত্যায় ভুট্টোর হাত আছে এবং ভূট্টোও ঠারেঠোরে তা বুঝিয়ে দেন। 

ওই বার্তায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি ছিলো বাংলাদেশের ইসলামি প্রজাতন্ত্র বিষয়ক সংশয়। ভুট্টো আগবাড়িয়ে তার বিবৃতিতে বাংলাদেশকে ইসলামিক রিপাবলিক বলে উল্লেখ করলেও তার আড়াইদিন পরও বাংলাদেশ সরকার তরফে এমন কোনো ঘোষণা আসেনি। বড় মুখ করে বিভিন্ন ইসলামী দেশগুলোর স্বীকৃতি আদায়ে তার দুতিয়ালিও এই প্রেক্ষিতে খানিকটা হোচট খায়। অন্যভাবে বললে ব্যাপারটা ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে নেন তিনি। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে বাংলাদেশ রেডিও এবং বিভিন্ন বার্তাসংস্থার টিকার সার্ভিসই (গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের সংক্ষিপ্ত রূপ) ছিলো পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের খবর জানার একমাত্র মাধ্যম। মেজর ডালিমের প্রথম ঘোষণা এবং বার্তাসংস্থা এএফপি ও রয়টার্সের তা হুবহু পরিবেশনকেই ভুট্টো তার ওই সম্বোধনের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন পরে। নেপথ্যের সত্যিটা পরের পোস্টে পরিষ্কার হয়ে যাবে, সেখানে বোঝা যাবে ভুট্টো আদৌ ভুল করে বলেছেন, নাকি চুক্তিটা সেরকমই হয়েছিলো।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের একটা বড় অভিযোগ ছিলো মুজিব ছিলেন রুশ-ভারতের দালাল। ৬ আগস্ট ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টারের সঙ্গে আলাপে মুজিব অবশ্য ডিফেন্ড করেছিলেন নিজেকে । বলেছিলেন :

আমি মার্ক্সিস্ট না, আমি একজন সমাজতন্ত্রী, তবে আমার নিজস্ব ধরণের সমাজতন্ত্রী। আমি সব দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই, কিন্তু কোনো দেশ যদি আশা করে আমি তাদের নির্দেশমতো চলবো সেটা হবে ভুল। আমি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া দুইদেশেরই খুব ভালো বন্ধু হতে চাই। কিন্তু আমি রাশিয়া বা আমেরিকার দালাল হতে চাই না। 

হত্যাকান্ডের পর ভারত ও সোভিয়েত আগ্রাসনবাদ থেকে বাংলাদেশ উদ্ধার পেয়েছে এমন একটা মতবাদের পক্ষে প্রচারণা তাই জোরালো ছিলো। আর এই অক্ষ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ছিলো মার্কিন-চীন এবং ইসলামী দেশগুলোর জোরালো সমর্থন। মোশতাক ঠিক সেকথাই বলেছিলেন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বোস্টারের সঙ্গে তার প্রথম বৈঠকে। ২০ আগস্টের তারবার্তায় বোস্টারের বরাতে লেখা হয়েছে :

উনি বললেন এখনও তার চাহিদামতো কোনো এজেন্ডা তৈরি না হলেও ১৯৭১ সালে হারানো সুযোগটা আজ নষ্ট করা উচিত হবে না। প্রসঙ্গটা উনি মে মাসে আমাদের দুজনের এক সাক্ষাতকারে একবার উল্লেখ করেছিলেন যে কলকাতায় মার্কিন দুতাবাসের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একটা সমঝোতার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত যা ফলপ্রসু হয়নি।

সাক্ষাতকারের ব্যাপারগুলো পরের লেখাটিতে আলোচনা করা যাবে। তবে মোশতাক ও ভুট্টোর দুজনেরই উদ্যোগ এবং তৎপরতায় এটা স্পষ্ট ছিলো যে তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের শেষ পর্বটা নতুন করে লেখতে চাইছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের দুই মিত্র ভারত এবং রাশিয়া এবার প্রতিপক্ষ হবে। সৌদি আরব-চীন এবং মার্কিন সহায়তায় আবার একজোট হয়ে যাবে দুই পাকিস্তান।

এই পর্যায়ে এসে ইসলামী প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ একটা দারুণ সহায় হলেও, শেষ পর্যন্ত তা ঝামেলা হয়ে দাড়ায় নানা বিবেচনায়। প্রথমত ভারত এ ব্যাপারে তাদের আপত্তি জানিয়ে দেয় স্পষ্টভাবেই। মুজিব হত্যাকাণ্ডসহ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে তারা কূটনৈতিক ভাষায় ‘বাংলাদেশের আভ্যন্তরিন সমস্যা’ বলে মেনে নিতে রাজী। কিন্তু নতুন সরকারের কোনো সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে সীমান্তে আবারও শরণার্থীর ঢল নামলে তারা বসে থাকবে না। ঘটনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানের স্বীকৃতি এবং ত্রাণসহায়তা পাঠানোর ব্যাপারটা সন্দেহজনক বলে জানায় তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় (এ বিষয়গুলো নিয়ে আলাদা পোস্টে আলোচনা হবে)। মোশতাকের টনক নড়ে, ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে নিশ্চয়তা দেওয়া হয় নাম পরিবর্তনের ব্যাপারটি ঘটবে না। তবে মোশতাক যে অসহায় নন তার প্রমাণও পায় ভারত। সীমান্ত জুড়ে চীনের রণসজ্জা তাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করায় যে বাংলাদেশ আক্রমণ করলে যুদ্ধটা অ্নেকগুলো ফ্রন্টে ছড়িয়ে যাবে। ২০ এপ্রিলের সিকিম অভ্যুত্থান কিংবা তামিলল্যান্ডে ভারতীয় সেনাদের উপস্থিতির পুনরাবৃত্তি থেকে তাই নিশ্চিত থাকে ঢাকা। অবশ্য মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দিতে খুব বেশী সময় নেয়নি ভারতও। মোশতাক অবশ্য ইতিমধ্যে কিছু পরিবর্তন এনেছেন। বক্তৃতায় জয় বাংলার বদলে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ দিয়ে যার শুরু। বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ নিষিদ্ধ এবং তার ছবি সব জায়গা থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। তার সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে টুপিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পোষাকের অংশ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া। রাষ্ট্রীয় পোষাক নির্ধারিত হয় তার সবসময়কার পরিধেয় আচকান এবং শেরওয়ানি । ৬ অক্টোবর মন্ত্রীপরিষদে এ ঘোষণা দেওয়ার আগে নিজের মাথার টুপিটাকে টেবিলে নামিয়ে সেটার দিকে আঙুল তুলে তার মনোভাব জানান তিনি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ছিলো চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন সরানোর কাজে নিয়োজিত সোভিয়েত নৌবাহিনীর সঙ্গে চুক্তি নবায়নে অস্বীকৃতি। আগের বছরই চুক্তি শেষ হয়ে গেলেও তখনও তারা চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়ে যায়নি, মোশতাক তাদের যেতে বাধ্য করলেন।

২৬ আগস্ট ভুট্টোকে পাঠানো তার চিঠি প্রকাশিত হয় পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় । ভুট্টোর ইসলামী প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সম্বোধনের জবাবে মোশতাক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবেই নিজেকে উল্লেখ করেছেন। তবে ঘাটতিটা পুষিয়ে দিয়েছেন ইসলামী সম্বোধনে। আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে লেখা সে চিঠিতে পাকিস্তানের সঙ্গে আবার আগের মতো সম্পর্ক স্থাপনে বাংলাদেশের জনগণ যে মুখিয়ে আছে এমন মনোভাব দেখান মোশতাক। লিখেন : “

ASSALAM-O-ALAIKUM: 

YOUR EXCELLENCY, I HAVE THE HONOUR TO ACKNOWLEDGE RECEIPT OF YOUR EXCELLENCY’S MESSAGE CONVEYED BY THE EMBASSY OF SWITZERLAND ON AUG. 18, 1975, AS WELL AS THE MESSAGE RECEIVED THROUGH YOUR AMBASSADOR IN RANGOON. “MAY I, ON BEHALF OF THE GOVERNMENT AND PEOPLE OF BANGLADESH, GRATEFULLY ACKNOWLEDGE THE GESTURES SO SPONTANEOUSLY MADE BY THE GOVERNMENT AND PEOPLE OF PAKISTAN.

“THE GOVERNMENT AND PEOPLE OF THE PEOPLE’S REPUBLIC OF BANGLADESH LOOK FORWARD WITH CONFIDENCE TO THE EARLIEST OPENING OF A NEW CHAPTER BETWEEN OUR TWO COUNTRIES, THE NORMALIZATION OF RELATIONS AND THE FORGING OF FRIENDLY AND BROTHERLY TIES BETWEEN US.”IN THE END, EXCELLENCY, I WOULD LIKE TO TRANSMIT GREETINGS FROM THE PEOPLE AND GOVERNMENT OF THE PEOPLE’S REPUBLIC OF BANGLADESH TO THE PEOPLE AND GOVERNMENT OF THE ISLAMIC REPUBLIC OF PAKISTAN.”

মজার ব্যাপার হচ্ছে ঢাকা থেকে রেডিওতে এই চিঠিপত্র চালাচালির ব্যাপারে বেশ রাখঢাক রেখে খবর প্রচার করা হয়। বলা হয় সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ হয়েছে। ভুট্টোর বার্তার ব্যাপারে জানানো হলেও উপঢৌকনের কথা চেপে যাওয়া হয়।

চমকপ্রদ ঠেকতে পারে যে, মোশতাক বাকশাল বাতিলসহ শেখ মুজিবের গৃহীত প্রচুর নীতিতে পরিবর্তন আনলেও মুক্তিযুদ্ধের চার চেতনায় হাত দেননি, কিংবা বলা যায় দেওয়ার সাহস পাননি। খুনীদের সুরক্ষার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ প্রণয়ন, স্বাধীনতাবিরোধীদের মুক্তি দিতে দালাল আইন বাতিলসহ ভুট্টোকে খুশী করার জন্য তার পদক্ষেপ কম ছিল না। ভুট্টো ধৈর্য্য ধরতে রাজী হলেন। হুট করে কিছু না করে নতুন সরকারকে থিতু হওয়ার সুযোগ দেওয়াটাকে তার কাছে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হলো। আপাতত জাহাজ কূটনীতি এবং দুদেশের দুতাবাস স্থাপনের মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই জাহাজ কূটনীতি প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। ১৯৭৩ সালে মুজিব খাদ্য সঙ্কট সমাধানে তৃতীয় মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে চাল কিনেছিলেন। ১৩মে মাদ্রাজ উপকুলে ৯ হাজার ৮০০ টন চালসহ ডুবে যায় গ্রিক জাহাজ স্পাইরোস। ২২মে জানা যায় ব্যাপারটা ছিলো অন্তর্ঘাত এবং এতে জাহাজের দুই পাকিস্তানী ক্রু জড়িত। দেশে কৃত্রিম খাদ্যসঙ্কট সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্রের জন্য পাকিস্তানকে সেবার কূটনৈতিকভাবে অভিযুক্ত করেছিলো ঢাকা। পাকিস্তানের জন্য বিব্রতকর ছিলো ৭৪ সালের ঘটনাটি। বাংলাদেশের বন্যাদূর্গতদের জন্য ৫ হাজার ৫০০টন চাল ও ৮৯০টন কাপড় পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন ভুট্টো। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে প্রভাবিত করার ফন্দি বলে সন্দেহ করে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন মুজিব।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য সফরে ভুট্টোকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সৌদি আরব অভিযোগ করে , শুরুতে বললেও বাংলাদেশ এখনও নিজেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষণা করেনি। এ ব্যাপারে বিভিন্ন মুসলিম দেশ, এমনকি পাকিস্তান থেকেও (বলা উচিত যে গোলাম আজমসহ জামাতে ইসলামীর অনেক নেতাই তখন সৌদি বাদশার আতিথ্যে, তাদের নাগরিকত্ব তখনও পাকিস্তানী) ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অভিযোগ এনেছে। তাই তারা স্বীকৃতি প্রত্যাহারের কথা ভাবছেন। জবাবে পাকিস্তানী তরফে বলা হয়, যে ঢাকা অভ্যুত্থানে ধর্মনিরপেক্ষতাপন্থী, ভারতপন্থী এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিভক্তির পক্ষের শক্তিতে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়েছে। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে মাথায় রেখেও বলা যায় যে বাংলাদেশ সরকার ধীরে ধীরে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে যা ভবিষ্যতে পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের পক্ষেই যাবে। বাংলাদেশ যে ভারতের চাপেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দিতে পারেনি এমনটাও জানায় পাকিস্তান। এরপর সৌদি আরব রাজী হয় স্বীকৃতি প্রত্যাহার না করতে।

দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ঘোষণা আসে ৪ অক্টোবর । নিউইয়র্কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবু সাঈদ চৌধুরী এবং পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী আজিজ আহমদের মধ্যে অনেকগুলো বৈঠকের পর এ ঘোষণা আসে। এতে দুই দেশের মধ্যে দুতাবাস স্থাপনের মাধ্যমে সম্পর্কোন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়। একইদিন ইসলামাবাদ থেকে পাঠানো তারবার্তায় বাড়তি কিছু খবর ছিলো। এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে ইসলামাবাদে একজন মন্ত্রীকে তার প্রতিনিধি হিসেবে পাঠিয়েছিলেন মোশতাক। এছাড়া করাচির এক পত্রিকায় বাংলাদেশ-পাকিস্তানের জোট (কনফেডারেশন) আসন্ন এমন এক খবরে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার কথাও জানা যায়। আগের রাতে পবিত্র শব-ই ক্দর উপলক্ষ্যে এক ভাষণেও মোশতাক একই ঘোষণা দেন। সে ঘোষণায় পরের বছর অর্থাৎ ’৭৬ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক কর্মকান্ডের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান তিনি। সব ধরণের রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি ’৭৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণাও দেওয়া হয়।

এর আগে ৩ সেপ্টেম্বরের এক তারবার্তায় পাকিস্তানের বন্যা দূর্গত অঞ্চলে বাংলাদেশ সরকারের একটি মেডিকেল টিম পাঠানোর খবর জানা যায়, বন্যার খবরে মোশতাকের উদ্বেগও জানানো হয়। পাকিস্তান মেডিকেল টিমকে অপ্রয়োজনীয় মনে করলেও শুভেচ্ছাদুত হিসেবে তাদের গ্রহণ করতে সম্মতির কথা জানায়। একই তারবার্তায় ভুট্টোর ঘোষিত উপহার সম্পর্কে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা হায়াত মেহেদি জানান যে উপহারের যোগাড়যন্ত্র চলছে। তবে বাংলাদেশ সরকার এই উপহার গ্রহণ করবে কিনা এ ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সম্মতি তাদের তরফে এখনও আসেনি। ২৩ সেপ্টেম্বরের তারবার্তায় জানা গেছে উপহারের প্রথমভাগ জাহাজে ওঠানো হয়েছে এবং সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে ৭ অক্টোবর তা সেখানে পৌছবে। ১ অক্টোবর পাঠানো তারবার্তায় সেদিনের পাকিস্তানী পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় ১০ হাজার ২২০টন চাল এবং ২৩৬টন চাল নিয়ে সাফিনা-ই- ইসমাইল নামের জাহাজটি আগেরদিন চট্টগ্রাম রওয়ানা হয়েছে। এটি ১১ অক্টোবর পৌছবে। ভুট্টোর প্রতিশ্রুত বাকি উপহার নভেম্বরের মধ্যেই আরো তিন-চারটি জাহাজে বাংলাদেশে পৌছে যাবে। ১৯৭১ সালের পর এটি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় পাকিস্তানের প্রথম জাহাজ। এ ব্যাপারে পাকিস্তানের এক কর্মকর্তাকে মার্কিন দুতাবাস থেকে মজা করে জিজ্ঞেস করা হয় যে জাহাজটা আটক করে বাংলাদেশ এটা নিজেদের সম্পত্তি বলে দাবি করার সম্ভবানা কতটুকু। উত্তর আসে যে, আগে হলে সম্ভাবনা ছিলো, এখন নতুন সরকার।

নভেম্বরের সেনাঅভুথ্যানের সময়টা প্রত্যাশিত উদ্বেগে কেটেছে পাকিস্তান সরকারের। এ ব্যাপারে ৮ নভেম্বর মার্কিন দূতাবাসের পাঠানো তারবার্তায় জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্বপদে ফিরে আসায় স্বস্তির আভাসে মিলেছে ভুট্টোর তরফে। খালেদ মোশাররফের অভ্যুথানে যে ভারতের হাত ছিলো না সেটা তিনি অবিশ্বাস করেননি। তবে খালেদের ব্যাপারে পাকিস্তানীদের অস্বস্তিটা ছিলো পরিষ্কার কারণ তাদের পররাষ্ট্রদপ্তরের চোখে তিনি রাজনৈতিক ভাবমূর্তির একজন জেনারেল যা পেশাদার জিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। বিচারপতি সায়েমকে প্রধান সামরিক আইনপ্রশাসক রেখে জিয়াকে তার অধীনস্থ করার সম্ভাব্য কারণটি জানতে চান ভুট্টো। রাষ্ট্রদূত বাইরোড উত্তরে বলেন যে একজন বেসামরিক বিচারপতির অধীনে সামরিক বাহিনীর থাকাটা আগামী দিনগুলোর জন্য কম ঝুকিপূর্ণ। সংঘাতটা আগামীতে আরো বাড়তে পারে কিনা ভুট্টোর এই আশঙ্কার জবাবে বাইরোডের মন্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ :তেমন কোনো সম্ভাবনার খবর এখনও আমরা পাইনি। নৌ এবং বিমান বাহিনী রহমানের (জিয়া) এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গেই আছে, আর মুক্তিবাহিনীর (!) অবস্থা ছিন্নভিন্ন, তারা সামরিক বাহিনীর অধীনেই আছে। ঢাকার বাইরে সেনানিবাসগুলোতে খালেদ মোশাররফের প্রতি অনুগত বা তার মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ এমন কোনো সেনা ইউনিট আছে কিনা জানতে চাওয়া হলে বাইরোড ভুট্টোকে নিশ্চিন্ত করে বলেন তেমন কোনো খবর এখনও আমরা পাইনি।

তবে ভুট্টোর স্বপ্নটা জিয়ার হাতেও পূর্ণতা পায়নি। ইসলামী প্রজাতন্ত্র বিষয়ে কোনো ঘোষণা তিনিও দেননি। এ ব্যাপারে এয়ার ভাইস মার্শাল তোয়াব এবং কর্ণেল ফারুক রশীদরা পরের বছর মে পর্যন্ত তুমুল চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হন (এ ব্যাপারে বিস্তারিত আসবে পরের লেখাটিতে)। লিবিয়ার আনুকুল্যে তাদের অভ্যুথান প্রচেষ্টা সেনা বাহিনীতে তেমন পাত্তা পায়নি। ১৫ আগস্টের হোতাদের একজন লে.কর্নেল রশীদ তার কিছুদিন পর মার্কিন সাংবাদিক লুই সিমন্সকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে সখেদে জানান যে জিয়া তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছেন। রশীদ বলেন :

THERE WAS A GROWING DIFFERENCE BETWEEN ZIA AND TAWAB,” HE SAID. “TAWAB WANTED TO HAVE BANGLADESH DECLARED AN ISLAMIC REPUBLIC AND UNITE FIRMLY WITH OTHER ISLAMIC STATES FOR FINANCIAL AND MORAL SUPPORT”-AN ANTI-INDIAN MOVE.
ZIA WAS STRONGLY OPPOSED TO THIS, RASHID SAID, ADDING THAT ZIA IS GRADUALLY DROPPING THE ANTI-INDIAN POSTURE WITH WHICH HE TOOK CONTROL OF BANGLADESH FOLLOWING A BLOODY ARMED MUTINY IN DACCA NOV. 7. RASHID SAID THAT AT ONE POINT DURING HIS CONVERSATION WITH ZIA, THE GENERAL TOLD HIM THAT BANGLADESH COULD NOT SURVIVE IF IT CONTINUED TO BE ANTI-INDIAN.

ভারতের বিরোধিতা করে টেকা যাবে না জিয়ার এই উপলব্ধির পেছনে সঙ্গত কারণ ছিলো। সেটা অন্য পোস্টে আলোচনা করা যাবে। তবে বাংলাদেশের ইসলামী করণে মোশতাকের অসম্পূর্ণ কাজগুলো দক্ষ হাতেই সেরেছেন রাজনীতিতে নেমে, রাষ্ট্রপতি হয়ে। তার প্রতি ভুট্টোর শুভেচ্ছার প্রথম উপহারটিও ছিলো বেশ দামী। একটি ৭০৭ বোয়িং বিমান। ’৭৬ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতা বিপ্লবের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এটি ছিলো তার মুসলিম ভাইদের জন্য ভুট্টোর আরেকটি নজরানা।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close